বাইপোলার

সমরজিৎ সিংহ



‘প্রেতজন্ম কাকে বলে, জানেন?’ প্রশ্নটি, মনে হল, অশ্বিনের গুগলি। আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছি প্রশ্নকর্তার দিকে। ভুল বললাম, তাকিয়ে রয়েছি প্রশ্নটির দিকে। যেন আমিই লাস্ট ব্যাটম্যান, বল ব্লক করতে পারলেই ওভার শেষ। সুতরাং, বল, মানে ঐ প্রশ্ন কোনদিকে টার্ণ নিচ্ছে, তা দেখা দরকার।

প্রশ্নকারী মাঝবয়সী। একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করেছেন। আমার বাড়িওলার সঙ্গে খুব খাতির। সে সুত্রে এখানে মানে আমার ঘরে এসেছেন। কদিন ধরে আমি অস্বাভাবিক সব আচরণ করে বেড়াচ্ছি, এটা বাড়িওলার ধারণা।

অস্বাভাবিক আচরণ মানে? কি করেছি আমি? ২১ জানুয়ারি সাতটা ঘুমের বড়ি খেয়ে ফেলেছিলাম। ঐ জন্য? ঘুমের বড়িখাওয়া কি অস্বাভাবিক কিছু?

পর পর তিন রাত ঘুমোতে পারিনি। ঘুমোতে গেলেই ঐ একই দৃশ্য। কয়েকটা লোক তাড়া করে যাচ্ছে এক তরুণীকে। না, কোনো হিন্দী ফিল্মের দৃশ্য এটা নয়। জায়গাটা তার চেনা। বিবেকানন্দ ব্যায়ামাগার থেকে যে রাস্তাটা সোজা চলে গেছে বটতলার দিকে, এটা সেই রাস্তা। একটু দূরে বন্যা নিয়ন্ত্রণের বাঁধ। এখন পাকা রাস্তা হয়ে গেছে।

এই দৃশ্য আমার চোখের সামনে। তিন দিন। একই দৃশ্য, একই স্থান। এবং এই দৃশ্যে। অথচ স্বপ্ন নয়। আমি জেগেই আছি। কিছুক্ষণ আগে, নিউজ দেখলাম। না, বাংলা নিউজ নয়। বাংলা নিউজ আমি দেখি না। বাংলা চ্যানেলগুলি বড় বেশি নিউজ তৈরি করে। একঘেয়েও।

যে মেয়েটা নিউজ পড়ছিল, মনে হলো, ত্রস্ত, বিপদগ্রস্ত তরুণীটি সে-ই। শুনশান রাস্তা, কোনো লোকজন কোথাও নেই। এমন কি, একটা নেড়া কুকুরও নেই। যেন কোনো ভূতুড়ে রাস্তা। তরুণীটি সেই রাস্তা ধরে দৌড়ে যাচ্ছে।

২১ জানুয়ারি বিকেলে ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার মানে রথীন কর। আমারই এক বন্ধু, মনোবিদও। সব শুনে বলল, একটু অ্যাবনর্মাল বটে, তবে ঘাবড়াবার কিছু নেই।

মানে ?

রথীন হাসলো। হাসলো বটে, কিন্তু আমার উপর তার চোখ যেন তীব্র এক সার্চলাইট ফেলে, আমার ভেতর ছানবিন করছে। অনেকটা অজগরের দৃষ্টি, যার সামনে থেকে নিজেকে আর সরানো যায় না। বললো, বাইপোলার ডিসঅর্ডার হলে চিন্তার বিষয় ছিল। তোমার তা নয়। তোমার দরকার রেস্ট। কমপ্লিট রেস্ট। ঘুমের বড়ি দিয়ে দিচ্ছি। এক সপ্তাহ পরে একবার এসো।

রথীন—

হ্যাঁ, বলো।

এই বাইপোলার ডিসঅর্ডারটা কী? খুব মারাত্মক কিছু? আই মীন, আমি পাগল-টাগল হয়ে যাচ্ছি না তো?

হো হো করে হেসে ওঠলো রথীন। তারপর, একটা সিগারেট আমার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললো, পাগল হবে কেন? আর বাইপোলার ডিসঅর্ডার এই বয়সে খুব নর্মাল ব্যাপার। আমেরিকায় দেড়-দু শতাংশ লোক এতে আক্রান্ত। আমাদের দেশে এ নিয়ে তেমন কোনো আলোকপাত হয়নি। হলেও আমার চোখে পড়েনি।

মনোযোগী ছাত্রের মত রথীনের কথা শুনতে থাকি আমি কত কিছু রথীন জানে! মন এক আজব দ্বীপ। কেউ কি এই দ্বীপ পুরোপুরি আবিষ্কার করতে পেরেছে? রথীন বলতে পারবে।

সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিয়ে, সে, পুনরায় বলে ওঠল, জানো, এই ডিসঅর্ডার মূলত শুরু হয় অ্যাডলসেন্ট পিরিয়ড থেকে। যৌবনে পুরো রূপ ধারণ করে বাইপোলার ডিসঅর্ডার। এক ধরণের ম্যানিয়াও বলতে পারো একে।

ঘরে ফেরার পথে ঘুমের বড়ি নিয়ে আসি অনেকগুলি। আজ আর আমি ঐ দৃশ্য দেখবো না। কিন্তু মেয়েটা কে? তাকেই বা বারবার দেখছি কেন? না কি এটা গতজন্মের কোনো ঘটনা? ঐ যে, জাতিস্মর তাতিস্মর জাতীয় কোনো ব্যাপার না তো?

রথীনকে জিগ্যেস করা উচিত ছিল। নেকস্ট যেদিন যাবো, ব্যাপারটা জেনে নিতে হবে ভালো করে। মেয়েটাকে ঐ লোকগুলি তাড়া করছে কেন? আজকাল চারদিকে যে হারে খুন-ধর্ষণ বাড়ছে, তা রীতিমত আতঙ্কের। মানুষ এখন আর মানুষ নেই।

পাড়ার মোড়ে এসে, সিগারেট কিনতে গিয়ে, ভাবলাম, ভদকা কিনে নিই। তাহলে ঘুমটা জম্পেশ হবে। কিছুটা রিলাক্সও হবে। ভদকা কিনতে গিয়ে পেলাম না। এটা লিকারশপ নয়, মোড়ের চালের দোকান। ওরা রাখে উপরি আয়ের জন্য। ভদকার বদলে ওকেনগ্লো একটা ফুল কিনে ফেললাম। হুইস্কি খেলে আমার ওকেনগ্লোই পছন্দ। এত মোলায়েম হুইস্কি আর নেই। সিপ নিতে নিতে মনে হবে, প্রেমিকার প্রাণের স্পর্শ পাচ্ছি।

প্রেমিকা বলতেই, মনে পড়লো, আমার কোনো প্রমিকা নেই। এই বয়সে এসে, একটাও প্রেমিকা নেই, কথাটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিরিশ পার হয়ে যাবো আর কিছুদিন পরেই। কলেজ লাইফে এক ক্লাসমেটকে পছন্দ হতো। মেয়েটা কি আমাকে পছন্দ করতো? আমি জানি না জানার সুযোগ হয়নি, তার আগেই বিয়ে হয়ে গেলো তার। স্কুল লাইফে ক্লাস এইটের একটা মেয়ে আমার পেছনে ঘুর ঘুর করতো খুব। সেটা কি প্রেম?

আসলে, প্রেমের সংজ্ঞা আমি জানি না। তবে, এই বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হয়ে থাকতে এসে, বাড়িওলার ভাইঝিকে দেখলেই, আমার হার্টবীট বেড়ে যায় অস্বাভাবিকভাবে। কলেজ শেষ করে বসে আছে অজন্তা। অজন্তাই তার নাম। ইলোরা হলেও আপত্তি নেই। নামে কি বা এসে যায়?

সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে এলে অজন্তাই জলখাবার দিয়ে যায়। রাতেও আমার রুমে খাবার দিতে আসে স। আমার প্রতি এটুকুই তার ডিউটি। কথা যা হয়, তা মোটেও রোমান্টিক নয়। বড্ড কেজো।

যখনই সে ঘরে আসে, আমার হার্টবীট এত বেড়ে যায়, যে, তার কোনো কথারই জবাব দিতে পারি না ঠিক করে। আমার হার্টবীট বেড়ে যাওয়ার কথা অজন্তা কি জানে? অনুভব করেছে কখনও? আমি জানি না।
ঘরে ফিরে, চুপচাপ, হুইস্কি খেতে থাকি। একা মদ যারা খায়, তারা যে কোনো সময় খুনও করতে পারে। আমার ভেতরে তাহলে সেই খুনী মানুষটা আছে? হয় তো বা। হয় তো কেন? রথীন যে ডিসঅর্ডারের কথা বলল, এটা তা নয় তো? না কি ঐ প্রেমহীনতাই বাইপোলার ডিসঅর্ডার?
একটা প্রেম আমাকে হয় তো পাল্টে দিতে পারে! অজন্তাকে বলে দেখবো? কি ভাববে সে? ভাবুক, যা খুশি সে ভাবুক। আমি তাকে বলবো আমার হার্টবীটের কথা। যদি সে স্বীকার করে নেয় আমাকে, যদি নেয়, তাহলে আমি সুস্থ হবো তো? ঐ দৃশ্য আমার চোখের সামনে আর আসবে না তো?
গত রাতে, দৃশ্যটা একটু পালটে গিয়েছিল। মেয়েটা দৌড়ছে। তার বুকের দো-পাট্টা পড়ে গেছে রাস্তায়। তার চোখেমুখে আতঙ্ক। লোকগুলো আরও কাছে চলে এসেছে। যত কাছে এগিয়ে আসছে, মেয়েটার চেহারা যেন পালটে যাচ্ছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাকে, চকিতে যেন মনে হলো, অজন্তা। সে দৌড়াচ্ছে। আর পারছে না। একটা লোক তাকে ধরতে যাবে, তখনই, আমি শুনতে পেলাম, অর্ক, আমাকে বাঁচাও।

অর্ক আমারই নাম। পিতৃপ্রদত্ত। যদিও পিতার মুখ আমি দেখিনি। মা এই তথ্য জানিয়েছিল আমাকে। তবে কি মেয়েটা আমাকেই ডাকছে? আমি তার কেউ হই তবে? না কি, এই অর্ক আর কেউ?

আরও এক পেগ বানিয়ে তাতে একটা দুটো করে ঘুমের বড়ি মেশাতে থাকি। এই রহস্য আমাকে বের করতেই হবে। তাকে কেন অজন্তা বলে মনে হয়েছিল কাল? না কি, সবটাই আমার ভ্রম? এটাই তবে রথীন কথিত বাইপোলার ডিসঅর্ডার?

এক চুমুকে গ্লাস খালি করে ফেলি। আহ্! তৃষ্ণা কেন মিটছে না? এত তৃষ্ণা আমার ছিল এতদিন? গ্লাসে পুনরায় মদ ঢালতে শুরু করি। আর মেশাতে থাকি ঘুমের বড়ি। আমার ঘুম চাই। নার্ভ শান্ত না হলে এই দৃশ্য পীড়া দেবে আমাকে। পীড়া? পীড়া নয়, আরও জটিলতার ভেতর ঠেলে দেবে আমাকে।

ঘুমোবার আগে অজন্তাকেও বলতে হবে আমার হার্টবীটের কথা। মেয়েটাকে কাল কেন অজন্তা মনে হলো? অজন্তার কথা ভাবছি বলে?

এই গ্লাসটাও খালি করলাম। আমার কি নেশা হবে না আজ? ঘুম আসবে না? মাথাটা কি একটু ধরেছে? পুনরায়, গ্লাস ভরতে যাবো, তখনই দরজায় কেউ যেন নক করলো। অজন্তাই হবে। না, আজ তাকে বলতে হবে।

এ কি! আপনি এভাবে পড়ে আছেন? ঈশশ!

কে বললো কথাটা? অজন্তা? চোখ মেলতে পারছি না কেন? আমি তো দরজা খুলে দিতে যাচ্ছিলাম। তাহলে?

কে যেন আমাকে মায়ের মত যত্ন করে বিছানায় শুইয়ে দিচ্ছে। টের পাচ্ছি। আমি তাকে জড়িয়ে ধরি। মা’র শরীরের গন্ধ আসছে।

আঃ! ছাড়ুন।

আমাকে ছাড়াবার চেষ্টা করলো সে। আমার শরীরের ভার কি নিতে পারছে না? না কি, আমি ডুবে যাচ্ছি তার শরীরে?

আপনি পাগল হয়ে গেছেন! আঃ!

পাগল? রথীন বলেছে, পাগল নয়, ডিসঅর্ডার। তার শরীরে ডুবে যেতে যেতে আমি আবিষ্কার করি, আমার ব্রেনসেলসগুলি ভেসে যাচ্ছে এক উষ্ণ নদীর খরস্রোতে। কোনোরকমেই আর সে স্রোত থেকে পরিত্রাণ আমার নেই।

‘আপনার এই জন্ম আসলে প্রেতজন্ম। গতজন্ম থেকে একটা অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছেন আপনি।'

লোকটার মুখোমুখি আমি। তাকে ঘিরে বাড়িওলা, তার বউ, তাদের দুই বাচ্চা মেয়ে আর অজন্তা। আচ্ছা, সে রাতে আসলে কী হয়েছিল? ২১ জানুয়ারি, ঐ রাতে ঘুমের বড়ি খেয়ে ফেলেছিলাম। আর ২৬ জানুয়ারি বিকেলে আমার সেই ঘুম ভাঙে। অজন্তা কি এসেছিল সে রাতে?

লোকটা কে? তাকে কে ডেকে এনেছে? আমাকে এরকম বলছেন কেন তিনি? অসহায়ের মত অজন্তার দিকে তাকালাম। তার মুখে আশ্চর্য এক হাসি। সে হাসিতে কি বরাভয় আছে?

বাড়িওলা বললেন, কোনো প্রতিকার আছে কি? অ্যাকচুয়ালি, আমরা অর্কবাবুকে খুব পছন্দ করি। একটা ডিপ্রেশন তার ভেতরে যে আছে, আগে বুঝিনি। সে থেকেই, বোধ হয়, ঘুমের বড়ি খেয়ে ফেলেছিলেন।


রাতে, অজন্তা এলো না খাবার নিয়ে। তার বদলে এলেন বাড়িওলার বউ। খাবার টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বললেন, সে রাতে আপনি আমাকে পাল্টে দিয়েছেন। পাগলের মত...

পাগলের মত? মানে?

পাগলই তো! নাহলে ওভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে খায়? বারবার বলছিলেন, তোমাকে বাঁচাতে চাই আমি। কাকে বাঁচাতে চাইছেন আপনি? আমাকে ?

একটা দৃশ্য। রথীন বলেছিল, ডিসঅর্ডার। আমার ভেতরে। আর লোকটা বললো, প্রেতজন্ম। আমি কাকে বাঁচাবো? আপনাকে? না কি, আমাকে?

অলংকরণঃ অর্ঘ্য দত্ত

ফেসবুক মন্তব্য