কলমির কালো দাম থেকে কেন্টাকি চিকেন

শবরী রায়


কবিতা গভীরতর এবং গহনতম মনের কথা কুড়িয়ে আনে। অচেতন ভেসে ওঠে, সচেতন সাজিয়ে সম্পাদনা করে। কবির উদ্দেশ্য কবিতা। কবি স্বাতন্ত্র্য চায়। স্বতন্ত্রতাই কি কবির একমাত্র উদ্দেশ্য?

সচেতন হয়ে কবি আঘাত করতে চায় প্রতিদিনকার একঘেয়েমিকে, কবির প্রেমাস্পদকে, পাঠককে, হয়তো নিজেকেও। কিন্তু শুধু আঘাতেই কি বদল হয়?

অনেকেই ভাবেন নতুন শব্দ যোগ করতে হবে, শব্দের কী আর নূতন - পুরাতন হয়? শব্দ এক অচেতন টুকরো। তাকে কুয়াশায় মাখিয়ে, রোদ্দুরে শুকিয়ে, বৃষ্টির রসে ম্যারিনেট করে, বারুদে জ্বালিয়ে, যে যেভাবে পারবে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে পঙক্তি রচনা করবে। সে বাক্যাংশ কাউকে ছুঁয়ে দিতে পারলে তার কাছে তা হবে কবিতা। সে নির্মাণই হোক বা স্বতঃস্ফূর্ততা। ধরা যাক 'আকাশপ্রদীপ' একটা শব্দ। শব্দটা মনে এলেই মনের মধ্যে দূর অন্ধকারে অনেক উঁচুতে কুয়াশায় ঢেকে যাওয়া, আবার বেরিয়ে আসা আলোকবিন্দুর কথা মনে পড়ে আমার। পাঠক আপনার? আপনারও নিশ্চয়ই কিছু না কিছু মনে পড়ছে। এখন প্রদীপকে যদি পিদিম লেখা হয়, একটা পুরোনো গন্ধ এসে লাগছে নাকে। এখানে একটা কবিতার উল্লেখ করছি। কবিতার নাম আকাশপিদিম। কবি চন্দন ঘোষ।___

"ফুলকাকিমা ঠাকুর দিতে গেছিলেন চিলেকোঠায় -
চাপ চাপ অন্ধকার; একাকিনী আকাশপিদিম

ফুলকাকিমা আর ফেরেননি -

আর আমরা এক নষ্ট সন্ধ্যায় দেখি দুটো কাক
হামলে ধরেছে নির্জন ঘুঘুপাখি এক

ঘুঘুটিও অবিকল ঠোঁট খুলে চিত হয়ে শুয়ে - "

একই শব্দ আলাদা মানুষের কাছে কতখানি অন্যরকম হয়ে যেতে পারে শুধু সামান্য চিত্রকল্প ও ধ্বনি বদলে দিলে। হয়ে উঠতে পারে কবিতা।

কবিতা তবে কী? শব্দবিষয়ক জ্ঞান? জ্ঞানের আধার? ভাষার সুশৃঙ্খল জটিলতা? চিন্তার নানা ঢেউ-এর ফসল? কবিতাকে কখনো রান্নাবান্নার সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছে হয় আমার। পাঠক অমনি ভাবছেন হয়তো মেয়েলি। কিন্তু তবু আমি বলবো একই তেল, নুন, ঝাল, মিষ্টি সমপরিমাণ ব্যবহার করে সামাণ্য নাড়াচাড়া ও তাপের পরিবর্তনে একই সবজির একেবারে ভিন্ন স্বাদ হতে পারে। আপনার প্রেম আমার প্রেম আলাদা, আপনার ঝড়, ভূমিকম্প, মৃত্যু-স্মৃতি আমার থেকে আলাদা হতে পারে, এবং কবিতাও।"অলৌকিক সেই দুটি হাত" ও ভিন্ন হতে পারে। কবি লিখছেন:

"আমার মা রবীন্দ্রসংগীত জানতেন না।
সারাদিন ঘরের কর্কশ মেঝে মুছে,.....
হাতদুটি হয়েছিল শিরীষের বিশুষ্ক বল্কল।"

অভিজ্ঞতা আলাদা হতে পারে কিন্তু। জ্বরের প্রলাপের ঘোরে সেই হাত হয়ে ওঠে, আশ্বিনমাসের জ্যোৎস্না, হতে পারে 'সদ্যোজাত ঘাসের সোহাগ'। এতো সহজ? অন্যত্র কবি লিখেছেন : "সহজ কথারা নাকি কবিতা হয় না। মায়েরা তো নিতান্ত সহজ। মাকে নিয়ে তাই কোনো কবিতা চলে না।" তাহলে কবিতা কি এই কবির কাছে "মাংসভুক শব্দের কীটাণু"? সারত্র-র মাছি? ইউটোপিয়া? পিছনের জানলার ভোজবাজি? বামিয়ান পাহাড়ের কুলুঙ্গি মন্দির? হাজারা শিশুর বোবা চাহনি? বিমুক্ত সটোরি? কবিতা কী স্পষ্ট নির্মাণ? নাকি সার্কাসের মাঠের আশ্চর্য ম্যাজিক? সুগন্ধেরশেষটুকু, একটি মৃত্যুর অনুপুঙ্খ বিবরণ। কিম্বা, "যে কথাটা বলাই যাবেনা কোনদিন / সেও যেন চাঁদের মিছিলে ভেসে গেছে"... কখনো আবার.."কলমির কালো দামে আটকে গিয়েছে পা / ছাড়ানো যাচ্ছে না কিছুতেই-" জীবন এবং অভিজ্ঞতা থেকেই কবি তাঁর কবিতাকে খুঁজে পান একথা মেনে নিয়ে যে কোন কবির কবিতার নিবিড় পাঠে তাঁর জীবনকে এবং কবিজীবনকে দেখতে পাবার কথা। সজ্ঞানে অথবা অনবধানে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় এর পঙক্তির কাছে ঋণ রয়েছে কবির। এ মন্দ কথা নয়। কিন্তু এরপরেও নিজস্বতা ঝলক দেখাচ্ছে নাকি তাই হল দেখবার বিষয়। একটি কবিতার নাম আশ্চর্য দহন।

'এইধারে পোড়াচ্ছিস তুই,
ওইধারে জ্বালিয়েছি আমি।
মহাধুম লেগেছে চৌদিকে ;
আগুনও লাফাচ্ছে অনুগামী
ছাগশিশু। তালি দেয় যেন
নির্লজ্জ মহুয়াখোর হাওয়া।
অরণ্য কখনো দেখেছে কি
আদরে সমগ্র পুড়ে যাওয়া?'

ছন্দের প্রতি কবির টান লক্ষ্যণীয় যদিও গুটিগুটি হাতে গোনা ছন্দ নয়। সচেতন শব্দ ব্যবহার ও রয়েছে। অক্ষরবৃত্তে মুগ্ধজড়িত কবিকে বারবার নিজেকেই কাটিয়ে নিতে হয়েছে এই মুগ্ধতা। "শিকড়ে শব্দের ঘ্রাণ " শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নিয়ে বেড়ে ওঠা আমার বহুবার মনে হয়েছে যে মানুষ গাছের চেয়েও সহনশীল। এটা আমার ব্যক্তিগত ভাবনা। মোটামুটি বেড়ে ওঠা একটা গাছকে অন্য প্রাকৃতিক পরিবেশে নিয়ে গেলে তার বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম।আর একাধিকবার হলে তো অসম্ভব। মতের অন্তর তো হতেই পারে। মনান্তর নেই। আমার শিকড়ে অশ্রুর ছোঁয়া নাই লাগতে পারে, আমার মা আর কবির মা অনুভব একদম আলাদা হতেই পারে। কিন্তু "মা তোমায় কতদিন স্বপ্নেও দেখিনি -" এই বাক্যবন্ধে নিজেকে রিলেট করতে পারলাম। আর না পারলেই বা কি? একদম অন্যরকম জীবন কী আমাদের সমৃদ্ধ করেনা? আর একটি কবিতা। "রবীন্দ্র লেকের ঈশ্বর-ঈশ্বরী"

"রবীন্দ্র লেকের আজ হৃদি উচাটন
অজস্র হীরের কুচি- তুমুল বারিশ

হ্যাঙ্গিং সেতুটি যেন সুরিয়াল ছবি
পিঠে তার চখাচখি, তুলি দিয়ে আঁকা

সবুজ কুর্তাটি মাখে উড়নির লাল
নারাঙ্গা ছাতার নীচে থেমে আছে কদম্বের হাওয়া

ঈশ্বর দেখছেন লাজ লাজ মুখে
ছায়া তাঁর পড়ে আছে জলের সবুজে-",

বিজ্ঞানমনস্ক কবি যথারীতি শিক্ষাগত যুক্তি দিয়ে বিশ্বাস করেন একটামাত্র মানবজীবন। "পাপ নেই পুনর্জন্ম নেই"। আবার অন্য বিশ্বাসে এসে পড়ে ঈশ্বর, এসে পড়ে অলৌকিক। "অনন্তের অ্যাম্বুলেন্স ডেকে যাচ্ছে আমাদের, / ডেকে যাচ্ছে কপোতাক্ষ চরে।" যাপন থেকে এসে যাচ্ছে সংস্কারের একলা শালিখ। শুধু শক্তি চট্টোপাধ্যায় নয় কবির রক্তে মেশা বিষাদের নীল শব্দে, মন্ত্রহীন অন্ধকারে, শব্দের চিতার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বারবার পায়ে জড়িয়ে যায় কলমির দাম, জড়িয়ে যায় জীবনানন্দীয় হেমন্তকালীন ধূসরতা।

উত্তরাধিকার সঙ্গে থাকলেও স্বাতন্ত্র্য না থাকলে জীবন ফিরেও তাকায় না। পাঠক ও মেধাহীন নয়, একথা কবি বোঝেন। তবে সব শব্দ সবাই জানবেন এমন নয়। পাঠককেও মাঝে মাঝে দু-পা এগিয়ে আসতেই হবে। প্রয়োজন হলে বাড়াতে হবে হাত, উল্টোতে হবে অভিধানের পাতা। আগ্রহী হলে পাঠকের নিজেরই লাভ। 'সটোরি' বা আলোকপ্রাপ্তি: 'জেন' সাধনার চরমবিন্দু। জ্যাজেন মুদ্রায় ধ্যানে বসেন একজন 'জেন' সাধক, পরম উপলব্ধি লাভের আশায়। কবির লেখায় ইছামতীর ঘ্রাণ যেমন আছে, আছে নানা ধরণের শব্দের ইকেবানা, আছে ডেটল তুলোর শুশ্রূষা কপিলমুনির আশ্রমে। সঙ্গে আছে মলসংস্কৃতি, কেন্টাগি চিকেন, মাস্কারা, গোলাপি টপ, ঝোলা দুল।পাশের টেবিল থেকেই কী কবি লক্ষ্য করছেন?

"মলে, নানা ছলে
কে এফ সির কোনার টেবিলে
পুরুষ্টু বলকারী ক্যাপসুলের মতো
মেয়ে এক ক্রিস্পি চিকেন লেগে
জিঘাংসু বসায় সাদা দাঁত।
চেয়ারে উল্টোদিকে বিবমিষু ছেলে
সোহাগি ক্লিভেজে চোখ রেখে তবু
ক্ষুধা কিম্বা ক্ষুধামান্দ্য - কিছুই ভাবেনা;
টিউশনের টাকাগুলো তার
মুরগীর ঠ্যাং হয়ে ইতস্তত ঘোরে,
পাখা মেলে নিরুদ্দেশে উড়ে চলে যায়।"

দেশকাল, সময়ের বিচারে চিরন্তন কবিতা আর কটাই বা লেখা হয়েছে। কবিকে দশকে বিচারের পক্ষে নই, কিন্তু সাম্প্রতিক রক্ত, জিঘাংসা, রাজনীতি থেকে কজন কবিই আর তার কলমকে মুক্ত রাখতে পারেন। না রাখা উচিৎ? কবির নিয়তি আছে,আছে পাশ ফেরা.. কান পাতলে শোনাও যায় খোলস ছাড়ার শব্দ... রয়ে যায় সুগন্ধের শেষটুকু...

"আমার মেধাকে পুষ্টি দেয় কে? ধর্মাধমে কে যোগায় অন্ন আর রস? আমার কালো রসিকতায় কে ওড়ায় শ্বেত কবুতর? বৃদ্ধ সমুদ্র - কুকুরের কে ফেরায় তীর?

সে পরে দেখাচ্ছে কাজল আর খুলে দেখাচ্ছে বুকের আঁচল- এঁকে দেখাচ্ছে প্রেম আর মুছে দেখাচ্ছে অশ্রু। সে, সে-ই তো ঘৃণায় ওষধি আর ব্যথা মোছা হাত, কামনায় অঙ্গীকার, তৃষ্ণায় সন্ন্যাস।

আমার রক্তে কে ছোঁয়ায় লাল, চেতনায় নীল সৌর-বীজ- কলমে পয়ার আর ফুসফুসে শব্দের ব্রহ্মনাদ।আমি তার কোমরের ভাঁজে ছোঁয়াবো না চোখ, তার চুলে আঙুলও দেবো না।

আবরণ-আভরণহীনা - সে আমার সমূহ নিয়তি।"

ফেসবুক মন্তব্য