তুঙ্গানাথ

পার্থ প্রতিম চট্টোপাধ্যায়



কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জিতে, হস্তিনাপুরের সিংহাসন পুনরায় জয় করেও ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের মনে শান্তি নেই। ব্রহ্মহত্যা এবং গোত্রহত্যার পাপ থেকে কিছুতেই নিজেকে মুক্ত করতে পারছেন না। কৃষ্ণ পরামর্শ দিলেন কাশীতে গিয়ে ভগবান শিবের আশীর্বাদ নিয়ে পাপ মুক্ত হতে। স্বজন হত্যার কারণে ভগবান শিব পাণ্ডবদের প্রতি অসুন্তষ্ট। তাই, তাঁদের কাশীতে আগমনের সংবাদ পেয়ে শিব কাশী ত্যাগ করে গাড়োয়ালের পর্বতে প্রস্থান করলেন। পাণ্ডবরাও কাশীতে এসে শিবের দেখা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত উত্তর ভারতের গাড়োয়াল অঞ্চলের পাহাড়ে এসে উপস্থিত হলেন। শিব, সেইসময় গুপ্তকাশীতে নন্দীর ছদ্মবেশে বাস করছেন। গুপ্তকাশীতে পৌঁছে পাণ্ডবরা খুঁজে পেলেন শিবকে। আশীর্বাদ গ্রহণের জন্য দ্বিতীয় পান্ডব ভীম, নন্দীরুপী শিবের পিছনে দৌড়ে গিয়ে ধরে ফেললেন নন্দীর পিছনের পা। নন্দী, পাণ্ডবদের হাতে ধরা না দেবার জন্য মাটিতে প্রবেশ করে গাড়োয়ালের পাঁচটি ভিন্ন স্থানে এই দেহের পাঁচটি অংশের প্রকাশ করেন।

এই পাঁচটি স্থান পঞ্চকেদার নামে পরিচিত। এর মধ্যে কেদারনাথে নন্দীর পিঠের অংশ প্রকাশিত হয়। মাধমাহেশ্বরে দেহের মধ্য অংশ। তুঙ্গানাথে নন্দীর দুই হাত। রুদ্রনাথে নন্দীর মুখমন্ডল। আর সর্বশেষ কল্পেশ্বর, এখানে প্রকাশিত হয় মস্তক। পান্ডবরা এই পঞ্চ কেদারে পাঁচটি মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করে শিবের আশীর্বাদ ধন্য হয়ে পাপ মুক্ত হলেন।



গুপ্তকাশীর শিব মন্দির


পঞ্চকেদারের তৃতীয় বা মধ্যকেদারটি হল, তুঙ্গানাথ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১২,০৭৩ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। তুঙ্গানাথের শিব মন্দিরটি, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিব মন্দির। এই মন্দিরটি গাড়োয়ালের রুদ্রপ্রয়াগ জেলার চোপতা অঞ্চলে। আমি নিশ্চিত, আমার আগেও অনেকে তুঙ্গানাথ নিয়ে অনেক কথা লিখেছেন, তাও চলুন আবার একসঙ্গে ঘুরে আসা যাক চোপতা আর তুঙ্গানাথ।



চোপতা উপত্যকা


কেদারনাথ হয়ে যারা বদ্রীনাথের দিকে যাবার জন্য উখীমঠের রাস্তা ধরেন, তাদের চোপতা পার হয়ে গোপেশ্বর পৌঁছতে হয়| সাধারণ দর্শনার্থী যারা চারধামের দর্শনের জন্য উত্তরাখন্ড আসেন তাঁরা সাধারণত এখানে থামেন না| কিন্তু প্রকৃতিপ্রেমিক পর্যটক, বিশেষ করে ট্রেকারদের এক বিশেষ গন্তব্যস্থল হলো চোপতা| পর্যটকদের কাছে চোপতা "Mini Switzerland" নামেও পরিচিত। উখীমঠের দিক থেকে যাত্রা শুরু করে সারি গ্রাম পার হওয়ার কিছু পর থেকেই অপুরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্যের সম্মুখীন হতে হয়। প্রথমবার, গুপ্তকাশী হয়ে চামোলি যাবার পথে কিছুক্ষনের জন্য থেমেছিলাম চোপতাতে। থাকা হয়নি সেবার। তখনই ঠিক করেছিলাম এরপর রাত কাটাতে হবে এখানে। আর সেই ইচ্ছামত পরের দুই বারেই থেকেছি এখানে। আর ফিরেছি দু রকম অভিজ্ঞতা নিয়ে।





চোপতা উপত্যকা, কেদারনাথ অভয়ারণ্যের অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতি প্রেমিকদের অদম্য ইচ্ছায় এবং স্থানীয় মানুষদের সহযোগিতায় এখনো তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার থাবা এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংস করতে পারেনি। হাতে গোনা কয়েকটি ছোট হোটেল বা "চটি" আছে এখানে। বিদ্যুতের কোনো ব্যবস্থা নেই সৌরবিদ্যুৎই এই চটিগুলির সম্বল। মোবাইলের কানেকশানও বেশিরভাগ সময় পাওয়া যায় না। কয়েকদিন বহির্জগতের সঙ্গে বিছিন্ন হয়ে বেশ নিশ্চিন্তে থাকা যায়।



চোপতা থেকে পায়ে হাঁটা পথে প্রায় ৪.৫ - ৫ কিমি হেঁটে, ২৫০০ ফুট উপরে তুঙ্গানাথ মন্দিরে আসতে হয়। বছরের ছয় মাস, এপ্রিলের শেষ বা মে মাসের শুরু থেকে প্রায় অক্টোবর মাসের শেষ অবধি পুজা হয় এখানে। বাকি সময় মন্দির বরফে ঢেকে থাকার কারণে তুঙ্গানাথের প্রতীকী পুজা হয় ২৯ কিমি দূরে মাক্কুমঠে।






চোপতা থেকে তুঙ্গানাথের রাস্তাটি প্রকৃতি নিজের হাতে সাজিয়েছেন। কিছুটা উপরে উঠার পর থেকেই গাছের সারি কম হতে থাকে। বিভিন্ন কোন থেকে উঁকি মারতে থাকে চারিধারের বরফঢাকা পর্বতশৃঙ্গগুলি। দেখতে পাওয়া যায় মোহময়ী সব পর্বতমালা, যমুনোত্রীর বান্দেরপুঁছ, গঙ্গোত্রির শিবালিক, কেদারনাথ, চৌখম্বা, নীলকণ্ঠ... কাকে ছেড়ে কার দিকে তাকাই। আর নিচে তাকালেই চোখ জুড়নো এক বিস্তীর্ণ সবুজ উপত্যকা, এ যেন সত্যিই এক স্বর্গরাজ্য।


প্রথমবার এই পথে এসেছিলাম ২০১৫-এর এপ্রিল মাসের শেষের দিকে। সেবার তুঙ্গানাথ অবধি পৌঁছতে পারিনি। বেশ কিছুটা হাঁটার পর গন্তব্যের থেকে প্রায় ১কিমি আগেই রাস্তায় দেখতে পেলাম প্রচুর বরফ। এগোবো কিনা ভাবতে ভাবতেই শুরু হলো বৃষ্টি, আর তার সাথে সাথেই বরফ পড়তে শুরু করলো। চতুর্দিকের সবুজ উপত্যকা নিমেষের মধ্যেই দুধসাদা হয়ে উঠলো। এই আবহাওয়ায় এগোনোর সহযোগী উপকরণ সাথে না থাকায়, বাধ্য হলাম নেমে আসতে। বরফপাতের মধ্যেই ৩.৫ কি.মি. রাস্তা হেঁটে প্রায় ২০০০ ফুট নামার বিরল অভিজ্ঞতাও হল। সেবার এসেছিলাম একা।



এরপর, আবার ২০১৭ -এর সেপ্টেম্বর মাসে এখানে। আর এবারে পৌঁছলাম তুঙ্গানাথে, সঙ্গে আমার দিদি আর স্ত্রী। সবাই মিলে মন্দিরে ঢুকে পুজোও দেওয়া হলো। সত্যিই এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

চতুর্দিকে বরফাবৃত পর্বতমালার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিবমন্দির, তৃতীয় কেদার "তুঙ্গানাথ"। মন্দির থেকে বেরিয়ে ছবি তুলেও আশ মিটলো না। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে নিচে চোপতার দিকে নামতে শুরু করলাম সবাই।



নামতে নামতে কানে ভেসে এলো মন্দিরের প্রাঙ্গণ থেকে কেউ উদাত্ত কণ্ঠে বলে চলেছেন -

কর্পূরগৌরাঙ্গ করুণাবতারম|

সংসারসারম ভুজগেন্দ্র হারম||

সদাবসন্তম হৃদয়ারবিন্দে|

ভবম ভবানীসহিতম নমামি||

ফেসবুক মন্তব্য