নারীবাদী আন্দোলন ও আমাদের নারীরা

তুষ্টি ভট্টাচার্য



১৮৩৭ সালে ফ্রেঞ্চ দার্শনিক ও ইউটোপীয় সমাজবাদী চার্লস ফুরিয়ে প্রথম ‘নারীবাদ” শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। নারীবাদ ও নারীবাদী (feminism, feminist) শব্দদুটি ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৭২-এ, যুক্তরাজ্যে ১৮৯০-এ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১০-এ। অক্সফোর্ড অভিধান অনুযায়ী নারীবাদ ও নারীবাদী শব্দদুটির উৎপত্তিকাল যথাক্রমে ১৮৫২ ও ১৮৯৫। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নারীবাদীরা বিভিন্ন কর্মসূচী ও লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছেন। বেশির ভাগ পাশ্চাত্য নারীবাদী ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, যে সমস্ত আন্দোলন নারীর অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করেছে, তাদের সব কটিকেই নারীবাদী হিসেবে গণ্য করা উচিৎ। তারা নিজেদের নারীবাদী না বললেও কিছু এসে যায় না এতে। আবার আর এক দল ঐতিহাসিক মনে করেন, নারীবাদী শব্দটি শুধুমাত্র আধুনিক নারীবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই এরা আগের আন্দোলনগুলোকে ‘উপনারীবাদ” নাম দিয়েছেন।
আধুনিক পাশ্চাত্য নারীবাদী আন্দোলন তিনটি ‘ঢেউ’-এ বিভক্ত। প্রথম ঢেউয়ের সময়ে ঊনবিংশ শতক ও বিংশ শতকের প্রথম ভাগে নারীর ভোটাধিকার অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ঢেউ বলতে ১৯৬০-এর দশকে নারীমুক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হওয়া মতাদর্শকে বোঝায়। এই সময়ে নারীর সামাজিক ও আইনগত সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হয়। তৃতীয় ঢেউ হল ১৯৯০ থেকে শুরু হওয়া একদম আলাদা গোত্রের এক অভিমুখ। এই সময়ে লিঙ্গনির্ভর প্রথাগত সামাজিক মূল্যবোধের আমূল পরিবর্তনের ওপর নজর দেওয়া হয়েছে। বিখ্যাত বৃটিশ দার্শনিক, রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ জন স্টুয়ার্ট মিল নারীর অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে লিখতে শুরু করেন। সেই হিসেবে তাঁকে প্রথম নারীবাদী বলা যেতে পারে। ১৮৬১ সালে তিনি ‘দ্য সাবজেকশন অফ উইমেন’ নামে একটি নিবন্ধ লেখেন যা ১৮৬৯সালে প্রকাশিত হয়। এই লেখায় নারীকে বৈধভাবে উপভোগ করা ও কাজে লাগানোর বিষয়কে ভুল প্রমাণিত করেন।
ফ্রেঞ্চ ভাষার Ecriture feminine কে অনুবাদ করে অনেক সময়েই বলা হয়েছে ‘মেয়েলী লেখা’। অনেকে আবার ‘মেয়েদের লেখা’ও বলেছেন। এই তত্ত্বে মেয়েদের ভাষায় ও লেখায় এবং শরীরে সংস্কৃতি এবং মানসিক পটভূমির যে প্রভাব, তাকেই খোলাখুলি ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। ১৯৭০-এর প্রথমে ফ্রানসে ফেমিনিস্ট লিটারারি থিওরির প্রতিষ্ঠা করেন Helene Cixous, Monique Wittig, Luce Irigaray, Chantal Chawaf, Catherine Clement এবং Julia Kristeva। ৯০এর দশকে প্রথমে Bracha Ettinger তাঁর সাইকো অ্যানালিটিক থিওরির মাধ্যমে এই তত্ত্বকে আরও সুদৃঢ় করেন। এই তত্ত্বে নিজেকে খোঁজার জন্য যে ভাষা প্রয়োজন, তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর জন্য মনোবৈজ্ঞানিকদের বিভিন্ন গবেষণার ওপর ভিত্তি করে প্রত্যেকটি মানুষের সামাজিক ভূমিকা কী হওয়া উচিৎ, বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন নারী যেন অবদমিত হয়ে না থাকে, সে যেন তার স্বকীয়তা না হারিয়ে, নিজস্বকে আবিষ্কার করে, একজন স্বপ্রতিষ্ঠিত মানুষ হিসেবে নিজেকে দেখে, এই তত্ত্বের মূল কথা ছিল এটাই।
এলেন সিজু(Helene Cixous) ‘দ্য লাফ অফ দ্য মেডুসা’ (১৯৭৫) নামক রচনায় বলেছিলেন নারীকে তার নিজস্বতাকে লিখতে হবে। অন্য নারীদের সম্বন্ধে লিখতে হবে এবং তাদের দিয়েও লেখাতে হবে। নারী নিজেই যেন তার শরীরকে উপেক্ষা না করে। তাদের যৌন আনন্দ যেন অস্বীকৃত এবং অবদমনের পথে না চলে। সিজুর এই রচনায় উৎসাহিত হয়ে ২০০৬ সালে ‘দ্য লাফ অফ দ্য মেডুসা’ নামেই একটি বই প্রকাশিত হয় যেখানে জুলিয়া ক্রিস্তেভা, লুসি ইরিগ্যারি, ব্রাকা ইটিনগার এবং এলেন সিজু একত্রে তাঁদের মতামত লিখেছেন। সিজু মতে ফেমিনিন লিটারারি নিয়ে শুধু মেয়েরাই লিখবে এমন তো না। পুরুষ লেখক, যেমন জেমস জয়েস, জিন জেনেট এঁরাও নিযুক্ত হয়েছিলেন এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করতে। যদিও অনেকেই তখন এর বিরোধিতা করেছিলেন, কারণ সিজুর মত অনুযায়ী ফেমিনিন লিটারারি কেবল মেয়েদের জন্যই। মেয়েদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থান প্রতিষ্ঠা করার জন্যই যেহেতু এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেহেতু পুরুষ লেখকদের এই বিষয়ে লেখার যৌক্তিকতা কী? সিজুর লেখার ধরনকে সাদা কালির লেখা বলা হত, যেহেতু তিনি বলেছিলেন মাতৃদুগ্ধ থেকেই উৎসারিত হয়েছে আমাদের সবটুকুই। ফলে সেই সময়ে তাঁর পুরুষ লেখকদের নিযুক্ত করা নিয়ে এই আন্দোলন কিছুটা হলেও ধাক্কা খেয়েছিল।
লুসি ইরিগ্যারির মতে নারীর যৌন সুখ শুধু অনুভবের। তাকে প্রকাশ করা বা ব্যাখ্যা করা যায় না। পুরুষদের মত নারীর যৌন সুখের প্রকট প্রকাশ নেই, যা দৃশ্যমান নয় তা কেবল অনুভবেরই, আর সেটা লেখার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করতে পারে কেবল নারীরাই। নারী তার নিজস্ব মেরু খনন করে তার ফসল ফলায় তার লেখায়। আর পুরুষ লেখে নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি থেকে। কৃস্তেভা বলেন মেয়েদের লেখা মা এবং তার গর্ভস্থ সন্তানের বন্ধন থেকে উঠে আসে। নারী অস্তিত্ব রক্ষা করে না, তাকে লড়াই করে টিঁকে থাকতে হয়। এই সূত্রে ইরিগ্যারি তাঁর তত্ত্বে লেখেন, মেয়েদের যৌনতা এবং লেখালেখি অনেক বেশি বিস্তৃত পরিসর জুড়ে রয়ে গেছে। যেহেতু পুরুষ এক নায়ক তন্ত্রের ফসল, ফলে তাদের লেখায় একটি একরৈখিক ধারা থাকে। আর মেয়েদের লেখা ততোধিক গুণিতকে বিভক্ত হতে থাকে। মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে যৌনাঙ্গ রয়েছে, আর তার ফলেই তাদের লেখার বিস্তৃতি এত ব্যাপক, সেখানে পুরুষ কেবল মাত্র একটি যৌনাঙ্গের সুখ ভোগ করে থাকে। ফলে তাদের লেখাও এক কেন্দ্রিক হয়ে যায়। সিজু আর ইরিগ্যারি দুজনেই বলেন, যেহেতু আদি কাল থেকে মেয়েরা হয় কুমারী, নয় বেশ্যা, নয়ত বউ বা মা হয়ে থেকেছে, তাই তাদের যৌনতাকে তারা প্রকাশ করতে পারে নি এতদিন। এবার তারা তাদের নতুন ভাষায় কথা বলুক, জেগে উঠুক নতুন ধারার লেখা নিয়ে, তাদের যৌন ভাষাকে তারা নিজেরাই প্রচার করুক।
পোস্ট মডার্ন ফেমিনিজম নিয়ে বলতে গিয়ে ১৯৯০-এ জুডিথ বাটলার তাঁর ‘জেন্ডার ট্রাবল’ বইয়ে লিখেছেন লিঙ্গ বৈষম্যই হল যত নষ্টের মূল। এই কারণে তিনি সিমন দ্য বেভর, মাইকেল ফুকো ও জ্যাক লাকানকে প্রচন্ড সমালোচনা করেন। এমন কি লুসি ইরিগ্যারির যুক্তি – চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী পুরুষকার বলতে যা বোঝায় তারই প্রতিবিম্ব হিসেবে নারীবাদের সূচনা হয়েছে, এই নীতিকেও খন্ডন করেন। বাটলারের সমালোচনার মূলে ছিল পূর্বের ফেমিনিজম তত্ত্বে জীববিদ্যা অনুযায়ী যৌনতা এবং সামাজিক বিভেদরেখা অনুযায়ী লিঙ্গ বৈষম্য বিষয়ে। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বুঝিয়েছিলেন কেন আমরা
পার্থিব বস্তু, ধরা যাক শরীর, সব সময়ে যে সামাজিক রীতি অনুযায়ী ব্যবহৃত হবে, এমনটা হতে পারে না। তিনি এও বলেছেন যে মহিলাদের এই অবদমনের কোন একটি কারণ বা একটিই সমাধান হতে পারে না। তার ফলে এই পোস্ট মডার্নিজম তত্ত্বের কোন সমাধান পাওয়া যায় নি বলে এই আন্দোলন অনেকাংশেই বিফল হয়েছে। যদিও বাটলার নিজে ‘পোস্ট মডার্নিজম’ শব্দের ব্যবহার মানতে চান নি।
পোস্ট মডার্নিজম সব সময়েই চারিত্রীকরণের বিরুদ্ধে গেছে। কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা তথ্যের ভিত্তিতে এই আন্দোলন চলেছিল। যদিও মেরি জো ফ্রাগ এর বাইরে গিয়ে বলেছেন মানুষের সমস্ত অভিজ্ঞতাই সঞ্চিত থাকে তার ভাষার মধ্যে। ক্ষমতার ব্যবহার একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গই যে করে থাকে তা না, আর ভাষাও আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে তার ক্ষমতাকে সীমিত করে বা বেঁধে রাখে। এই প্রসঙ্গে বলি, কেট বরন্‌স্টে্ন ছিলেন একজন ট্র্যান্সজেন্ডার লেখক, যিনি নিজেকে পোস্টমডার্ন ফেমিনিস্ট বলে ঘোষণা করেন।
ভারতীয় ফেমিনিজমের ইতিহাসকেও তিনটে পর্যায়ে ভাগ করা যায়। পাশ্চাত্যের মত নয়, বরং ভারতে নারীবাদী আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের (১৮৫০-১৯১৫) সূচনা হয় পুরুষের হাত ধরেই। মহারাষ্ট্রে প্রথম মহিলাদের অধিকার ও শিক্ষার দাবীতে নারীবাদী আন্দোলন শুরু হয় মহিলাদের দ্বারাই। সাবিত্রীবাঈ ফুলে ভারতের প্রথম মেয়েদের স্কুল চালু করেন। তারাবাঈ সিন্ধে প্রথম নারীবাদী লেখা লেখেন এবং পান্ডিতা রামবাঈ হিন্দুধর্মের জাতপাত প্রথার কঠোর সমালোচনা করেন ও নিজে জাতের বাইরে বেরিয়ে খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। এসময়ে বাংলার নবজাগরণের ফলে হিন্ধু ধর্মের সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তি, বিধবা বিবাহ, শিশু বিবাহ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের সম্পত্তিতে আইনগত অধিকার এবং সন্তান দত্তক নেওয়ার অধিকার আদায়ের জন্য যে আন্দোলন চলছিল, নারীবাদী আন্দোলন তার ফলে অনেকটাই অক্সিজেন পায়। ১৮৮৬ সালে নারীবাদী কবি কামিনী রায় ভারতের প্রথম অনার্স গ্র্যাজুয়েট হন। এমন কি সেই বৃটিশ আমলেও কয়েকটি রাজ্য মহিলা শাসিত ছিল। যেমন ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ, কিট্টুরের রাণী চেন্নামা, ভোপালের কুদিসা বেগম, পাঞ্জাবের জিন্দ কৌর প্রভৃতি।
দ্বিতীয় পর্যায়ে (১৯১৫-১৯৪৭) গান্ধীজী পর্দা প্রথা সরিয়ে মেয়েদের অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে যুক্ত হতে ডাক দেন। সত্যাগ্রহ আন্দোলনেও মেয়েদের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। এই সময়েই অল ইন্ডিয়া উওমেনস কনফারেন্স এবং ন্যাশানাল ফেডারেসন অফ ইন্ডিয়ান উওমেন – এই দুটি সংস্থা তৈরি হয়। ১৯২০সাল থেকে প্রকৃত অর্থে ফেমিনিজম মুভমেন্ট চালু হয়। স্থানীয় মহিলারা, নিজেদের সংগঠন তৈরি করে মেয়েদের শিক্ষা, খেটে খাওয়া মহিলাদের কাজের জগতে সুরক্ষা ও সমতার জন্য লড়াই শুরু করে। জাতীয় পর্যায়ে গান্ধীজীর আওতায় থেকে AICWর মহিলা সদস্যরা বিভিন্ন রকম আন্দোলনে যুক্ত হয়। ১৯৩০ সালে এভাবেই আইন অমান্য আন্দোলনে মহিলাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থেকে যায়।
স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও AICW তাদের সংগঠনের কাজ চালু রাখে। ১৯৫৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হলে ন্যাশানাল ফেডারেসন অফ ইন্ডিয়ান উওমেন নামে তাদের মহিলা শাখাও কাজ শুরু করে। ১৯৬৬ সালে ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৬৬-৭৭ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। চতুর্থবারে ১৯৮০ সালে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হলেও ১৯৮৪ সালে আচমকাই আততায়ীর হাতে নিহত হন। ভারতের সমস্ত রাজ্যে মহিলাদের অধিকার রক্ষার জন্য যে আন্দোলন হয়েছে, কেরালার নেত্রীরাই সে বিষয়ে এগিয়ে থেকেছেন। কেরালা সব সময়েই নারীদের সাক্ষরতার হারে, স্বাস্থ্য, সুরক্ষা এবং সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় এগিয়ে থেকেছে। ১৯৮৮ সালে বিনা আগরওয়ালের এক সমীক্ষা অনুসারে দেখা গেছে, সারা ভারতের মহিলারা যেখানে পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় ১৩% হার বজায় রেখেছে, সেখানে কেরালায় এই হার ২৪%।
২০১৪ সালে মুম্বাই ফ্যামিলি কোর্ট একটি রায়ে স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টের ২৭(১)(ডি) ধারা অনুযায়ী একজন স্বামী তার স্ত্রীকে কুর্তা-জিন্সের বদলে শাড়ি পরতে বাধ্য করানোর কারণে নিষ্ঠুরতার অভিযোগে বিবাহ বিচ্ছেদের রায় দেয়। ২০১৬ সালে দিল্লী হাইকোর্ট একটি রায় দেয়, যৌথ পরিবারের সব থেকে বয়স্ক মহিলা পরিবারের ‘কর্তা’ হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়াও আরও একটি উল্লেখযোগ্য রায় ঘোষণা করা হয়, যেখানে সন্তান প্রতিপালনে অভিভাবক হিসেবে একজন মা যে কোন প্রতিষ্ঠানে একক স্বীকৃতি পাবেন। বাবার সাক্ষর জরুরী নয় এই ক্ষেত্রে।
আমরা যদি ভারতীয় উপমহাদেশের নারীবাদী লেখিকাদের প্রসঙ্গে আসি, একথা ঠিক যে এখানে ভার্জিনিয়া উলফ বা টনি মরিসনের মত কাউকে আদর্শ হিসেবে দাঁড় করাতে পারব না। সত্যি বলতে কি, যেহেতু পুরুষের হাত ধরে নারীবাদ এ দেশে এসেছে, তাই নারীবাদী আন্দোলন এগিয়েছে ধীর লয়ে, মৃদু পদক্ষেপে। যে সময়ে মেয়েরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল, ঘরের বাইরে বেরিয়ে বাইরের দুনিয়াকে প্রত্যক্ষ করা ছিল তাদের কাছে অলৌকিক কল্পনার মত। সেই সময়ে কামিনী রায়ের মত একজন নারীবাদী লেখিকার উদয় হয়।
কবি কামিনী রায় একজন কবি, সমাজকর্মী এবং নারীবাদী লেখিকা ১৮৮৬ সালে ভারতের বেথুন কলেজ থেকে সংস্কৃতে প্রথম মহিলা অনার্স গ্র্যাজুয়েট হন এবং এই কলেজেই অধ্যাপনা শুরু করেন। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। তিনি সব সময়েই অন্য নারী সাহিত্যিকদের উৎসাহ দিতেন ও সাহায্য করতেন। তিনি ১৯২২-২৩ সালে নারীশ্রম তদন্ত কমিশনের সদস্য ছিলেন।
‘কাঁদে প্রাণ যবে আঁখি
সযতনে শুকায়ে রাখি;-
নিরমল নয়নের জলে, পাছে লোকে কিছু বলে।

একটি স্নেহের কথা
প্রশমিতে পারে ব্যথা;-
চলে যাই উপেক্ষার ছলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।‘ - কামিনী রায়ের এই কবিতাটি যে আজও কত সত্য! লোকলজ্জার ভয়ে এখনও মেয়েরা অনেক অনুভূতিই প্রকাশ করতে পারে না।

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (৯ ডিসেম্বর ১৮৮০ - ৯ ডিসেম্বর ১৯৩২) হলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন খ্যাতিমান বাঙালি সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক। তাঁকে বাঙালি ‘নারী জাগরণের অগ্রদূত’ বলা হত। ১৯১০ সালে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলার ফলে স্কুল বন্ধ করে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। এখানে ১৯১১ সালের ১৫ই মার্চ তিনি সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল পুনরায় চালু করেন। প্রাথমিক অবস্থায় ছাত্রী ছিল ৮ জন। চার বছরের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪-তে। ১৯৩০ সালে এটি হাইস্কুলে পরিণত হয়।
বেগম সুফিয়া কামাল, ( জন্ম: ২০শেজুন, ১৯১১ মৃত্যু: ২০শেনভেম্বর, ১৯৯৯) বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা কবি, লেখিকা, নারীবাদী ও নারীআন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে অতি পরিচিত ব্যক্তিত্ব। মুসলিম নারীদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামে’ রোকেয়ার সঙ্গে সুফিয়া কামালের পরিচয় হয়। বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা ও প্রতিজ্ঞা তাঁর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়, যা তাঁর জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে নারীজাগরণ আর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি উজ্জ্বল ভূমিকা রেখে গেছেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শরিক হয়েছেন, কার্ফ্যু উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেছেন। মুক্তবুদ্ধির পক্ষে এবং সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিপক্ষে আমৃত্যু তিনি সংগ্রাম করেছেন।
শর্মিলা রেগে (৭ জুলাই ১৯৬৪- ১৩ জুলাই ২০১৩) একজন ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানী, নারীবাদী বিদুষী ছিলেন। তিনি "রাইটিং কাস্ট/ রাইটিং জেন্ডার" এই বইটির লেখিকা ছিলেন। ক্রান্তিজ্যোতি সাবিত্রীবাই ফুলে স্ত্রী অভ্যাস কেন্দ্র, পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ওঁর অবদানের জন্যে মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস এর পক্ষ থেকে তাঁকে Malcolm Adiseshiah সম্মানে সম্মানিত করা হয়েছিল। শর্মিলাকে ভারতের অগ্রগণ্য নারীবাদীদের মধ্যে একজন মনে করা হয়। দলিত নারীবাদী দৃষ্টিকোণ চিন্তাধারা প্রথম ওঁর লেখাতেই পাওয়া যায়। ভারতীয় নারীবাদী আলোচনায় তিনি জাতি, শ্রেণী, ধর্ম, যৌনতার নতুন দিশা খুলে দিয়েছিলেন। শিক্ষা জগতে তার অবদান, দলিত ছাত্রদের জন্যে তার আজীবন লড়াই, শিক্ষাক্ষেত্রে সংশোধনের প্রতি তার দায়বদ্ধতা প্রকাশ করে।
ইসমত চুঘতাই (আগস্ট১৯১৫-অক্টোবর ১৯৯১) একজন উল্লেখযোগ্য উর্দু লেখিকা যাঁর অদম্য মনোভাব আর নারীবাদী তীব্রতা তাঁর লেখায় স্পষ্ট। ভারত ভাগ হওয়ার পরবর্তী সময়েও তিনি ভারতেই থেকে যান। বিংশ শতাব্দীর উর্দু সাহিত্যে রশিদ জাহান, ওয়াজেদা তবাসসুম, কুয়ারাতুলিয়ান হায়দারের পাশাপাশি ইসমতের কাজ উল্লেখযোগ্য। আধুনিক ভারতে তিনি মেয়েদের যৌনতা বিষয়ে মধ্যবিত্তের বিপন্নতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। তাঁর বিতর্কিত লেখার ধরণের জন্য নবীন এবং বোদ্ধাদের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর ছোট গল্পের সমগ্র নারীবাদী সাহিত্যকে মজবুত ভিত দিয়েছে। এমনকি ‘লিহাফ’ গল্পটি লেখার জন্য তাঁকে কোর্টেও যেতে হয়েছে!
কমলা দাস (৩১শে মার্চ- ৩১শেমে২০০৯) তাঁর ডাক নাম মাধবীকুট্টি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তিনি যেমন ইংরেজিতে কবিতা লিখেছেন তেমনই মালায়ালম ভাষায় কেরালার জনপ্রিয় লেখক হিসেবেও খ্যাতি লাভ করেন। কেরালায় তাঁর খ্যাতির কারণ ছিল তাঁর সুলিখিত ছোট গল্প আর আত্মজীবনী। তিনি মহিলাদের যৌনতা বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করে বুঝিয়ে দিয়ে ছিলেন যে যৌনতা বোধে কোন অপরাধ থাকতে নেই। এটা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক। সেই সময়ে এই মতবাদের জন্য তাঁকে একজন আইকন হিসেবে দেখা হত।
চিত্রা ব্যানার্জী দিবাকারুণী (১৯৫৬সালের ২৯জুলাইয়ে চিত্রলেখা ব্যানার্জী নামে জন্মগ্রহণ করেন) একজন ভারতীয়-অ্যামেরিকান লেখক ও কবি যিনি নারীবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ ছিলেন। তাঁর সুপরিচিত কাজ ‘প্যালেস অফ ইলিউশন’ যেখানে তিনি দ্রৌপদীর চোখ দিয়ে মহাভারত দেখেছেন। খুব লেখকই আছেন, যিনি এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে লেখার সাহস পাবেন। তাঁর ছোট গল্প সমগ্র ‘অ্যারেঞ্জড্‌ ম্যারাজ’ ১৯৯৫ সালে অ্যামেরিকান বুক অ্যাওয়ার্ড পায়। তিনি যেমন ছোটদের জন্য লিখেছেন, তেমনি রিয়েলিস্টিক ফিকশন, হিস্টোরিকাল ফিকশন, ম্যাজিকাল রিয়েলিজম, মিথ এবং ফ্যান্টাসি নিয়েও লিখেছেন। তিনি একাধারে ভারত এবং অ্যামেরিকায় কাজ করে গেছেন।
ললিতাম্বিকা অন্তর্জনম (১৯০৯-১৯৮৭) মালায়ালাম লেখিকা যিনি মহিলাদের জন্য লিখেছেন। নয় খন্ডের ছোট গল্প, ছটি কাব্যসমগ্র, দুটি ছোটদের বই এবং একটি উপন্যাস ‘অগ্নিসাক্ষী’ (১৯৭৬) যার জন্য তিনি কেন্দ্রীয় সাহিত্য অ্যাকাডেমি এবং কেরালা সাহিত্য অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পান ১৯৭৭-এ। তিনি মহাত্মা গান্ধীর আদর্সে অনুপ্রাণীত হয়েছিলেন এবং নিজের মত করে সমাজ সংস্কারের কাজে হাত লাগিয়েছিলেন। তাঁর লেখায় সমাজ-সংসারে মহিলাদের ভূমিকা ও তাদের নিজস্বতার মধ্যে যে সংঘাত বাঁধে, সেই প্রসঙ্গ এসেছে বারবার। বিবাহ যে মহিলাদের কাছে যৌন বন্ধন ও দাসত্ব- এও উল্লেখ করেছেন।
অনিতা মজুমদার দেসাই ১৯৩৭সালের ২৪-এ জুন জন্মগ্রহণ করেন। বুকার প্রাইজের জন্য তিনি তিনবার মনোনীত হয়েছেন। ১৯৭৮সালে তাঁর উপন্যাস ‘ফায়ার অন দ্য মাউনটেন’ সাহিত্য অ্যাকাডেমি পায়। তাঁর লেখা ‘দ্য ভিলেজ বাই দ্য সি’ বৃটিশ গার্ডিয়ান প্রাইজ পায়। ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে ১৯৯৩ সালে ক্রিয়েটিভ রাইটিং টিচার হিসেবে যোগ দেন। ইয়েল সোসাইটি অফ লিটারেচারের তিনি একজন ফেলো। তিনি নিউ ইয়র্ক রিভিউ অফ বুকস-এর জন্যও লিখেছেন।
শশী দেশপান্ডে ১৯৩৮সালে কর্ণাটকে জন্মেছেন কিন্তু বড় হয়েছেন মুম্বাই এবং বেঙ্গালুরুতে। বিখ্যাত কন্নড় নাট্যকার ও লেখক শ্রীরঙ্গার দ্বিতীয় কন্যা তিনি। ১৯৯০ সালে ‘দ্যাট লং সাইলেন্স’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অ্যাকাডেমি পান এবং ২০০৯সালে পদ্মশ্রী পুরস্কার পান। ছোটদের জন্য তিনি চারটি বই লেখেন, অজস্র ছোট গল্প ও নটি উপন্যাসও তিনি লিখেছেন। এম এম কালবুর্গির খুনের বিরোধিতা করে ২০১৫র ৯-এ অক্টোবর সাহিত্য অ্যাকেডেমির সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং সাহিত্য অ্যাকদেমি পুরস্কারও ফিরিয়ে দেন। যদিও অনিতা দেশাই ও শশী দেশপান্ডেকে সেই অর্থে নারীবাদী লেখিকার তকমা দেওয়া যায় না।
শোভা রাজাধ্যক্ষ ১৯৪৮এর ৭ই জানুয়ারিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শোভা দে নামেই পরিচিত। তাঁর লেখায় সামাজিক প্রেক্ষিতে যৌনতার ব্যবহার খুব খোলাখুলি ভাবেই করেছেন। তাঁকে এই জন্য ভারতের জ্যাকি কলিন্স নামে ডাকা হয়ে থাকে। মডেল হিসেবে নিজের কেরিয়ার শুরু করে ১৯৭০ সালে তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। স্টারডাস্ট, সোসাইটি এবং সেলিব্রিটি নামের তিনটি পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। পরে টেলিভিসনের সোপ অপেরাও লিখেছেন। তাঁর বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য সব সময়ে লাইম লাইটে থেকেছেন।
নারী নির্যাতন বন্ধ করার জন্য আইনের বাইরে কিছু সরকারী পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য ‘বেল বাজাও’ মুভমেন্ট। ২০০৮ সালের ২০শে আগস্ট ব্রেকথ্রু (হিউম্যান রাইটস) –র অধীনে মিনিস্ট্রি অফ উইমেন অ্যান্ড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট ‘বেল বাজাও’ (রিং দ্য বেল) নামের এক অ্যান্টি ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স ক্যামপেন চালু করে। এই প্রচারে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের নিজস্ব এলাকায় বধূ নির্যাতনের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়। কোন বাড়িতে এমন কিছু ঘটলে তারা সেই বাড়িতে বেল বাজিয়ে প্রবেশ করে এবং এক গ্লাস জল বা এক কাপ চা অথবা সেই বাড়ির ফোন ব্যবহারের অনুমতি চায়। এর অর্থ এই ভাবে অত্যাচারীকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় বাসিন্দারা সমস্ত ঘটনা নজরে রাখছে। অভিনেতা বোমান ইরানি এই প্রচারের অ্যাম্বাসেডর নিযুক্ত হন। তিনি বলেন পুরুষরাই অত্যাচারী পুরুষদের বিরুদ্ধে এগিয়ে না এলে নারী নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না। আরও একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। পাকিস্থানে এক অন্ত্যজ গ্রামে এক অত্যাচারিত একক মহিলার সংগ্রামের ফলে উত্থিত হয়েছে মহিলাদের জন্য পঞ্চায়েত। পাকিস্থানের তবসুম আদনান মেয়েদের প্রতি অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কেবল গর্জেই ওঠেন নি, একার চেষ্টায় মেয়েদের জুটিয়ে তৈরি করেছেন ‘খোয়েন্দা জিরগা’, মানে বোনেদের বা মেয়েদের পঞ্চায়েত। মেয়েদের ওপর অত্যাচার হলে কেবল পুরুষরাই নিদান দিতে পারবে, রায় ঘোষণা করবে, শাস্তি স্থির করবে – এই একতরফা পুরুষালি বিচার তিনি খারিজ করেছেন। ২০১৪ সালের তবাসুমের এলাকার একটি মেয়েকে ধর্ষণ করা হল। খোয়েন্দা জিরগা এর প্রতিবাদে প্রতিবাদ মিছিল করল, ঘটনাটি লোকসমক্ষে নিয়ে এল। মেয়েদের জন্য মেয়েদের প্রতিবাদ এমন জায়গায় এল যে পুরুষরা আর একা সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পেল না। ইতিহাস ভেঙে পাশতুন সমাজে এক জন মহিলা জিরগার সদস্য হওয়ার ডাক পেলেন তবসুম। ধর্মীয় বাধা সত্ত্বেও সিন্ধু প্রদেশের আইনে আঠেরো বছরের নিচে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যাবে না এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সাহসিকতার জন্য ২০১৪ সালে তবসুম পেয়েছেন নেদারল্যান্ড সরকারের ‘বেস্ট হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার অ্যাওয়ার্ড’, ২০১৫-এ পেয়েছেন মার্কিন সরকারের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অফ কারেজ অ্যাওয়ার্ড’। এ বছর কলম্বিয়ায় পেলেন ‘নেলসন ম্যান্ডেলা-গ্রাচা মাচেল ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড’।
এখনকার বাঙালি নারীবাদী লেখিকাদের কথা বলতে গেলে প্রথমেই মল্লিকা সেনগুপ্ত ও তসলিমা নাসরিনের উল্লেখ করতে হয়। মল্লিকা সেনগুপ্ত (১৯৬০–২০১১) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। তিনি কুড়িটি বই লেখেন। তিনি আপোষহীন রাজনৈতিক ও নারীবাদী হিসেবে পরিচিত। তাঁর লেখার গুণে তিনি আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তাঁর লেখা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার তাকে সুকান্ত পুরস্কার, বাংলা-অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড এবং ফেলোশিপ ফর লিটারেচার দিয়ে সম্মানিত করেছে। ইতিহাসের ব্রাত্য নারী চরিত্ররা প্রায়ই তাঁর লেখায় পুনর্জীবিত হয়েছেন। সমসাময়িক কবি সংযুক্তা দাসগুপ্তের ভাষায় "তার কবিতায় নারীস্বত্বা কেবলমাত্র অন্তর্ভূতি সচেতনতা হিসেবেই থেকে যায় না, সেটা প্রস্ফুটিত হয় সমস্ত প্রান্তিক নারীর নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক স্বতস্ফুর্ত প্রতিবাদ।"
তসলিমা নাসরিন (জন্ম: ২৫ আগস্ট ১৯৬২) বাংলাদেশের একজন সাহিত্যিক ও চিকিৎসক। বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে একজন উদীয়মান কবি হিসেবে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করে তসলিমা এই শতকের শেষের দিকে নারীবাদী ও ধর্মীয় সমালোচনামূলক রচনার কারণে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন। তিনি তাঁর রচনা ও ভাষণের মাধ্যমে লিঙ্গসমতা, মুক্তচিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ ও মানবাধিকারের প্রচার করায় ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীদের রোষানলে পড়েন ও তাঁদের নিকট হতে হত্যার হুমকি পেতে থাকায় ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারত সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করতে বাধ্য হন; বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে আল কায়িদার সঙ্গে যুক্ত মৌলবাদীরা তাঁর প্রাণনাশের হুমকি দিলে সেন্টার ফর ইনক্যুয়ারি তাঁকে ঐ বছর ২৭শে মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেতে সহায়তা করে এবং তাঁর খাদ্য, বাসস্থান নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
আশাপূর্ণা দেবী, প্রতিভা বসু শুধু মেয়েদের কথাই লিখেছেন, সংসারের কথা শুনিয়েছেন এমন তো না। তাঁরা নিজেদের বৃত্তে পৃথিবীকে লিখেছেন। যেমনটা সুচিত্রা ভট্টাচার্যর উপন্যাসেও পেয়েছি আমরা। সেই আমলের সামাজিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে একজন কামিনী রায় বা সুফিয়া কামাল, একজন ইসমত চুঘতাই বা একজন বেগম রোকেয়া, একজন আশাপূর্ণা দেবী বা প্রতিভা বসুর উত্থান মানে পাশ্চাত্যের নারীবাদী উগ্র আন্দোলনের থেকে তার তীব্রতা অনেক বেশি ভেবে নিতে হবে। আবার সেই দিক থেকে কবিতা সিংহ অনেক স্পষ্ট। তাঁর লেখায় মেয়েদের বঞ্চনা জনিত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছে তীব্র ভাবে। নবনীতা দেব সেন তাঁর উচ্চারণে যেমন স্বাক্ষর রেখেছেন কবিতা, গদ্যে, রম্য রচনায়, ভ্রমণে, আবার আশির দশকের চৈতালী চট্টোপাধ্যায়, সংযুক্তা বন্দোপাধ্যায়, – এঁদের কবিতা ছিল ভীষণ রকম ‘মেয়েলী’। অর্থাৎ মেয়েদের জীবন, মেয়েদের যাপন, বঞ্চনা, ক্ষোভ লিখেছেন নিপুণ ভাবে। কিছু শব্দ যেমন ‘পুটলি বন্দী জীবন, ’ন্যাতা’, রান্নাঘর বিষয়ক লেখা - এইসব যা কিনা একজন মেয়েই পারে তার লেখায় মিশিয়ে দিতে, ব্যবহৃত হতে দেখেছি। চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের এই কবিতাটি যেমন –
‘'কী চমৎকার এক সন্ধ্যা নামল, আর
দূরে গেল যমের দুয়ার!
হিমপতনের স্তব্ধতা, পাতা খসে পড়ছে না কাছে দূরে,
সেক্সি গন্ধ কদমের!
মেয়েটি নির্ভয়।
...............
তবে, এটা বাস্তব ছিল না!
মেয়েটির দেহ, পরদিন ভোরবেলা, তছনছ, পড়ে থাকবে
নয়ানজুলির ঘাসেজলে"
পরবর্তী কালে যশোধরা রায়চৌধুরীর লেখাতেও এমন স্বাদ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি একটি কবিতায় পুরুষের সহমর্মীতার রূপ লিখেছেন তিনি।
‘আচ্ছা, কত ব্রেসিয়ার বিক্রেতাকে পুরুষ দেখেছ-
কিন্তু কত জনকে তুমি অশ্লীল দেখেছ?
স্বধর্মেই পুণ্য আছে, রোজকার মরাবাঁচারুটিতেই
ঈশ্বর রয়েছে। নেই ধর্ষণকামনা, হিংসা, লোভ।'
মন্দাক্রান্তা সেন, রোশনারা মিশ্রর লেখায় রাজনীতির পাশাপাশি মেয়েদের কথাও এসেছে।
মন্দাক্রান্তা লিখেছেন -
‘সিঁথি কেটে গেছে, বাম হাতে চেপে ধরি
ডান হাতে খুব আলতো লাগাই তুলোটা
লোকে বলে এ কী অশৈলী মরি মরি
সিঁথির রক্তে ডুবে মরি আমি কুলটা’
রোশনারা লিখেছেন তাঁর মত করে -
‘গবাদি পশুর মত ভারি নয় পাছা
দু পায়ে উঠে দাঁড়ায় যারা
নাবালি না কাটা মেয়েদের সেই সংসারে
যেখানে শিশুরা আসে নির্ভরতা নিয়ে
পুরুষের আয়ু খাবে বলে
মেয়েরা সে বাড়ির থতমত পুরুষের কানে
বিষের মত ঢালে প্রেম’
এই প্রসঙ্গে অনিতা অগ্নিহোত্রীর নাম না উল্লেখ করলেই নয়। মিতুল দত্ত মেয়েদের অপ্রাপ্তির ছবি এঁকেছেন। সঙ্গীতা বন্দোপাধ্যায়, তিলোত্তমা মজুমদারের লেখায় যৌনতার বিবরণ এসেছে খোলাখুলি ভাবেই। অনুসূয়া সেনগুপ্ত, ভাস্বতী ঘোষ, মৌ সেন, অনিন্দিতা গুপ্ত রায়, রিমি দে, সুতপা সেনগুপ্ত,তানিয়া চক্রবর্তী প্রমুখরা আজকের মেয়েদের কথা বলেছেন। মেয়েদের কথা এলেও সেই অর্থে এখন নারীবাদী লেখিকা এই বঙ্গে নেই বললেই চলে।
আজকের দিনে হয়ত নারীবাদী আন্দোলনের আগ্রাসন কমেছে। হয়ত এর উগ্রতার কারণে মেয়েরা সেভাবে জড়াচ্ছে না এই আন্দোলনে। এই আন্দোলনে প্রকাশ্যে না জড়িয়েও মেয়েরা আজকাল তাদের কথা লিখছে নির্দ্বিধায়। যৌনতা আর কোন ট্যাবু নয় এখন। যারা যৌনতা লিখতে বা পড়তে পছন্দ করেন না, তেমন মানুষ অর্থাৎ পুরুষ, নারী নির্বিশেষে চিরকালই ছিল, আজও আছে। তবুও নারীবাদী আন্দোলনের ভূমিকা কমে নি। এই আন্দোলনের সুফল এখন মেয়েরা হাতেনাতে পাচ্ছে। ধর্ষণ, নিগ্রহ কমে নি বটে, কিন্তু এর বিরুদ্ধে এককাট্টা হতে পারছে। গৃহ লালিত যে শারীরিক বা মানসিক অত্যাচারে মেয়েরা ভয়ে বা লজ্জায় এতদিন মুখ খুলতে পারত না, সরব হয়ে উঠছে অনেকাংশে। নারীবাদী লেখার মূল কথা যা ছিল – মেয়েদের নিজেদের লেখা, তাও হচ্ছে প্রবল ভাবে। একটু নিজের কথা না বলে পারছি না এখানে। আমিও তো লিখছি! কবিতা, গদ্য, রম্য বা প্রবন্ধ যাই হোক না কেন, সেই আমার কথা বা মেয়েদের কথাই লিখছি খোলাখুলি। এই লিখতে এসে আর সবার মত আমাকেও শুনতে হয়েছে – সময় নষ্ট! সংসারে কম সময় দেওয়া হচ্ছে, ইত্যাদি। তা বলে কি থেমে গেছি? বরং এই বিরুদ্ধ কথা গুলোই আমাকে সাহস জুগিয়েছে, নিজের জেদ নিয়ে লিখে গেছি। প্রতিটি আন্দোলনের রূপরেখা যেমন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, পরিস্থিতি বা পরিবেশের সঙ্গে বদলে যায়, এই আন্দোলনও সেই কবেকার ব্রা-পোড়ানোর মহোৎসব থেকে দূরে সরে এসেছে। হয়ত আরও অনেক নতুন দিকবদল আসবে। আমরা অপেক্ষায় থাকব। অপেক্ষা সেই দিনের জন্য, যে দিনটি শুধু নারীদিবস নামের লোক দেখানো একটা দিন হবে না শুধুমাত্র, একটা নিজস্ব দিন থাকবে মেয়েদের। শুধু নিজের মত করে দিন কাটানোর স্বাধীনতা থাকবে। মেয়েরা যেহেতু মা, সন্তান পালনে তাদের দক্ষতা যেমন অনস্বীকার্য, তেমন সমাজ পালনেও তাই হওয়া স্বাভাবিক। তাই সৃষ্টির প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালনকারীরা যদি পিছিয়ে থাকে, কোন সমাজই এগোয় না। মেয়েদের নিজেদেরই ইচ্ছা শক্তির জোরে এগিয়ে আসতে হবে। কেউ হাত ধরে তাকে এগিয়ে দেবে, এই পরজীবি ভাবনা তাদের মাথা থেকে না গেলে তাদেরই ক্ষতি।

সাম্প্রতিক এক ওয়েবে যশোধরাদির একটি লেখা থেকে উদ্ধৃতি না দিয়ে এই লেখা শেষ করতে পারলাম না। "শুনতে অদ্ভুত লাগলেও একেবারে অনস্বীকার্য এক বিপ্লব এনেছে স্যানিটারি ন্যাপকিনের শুষ্কতার বহুলপ্রাপ্যতা। স্মল ইজ বিউটিফুল নিয়ম মেনে আর এনেছে সহজে ব্যবহার্য এক টাকা দু টাকার পাউচে সর্বজনের আয়ত্তাধীন শ্যাম্পু। ভুললে চলবে না, গরম গরম ফেমিনিস্ট ভাষণের একইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কন্যভ্রূণ হত্যার জন্য লিঙ্গ নির্ধারণের ক্লিনিকেরা, পাশাপাশি সৌন্দর্য রক্ষায় প্ল্যাস্টিক সার্জারি, নানা ধরণের স্কিন ট্রিটমেন্টের ক্লিনিকগুলোও ব্যাঙের ছাতার মত।
পণ্যায়ন আর বিশ্বায়নের ঢেউ কুড়ি বছরের দেরিতে মার্কিনি নারীবাদকে নিজস্ব বয়ানে আনল এ বঙ্গে, ব্রেসিয়ার পোড়ানোর বদলে যারা ব্রেসিয়ারের সেল দেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সবার সামনে বিনা দ্বিধায়!......... এই প্রথম শিখছে মেয়েরা, যে মুহুর্তে একজন পুরুষ, তার ভালবাসা (পড়ুন কাম ও অধিকার) নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন জীবন থেকে, সেই মুহূর্তে অসৌন্দর্যের গর্তে পড়ে যাচ্ছেন না মেয়েরা… বিধবা বা অবিবাহিতার ভাল সাজার, ভাল জামাকাপড় পরার অধিকার নেই, আয়নায় নিজের মুখ দেখাও অপ্রয়োজনীয়, এই অনুভূতি চলে গিয়ে আসছে আত্মপ্রেম আর আত্ম আবিষ্কারের প্রবণতা। যা অবশ্যই আসছে পণ্যায়নের হাত ধরে, কিন্তু মূলগত ভাবে বদলে দিচ্ছে কাঠামোটা।"

অলংকরণঃ অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়

ফেসবুক মন্তব্য