অক্ষরের চাষবাস

অর্ঘ্য দত্ত



বর্ষা সংখ্যা। এই সংখ্যার জন্য আজ যখন সম্পাদকীয় লিখতে বসেছি বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। মুম্বই শহর থৈথৈ করছে জলে। রাস্তার পাশের উঁচু পাথুরে টিলা থেকে নামা ধস অবরুদ্ধ করেছে শহরের হাইওয়ে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, অন্ধকার।

বাংলা সাহিত্যচর্চার যে লৌকিক আকাশটুকু সাধারণের মাথার পরে ঝুঁকে পড়ে প্রতিদিনকার ছোঁয়া দেয়, খোলা জানালা দিয়ে আলো হয়ে ঢুকে আসে, ডান হাতের আনাড়ি আঙুলে মাখিয়ে দেয় নীল অক্ষরের যাদু, সেখানে‌ও যেন হঠাৎ করে ঘনিয়ে উঠেছে বিষ-বাদলের অন্ধকার! সে আকাশ‌ও যেন আজ মেঘাচ্ছন্ন! এর সহজ অঙ্গনটুকু আপাত-নিরীহ টিলা থেকে গড়িয়ে পড়া ক্ষমতা ও অবিশ্বাসের আবর্জনায় অবরুদ্ধ!

এই মেঘ, এই অন্ধকার, এই বৃষ্টি, এই কৃতঘ্ন অবরোধ এই সব নিয়েই ঘুরে ঘুরে আসা যে বর্ষা ঋতু তা আসলে আমাদের বারবার ডোবায়‌ও যেমন, তেমনই ঘটায় নতুন প্রাণের অঙ্কুরোদগম। ধ্বংস ও সৃষ্টি, জীবন ও মৃত্যু, ভেসে যাওয়া ও কূল পাওয়ার মাঝে কড়া ট্রাফিক পুলিশের মতো দাঁড়িয়ে থাকে এই বর্ষা। কোন পথটির দিকে যে তার হাতখানি প্রসারিত করে আমাদের দিকনির্দেশ করবে আমরা তা টের পাই না। শুধু টের পাই সাময়িক আলোর অভাব। বিশ্বাস বাড়ন্ত আজ। ক্রূর অভিসন্ধি দখল নিচ্ছে নিষ্ঠা ও ভালোবাসার রাজপাট।

দূর থেকে সত্যদ্রষ্টা কবি ভেবে, সম্মাননীয় অধ্যাপক ভেবে যাকে অতিথির সমাদর দিলাম, তার মিথ্যা ও লোভের বেসাতি ক্রমে প্রকট হয়ে উঠল। তার অপরাধ লঘু করতে, তার থেকে বিক্ষুব্ধ মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতে মঞ্চে অবতীর্ণ হয়ে পাকা রাজনৈতিক নেতার মতো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গোপন যৌন সম্পর্ক নিয়ে প্রমাণহীন মন্তব্য করে বসলেন কলকাতার আর এক বরিষ্ঠ কবি। সবমিলিয়ে যেন এক শ্বাসরোধকারী অবস্থা। সাহিত্যর নামে এই মুম্বাই শহরেও চলে নানা অসৈরন। তবু ভরসা পাই যখন দেখি এ শহরে এখনও আকাল পড়েনি মেধাবী ও শিক্ষিত পাঠকেরও।

নিরলস পাঠ‌ই যে সাহিত্যপ্রেমের মূল ও প্রধান লক্ষণ এই দেখনদারির সময়ে সে কথাটাই যেন আমরা অনেকেই ভুলে যাচ্ছি। বিনা আয়াসে বাজিমাতই যেন একমাত্র অভীষ্ট। ফলে অন্ধকার তো ঘনাবেই। শুধু কোনো বর্ষার মেঘলা আকাশ‌ই যে দীর্ঘস্থায়ী হয় না এটুকুই আশার কথা। আলো ফুটবে। ফুটবেই।

এবারে অচেনা কবি-লেখকদের কাছ থেকে এত লেখা এসেছে যে এই সংখ্যায় আমন্ত্রিত লেখা প্রায় নেই বললেই চলে। এই যে বম্বেDuck-এর প্রতি একটা ক্রমবর্ধমান আগ্রহ তা আমাদের সমস্ত পরিশ্রমের কষ্টকেই লাঘব করে। সম্প্রতি দুটি নতুন সিদ্ধান্ত‌ও নেওয়া হয়েছে। তার একটি হল এখন থেকে প্রতি এক-দেড় মাস অন্তর প্রকাশিত হবে বম্বেDuck ওয়েব সংখ্যা। অর্থাৎ বছরে চারটির পরিবর্তে কম পক্ষে আটটি। এই সংখ্যা থেকেই শুরু হচ্ছে সমরজিৎ সিংহের ধারাবাহিক উপন্যাস।
এবং দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি হলো এই সংখ্যা থেকে বম্বেDuck আবার দ্বিভাষিক। বাই লিঙ্গুয়াল। বাংলার সঙ্গে থাকবে ইংরেজী লেখাও। ইংরেজী বিভাগ সম্পাদনা করবেন লেখিকা পূজা রায় এবং প্রদীপ রায়চৌধুরী। এ বাবদে ওদের দুজনের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাখলাম।

যথারীতি এই সংখ্যার অলংকরণ‌ও করা হয়েছে অনেকে মিলে। অরিন্দম ব্যস্ত ও অসুস্থ থাকাতে আমাকে এবং সিদ্ধার্থকেও অপটু হাতে তুলে নিতে হয়েছে তুলি ও রঙ পেনসিল। তবে কল্লোল রায় অবশ্যই ব্যতিক্রম। ওর করা অলংকরণগুলো পেশাদারী দক্ষতার চিহ্নে উজ্জ্বল। ওর প্রতিও জানালাম আমার সবিশেষ কৃতজ্ঞতা। ব্যবহৃত হয়েছে বন্ধু পার্থ ও রুদ্রর তোলা ফটোও। সিদ্ধার্থর অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা প্রতি সংখ্যায় কী আর বলব! ওকে ছাড়া বম্বেDuck প্রকাশ করা প্রকৃতই অসম্ভবসাধ্য।

দু মাস আগে যখন গত নববর্ষ সংখ্যার সম্পাদকীয় লিখছিলাম তখন‌ আশা করেছিলাম যে এই বর্ষা সংখ্যার সম্পাদকীয়‌ আর ঘরবন্দী দশাতে লিখতে হবে না। এখনও আশা করছি আবার যখন পরবর্তী সংখ্যার সম্পাদকীয় লিখব তখন আমাদের দেশে ফিরে আসবে আলিঙ্গন ও করমর্দনের আবহ। নিপাত যাবে সব রকমের ভাইরাস।

কী যেন একটা কথা আছে না, আশায় বাস করে চাষা! অক্ষর চাষিদেরতো এই আশাটুকুই ভরসা। তাই না?

[ আপনার সেরা লেখাটা পাঠান। পাঠাবেন ডক্স ফাইলে অথবা সরাসরি মেল বডিতে টাইপ করে। মেল আইডি kusumarghya@yahoo.com , সম্পাদক মণ্ডলীর পছন্দ হলে লেখা প্রকাশ করা হবে। লেখা পাঠানোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নেই।]

ছবিঃ পার্থ প্রতিম চট্টোপাধ্যায়

ফেসবুক মন্তব্য