ঈর্ষা

অর্ঘ্য দত্ত


ওরা সবে গুছিয়ে বসেছে, তুলির মোবাইলটা বেজে উঠল। "হ্যাঁ, বউমা? বলো। না না, কোনো অসুবিধা নেই, খুব ভালো ঘুরছি। হ্যাঁ,হ্যাঁ, লক্ষ্মীপুজোয় আসছি...।" ফোনে কথা বলতে বলতে তুলি সোফা থেকে উঠে লাগোয়া ব্যালকনিতে চলে গেল। গলার আওয়াজটাও কমে গেল।
-- "বৌমা মানে মাইমা, এই মাইমার কাছে থেকেই তো তুলি কলকাতায় পড়াশোনা করেছে। ওর দিদিমার মুখে বৌমা শুনেই তুলিও ছোটবেলা থেকে বৌমা বলতে শিখেছে।" আসর শুরুর মুখেই এমন রসভঙ্গ করে তুলির উঠে যাওয়ার অস্বস্তি কাটাতেই যেন অতনু সামনে বসা রিংকু আর সুমিতকে কথাগুলো বলে।
কিন্তু সামনের গ্লাস টপ নিচু টেবিলটার ওপরে চারটে গ্লাসে সাজানো স্মিরনফ্ উইথ ফ্রেস অরেঞ্জ জুস আর দুটো প্লেটে কাবাব আর সালাড সাজিয়ে রেখে সুমিত বা রিংকু কেউই এখন অতনুর কথা শুনতে খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হলো না। ওরা চুপ করে বসে থাকে। সুমিতের চোখ যায় দেওয়াল ঘড়ির দিকে। সোয়া নটা। মুম্বাইয়ে সবে সন্ধ্যাই। রিংকু বলে, ফোন করার আর সময় পেলো না! গলায় অধৈর্য। রিংকুটার চিরকালই ধৈর্য কম, অতনু ভাবে।
"তুলি, একবার চিয়ার্স করে তারপর গিয়ে কথা বলো না।" অতনু ব্যালকনির দিকে মুখ করে বলে, একটু জোরেই। তুলি কানে মোবাইল চেপে নীরবে এসে টেবিল থেকে একটা গ্লাস তুলে উঁচু করে ধরে। ওরা তিনজনেও তাড়াতাড়ি তুলে নেয় এক একটা গ্লাস। চারজনেই গ্লাসে গ্লাস ঠেকিয়ে চাপা স্বরে বলে 'চিয়ার্স'।
"না, বৌমা, সব মনে আছে, আমারও আজ মনে পড়ছিল...।" আস্তে টেনে টেনে কথাগুলো বলতে বলতে তুলি আবার ব্যালকনিতে চলে যায়। অতনু ঘাড় ঘুরিয়ে তুলির মুখটা দেখার চেষ্টা করে। তুলির গলার স্বরটা যেন ভারী ও ভিজে মনে হয়। ও বুঝতে পারে বৌমার সঙ্গে তুলির কী প্রসঙ্গে কথা হচ্ছে। পরক্ষণেই একটা লম্বা সিপ নিয়ে ওর স্বভাবমতো হইহই করে সুমিত আর রিংকুকে বলে ওঠে, "জানিস, বান্দ্রা স্টেশনে আজ একটা পাগলিকে দেখলাম ঠিক আমাদের পাগলির মতো!" ওরা দুজনেই অবাক হয়ে একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন করে বসে, কে পাগলি? কোন পাগলি? কোথায় দেখলি? কখন দেখলি? অতনু বলে, "আরে আমাদের পাগলিরে। পিয়ালি। অনেক মিল। মানে ও সত্যিই পাগলি হলে যেমন হতো আর কি!"
"অতনু! তুই না, সত্যি!" রিংকু বলে হাসতে হাসতে, "রাস্তার কোন পাগলি, তার মধ্যেও তুই এখানে পিয়ালিকে দেখছিস।" সুমিত ব্যালকনি থেকে তুলিকে ঢুকতে দেখে বলে, "ছাড় না। তোরা দুজনেই সমান। আজ সারাদিন কী দেখলি, কোথায় কোথায় ঘুরলি তাই বল।" সুমিত যেন প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করে।
"না, না, ও কিন্তু ঠিকই বলেছে। বান্দ্রা প্ল্যাটফর্মে দেখা ওই মহিলাকে অনেকটা পিয়ালিদির মতোই দেখতে।" তুলি কথাগুলো বলতে বলতে সোফায় এসে বসে। তুলি যে ব্যালকনি থেকে ওদের কথা শুনেছে বোঝা যায়।
"মহিলা মানে প্ল্যাটফর্মের পাগলি?" রিংকু অবাক হয়ে প্রশ্ন করে।
"হ্যাঁ। এমনকি বাঁ কানের নিচে চিবুকের সেই জোড়া আঁচিলও ছিল।" অতনু বলে।
"কাকতালীয়! তবে এ অনেক মোটা, বয়সও তোমাদের থেকে নির্ঘাৎ অনেক বেশি হবে। পিয়ালিদির কত লম্বা চুল, এর ছোটো করে ছাঁটা।" তুলি একটা ছোট্টো সিপ নিয়ে হাসতে হাসতে বলে। ওর মুখে হাসি দেখে অতনুর আরাম লাগে।
"চুল তো এখন তোমাদেরও ছোট করে কাটা। আর ওজন তোমাদেরও বেড়েছে।" অতনু বলে।
"কিন্তু আমরা এখনো বাংলাতেই কথা বলি।" তুলি উত্তর দেয়।
"সেকি তোরা আবার সেই পাগলির সঙ্গে কথাও বলেছিস না কি?" সুমিত প্রশ্ন করে।
"আমি না। তুলি গিয়ে কথা বলে এসেছে।" অতনু বলে।
"কী করবো? তোমাদের বন্ধু ঐ প্ল্যাটফর্মে ওভারব্রিজের নিচে ময়লা ছেঁড়া নাইটি পরা নিজের মনে বিড়বিড় করা পাগলিটাকে বসে থাকতে দেখে এমন উত্তেজিত হয়ে পড়লেন, একবার নিজে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষন করে আসছেন, আরেকবার প্ল্যাটফর্মের টি-স্টলে গিয়ে ঐ পাগলির পরিচয় জানতে চাইছেন, অগত্যা আমাকেই হাল ধরতে হল...।"
"তুই পারিসও! তোর হিংসা হচ্ছিল না?" সুমিত বলে। তারপর রিংকুকে উদ্দেশ্য করে বলে, "তুলিকে দেখে শেখো।"
"সত্যিরে। আমি হলে পারতাম না। এইতো দুবছর আগে সিমলায় বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ রাস্তা থেকে সুমিত নাকি একটা শালের দোকানে ফিলসফির শিবানীকে দেখেছিল। শিবানীকে তোদের মনে আছেতো? ফর্সা মতো, টিয়াপাখি নাক। সুমিততো ওকে দেখলেই প্রথম থেকেই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতো। আমি বলেছিলাম- নাথ্থিং ডুয়িং। ঐ দোকানে ঢুকতেই দিই নি, সে সুমিত যতই ছুঁকছুঁক করুক। আবার খাবি খাওয়ার সুযোগ করে দেব নাকি!" রিংকু হড়বড় করে কথাগুলো বলেই হাতের গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দেয়।
"খান্ডারনি মাইরি!" সুমিতের কথায় ওরা সবাই হেসে ওঠে। রিংকুও।
নভি মুম্বাইয়ের নেরুলে রিংকু-সুমিতের ব্যাংক অফিসারস কোয়ার্টারে ছ'তলার প্রশস্ত বসার ঘরে আজ আসর বসেছে। সুমিত আছে ব্যাংকে আর রিংকু একটা প্রাইভেট কনভেন্ট স্কুলে। ওদের একটিই মেয়ে, গতবছর বিয়ে করে হায়দ্রাবাদে। অতনু ওদের ক্লাসমেট ছিল। মানে অতনু, সুমিত ও রিংকু এম এ-ক্লাশে সহপাঠী ছিল তিরিশ বছর আগে। এমনকি যে পিয়ালির কথা ওরা বলছে, সেও। তুলি এম এতে ওদের পরের ব্যাচ। সবারই সাবজেক্ট ছিল ইংরাজি। পিয়ালি আর অতনু অনার্সও করেছিল একই কলেজ থেকে। প্রথম প্রথম ওদের ঘনিষ্ঠতা দেখে মনে হত ওরা পরস্পরকে ভালোবাসে। সবাই ভাবতো ওরা প্রেমিক-প্রেমিকা, যেমন ছিল সুমিত ও রিংকু। পিয়ালিকে ইউনিভার্সিটিতে ওদের ব্যাচের সবাই আড়ালে পাগলি বলতো, ওর অল্পতেই রেগে যাওয়া, মুডি ও খেপাটে স্বভাবের জন্য। আসলে ওর মা-ই ছিল মানসিক ভারসাম্যহীন। ওর ডাক্তার বাবা এফ আর সি এস করতে লন্ডনে গিয়ে আগে থেকেই ওখানে থাকা ওর মায়ের এক পিসতুতো বোনের সঙ্গে থাকতে শুরু করে। যদিও নিয়ম করে টাকা পাঠাতেন যাতে পিয়ালি বা ওর মার অসুবিধা না হয়, তবু একমাত্র সন্তান পিয়ালিকে একা সংসার সামলে, সারাদিন থম মেরে বসে থাকা মাকে সামলিয়ে, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে অনেক অসুবিধারই মুখোমুখি হতে হতো। পিয়ালি জেদি ও খুব মুডি হলেও বন্ধুদের কিন্তু খুব ভালোওবাসতো। নানান রকম মুখরোচক খাবার করে নিয়ে আসতো সবার জন্য। প্রতিটা ক্লাশ করতো মন দিয়ে, শর্ট হ্যান্ডে নোট নিত। এবং বন্ধুরা চাইলেই নোটস দিয়ে দিত অম্লান বদনে। ওর একটাই লক্ষ্য ছিল, লন্ডনে যাওয়া। বাবার নাকের গোড়ায় মাকে নিয়ে গিয়ে স্বাধীনভাবে থাকা। এসবই ও অতনুকে বলতো। ফলে অন্যদের মতো করে অতনু পিয়ালির কখনো প্রেম করা হয়ে ওঠেনি। ওদের সম্পর্কটা ঠিক প্রেম ছিল কিনা সেটাও অতনুর কাছে স্পষ্ট ছিল না। ওরা একসাথে আউট্রাম বা ভিক্টোরিয়ায় না গিয়ে ওর মাকে নিয়ে বরং ডাক্তারের কাছে যেত। ওরা একসাথে কখনো সিনেমায় না গেলেও, পিয়ালিদের বাড়িটার ট্যাক্স মুকুবের জন্য মিউনিসিপালিটির অফিসে গিয়ে ধরনা দিয়েছে। ওরা সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পরে পিয়ালি যখন ফার্স্টক্লাশ পাওয়ার জেদে নিজেকে পড়াশোনা আর টিউটোরিয়ালে ব্যস্ত করে ফেলে অতনু তখন ফার্স্ট ইয়ারে সদ্য ভর্তি হওয়া সুন্দরী তুলির আকর্ষণে মজতে থাকে। পিয়ালির যেন এ সবে কিছুই যায় আসে না। আর ওর কিছু যায় আসে না বুঝতে পেরেই যেন অতনু আরো মরিয়া হয়ে তুলির প্রেমে ডুবতে থাকে। তারপর ফাইনাল পরীক্ষার পরে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পিয়ালির সঙ্গে। তখনও তো মোবাইলের যুগ শুরু হয়নি। পাস করে ওদের ব্যাচের অনেকের মতো সুমিত ঢুকলো ব্যাংকে, প্রভিসনারি অফিসার হয়ে। ঢুকেই পরের বছরই রিংকুর সঙ্গে বিয়ে। অতনু ও তুলি গিয়েছিল ওদের বিয়েতে। পিয়ালি আসেনি। অতনু ঢুকলো স্কুলে, তুলিও। ওরাও বিয়ে করলো তার বছর দুয়েকের মধ্যেই। ওদের একটিই ছেলে। সেও ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে চাকরি করছে ইনফোসিস, হিউস্টানে। সুমিত গত চার বছর ট্রানস্ফারড্ হয়ে মুম্বাইয়ে। অতনু তুলি গোয়া ঘুরে ফেরার পথে ওদের কাছে এসে উঠেছে তিনদিন আগে। আগামীকাল দুপুরে ওদের কলকাতা ফেরার টিকিট। ফ্লাইটে। তিন মাস আগেই কাটা সস্তার টিকিট। উইক ডেজ বলে সুমিত আর রিংকু শুধু প্রথম দিনই ছুটি নিয়েছিল। তারপরের দুদিনই অতনু আর তুলি নিজেদের মতো করে শহরটা ঘুরে দেখছে। ট্রেনে, বাসে, ট্যাক্সিতে। সুমিত অবশ্য ওর গাড়ি ড্রাইভার ছেড়ে দিতে চেয়েছিল, অতনুই রাজি হয়নি। ট্রেনে বাসে না ঘুরলে নাকি একটা শহরের আসল স্পিরিটটা বোঝা যায় না। অতনুর এই প্রথম মুম্বাইতে আসা হলেও তুলি আগে একবার এসেছিল হায়ার সেকেন্ডারি পড়ার সময়।
"বেচারা সুমিত! এ জীবনে আর হয়তো শিবানীকে দেখার সুযোগই পাবে না।" অতনু চোখ মটকে বলে।
"এই তুই আর বাজে কথা বলিস না। আমাদের বয়স কত হলো মনে আছে! এ বয়সে দেখা হলেই বা কী হাতি ঘোড়া হত? তোরই যদি আজ পিয়ালির সঙ্গে দেখা হয়ে যেত কী করতিস তুই, শুনি?" রিংকু কৃত্রিম ক্রোধ দেখায়।
"কী আর করতো, কালকের ফেরার টিকিট ক্যান্সেল করে পিয়ালিকে নিয়ে মানসিক ডাক্তারের কাছে দৌড়তো, যেমন একসময় ওর মাকে নিয়ে যেতো বলে শুনেছি।" তুলি বলে। রিংকু হাসতে হাসতে বলে, "ঠিক বলেছিস।" যদিও তুলি সে হাসিতে যোগ দেয় না।
অতনু হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলে, "জানি না রে কি করতাম। না, কালকের টিকিট হয়তো ক্যান্সেল করতাম না, তবে তোদের বাড়িতে এনে তুলতাম ঠিক... তোদের ঘাড়েই দায়িত্ব চাপিয়ে যেতাম। প্ল্যাটফর্মে ফেলে আসতাম না। পিয়ালি আমাদের সবাইকেই কী ভালোবাসতো, বল!"
"সবাইকেই?" তুলি ঘুরিয়ে প্রশ্নটা করেই হেসে ফেলে। যদিও বাকি তিনজন যোগ দেয় না সে হাসিতে।
"ও কথা ছাড়। আগে বল, তুই কী জিগ্যেস করলি ওই পাগলিটাকে? এক্সকিউজ মি, আপনার নাম কি পিয়ালি?" রিংকু কথাগুলো তুলিকে বলেই এখন খিলখিল করে হেসে ওঠে।
তুলি কোনো উত্তর না দিয়ে প্লেট থেকে একটা কাবাব মুখে পুড়ে চোখ বন্ধ করে বলে, "আহা! দারুণ বানিয়েছো রিংকুদি।"
অতনু ওর আর সুমিতের গ্লাসে নতুন পেগ বানিয়ে আইস কিউব দিতে দিতে রিংকুর কথার খেই ধরে বলে, "নারে নাম বলবে কি, সে তো বদ্ধ পাগলি। ব্রিজের তলায় জড়োসড়ো হয়ে নিজের মনে খুব আস্তে আস্তে, নিচু স্বরে বিড়বিড় করে যাচ্ছে। আমি প্ল্যাটফর্মের টি-স্টলে জিজ্ঞেস করলাম কেউ ওর পরিচয় জানে কিনা তা ওরাও কেউ কিছু বলতে পারলো না। এমন কতো পাগল ভিখারি আসে যায়, মুম্বাই শহরে কে কার খোঁজ রাখে! অল্প বয়স্ক কোনো মহিলা হলে হয়তো নজরে পড়তো, একে দেখেই তো সিনিয়ার সিটিজেন মনে হচ্ছে। তখন তুলি ঐ স্টল থেকে দুটো বড়া-পাও কিনে ওর একদম সামনে গিয়ে উবু হয়ে বসে ওকে দিল।"
"আর ও নিলো? বাবা, এ তো জাতে পাগল, তালে ঠিক।" রিংকু বলে।
রিংকুটা চিরকালই একই রকম সংবেদনহীন থেকে গেল, অতনু মনে মনে ভাবে। বিরক্ত হয়। মুখে বলে, "হ্যাঁ নিলো মানে, তুলিই ওর সামনে কাগজের প্লেটটা রেখে দিল। আর মন দিয়ে কান খাড়া করে ওর ঐ বিড়বিড় শুনে এলো।"
"কী বলছিল রে?" রিংকু উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করে।
এতক্ষণ বাদে তুলি বললো, "কী জানি, কী বলছিল। তা তো বুঝতে পারিনি, তবে চোস্ত মারাঠীতে বলছিল। ভদ্রমহিলা যে মারাঠীই এতে কোনো সন্দেহ নেই।"
"আচ্ছা, আজ কি শুধু ঐ পাগলিকে নিয়েই কথা হবে, আর কোনো টপিক নেই?" সুমিত এক চুুুমুকে নিজের গ্লাস ফাঁকা করে ঠক করে টেবিলে রেখে বলে।
"বাবুর চড়েছে রে! তোরা এবার একটু শিবানীর টপিক তোল।" রিংকুর কথায় ওরা চারজনেই হেসে ওঠে।

ওদের আড্ডা চলে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত। রিংকু চিকেন ও চিংড়ি দিয়ে মিক্সড্ স্টিউড রাইস বানিয়েছিল। হলে বসে গল্প করতে করতেই ওরা তাই দিয়ে ডিনার সেরে নেয়। টেবিল পরিস্কার করতে রিংকুর সঙ্গে তুলিও হাত লাগায়। সব কাজ মিটলে রিংকুর কাঁধে হাত রেখে সুমিত ওদের বলে, "চলো গুরু, আমাদের আবার সকালে উঠেই দৌড়তে হবে। অতএব, আমরা ভাই-বোন শুতে চললাম। গুড নাইট, স্লীপ টাইট। তোদেরতো হানিমুন চলছে, অতএব এনজয়...।" ওরা শুতে চলে গেলে তুলি গিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়ায়। দূরে অন্ধকারে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা দেখা যাচ্ছে। কুচকুচে আকাশে রুপোর রেকাবির মতো চাঁদ উঠেছে। কাল কোজাগরী। চারপাশের বিভিন্ন উচ্চতার বহুতলের মাথায় ডিস অ্যান্টেনাগুলো চকচক করছে। জানলাগুলো দিয়ে টিভির টুকরো দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। নিচে রাস্তায় এখনো প্রচুর গাড়ি, অটো চলছে। মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। মুম্বাই থেকে এত দূরের শহরতলিতেও এতো রাতে কেমন জমজমাট! এ শহর কি ঘুমায় না!
অতনু সিগারেটটা অ্যাসট্রেতে গুঁজে দিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। তুলির পিঠে হাত রেখে বলে, "তোমার বৌমা বাবাইয়ের কথা বলছিলেন, তাই না?"
"বৌমা, আগামীকাল রাতে লক্ষ্মীপুজোয় প্রতিবারের মতো ওঁর কাছে সোদপুরে যেতে বললেন।"
"আমি জানি, তোমরা বাবাইয়ের কথাও বলেছো। তুমি তো আগে একবার ওদের সঙ্গেই বম্বে বেড়াতে এসেছিলে। তোমার মামা, বৌমা, কাকলিদি, বাবাই আর তুমি। আমি তোমার মামা বাড়ির অ্যালবামে বুট হাউসের সামনে স্কার্ট পরা তোমার সঙ্গে বাবাইয়ের সাদা কালো ফটো দেখেছিলাম। আমি জানি আজ হ্যাঙ্গিং গার্ডেনে গিয়ে তোমার সে সব মনে পড়ছিল।"
"থাক না ওসব কথা।" তুলি বলে। অতনু টের পায় আজ বাবাইয়ের প্রসঙ্গেও ওর হাতের নিচে তুলির পিঠের ত্বক আর যেন তেমন ঠান্ডা ও শক্ত হয়ে উঠছে না।
"আমারও কি ভালো লাগে তুলি? আমিও কি অপরাধবোধে ভুগি না? আমিও কি ভুলতে পেরেছি ঐ দিনটা যেদিন তোমাকে বাড়িতে না পেয়ে ওর সঙ্গে একবার দেখা করার অনুরোধ করে বাবাই তোমার জন্য দু'লাইন লিখে আমাকে দিয়ে গেল। কেন যে একঘন্টা বাদে তুমি বাড়ি ফিরে এলেই তোমাকে সেই চিঠিটা দিলাম না! কেন যে তোমাকে বললাম না ওকে কেমন বিধ্বস্ত লাগছিল! তুমি তখনই বা অন্তত সেদিন বিকেলেও যদি সোদপুরে গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করতে! সিঁথি থেকে সোদপুর যেতে কতক্ষণই বা লাগতো...।"
"হ্যাঁ, তাহলে সেদিন রাতেই হয়তো ও গলায় দড়ি দিতো না। কিন্তু এখন কেন বলছো সে সব জানা কথা? কী লাভ?"
"লাভ ক্ষতির কথা নয়, আমি নিজেকেই যে মাফ করতে পারি নি। তোমার নিজের মামাতো দাদা.. আসলে ঐ যে কফি হাউসে বসে হাসতে হাসতে আমাকে বলেছিলো, 'মহারাষ্ট্রীয়দের মতো মামাতো পিসতুতো ভাই বোনদের বিয়েটা আমাদের মধ্যে সিদ্ধ নয় বলেই তুলি তোমাকে বিয়ে করছে, না হলে ও আমাকেই বিয়ে করতো।' ওরকম অদ্ভুত রসিকতা আমি সহ্য করতে পারিনি। সেই কথাটা শোনার পর থেকে ঈর্ষার কাঁটায় আমি গোপনে বিক্ষত হতাম, চাইতাম না তোমাদের দেখা হোক।" অতনুর গলার স্বর ভারী হয়ে ওঠে অকৃত্রিম আবেগে।
চার পেগ স্মিরনফের উষ্ণতা, এই অচেনা শহরের ছ'তলা ফ্ল্যাটের নিরিবিলি ব্যালকনি, পশ্চিমঘাটের প্রশস্ত ধূসর পাথুরে তরঙ্গের ওপর নেমে আসা প্রাক কোজাগরী চন্দ্রিমা সব মিলে মিশে অতনুর ভেতরে অনেকবছরের জমে থাকা একটা অন্ধকার যেন আজ হঠাৎই গলে যেতে থাকে। ও দুহাত দিয়ে তুলিকেে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনে বলতে থাকে, "আমাকে ক্ষমা করো তুলি। তুমি কত উদার, কত মহান। সুমিত তখন ঠিকই বলেছিল... তুমি কী অবলীলায় ঐ মহিলার সামনে গিয়ে বসলে একথা জেনেও যে ও পিয়ালি হতে পারে। মহিলা হয়েও ঈর্ষা তোমাকে কাবু করতে পারলো না, আর আমি... আমি কি না...।"
"প্লিজ এসব কথা বন্ধ করো।" তুলি ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘন হয়ে আসে অতনুর বুকের কাছে। হাসিমুখে অতনুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, "অদ্যই শেষ রজনী। কাল থেকে তো আবার সেই সংসারের খাঁচা। দেখতে দেখতে পুজোর ছুটি শেষ হয়ে যাবে। সেই স্কুল, টিউশানি, খাতা দেখা। ছেলেটাও অত দূরে, ভালো লাগে না গো আর।"
অতনু ওকে দু হাতে নিবিড় জড়িয়ে ধরলে তুলি চাপা স্বরে বলে, "চলো, শুতে যাই।"

অতনু তুলিকে আদর করতে করতে বুঝতে পারছিল ওকে গলানোর জন্য আজ বেশি কসরৎ করতে হবে না। তুলি নিজেই আজ নরম হয়ে উঠছে। অতনু খুশি হয়, মনটা হালকা হয়ে ওঠে। তুলি অতনুর পিঠ খামচে ধরে মুখে গাঢ় স্বরে বলে, "তুমি কষ্ট পেয়ো না। ঈর্ষা হয়। ঈর্ষা হয়। আমি জানি সবারই ঈর্ষা হয়।" আর নিজের মধ্যে অতনুকে অনুভব করতে করতে একই সঙ্গে মনে মনে বলতে থাকে, "আমি সরি অতনু... তোমার গোপন ঈর্ষার কথা তো তুমি আজ বলতে পারলে, কিন্তু আমি তোমাকে কোনোদিনও বলতে পারবো না যে আজ প্ল্যাটফর্মের ওই মহিলা মারাঠীতে নয়, পরিস্কার ইংরাজিতে বিড়বিড় করছিল..to die, to sleep.. To sleep, perchance to dream.. Aye, there's the rub..For in that sleep of death what dreams may come..."

অলংকরণঃ সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

ফেসবুক মন্তব্য