কবিতা পড়া, না পড়ার কথা

উদয়ন ভট্টচার্য


(উদয়ন ভট্টাচার্য নিজেকে সংস্কৃতি কর্মী হিসাবে পরিচয় দিতেই ভালোবাসেন। মুম্বাইয়ের সাহানা টেগোর সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান মিউজিক অ্যান্ড কালচারের সঙ্গে জড়িত আছেন গত পঁয়ত্রিশ বছর। খেয়ালখুশি মতো বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ লেখেন। বাংলা কবিতার একনিষ্ঠ পাঠক এবং আবৃত্তিকার।)

আমার প্রজন্মের আমিই বোধহয় একমাত্র বাঙালি যে কখনো এক লাইনও কবিতা লেখেনি। এমনকী গোপনে কখনো লেখার চেষ্টাও করেনি। অথচ পারিবারিক পরিবেশ যে ঠিক কবে, কোন শিশুকালে আমার মধ্যে কবিতা ভালোবাসার বীজ বপন করেছিল তা আর আজ নিশ্চিত করে মনেও করতে পারি না। এই যে কবিতা শুনতে শুনতে, পড়তে পড়তে আর বলতে বলতে বড় হয়ে উঠেছিলাম সে অবশ্য শুধুই আমার পারিবারিক পরিবেশের জন্য নয়, 'কিশোর বাহিনী'-রও ছিল এতে সমান অবদান। সোভিয়েত রাশিয়ার ইয়ং কমিউনিস্ট লীগের অনুকরণে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলায় গড়ে তুলেছিলেন কিশোর বাহিনী। পাড়ায় পাড়ায় ছিল তার শাখা। আমাদের আঞ্চলিক শাখাতে আমাদের ভাইবোনেদের সবার ছিল নিয়মিত যাতায়াত। সপ্তাহের তিন সন্ধ্যায় সেখানে খেলাধূলো এবং বিভিন্ন সংস্কৃতি চর্চার মধ্যে অন্যতম ছিল অন্ত্যাক্ষরী খেলা। না, সে অন্ত্যাক্ষরীর সঙ্গে এখনকার মতো বাংলা-হিন্দি সিনেমার গানের আদৌ কোনো সম্পর্ক ছিল না। সে খেলা আমরা খেলতাম বাংলা কবিতার পংক্তি দিয়ে। আর সেই খেলা ও তা জেতার অদম্য ইচ্ছেই আমাকে কবিতা পড়ার উৎসাহ জোগাত ঐ বালক বয়সে।
ছোটোবেলায়, ভালোভাবে বাংলা পড়তে শেখার আগেই, কবিতার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, বন্ধুত্ব হয়েছে, কানে শুনে শুনে। তবে নিজে পড়ার সূচনা অবশ্য পাঠ্য বইয়ের পদ্য দিয়েই। সে সবের বেশিরভাগই ছিল নীতিশিক্ষামূলক যা আমাকে কখনোই আকর্ষণ করতে পারেনি। তাই তখন থেকেই পাশাপাশি খুঁজতে শুরু করেছিলাম অন্য সব কবিতা, যা ঐ বয়সেরও উপযুক্ত। যেমন রবীন্দ্রনাথের সহজপাঠের কবিতাগুলি। ঐ সহজ কবিতাগুলির ভেতরেই প্রকৃতির, পরিবেশের, চেনা জগতের যে সব মায়া ভরা অসাধারণ ছবি কবি এঁকেছেন তা শিশুমনে এমন গভীর দাগ কেটেছিল যে আজও তা স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আর সেই সব কবিতাই রবীন্দ্রনাথের প্রতি, তাঁর লেখার প্রতি আমার মনে এমন এক মুগ্ধতা আর ভালোবাসা তৈরি করে দিয়েছিল যা আজও অম্লান।
অবশ্য মাইকেল মধুসূদন দত্তকে বাদ দিলে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত থেকে আরম্ভ করে হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায় পর্যন্ত রবীন্দ্র পূর্ববর্তী বাংলা কবিতার যে জগত, আমাদের সময়ে আর তা সেভাবে স্পর্শ করতো না। সে সব কবিতার বিষয়, ভাষা, ছন্দ সবই যেন অন্য কোনো ফেলে আসা যুগের বলে আমাদের মনে হতো। আসলে রবীন্দ্রনাথ এসেই বাংলা কবিতার জগতটাকে আমূল পাল্টে দিয়েছিলেন। আর শুধু বাংলা কবিতাই বা বলি কেন! আমার ধারণা, তাঁর প্রভাবে ভারতীয় কবিতাই পেতে শুরু করেছিলো এক নতুন রূপ। প্রথম জীবনের কিছু কবিতা বাদ দিলে, তিনি নিজেই যেগুলিকে কবিতা বলতে অস্বীকার করে গেছেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতার ভাবনা, বিষয়, শব্দচয়ন, ছন্দ, তাঁর কবিতার অন্তর্লীন দর্শন আজও তাঁর অগণিত ভক্তকে মুগ্ধ করে রাখে। এমনকি সে সময়ের প্রেক্ষিতে তাঁর বলাকার ছন্দ বা অন্ত্যমিলহীন গদ্যকবিতাগুলিতে ছন্দের ব্যবহার আমাকে আজও বিস্মিত করে। আজও আমি তাঁর কবিতা যখনই পড়ি, নতুন নতুন অর্থ খুঁজে পাই। আর তাই- " এখনো প্রাণের স্তরে স্তরে, তোমার দানের মাটি সোনার ফসল তুলে ধরে।" ( সুকান্ত ভট্টাচার্য )
কাজি নজরুল ইসলাম বা কল্লোল গোষ্ঠীর কবিদের রবীন্দ্রনাথের প্রায় সমসাময়িকই বলা যায়। নজরুল যেন বেশিরভাগ কবিতাই লিখেছেন শুধুই তাঁর 'সৃষ্টি সুখের উল্লাসে'। তাঁর কিছু কিছু কবিতার বিষয় এতই সমসাময়িক ছিল যে সেগুলো আজ আর পড়তে বা বলতে ইচ্ছা করে না। কল্লোল গোষ্ঠীর কবিদের একটা চেষ্টা ছিল রবীন্দ্রপ্রভাব মুক্ত হয়ে কবিতা লেখার। তাঁদের মধ্যে অচিন্ত্য সেনগুপ্তের কবিতা 'জং' অথবা প্রেমেন্দ্র মিত্রের এমন পংক্তি --
"ছাদে যেওনাকো সেখানে আকাশ অনেক বড় সীমানাহীন,
তারাদের চোখে এত জিজ্ঞাসা, স্বপন সব হবে বিলীন",পড়লে মনে হয় এরা রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাষা থেকে কয়েক যোজন দূরে।
একই চেষ্টা জারি রেখেছিলেন কবিতা পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা বুদ্ধদেব বসু অথবা পরিচয়-এর প্রতিষ্ঠাতা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। তবু সুধীন্দ্রনাথের জনপ্রিয় কবিতা, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতা 'শাশ্বতী'র ছত্রে ছত্রে দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথের প্রভাব। যেমন, তাঁর --
" আগত শরৎ অগোচর প্রতিবেশে
হানে মৃদঙ্গ বাতাসে প্রতিধ্বনি
মূক প্রতীক্ষা সমাপ্ত অবশেষে
হাটে মাঠে বাটে আরব্ধ আগমনী" কিন্তু আমাদের রবীন্দ্রনাথকেই মনে করিয়ে দেয়। বুদ্ধদেব বসুর স্বাতন্ত্র্য তাঁর পশ্চিমি দুনিয়া ঘেঁষা চিন্তায়, তাঁর শব্দচয়নে ও বাক্য রচনায়। তাঁরও কোনো কোনো কবিতায় যেন উঁকি দিয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের ছায়া মধ্যগগনের রবিকে কে আর সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে পারে! তবু, এঁদের অনেক কবিতা আজও আবার বই খুলে পড়ি, মনে মনে আওড়াই। ঐ সময়েরই আরেক কবি বিষ্ণু দে তাঁর কবিতায় বহু গ্রীক মিথ এবং পাশ্চাত্য সংগীতকার ও তাদের সৃষ্ট সুরের সাহায্যে চিত্রকল্প তৈরির চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সে সব কবিতা বেশ অন্যরকমের হলেও, ঐ সব মিথ বা সুর সম্বন্ধে ধারণা না থাকলে তার রসাস্বাদন বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। একই সময়ের কবি সমর সেন বা অজিত দত্তের কবিতায় পাশ্চাত্য চিন্তার ও ধারার প্রভাব আমাকে কখনোই আকর্ষণ করেনি।
এরই মাঝে জীবনানন্দ দাসের আবির্ভাব যেন বাংলা কবিতার এতদিনকার চেনা জগতে নিয়ে এল এক নতুন হাওয়া। যদিও তাঁর মৃত্যুর আগে আমি তেমন ভাবে তাঁর কবিতা পড়িনি, আমার পড়ার জগত তখনও রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত ও পাঠ্যপুস্তকের কবিতাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরে কলেজে পড়ার সময় কফিহাউসের আড্ডায় আমি আবিষ্কার করি জীবনানন্দের কবিতা। এবং তাঁর কবিতার প্রেমে পড়ি। তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে বিষয়ে, বোধে, ভাষায়, ছন্দের ব্যবহারে, চিত্রকল্প সৃষ্টিতে তিনি সমসাময়িকদের থেকে একেবারেই আলাদা। তিনি যেন একা এক দ্বীপ। এক বেদনাঘেরা বিষাদময় জগতে যেন তাঁর বাস, তাঁর যাবতীয় সৃষ্টি। আমার কাছে আজও তিনি অনন্য। আজও আমি তাঁর কবিতার কাছে ফিরে ফিরে যাই। বার বার পড়ি। এই সময়ের আমার দুই অত্যন্ত প্রিয় কবি সুকুমার রায় এবং সুকান্ত ভট্টাচার্য। সুকুমার রায় হলেন বাংলা সাহিত্যে উদ্ভট হাস্যরসের কবিতার জনক। তিনি যখন 'শব্দকল্পদ্রুম' কবিতায় লেখেন,
"ঠাস-ঠাস দ্রুমদ্রাম শুনে লাগে খটকা
ফুল ফোটে? তাই বলো আমি ভাবি পটকা", তখন বিষয়ের অভিনবত্ব এবং শব্দের ব্যবহার আমাকে চমকে দেয়। তার বহু কবিতা আজও আমি সুযোগ পেলেই আবৃত্তি করি। তবে দুঃখের কথা সুকুমার রায়ের লেখার যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। তিনি পাননি তাঁর প্রাপ্য জনপ্রিয়তা। তাঁর কবিতাকে আমরা ছোটদের কবিতা বলে দূরে সরিয়ে রেখেছি। আর তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বলি সত্যজিৎ রায়ের বাবা।
সুকান্ত ভট্টাচার্যর মৃত্যু হয়েছিল মাত্র আঠারো বছর বয়সে। অথচ সেই বয়সেই তাঁর কবিতার গভীরতা আমাকে বিস্মিত করে। এমনকি তাঁর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ছোটোদের জন্য লেখা 'এক যে ছিল' কবিতার পংক্তি "বড়োমানুষীর মধ্যে গরিবের মতো মানুষ তাই বড়ো হয়ে সে বড়োমানুষ না হয়ে মানুষ হিসেবে হল অনেক বড়ো" - চমৎকৃত করে।
পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে আমি বাংলা কবিতার জগতে একটা শূন্যতা অনুভব করতাম। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং শঙ্খ ঘোষ ছাড়া এই সময়ের অন্য কোনো কবির লেখা আমার মনে তেমন রেখাপাত করেনি। কখনো-সখনো অন্য কোনো কবির এক-আধটা কবিতা বিক্ষিপ্ত ভাবে ভালো লেগে গেলেও, এখন আর সেসবের মধ্যে থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু মনে পড়ছে না।
ষাটের দশকে বাংলা কবিতা যেন এক নতুন জীবন পেলো। একদল টগবগে যুবক এসে যেন ওলট পালট করে দিল কবিতার জগৎটাকে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দীপক মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শরৎ মুখোপাধ্যায়রা হৈ হৈ করে রাজত্ব শুরু করলেন। আরো অনেকেই ছিলেন এই কৃত্তিবাসের কালে। তবে প্রায় একই সময়ে শুরু হওয়া হাংরি আন্দোলনের ব্যাপারটা আমার কাছে আজও এক আরোপিত প্রচেষ্টা মনে হয়। বিদেশের যে অ্যাংরি জেনারেশনের অনুকরণে হাংরির জন্ম, তার মূলে ছিল পশ্চিমি বৈভবের ফলে সব সহজে পেয়ে যাওয়ার এক মানসিক ক্লান্তি -- যার চূড়ান্ত প্রকাশ, 'মানি কান্ট বাই মি লাভ'-এ। সেই অ্যাঙ্গার ছড়িয়ে পড়েছিল সারা পশ্চিমি দুনিয়ায়। তারই ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ক্যাম্পাস রেভোলিউশনের জন্ম হয়েছিল। নিউইয়র্ক শহরে শুরু হয়েছিল কবিতা আন্দোলন। বাংলায় যে হাংরি আন্দোলনের উৎস ঠিক কী ছিল তা আজও আমার কাছে পরিষ্কার নয়। এই গোষ্ঠীর কবিদের লেখা পড়ে আমার মনে হতো যৌন ক্ষুধাই যেন তাঁদের হাঙ্গারের উৎস। তাঁদের লেখায় দেখি অকারণ যৌনতার ছড়াছড়ি। তাছাড়া এই আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত মুখ তো গর্ব করে বলতেই ভালোবাসেন যে তাঁকে অশ্লীলতার দায়ে কারাবন্দী করা হয়েছিল। আমার মনে হয়েছে অন্যরকম হতে চেষ্টা করার তাৎক্ষণিক উত্তেজনাই এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হওয়াতে অল্পদিনের মধ্যেই অনেক সহযোগী সরে আসেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় শুরুতে এদের সঙ্গে থাকলেও, পরে সরে এসেছিলেন। আন্দোলনের হোতারা যদিও বলেন পুলিশের হাত থেকে নিস্তার পেতেই তিনি নাকি মুচলেকা দিয়ে সরে এসেছিলেন। কবির মুখে অবশ্য আমি শুনেছি আন্দোলনে বিশ্বাস হারানোই ছিল তাঁর সরে আসার মূল কারণ। তখন, আমার তরুণ বয়সে বাংলা কবিতার জগতটা বোঝার জন্য এই সব তথাকথিত নিয়মভাঙা কবিতাও অনেক পড়েছি, আজ কিন্তু সেসব পড়ার আর কোনো বাসনা হয় না। অথচ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শরৎ মুখোপাধ্যায়, তারাপদ রায় আজও পড়ি। কবিতা সিংহও ছিলেন আমার আর এক প্রিয় কবি। পড়তে ভালবাসতাম বিনয় মজুমদার, তুষার রায়, ভাস্কর চক্রবর্তী, সমরেন্দ্র সেনগুপ্তের কবিতাও। আপশোস হয় এঁদের মধ্যে তুষার রায়, কবিতা সিংহ ও ভাস্কর চক্রবর্তী বড় তাড়াতাড়ি চলে গেলেন। সম্প্রতি বিদায় নিলেন সমরেন্দ্র সেনগুপ্তও।
এঁদের পরবর্তী প্রজন্মের যে সব কবির কবিতা পশ্চিমবঙ্গ থেকে দূরে বসেও কিনে এনে পড়েছি তাঁরা হলেন জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার, মল্লিকা সেনগুপ্ত। মল্লিকার অকাল প্রয়াণও দুঃখজনক, তাঁর কাছ থেকে বাংলা সাহিত্যের আরো অনেক কিছু পাওয়ার ছিল। আর দেশ পত্রিকায় শ্রীজাত-র প্রথম কবিতাগুচ্ছ পড়ে চমকে উঠেছিলাম। ওঁর লেখা চোখে পড়লে আজও পড়ি। ভালো লাগে।
এটুকু পড়ে অনেকেই ভাবতে পারেন যে আমার কবিতা পড়া বুঝি জনপ্রিয় মূলস্রোতেই শুধু সীমাবদ্ধ। তা কিন্তু নয়। আমি সমস্ত ধারার কবিতারই পড়ার এবং খোঁজ রাখার চেষ্টা করি। কখনো কোনো কোনো কবিতা বেশ ভালো লেগে যায়, কখনো লাগে না। বিশেষ করে বহির্বঙ্গের কবিদের কবিতা, আঞ্চলিক ভাষায় লেখা কবিতা এবং 'নতুন কবিতা' এই তিনটে ধারার কবিতা সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট কৌতূহল আছে এবং সে বিষয়ে খোঁজখবর রাখার বা সেসব কবিতা পড়ারও চেষ্টা করি।
বন্ধুবর অরুণ চক্রবর্তীকে ধন্যবাদ। তাঁর উদ্যোগে আয়োজিত দিল্লির বহির্বঙ্গ উৎসবে বেশ কিছু পশ্চিমবঙ্গের বাইরের কবির লেখা বাংলা কবিতা শোনার সুযোগ হয়েছিল। তবে উৎসব পরবর্তী সময়ে তাদের লেখা আর নিয়মিত পড়ার সুযোগ পাইনি। মনে আছে, ঐ উৎসবে শঙ্খশুভ্র দেববর্মণের কবিতা আমার মনে গভীর দাগ কেটেছিল। অথচ, মুম্বাই বসে তার লেখালেখি আর সেভাবে অনুসরণ করতে পারিনি।
মুম্বাই বা নভিমুম্বাই তথা মহারাস্ট্রে বসে যারা নিয়মিত লিখছেন, তাদের লেখার সঙ্গেও পরিচিত থেকেছি। তবে রাজলক্ষ্মী দেবী বেশি বয়সে পারিবারিক বাধ্যবাধকতায় পুণেতে স্থিত হলেও তাঁকে আমার ঠিক বহির্বঙ্গের কবি বলে মেনে নিতে মন চায় না। তাঁর সৃষ্টির মূল সময়টা কেটেছে কলকাতাতেই। একই রকম ভাবে মলয় রায়চৌধুরী এখন বেশ কিছু বছর ধরে মুম্বাইবাসী হলেও তাঁরও সাহিত্য সৃষ্টির মূল সময়টা কেটেছে মুম্বাইয়ের বাইরেই। নাগপুরের সুকুমার চৌধুরীর লেখা পড়ছি অনেকদিন ধরে। তার বেশ কিছু লেখা আমার ভালো লেগেছে। মুম্বাইয়ের রুণা বন্দোপাধ্যায়ের কবিতা যখন প্রথম তার নিজের মুখেই পাঠ শুনি, মনকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। পরেও ওর কবিতা পড়েছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। মন্দিরা পাল এবং শবরী রায়ের কবিতা যদিও তুলনায় কম পড়েছি, যেটুকু পড়েছি, ভাল লেগেছে। ক'বছর আগে অর্ঘ্য দত্ত ওর 'বিখন্ড দর্পণে আমি' বইটি উপহার দিয়েছিলেন, আত্মজৈবনিক স্টাইলে গদ্য-পদ্যের বইটার ভাষা আমার ভালো লাগলেও প্রায় সমস্ত কবিতাই কাহিনীমূলক হওয়াতে আমি হতাশ হয়েছিলাম। তবে পরবর্তীকালে ভাষা, ভাবনা ও নির্মানকৌশলে অর্ঘ্যর লেখা অনেক পরিণত হয়েছে। অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা লেখার শুরু অনেক বেশি বয়সে। আন্তর্জালে প্রকাশিত তার প্রথম কবিতাই আমাকে নাড়া দিয়েছিল। নিয়মিত লিখতে লিখতে আজ তিনিও অনেক বেশি পরিণত। আমার আর এক ভালোলাগা কবি একদা মুম্বাইবাসী সঞ্জিতা সেন হঠাৎই কোথায় হারিয়ে গেলেন!
ভিলাইয়ের শিবব্রত দেওয়ানজি লিখছেন অনেকদিন ধরে। সব না পড়লেও তাঁর কবিতা যেটুকু পড়েছি, খারাপ লাগে নি। ব্যাঙ্গালুরুতে বসে লেখেন রঞ্জন ঘোষাল। তাঁর লেখা বর্ণ ও বৈচিত্র্যময়-- রঙীন প্রজাপতির মতো। তাঁর গদ্যের ভাষাও কবিতার মতো ললিত। অর্ঘ্য দত্তর সম্পাদনায় বহির্বঙ্গের কবিদের কবিতা সংকলন 'কবিতা পরবাসে'-র দুটি সংখ্যা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। ওকে ধন্যবাদ, বহির্বঙ্গের অনেক কবির কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটাতে সাহায্য করেছে ঐ সংকলনের মাধ্যমে। তবে পরিচয় বলছি বটে, কিন্তু কোনো কবিরই একটি-দুটি মাত্র কবিতা পড়ে সামগ্রিক ভাবে সেই কবির কবিতা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা করা যায় না। তাই এখানে তাদের সম্বন্ধে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলাম।
আঞ্চলিক ভাষায় লেখেন যে সব কবিরা, তাঁদের কিছু কবিতা পড়ে মনে হয়েছে সেগুলো যেন আবৃত্তিকারদের জন্যই লেখা। নাটকীয়তায় ভরা সে সব কবিতা আমাকে বিশেষ আকর্ষণ করেনি।
'নতুন কবিতা'র বেশির ভাগ লেখাই আমার বোধগম্যতার বাইরে। নতুন কবিতার হোতা বারীন ঘোষালের এই বিষয়ে লেখা বেশ কিছু প্রবন্ধ পড়েও আমি ওদের কবিতার দর্শন বুঝতে পারিনি। আধুনিক কবিতা পরবর্তী এই নতুন কবিতাকে ওঁরা উত্তর-আধুনিকতার সংজ্ঞায় বাঁধতেও রাজি নয়। তবু এই গোষ্ঠীর কোনো কোনো কবির কিছু কিছু কবিতাকে হঠাৎ যেন ছুঁয়ে ফেলতে পারি, ভালো লেগে যায়। বাংলা কবিতার জগতে বিভিন্ন সময়ে কোনো না কোনো সাহিত্য পত্রিকা ঘিরে গড়ে উঠেছিল সাহিত্য-গোষ্ঠী, যেখানে সবাই ছিলেন সমান। সে সব গোষ্ঠীর জন্য কোনো হোতার প্রয়োজন হতো না, প্রয়োজন হতো না কোনো পৃথক দর্শনের। তাই এমন একজন হোতার দর্শন অনুসরণ করে কোনো গোষ্ঠীকে কবিতা লিখতে দেখে অবাক হয়েছিলাম।
জানি অনেকেই বলবেন, তুমি কে হে অর্বাচীন, কবিতা নিয়ে মাতব্বরি করতে এসেছো? আমি তাদের বলবো, আমি হলাম সেই তাদের একজন, যারা পড়বে বলেই কবি তার লেখা কবিতা যত্ন করে বুক পকেটে না রেখে, প্রকাশ করেছেন। আমি পাঠক। এবং আমি বিশ্বাস করি কবিতা পড়া ও তা নিয়ে দু-চার কথা বলা আমার জন্মগত অধিকার।

ফেসবুক মন্তব্য