শুভ বিজয়া ২০১৬

অর্ঘ্য দত্ত



সম্পাদকের সবথেকে বিরক্তিকর কাজটা বোধহয় সম্পাদকীয় লেখা। এ লেখা তো সবসময় স্বেচ্ছায় আসে না, একে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তৈরি করতে হয়। কী লিখব, কী নিয়ে লিখব ভাবতে ভাবতেই সময় চলে যায়। শোনার মানুষ আছে ভেবে একেক সময় বলার কথা বিজবিজ করতে থাকে। বিষয়ের কী অভাব আছে!! ভোররাতে তুলে আনা ফুটপাথের বালিকা থেকে মোকাম্বো, উরি থেকে তারক বিশ্বাস, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক থেকে দুর্গোৎসব, কিছু একটা নিয়ে লিখলেই হলো। অথচ, লিখতে বসলে সে সব নিয়ে লিখতেও ভালো লাগে না। এই সম্পাদকীয় লেখাটুকু ছাড়া আস্তে আস্তে একটি পত্রিকা তৈরি হয়ে ওঠার বাকি প্রক্রিয়াটুকু কিন্তু বেশ উপভোগ্য, ভারী আনন্দের! তার ওপর যদি সে কাজে সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়ের মতো একজন সহমর্মী এবং অক্লান্ত সাথী থাকে।
ভালোলাগা আমন্ত্রিত কবি লেখকদের মেল এলেই তো উত্তেজনা! সে লেখা পড়াও আনন্দের। প্রচুর আসা কবিতা থেকে বাছাই করা, কোনো কোনো লেখা সম্পাদনা করা, অদ্ভূত সব বানানের মুখোমুখি হওয়া, কাউকে কাউকে নিয়মিত তাগাদা দিয়ে লেখা আদায় করা, কখনো কোনো আমন্ত্রিত বা অতি পরিচিত কবি লেখকের লেখা পছন্দ না হলে বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার মতো কে সেই লেখা অমনোনীত হওয়ার অপ্রিয় খবরটি যথাস্থানে পৌঁছে দেবে তা'নিয়ে গুঁতোগুঁতি করা, সবেতেই আনন্দ, সবেতেই উত্তেজনা। কোনো কাজেই যেন খাটনির কষ্ট নেই। একি শুধুই নতুন কোনো কিছু করার সাময়িক উদ্দীপনা? নাকি পছন্দের কাজ করার আনন্দও! সিদ্ধার্থই শুধু নয়, দুই অরিন্দমও তো আছে। দল বেঁধে এক সাথে একটা ভালোলাগা কাজ করার তৃপ্তিও তো আছে!!
তা, কী নিয়ে কথা বলা যায় ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল, আত্মপ্রকাশ সংখ্যার পাঠকদের পাঠ প্রতিক্রিয়ায় বেশ কিছু প্রশ্ন, বেশ ইনটারেস্টিং কিছু প্রসঙ্গ ছিল। তা নিয়ে বরং এখানে দু-চার কথা বলা যাক। যেমন একজন লিখেছিলেন, 'পত্রিকাটা ভালই লাগল, অনেক লেখারই মান বেশ ভাল। তবে পত্রিকাটা করার কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য খুঁজে পেলাম না।' আমরা বলবো আপনার কাছ থেকে ঐ 'ভালোই লাগলো' টুকু শোনা ছাড়া আর কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য থাকলে তো তা খুঁজে পাবেন। এই মুহূর্তে মনোজ্ঞ পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করা, সাহিত্যপ্রেমী পাঠকদের পাঠতৃপ্তি দেওয়া ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। হ্যাঁ, আরেকটি উদ্দেশ্য অবশ্য আছে। মুম্বাইতে বসে যারা নিয়মিত লিখছেন, লিখতে চান, আমরা চাই এই পত্রিকা তাদের সকলের নিজের পত্রিকা হয়ে উঠুক। তাদের লেখা প্রকাশযোগ্য হলে তা পাঠকদের কাছে নিয়মিত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সে পালন করুক। আমরা চাই বম্বেduck- এর মাধ্যমে আপামর বাংলা পাঠকদের এসময়ের মুম্বাইয়ে বাংলা সাহিত্য চর্চা সম্বন্ধে একটি সঠিক ধারণা গড়ে উঠুক।
কেউ কেউ কৌতূহল প্রকাশ করেছিলেন আমাদের দুটি বিশেষ বিভাগ, নির্মাণ খেলা এবং আমচি মুম্বাই, সম্বন্ধেও। তাদের জানাই, 'নির্মাণ খেলা'-য় থাকবে কোনো কবির একাধিক কবিতা এবং তাঁরই কবিতার বিষয়ে অন্যের লেখা গদ্য। আর 'আমচি মুম্বাই'? এই মারাঠী শব্দ বন্ধের অর্থ হল আমার মুম্বাই। এই বিভাগে থাকবে মুম্বাইয়ের কোনো বিশিষ্ট বাঙালির পরিচয় এবং তাঁর নিজের লেখা অথবা তাঁর সম্বন্ধে অন্যের কোনো লেখা বা সাক্ষাৎকার।
বম্বেDuck-এর আত্মপ্রকাশ সংখ্যা দেখে কবি- লেখিকা তুষ্টি ভট্টাচার্য বলেছিলেন ওয়েবের ডিজাইনটা বড্ড ম্যাড়মেড়ে হয়েছে, পরের সংখ্যাটা যেন একটু আকর্ষণীয় হয়। বন্ধুর আন্তরিকতায় বলেছিলেন। মাথায় ছিল কথাটা। তার ওপর এবার আবার শারদ সংখ্যা, একটু বিশেষ সাজুগুজুর শখ তো দরিদ্রেরও হয়! কিন্তু সাধ্য কই! তাই এই মধ্যবিত্ত আমার শৈশব-কৈশোরে মাকে পুজোর আগে রাত জেগে ছিট কাপড় কেটে সেলাই মেশিনে নিজে হাতে সন্তানদের সাজানোর দায়িত্ব তুলে নিতে দেখার স্মৃতি ভেসে ওঠে। আমাদের ওয়েব ডিজাইনের অভিজ্ঞতা নেই, পেশাদার প্রকৌশলীর সাহায্য সহজলভ্য নয়! কুছ পরোয়া নেহি। অরিন্দম চক্রবর্তী তো পেশাদার শিল্পিই। সানন্দে এঁকে দিল দুটো রঙীন ছবি, যা দিয়ে প্রচ্ছদ হল। অরি, মানে অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়, সিদ্ধার্থ এবং আমি মিলে শুরু করলাম অলংকরণের জন্য ছবি আঁকা। সে যেমনই হোক, আমাদের ভরসা সংবেদী পাঠক মাত্রই তার মধ্যে খুঁজে পাবেন আমাদের প্রাণের স্পর্শ। অভিজ্ঞতায়, রিসোর্সে না-ধনী আমাদের শিশু সন্তান বম্বেডাককে সাজানোর দায়িত্বও না হয় আমরাই তুলে নিলাম। এবছর নাই বা হল তার ব্রান্ডেড পোশাক, পেশাদার অলংকরণ, তার মুখের অম্লান হাসিটি আরো ঝকঝক করে উঠলেই হল। আর কে না জানে, সস্তার জামা পড়া খোকা-খুকুর মুখের হাসি তখনই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যখন তাকে কেউ বলে, বাঃ, ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে তো তোমায়। অর্থাৎ, ভালো বলার মতো কোনো কিছু থাকলে তার তারিফ শুনতে চায় সে। বম্বেDuck ও তাই শুনতে চায়।
সব থেকে বেশি যে কথাটা ইনিয়েবিনিয়ে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে, ইনবক্সে বা প্রকাশ্যে অনেকেই আমাকে বলেছেন তা হল, আবার একটি পত্রিকা!! কেন, কী দরকার ছিল! এ কথার জবাব এক বাক্যে কেন সহস্র বাক্যেও বোধহয় আমার পক্ষে নিশ্চিত করে দেওয়া সম্ভব নয়। দরকার-অদরকার কে স্থির করবে? কিভাবে তার বিচার হবে? নতুন পত্রিকার জন্মলগ্নেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তার আবশ্যকতা নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন, মজার কথা তারা কেউই কিন্তু বিশুদ্ধ পাঠক নন, তারা নিজেরাও লেখেন এবং অনেকেই পত্রিকা সম্পাদনায় যুক্ত। এই যে তারা নিজেরাও ভূরি ভূরি লিখছেন তারই বা আবশ্যিকতা কী? তিনি যে পত্রিকাটি প্রকাশ করছেন কত পাঠকের কাছে হয়তো সেও সম্পূর্ণ অনাবশ্যক মনে হচ্ছে। তবু আপনারা যেমন লিখছেন, পত্রিকা করছেন মূলত আপনার নিজের আনন্দের জন্যই, না লিখে থাকতে পারেন না বলে, আমরাও তাই। সব সময় একটা সৎ উদ্যোগের পেছনে নিছক নতুন সৃষ্টির আনন্দের বাইরেও যে গূঢ় মতলব বা কূট উদ্দেশ্য থাকতেই হবে তেমন কোনো কথা নেই। অন্যেও যে তার থেকে আনন্দ পাচ্ছে, অন্যেও যে তা কিছুমাত্র উপভোগ করছে সেটুকুই হল উপরি প্রাপ্তি। পরে, সুদের মতো, মূলের থেকেও যা হয়ে ওঠে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, ভবিষ্যতে কার লেখা, কার পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, অমূল্য হয়ে উঠবে সে বিচার ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দিয়ে আসুন, আপনি, আমি এবং ওরা সবাই যার যেমন ইচ্ছে লিখুক এবং প্রকাশ করুক। এবং এ ব্যাপারে বাংলা অক্ষরে সব থেকে বেশি যিনি লিখে গেছেন, অল্প বয়স থেকেই বিভিন্ন নতুন পত্রিকার জন্মের সঙ্গে যিনি প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন, একশো তেত্রিশ বছর আগের ঠিক এমনি এক আশ্বিনে তিনি যে কথাটা লিখেছিলেন, আমরা আজও তা বিশ্বাস করি __ "একটি গাছে কতশত বীজ জন্মে। তাহার মধ্যে সবগুলো কিছু গাছ হয় না। কিন্তু গুটিকত গাছ জন্মাইবার উদ্দেশে বিস্তর নিষ্ফল বীজ জন্মানো আবশ্যক।"

আমাদের স্বপ্ন, বম্বেDuck-ও একদিন মহীরুহ হইবে। কে বলিতে পারে!!


(এই পত্রিকায় প্রকাশিত সমস্ত লেখারই বিষয়, বক্তব্য এবং মৌলিকত্বের দায় শুধুমাত্র লেখকের।)

প্রচ্ছদ ও সম্পাদকীয় অলংকরণঃ অরিন্দম চক্রবর্তী

ফেসবুক মন্তব্য