দ্বিজেনদা ও আর্ট অব সাইকেল মেন্টেনেন্স

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়




বিকেল বেলা সাইকেলটা নিয়ে বেরোতে গিয়ে দেখি সামনের চাকাটা টাল খাচ্ছে। চোরা লিক হয়েছে মনে হচ্ছে। চট করে নেমে পড়লাম। ঠেলতে ঠেলতে মোড়ের মাথায় মহাকালী সাইকেল রিপেয়ারিং শপ। প্রোঃ – দ্বিজেন পরামানিক। চালিয়ে আনলে টিউবটা নির্ঘাত কেটেকুটে ভোগে চলে যেত। তাই হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে আনতে হল। খানিকটা সময় গেল। দ্বিজেনদা সবে ঝাঁপ তুলে বিড়ি ধরিয়েছে। স্প্যানার, হাতুড়ি মাতুড়ি নানান জিনিষ পত্র গুছিয়ে-গাছিয়ে রাখছে।
“দ্বিজেনদা, একটু দেখো তো।”
“দেখছি, দেখছি, এত তাড়া কিসের? যতক্ষণ না পাকে পড়বে, তুমি কি আর আসবে? কদ্দিন বলেছি একবার অয়েলিং করিয়ে নাও।”
দ্বিজেনদা বিড়িটা দাঁতে চেপে হাতের কাজ সারছে। আর তাড়া! এতক্ষণে বন্দনাদির গানের ক্লাসে বিনি ‘আয় তবে সহচরী’, ‘মম চিত্তে' শেষ করে 'মধুর মধুর বাঁশি বাজে' শুরু করে দিয়েছে। নামটা অবশ্য আমার দেওয়া, সত্যিকারের নাম জানি না - নাম রেখেছি বনলতা - তার থেকে বিনি। ফর্সা মেয়েদের নাম কি বনলতা হয়? কে জানে? আসলে বনলতা নামটা আমার খুব পছন্দ।
সকালের দিকে ক্লাস হলে বন্দনাদি ‘সাজিয়াছো যোগীটা’ এক্সট্রা করান। আর বড় জোর দশ মিনিট। ‘কাবেরী নদী জলে’ করেই বিনি বেরিয়ে পড়বে। আজকে আর দেখা হবে না। দেখাটা অবশ্য একতরফা। বিনি কোন দিকে না তাকিয়ে হন হন করে হেঁটে চলে যায়। আমি পিছন পিছন সাইকেল নিয়ে কিছুটা গিয়ে ফিরে আসি। বেশ ক’দিন ধরেই চলছে।
“মনে হচ্ছে পেরেক টেরেক ঢুকে গেছে।”
দ্বিজেনদা একটা স্ক্রু ড্রাইভারের চাড় দিয়ে অভ্যস্ত হাতে চাকার থেকে টায়ার খুলে টিউবটা বার করে আনল। এবার সেটায় হাওয়া ভরে বালতির জলে ডুবিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লিক খুঁজছে। আমি মন দিয়ে দেখছি। একটা সামান্য লিক বার করতে কত সময় লাগে রে বাবা? পিছনে একটা খিল খিল হাসির শব্দ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি বিনি। সঙ্গে আরো দুটো মেয়ে। এদিকেই আসছে। হাসতে হাসতে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ছে। বিনির টানা টানা চোখ, টিকালো নাক, মা দুর্গার মত চেহারা। ওর ডান পাশের মেয়েটার মাজা মাজা গায়ের রঙ, লম্বা চুল, কপাল থেকে টেনে তুলে, বিনুনি করে বাঁধা। মেয়েটাকে আগে দেখিনি। বেণী দুলিয়ে হাঁটছে। সাদা ঝকঝকে দাঁত বের করে হাসছে। কাছাকাছি এসে আমায় চমকে দিয়ে বলল, “এই হাবলা, আজ আসিস নি কেন?”
আমার কান লাল হয়ে গেল। দ্বিজেনদার সে’সব দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। সে লিক খুঁজে পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে আছে। টিউবটা তুলে হাওয়া বার করে লিকের জায়গাটা সিরীষ কাগজ দিয়ে ঘষছে। গ্লু লাগিয়ে মুখের কাছে এনে ফুঁ দিচ্ছে। বলছে, “বুঝলে বাপি, সাইকেল রিপেয়ারিং কি যার তার কম্মো? এ হল একটা আর্ট। সবাইকে দিয়ে হয় না। তা ছাড়া সে ভাবে দেখলে সাইকেল হল কেষ্টর জীব। রাস্তায় নামলেই তাতে প্রাণ সঞ্চার হয়। তাকে তোয়াজ করতে হয়, ঠিক ঠাক মেন্টেন করতে হয়!”
আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। দ্বিজেনদা এবার টিউবটা গ্লু শুকোবার জন্যে রেখে দেবে। অন্য আর একটা টিউব থেকে কাঁচি দিয়ে একটা চৌকো টুকরো কাটবে। তার কর্নারগুলো গোল করে ছেঁটে দেবে। নিখুঁত পরিমাপ। যেন মহান শিল্পকর্ম সৃষ্টি হচ্ছে। শুরু করার আগে আর একটা বিড়ি ধরাল দ্বিজেনদা। নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছে। আমি বিমর্ষভাবে বললাম, “দ্বিজেনদা, তোমার তো সময় লাগবে। সাইকেলটা বরং রেখেই যাই। চেনটা বার বার পড়ে যাচ্ছে। একটু কেটে ছোট করে দিও। ব্রেকটাও একটু টেনে দিও।”
বিনিরা এসব শুনল না, চলে গেল। লজঝড়ে মেন্টেনেন্সহীন সাইকেল নিয়ে কি আর বিনির মত সুন্দর মেয়েদের নাগাল পাওয়া যায়? একটু এগিয়ে গিয়ে বেণী দোলানো মেয়েটা একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। তার মুখে তখনও হাসি লেগে আছে।



আমার সঙ্গে সঙ্গে সাইকেলটারও বয়স বাড়ছে। ক্লাস ফাইভে পড়বার সময় বাবা এই সেকেণ্ড হ্যাণ্ড হাম্বার সাইকেলটা কিনে দিয়েছিল। গঙ্গার ওপারের জুট মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। একজন কর্মী সাইকেলটা বেচে দিয়ে দেশে চলে গেল। প্রথমে হাফ প্যাডেল। তারপর সীটে বসে লেংচে লেংচে। ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া তৈরি হয়ে যায়। ঠিক বন্ধুত্ব বলা যায় না। খানিকটা পারস্পরিক সম্মানের। আমি ক্লাস এইট থেকে সাবলীলভাবে তাকে চালাতে শুরু করি। পরবর্তীকালে অবশ্য সাইকেলটা নানান রকম ফন্দীফিকির শিখে নেয়। তার সবগুলো যে আমার পছন্দ হয় এমন নয়। কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা তখন এমন যায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে আমাকে বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হয়।
সাইকেলে হাওয়া ভরাটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। সেটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু অলরেডি টিউবটায় তিনটে তাপ্পি পড়েছে। দুদিনের মাথায় চাকায় আঙ্গুল বসে যাচ্ছে। আমার একটু টেনসান হচ্ছিল। মহাদেবদা হাওয়া দেবার সময় ভাল করে নজর করে বলল, “ভ্যালট্যুবটা গেছে।” তবু ভাল। অল্পের ওপর দিয়ে গেল। চাকায় হাওয়া ভরে লাল দিঘীর পাড় দিয়ে গঞ্জের দিকে যাচ্ছি, দেখি নন্দিনী আসছে। আজ একা, সাথে কেউ নেই। নন্দিনী আমার বন্ধু তাপসের বোন। ক্লাস নাইনে পড়ে। আমাদের কাছাকাছি বাড়ি। একই পাড়ায়, এ গলি, ও গলি। মাঝে মধ্যে জ্যামিতির এক্সট্রা আটকে গেলে নন্দিনী আমার কাছে আসে। সবাই জানে অঙ্কে আমার খুব মাথা। দেখিয়ে দিই। কিন্তু নন্দিনী হুট করে চলে আসে বলে বাড়ির মধ্যেও আমাকে গেঞ্জি আর পাজামা পরে থাকতে হয়। হাফ প্যান্ট পরলে পায়ের লোম দেখা যায়। নন্দিনী আকারে ইঙ্গিতে জানিয়েছে লোম বার করা পা তার পছন্দ নয়।
সাদা-নীল স্কুল ইউনিফর্মে ওকে দোপাটি ফুলের মত দেখাচ্ছে। আমায় দেখেই হাত দেখিয়ে থামালো। খুব দাপুটে মেয়ে। কথা নেই বার্তা নেই টপ করে আমার সাইকেলের কেরিয়ারে উঠে বসে বলল, “চল।”
আমি কিন্তু কিন্তু করে বললাম, “কেউ যদি দেখে?”
সে দাবড়ানি দিয়ে বলল, “সে আমি কি জানি? আমি আর হাঁটতে পারছি না।”
নন্দিনী এমনি। ওকে আমি বিনির কথা বলেছি। বরং বলা ভালো, গলায় পা দিয়ে নন্দিনী আমার মুখ থেকে বিনির কথা বার করে নিয়েছে। আমি নাকি স্লো সাইকেল করে বিনির পিছনে পিছনে যাচ্ছিলাম। নন্দিনী স্কুল থেকে রিক্সা করে ফেরার সময় দেখে ফেলেছিল।
আমি প্যাডেলে চাপ দিলাম। সদ্য হাওয়া ভরা সামনের চাকাটা রাস্তা ছেড়ে হাওয়ায় ভর দিল। নন্দিনী পিছন থেকে আমার কোমর ধরে আছে। আমাদের দুজনকে নিয়ে সাইকেলটা উড়ছে। আমাদের পুরোন শহরতলির গলি-ঘুঁজির ওপর দিয়ে আমরা ভেসে যাচ্ছি। ভাসতে ভাসতে নন্দিনীদের বাড়ির ছাতে। সাইকেলটা ছাতের পাঁচিলে ঠেস দিয়ে দাঁড় করাতেই নন্দিনী বলল, “এবার আমরা ঘুড়ি ওড়াবো।”
চিলেকোঠার ঘর থেকে লাঠাই আর ঘুড়ি নিয়ে এল। কালো রঙের মোমটানা দেড়-তেল ঘুড়ি। আমি হাওয়ার দিক খুঁজে বাড়তে লাগলাম। বাড়তে বাড়তে ঘুড়িটা ছুন্নি গুলি হয়ে গেল। নন্দিনী বলল, “ও মা, এ কী? তুমি প্যাঁচ খেলবে না? ওই যে লাল নীল পেটকাটা, ওটার সঙ্গে প্যাঁচ খেল।”
আমি কাতর ভাবে বললাম, “নন্দিনী আমি প্যাঁচ খেলতে পারি না। হেরে যাই।”
নন্দিনী বলল, “ওসব জানি না, তোমায় খেলতেই হবে।”
আমি সুতোয় ঢিল দিলাম। মাঞ্জা দেওয়া সুতো সর সর করে আমার হাতের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে, ধারে আমার হাত কেটে যাচ্ছে। আমাদের ঘুড়িটা ভো-কাট্টা হয়ে নারকোল গাছের মাথার ওপর দিয়ে ভ্রাতৃ সঙ্ঘের মাঠের দিকে ভেসে গেল। নন্দিনী রাগ করে বলল, “তুমি পারলে না? তুমি কিচ্ছু পারো না।”
আমায় একলা রেখে, আবছায়া সিঁড়ি দিয়ে নন্দিনী দুম দুম করে নীচে নেমে গেল।
নন্দিনী ছাড়া আমি এখন সাইকেলটা ছাত থেকে নামাবো কি করে?
চুপ করে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম। আকাশের রঙ গাঢ় হচ্ছে। কোকোনাট নার্সারীর দিক থেকে অন্ধকার উঠে আসছে। সিঁড়িতে একটা পায়ের শব্দ পাচ্ছি। সেই মেয়েটা উঠে এল। লম্বা চুলে বেণী দোলানো, মাজা রঙ। আমার দিকে তাকিয়ে মিচকে হেসে বলল, “আমি রিণি, বিনির বন্ধু। চল, আমি ওপর থেকে ধরছি। তুমি সাইকেলটা নামাও।”
সেই প্রথম দেখলাম রিণির গজদাঁত আছে।



সাইকেলটা আজকাল বারান্দার এক কোণে পড়ে থাকে। হ্যাণ্ডেলটা আড় হয়ে গ্রীলে আটকানো থেকে। নিজে কোথাও যাবার ইচ্ছে হলেও যেতে পারবে না। বাড়িতে কোনো বাচ্ছাটাচ্ছা এলে ওটার ওপর চড়ার চেষ্টা করে। কিড়িং করে বেল বাজিয়ে দেয়। সাইকেলটা কিছু বলে না। আমার মা খুব সতর্ক থাকে। কেন জানি না মা সাইকেলটাকে খুব একটা বিশ্বাস করে না। বাচ্ছাটাকে সরিয়ে আনে। যদি ঘাড়ে পড়ে যায়।
রিণি আজ অফার লেটার পেয়েছে। পেয়েই নাচতে নাচতে দেখা করতে এসেছে। আজ বাড়িতে মা নেই। ফাঁকা বাড়ি দেখে আমরা একটু ঘন হয়ে বসেছি। রিণি আমার মাথাটা বুকের মধ্যে নিয়েছে। মাথাটা হেঁড়ে বলে রিণির দম বন্ধ হয়ে আসে। তবু ও চেপে ধরে রাখে। আমি জানি এই সময় ও ভাবে ওর ছেলের মাথাটাও এমনি হেঁড়ে হবে। মনে মনে বোধ হয় একটু লজ্জা পায়। আমার চুলে স্নেহ ভরে বিলি কেটে দেয়, যেন নিজের অজাত ছেলেকেই আদর করছে।
“সারা জীবন এমনি করে আমার সঙ্গে থাকবি তো?”
আমি বললাম, “নাহ্।”
“তার মানে? তুই আমায় ভালবাসিস না?”
রিণি অবাক হল। আমার মাথাটা জোর করে ঠেলে সরিয়ে দিল।
“কে বলল তোকে ভালবাসি না, বাসি তো। তার মানে কি সারা জীবন তোর সঙ্গে থাকতে হবে?” বলতে বলতে আমি গীটারটা রিণির হাতের কাছ থেকে সরিয়ে রাখি। সাবধানের মার নেই। হয়ত ওটা তুলেই ধাঁই করে বসিয়ে দিল। আমি রিণির থেকে বছর দুয়েকের ছোট। রিণি ইঞ্জিনীয়ারিঙে আমার থেকে এক ইয়ার আগে। এই নিয়ে রিণির একটা অস্বস্তি আছে। আমি বিশেষ পাত্তা দিই না।
রিণির মুখে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। বলল, “সেদিন যে হোস্টলের ঘরে চকাস করে চুমু খেলি?”
“কবে?” আমি ভুরু কোঁচকালাম। তারপর গম্ভীর হয়ে বললাম, “সে তো জ্বরের ঘোরে। নইলে চুমু খাবার সময় শব্দ হয় নাকি?”
“হয়, বাচ্ছারা যখন মাকে চুমু খায়। তুই কী প্রেম করবি? বাচ্ছা ছেলে, নাক টিপলে দুধ বেরোয়।”
রিণি রাগে গসগস করতে করতে ঘর ছেড়ে চলে গেল। আমি জানলা দিয়ে দেখলাম, রিণি বারান্দা পার হচ্ছে। আমার নতুন কেনা মোটর বাইকটা বারান্দার এক ধারে পার্ক করা। ওটাকে নিয়ে আমার দারুণ আদিখ্যেতা। আমার বাইকটা মেটালের, বাকিদের সব প্লাস্টিকের। সামনের বছর ওটা নিয়ে লেহ্-লাদাক যাবার প্ল্যান আছে। পাশেই হাম্বার সাইকেলটা দাঁত খিঁচিয়ে পড়ে আছে। ওটা আর চালানো হয় না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় সাইকেলটা মনে মনে বাইকটাকে হিংসে করে। মুখে কিছু বলে না।
পাশ দিয়ে যাবার সময় রিণি বাইকের চাকার ওপর ছোট্ট করে একটা লাথি কষিয়ে উঃ করে উঠল। রাগতে গিয়ে হেসে ফেললাম। বোকা, রাগী আর পসেসিভ মেয়েদের আমার বেশ পছন্দ। আমি আবার কানে হেডোফোন গুঁজতে যাচ্ছিলাম। শব্দ শুনে ফিরে দেখি সাইকেলটা খিক খিক করে হাসছে।
মুখ ফিরিয়ে হেঁকে বললাম, “এত হাসির কী হল?”
সে জবাব দিল না।



রিণি কোন সন্দেহ করে নি। বাইকের পিছনে চড়তে চড়তে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?” বললাম, “ভিজতে”। ফেডেড জিনস আর লাল টি শার্টে দুরন্ত লাগছে ওকে। একটা ওড়না দিয়ে চুল, মুখ ঢেকে নিল। বৃষ্টির আগের ধূলো – ঝড় থেকে বাঁচতে। শুধু চোখ দুটো খোলা রইল। আপাতত বৃষ্টি নেই। কিন্তু মেঘ অনেক নীচে নেমে এসেছে। যে কোন মুহূর্তে এসে পড়বে।
আমরা এই শহরে চাকরি করি। দুজনেই। আমাদের ছোট্ট মফস্বলটা এখান থেকে অনেক দূরে। টিউশন ক্লাশ করে ফেরার সময় রাত হয়ে গেলে সন্তোষদা বলত, “বাপি রিণিকে ওদের গলির মুখ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে যাবি।”
“না, না সন্তোষদা আমি ঠিক চলে যাব।” বলেও রিণি বেণী দুলিয়ে আমার সঙ্গে হেঁটে হেঁটে যেত। আমি সাইকেলের হ্যাণ্ডেলটা ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতাম। সাইকেলের একদিকে আমি, অন্যদিকে রিণি। মাঝখানে সাইকেলটা একবার আমার দিকে, একবার রিনির দিকে ঘাড় কাত করে তাকাত। আমি বলতাম, “রিণি, বনলতা সেনের নাম শুনেছিস? কে বল তো?”
রিণি পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে বলত, “কাল বিকেলের শোয়ে, হাম আপকে হ্যায় কৌনের টিকিট কেটে আনবি, আমি আর দিদি দেখতে যাব।”
রিণি আলগা হয়ে বসে আছে আমার পিঠে হাত রেখে। পনভেল পেরিয়ে গোয়া হাইওয়েতে পড়তে না পড়তে দু এক বিন্দু জল উড়ে এল। কারনালায় মোটর বাইক রেখে চা খেলাম দু জনে। টিনের শেডের নীচে ক’টা চেয়ার টেবিল পাতা। প্লাস্টিকের, রঙ জ্বলে গেছে। আচমকা জিজ্ঞেস করলাম, “সন্দীপকে চিনিস?” রিণি একটু চমকে উঠল যেন। তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল, “হ্যাঁ, ছেলেবেলার বন্ধু। রিসেন্টলি দেখা হল। খুব ডিপ্রেশনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, বেচারা।” কর্কশ ভাবে বলে উঠলাম, “পৃথিবীর সবার ডিপ্রেশন কাটানোর দায় কি তোর?” রিণি কোন কথা বলল না, মুখ ঘুরিয়ে নিল। আমরা উঠে পড়লাম। ইচ্ছে করে হেলমেটটা টেবিলে ছেড়ে রেখে এলাম। রিণিও খেয়াল করল না। একটু অন্যমনস্ক হয়ে আছে। নীচু গলায় গুনগুন করে গান গাইছে। ওড়নাটা কোমরে বেঁধে রেখেছে। আমার দিকে একবারও তাকাচ্ছে না। পাহাড় আর জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে আছে।
গোয়া হাইওয়েতে ডিভাইডার নেই। বাইকের স্পীড বাড়ালাম। অল্প বৃষ্টি পড়ছে। রিণি আমার কোমর জড়িয়ে ঝুঁকে এল। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে পিঠের ওপর মুখ আড়াল করে রাখল। আমার আধখানা শরীর রিণির নরম বুকের স্পর্শ পাচ্ছে। বাকি আধখানায় বৃষ্টি পড়ছে। আমার মুখ, গলা, শার্টের বোতাম খোলা বুকে, বৃষ্টি বিঁধছে। ছুরির মত। বুঝতে পারছি না এর মধ্যে ঠিক কোন আধখানাটা আমি। উল্টো দিক থেকে ট্রাক আসছে একটার পর একটা। মাথাটা খালি খালি লাগছে। যে জন্য আসা, বাইকটা সামান্য হেলিয়ে যে কোন একটার সামনে নিয়ে গেলেই হয়।
একদল কম বয়সী প্রাণবন্ত ছেলেমেয়ে বৃষ্টির মধ্যেই সাইকেল চালিয়ে পাহাড়ে উঠছে। ওদের মাথার সাইক্লিং হেলমেট থেকে শুরু করে হাঁটুর ক্যাপ পর্যন্ত সপসপে ভিজে। সাইকেলগুলো দামী, গীয়ার চেঞ্জিং। মনে হল এই শহরে সাইকেল রিপেয়ারিঙের দোকান দেখিনি। আছে নিশ্চয়ই। কোথাও না কোথাও। নাকি দামী সাইকেলের মেন্টেনেন্স লাগে না।
চড়াই শেষ হয়ে আসছে প্রায়। রাস্তার ধারে খানিকটা খোলা যায়গা, ঘাস জমি। বাইকটা রেখে নামলাম। রিণির দিকে না তাকিয়ে সোজা হেঁটে গেলাম। খাদের কিনারায় একখানা পাথরের বেঞ্চ। তার ওপর একটা পা তুলে দিয়ে দূরে তাকিয়ে রইলাম। রিণি এল। আমার পিঠে মৃদু হাত রেখে বলল, “পারলি না তো? জানতাম পারবি না।”
আমি অবাক হলাম, রিণি জানত। জেনে শুনেও সঙ্গে এসেছিল। মুখ ফিরিয়ে রিণিকে জিগ্যেস করলাম, “আমার সঙ্গে থাকতে তোর দমবন্ধ লাগে, তাই না?”
রিণি আমার কথার জবাব দিল না। আমাকে সম্পূর্ণ তাচ্ছিল্য করে দাঁড় করিয়ে রাখা বাইকটার দিকে ফিরে যাচ্ছিল। সেটাও আমাদের মতই ডাহা ভিজছিল।
পিছন থেকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই কী আরও বেশি স্পেস চাস?”
রিণি থমকে দাঁড়ালো। ফিরে এল। তর্জনী দিয়ে আমার বুকে খোঁচা মেরে বলল, “এই খানে।”
মনে পড়ল হাম্বার সাইকেলটা বাড়িতে এমনিই পড়ে আছে। কেউ চালায় না। ফ্রেমে মাকড়শা জাল বাঁধে। জানলা দিয়ে বৃষ্টির ঝাট এসে জং ধরে। যেই দেখে সেই বলে ওটাকে এবার রদ্দিতে বেচে দে। আমার হাত ওঠে না। এবার বাড়ি যাব যখন সাইকেলটাকে দ্বিজেনদার দোকানে দিয়ে সাফ সাফাই, অয়েলিং করে রাখতে হবে।
রিণিকে বললাম, “চল ফিরে যাই।”

অলংকরণঃ অর্ঘ্য দত্ত

ফেসবুক মন্তব্য