ঘনতন্ত্র

অমিত মুখোপাধ্যায়



রসময়ের চোখ মেলা থাকলেও চারপাশের কিছু নজরে আসে না। বরং মনের আঁধারি থেকে চালান হতে থাকে ছবির সারি। অতীতের শ্রুতির অ্যালবাম, অথচ আসন্ন অত্যাচারের আঁকিবুকি থাকে সেখানে। থাকে আর্তনাদের আবহ। আতঙ্কের গন্ধ। চাপা কান্না। অদূরে গরাদের খাঁচায় দিনের রঙ যত মুছে যায়, ত্রাস ঘিরে ধরে।

তবু তো এখনো বাইরে বসে আছে রসময়। কবুল করেছে রক্ষীর প্রস্তাব। অভাবী মানুষটা বহু দরাদরি করে রফায় এসে আশ্বাস হিসেবে আপাতত একটা ভাঙা চেয়ার পেয়েছে ভেতরের ফালি বারান্দায়। পেছনে জেলা সদরের গরাদের ভেতর থেকে বন্দীদের বুলি শোনা যায়। কথা কাটাকাটির চাপা শব্দ ভাসে।

মাঝরাতে ডিউটিতে থাকা কর্মী বলে, এবার তো আমাকে একটু ঘুমোতে হবে। এই টেবিল ছাড়া গা ঢালার জায়গা নেই।আপনি এবার ...

রসময়কে কুখ্যাত সেই কুণ্ডে ঢুকিয়ে দেয় লোকটা। চাপা স্বরে ভেতরে কিছু মন্ত্র ছুঁড়ে দেয়। কুণ্ডের বাসিন্দা অনেকে তখন ঘুমন্ত। দু’এক জন জেগে থাকলেও চোখ ঢুলুঢুলু। তবু যাদের শোনার ঠিক যেন শুনে নেয়। আরও নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকে তারা।

নরকে ঢোকার অন্তত প্রথম মুহূর্তে ঝাঁকুনি নেই রসময়ের। তার জন্য মেপে করা চকের দাগের পরিসর মেনে গা কোন রকমে আলগা করলেও ঘুম নেই। কম্বলের গন্ধ মেনে নিলেও তার কাঁটার কুটকুটে কামড়ের থেকে রেহাই নেই। বিচিত্র সব শব্দ, নতুন আঁধারে সামান্য স্বস্তিও নেই। অপরিচিত অসহ যত নেই-এর কুয়োতলায় নেমে চলে সে। শরীর বুঝি আপন ওজন আর বাস্তবকে দূর জগতে হারিয়ে এসেছে। আর মন হাল ছাড়ে এমন যে নিজস্ব ভাবনার ছন্দ গায়েব হয়ে যায়।

শুধু ভয়ের হাজার জাতভাই কবলে নেয় রসময়কে। একেক চেহারায় হুমকিতে বেয়াড়া ভাবে উড়ে এসে ঘা দেয়। ত্রিভুবনে এর থেকে খারাপ দশা আর কী হতে পারে! এ সর্বনাশটুকুই বাকি ছিল হতদশা জীবনে, তা-ও কোনও অপরাধ ছাড়া! ...কাল যদি দুই ভাই টাকা না আনে! ...এক লাখ চেয়েছিল চিরুবাবু, গুরুভাইয়ের দৌলতে ধরাধরি ও বিবেচনার পরে হিসেব করে। মেরে কেটে মায়ের ভোগে দিলেও তত টাকা চাঁদা উঠবে না শুনে তিরিশে রফা হয়, তা-ও তিন কিস্তিতে! চিরুবাবুর চাপা কোকানি শুনেছে রসময়, "এত নিচে কী কইরা নামতেসি! এত ছাড়!"

...চুক্তিমতো প্রথম কিস্তিতে কাল পাঁচ দেবার কথা। তা হলে কাল মামলা উঠলে ছাড়া পাওয়া যাবে। চিরুবাবুর আশ্বাস, তয় জামিনের জমিন তয়ের হয়ি যাবে। ...যে ভাবে হোক টাকাটা জোগাড় করার কথা। ছোটোর মুরোদ কম, আবার মেজোর বউ সুবিধের নয়। এখনো পর্যন্ত একান্নবর্তী হলেও সে একা, চোরাস্রোতে পাড় বিপন্ন। সেই টানাপড়েনে রসময়কে নতুন জায়গায় দোকান দিতে হলো বলে নিজের কিছু নেই। বউ আত্মহত্যা করার পর সেজো তো নিরুদ্দেশ। সে খবর পেয়েছে সেজোর শ্বশুরবাড়ি। প্ররোচনা দিয়েছে বলে সেজোর সাথে রসময়ের নামও ঢুকিয়েছে তাদের উকিল।তাই মরছে এখন সে! টাকা না দিলে এই ঠাসাঠাসি যমালয়ে জমা থেকে যেতে হবে। তা হলে বাঁচবে না সে। ...মাত্র দুদিন থানার লক-আপে থেকে প্রভাস মরতে চেয়েছিল!

মালিক কর ফাঁকি দিতে সিলমোহর জাল করে। ধরা পড়তে প্রভাসকে ফাঁসিয়ে দেয়।অসহায় কর্মচারিকে লক-আপে যেতে হয়। তবু সে মালিক খরচা করে বন্দীদশায় কোন রকমে বাঁচার ব্যবস্থা করে। দু’তিন দিনে বার করে আনে। প্রভাসের গাঁয়ের বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে বলে জরুরি কাজে তাকে বিহারে পাঠিয়েছে। ছাড়া পেয়ে সে খুব কাঁদে, কোনো রকমে বলে, রসময়দা, মরণের ডেরা দেখে বাঁচার ইচ্ছেটাই চলে গেছে। ভেবেছিলাম লক-আপ থেকে বেরিয়ে সোজা কোথাও গিয়ে আত্মহত্যা করব।মালিক বোধহয় বুঝেছিল, নিজে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। ছেলে আর বৌয়ের সাথে থাকার জন্য ছুটি দিয়েছিল। ...ওই ক’দিনে আধমরা হয়ে গেছি দাদা! ... ভাগ্য ভালো রসময় থানার লক-আপে নয়, সদরের বড় জেলহাজতে আছে।

শেষ রাতে কখন চোখ লেগে আসে, চিৎকারে ধড়মড়িয়ে ওঠে রসময়। আ – আ- বাঁচাও! মরে গেলাম! ধ্বস্তাধ্বস্তি থেকে মারপিট বেধে যায়। চকের দাগ পেরিয়ে কারো পা অন্যের সাম্রাজ্যে দখল নিয়েছে। তাই ব্লেড চালিয়ে ঝটিতি শাস্তি দেওয়া হয়েছে।রক্ষীরা এসে থামানো, পেটানো থেকে রক্ত বন্ধ করার ব্যবস্থা করে।

দ্বিতীয় দিনঃ ভোর বলে এখানে নেই কিছু। সকলে যখন পারে সকালের নানা বিচিত্র অভ্যাস সারতে শুরু করে। আলো ফুটতে রসময় বোঝে প্রকৃতির ডাক এখানে প্রকৃত অর্থে সারা দুষ্কর। একটাই পায়খানা-তথা-গোসলখানা, যার দরজা নেই। অর্থাৎ বাকিদের মুখোমুখি হয়ে কাজ সারতে হবে, এবং যত জলদি সম্ভব। লাইন তো আছেই, তা ছাড়া স্বঘোষিত সর্দারদের আচমকা তাড়া দেওয়া থাকবে। বাড়তি হিসেবে হুমকি।

নিভৃতিকে ভৃত্য বানিয়ে দেওয়া দেখে রসময়ের বেগ নিভে যায়। জনা বিশেক বন্দীর জন্য এক জোড়া স্টিলের গেলাস, শেকল দিয়ে বাঁধা। নিতান্ত দায়ে না পড়লে পাশের নোংরা কলসি থেকে জল নিয়ে কেউ খায় না। সকালে সাতটা নাগাদ বন্দীদের গুনে নিয়ে বাইরে বেরোতে দিলে পাকশালার পাশের কল থেকে তেষ্টা মেটায়। চা ঠিক মতো দেয় না। সর্দাররা ম্যানেজ করে। পেলেও সে-ই দাগী গেলাসে প্রায়-ঠাণ্ডা প্রায়-চায়ে চুমুক দিতে হবে। দুপুরে খিদের চোটে মোটা একটা রুটি কি যেন সবজি দিয়ে খেতে হয় রসময়কে। বারোটায় পাকশালা বন্ধ। খাওয়ার পরে সবাইকে গুনে দেখে হাজতে ঢোকায়। তাই মাতব্বরদের অনেকে থালা নিয়ে আসে ভেতরে ঢোকার সময়, পরে খায়। যদিও নিয়ম নেই বলে বাকিরা তা করতে পারে না। বিকেল তিনটেয় ফের ছাড়লে সে উঁচু দেওয়ালের ভেতরের জমিতে ঘোরে বটে, কিন্তু পাঁচ হাজারের চিন্তা ঘিরে থাকে। কোণের বাগান দেখে। পাকশালার পেছনটা নজর করে। একটা কেমন গুদামের মতো ঘর আছে। ওর পাশে এসে রন্টা বলে, এ পাঁচিল পেরনো আমার কাছে কিছু না! ফাঁকা পেলেই ঠিক চড়ে যাব। রন্টা ফাঁকা বাড়িতে চুরির ওস্তাদ।রসময় ভয়ে তাকায়, কেউ শোনে নি তো! ...সাঁঝে গুনে গুনে ঢোকানোর সময় চিরুবাবু রসময়কে চিবিয়ে বলে, কেউ আসে নি! এহনে টের পাবা!

তৃতীয় দিনঃ ভায়েরা কি ওটুকু টাকার বন্দোবস্ত করতে পারে নি! এই চিন্তা সারা সকাল জুড়ে থাকে। বেলায় আদালতে নেবার সময় চিরুবাবু চিরকুটের মতো কাগজে কী যে দু’ছত্র লেখে, তা দেখে সরকারি উকিল হেফাজত চায়, রসময় নাকি বিপজ্জনক লোক, ছাড়া পেলে কেসের ক্ষতি হবে! হাকিম সেইমতো হুকুম দেয়। কত লোকে রসময়ের দিকে কত চোখে চায়। বাকি দিন তেতো হয়ে যায় তার। হাজতে ফিরে দেখে এক পাঞ্জাবি গায়ক, ধরা পড়েছে বিমানবন্দরে, কী সব লুকিয়ে আনতে গিয়ে। সে তো কাঁদে হাউমাউ করে। তার সুখের শরীর ভেতরের দশা দেখে অস্থির। কী করবে, কী বলবে ভেবে না পেয়ে জল ঝরিয়ে চলে।... তাকে আনন্দ দেবার জন্যে কিনা কে জানে রাতে পুলিশ পাশের হাজত থেকে গায়ক-ডাকাতকে ডেকে আসর বসায়। দিব্যি জমে যায় গান। শোনার ফাঁকে ডাকাত রামুর কাণ্ড জানা যায়। ভয়ানক সব ডাকাতি করার সময় অনেক খুন করেছে। এক বার পালাতে গিয়ে রামদা পড়ে যাওয়ায় চেঁচাতে থাকা লোককে স্রেফ গলা মুচড়ে শেষ করেছে! ... রন্টা বলে, এদিকে নিজের গলা মুচড়ে কেমন সুর বার করে শোনো!...হা, হা, আর ওর পাশের লোকটা হলো আনন্দ, হাজতে ওকে সবাই ডরায়, যা খুশি করে দিতে পারে। সেদিন গার্ডকে চাপা গলায় ধমকাল, আমার মেয়াদ তো হয়ে এসেছে, বাইরে পাব ঠিক তোকে, তোকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি! আমাকে একদম ঘাঁটাস না বলে দিচ্ছি!... আর ওর দিকে তাকিয়ে গার্ডটা সব হজম করে চুপ করে গেল! খুব সাবধান!

চতুর্থ দিনঃ নেতা নামে পরিচিত সুরজ রসময়ের দশা দেখে সকালে পাকশালা থেকে এনে চা খাওয়ায়। সে চাবি নকল করার মাস্টার। দাগীদের মাথা হয়ে কাজ করে।ইদানিং নানা দোকানের মালের খোঁজ নিয়ে, তালা দেখে চাবি বানিয়ে রাতে নিখুঁতভাবে দামি জিনিস পাচার করত। যখন রসময়যেচে চা খাওয়ানোর কারণ ভাবে, সুরজ বলে, নসিব খারাপ, খোচর খবর দিয়ে দিল বলে পাকড়ে গেলাম। ... নহি তো বিলকুল হোশিয়ার কি কাম হ্যায়! কথার মাঝে পাঞ্জাবি গায়কের ডুকরে কেঁদে ওঠা চমকে দেয়। বাছবিচারহীন চা চেখে বেচারার মনে নাকি পাঞ্জাবের দুধ উথলে উঠেছে! সুরজ তার খবর জোগাড় করে ফেলেছে। গান গাইতে সে নাকি হংকং, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ব্যাঙ্কক যায়। তবে সে পাচারকারী নয়। ওখানে নানা ভারতীয় আড্ডায় গানের পরে পয়সা-থাকা-খাওয়া ম্যানেজ করে ভক্তদের মাঝে হাত দেখে বেড়ায়। গণক হিসেবেই বেশি রোজগার। ... তাকে আটকেছে পাশপোর্টে কী এক গণ্ডগোল ধরা পড়ায়।

এমনিতে মন ভালো নেই, টাকার কোন খবর নেই ভায়েদের কাছ থেকে, তার মাঝে রন্টার খোঁজ, কী বলছিল সুরজ? বলে, খুব সাবধান! সাঙ্ঘাতিক লোক কিন্তু! আমি নেহাত ফাঁকা পেটের দায়ে ফাঁকা বাড়ি যাই, কিন্তু অন্য কিছু করি না! খেটে খাব ভেবেছিলাম, তা এখানে তো পুলিশের দালাল ভালো হতে চাইলেও ছাড়বে না, আমাদের থেকে মেলা কামাই কমে যাবে না! তাই কেরলে মাছ-সংরক্ষণের কাজে গেছিলাম। জাপানি সাহায্য আসত। তা সব দেখতে এক জাপানি মেয়ে এল। একটু পড়া জানি বলে কোম্পানি ওর সাথে নানা কেন্দ্রে পাঠাত। এমন ভাব হয়ে গেল যে যাবার সময় আমায় নিয়ে যেতে চাইল। ... না, ভয়ে যাই নি। অথচ ওখানকার কাজটা গেল! গেলাম মুম্বাইয়ে। যখন যা কাজ জোটে করি। বিয়ার-বারের বাঙালি মেয়ের সাথে চেনা হলো। নাচ করে ভালোই পেত। সেখানে কাজ আর ঠেক মিলে গেল। ... জানো ওখানে ওস্তাদরা গাঁজা কিনে খায় না, বলে ওরা নাকি বনেদি গুণ্ডা, বাড়িতে লুকিয়ে চাষ করে তবে খায়! ... কী দুঃখের কথা, অন্যদের সাথে আমাকেও পুলিশ এখানে নিয়ে এল! ... এবার ছাড়া পেলে শালা একেবারে দূরে এক ইঁটভাটায় গিয়ে কাজ করব। সেখানে পুলিশ কিছুতে খুঁজে পাবে না, হ্যাঁ ওরা বলেছে। ... বাকি সব ছেড়ে দেব, মাইরি বলছি দাদা! রসময়কে সে ছাড়ত না, নেহাত কর্তাদের ডাক পড়ল, বারো ফিট উঁচুতে বাল্ব লাগাতে। রসময় দেখল একজনের কাঁধে চড়ে রন্টা দিব্যি খারাপ আলো খুলে নতুন লাগিয়ে দিল। বিকেলে রসময়ের বউ শান্তি এল প্রতিবেশী মাসিমাকে নিয়ে। দুর্দশা দেখে দুজনে কাতর।

দু’ এক দিনের মধ্যে পাঁচ বা দশের ব্যবস্থা হবে। রসময়ের মুখে কথা সরে না।মাসিমার হঠাৎ মনে পড়ে পাড়ার এক পুলিশকর্মী এদিকে বদলি হবার কথা বলেছিল না! তখনি রসময়কে খোঁজ নিতে বললেও সে গা করে না। কেমন যেন হয়ে গেছে রসময়! মাসিমা তখন এক রক্ষীকে ডেকে বলে। ... ও আপনি ওই রোগামতো নিশানাথদার কথা বলছেন! হ্যাঁ, ওদিকেই উনি থাকেন। এখন বোধহয় ছুটিতে আছেন।আপনাদের কে হন!

কিছুক্ষণের মধ্যে ছড়িয়ে যায় খবর। কেউ আবার নিশানাথকে ফোন করে জেনে নেয়।দু’ এক জন এসে খোঁজ করে যায়। রাত থেকে কেমন এক তফাত বোঝা যায়। পুলিশ নরম কথা বলে। সহবন্দীদের বাকিরাও সহনশীল হয়ে ওঠে। তার খাওয়ার নমুনা বদলে যায়। অনেকে খাতির করে বলে, ও আপনাকে তো জোর করে কেস দিয়েছে!চিন্তা করবেন না, ব্যবস্থা কিছু ঠিক হয়ে যাবে। আরও কত ভালো কথা শুনে নিজের কানকে সে ভরসা করতে পারে না। রাতে শোবার সময় সবচেয়ে মার্কামারা খুনের অপরাধী অকথ্যভাষী আনন্দ, যে কিনা অত্যাচারী ওয়ার্ডেনকে পর্যন্ত শাসায়, সে বিহারিনাথকে ডেকে চুপিচুপি কী যেন বলে। তার পরই বিহারিনাথ রসময়কে ডাকে।জবরদখল করা কম্বলের গাদা থেকে কয়েকটা নিয়ে মোটা করে মেঝেয় পেতে তার পাশে শুতে বলে। ওরে বাবা কোথা থেকে বালিশও জোগাড় করেছে! সে যেতে ভয় পায়, ব্যাটা ফাঁসুড়ে, ওর বিদ্যা নানা কায়দায় গলা টিপে মারা। সেসব কৌশলের কথা চেলাকে বলছিল যে! এক নেতার নির্দেশে জবরদস্ত কাউকে দড়ির ফাঁস দিয়ে কাজ প্রায় সেরে এনেছিল। লোকটার শরীরে পরপর পরিবর্তন, চোখমুখের দশা, চরম কষ্ট দেখছিল। তার চোখের সামনে মৃত্যু। লোকটার অবয়বে অবসাদ, প্রাণপণ শেষ চেষ্টা বৃথা বুঝে নিভে আসা, অসহায়তা, নজরে তীব্র আর্তি! হঠাৎ নেতা কী ভেবে ছেড়ে দিতে বলে। চেলাকে বিহারিনাথ বলছিল, এ ভাবে শিকার ছেড়ে দিতে আছে বল দিকি! আহত দুশমন বেঁচে থাকার অনেক বিপদ! একটা কাঁটা ঝুলে রইল! ... রসময় ভাবে রাতে ঘুমের ঘোরে যদি ভুল করে গলা টিপে ধরে! ... তবু অনুরোধের চোটে সে না গিয়ে পারে না।

পঞ্চমীঃ সকালে কাচের গেলাসে চা, আর কেকের টুকরো! বাইরে ছাড়ার পর সেই ভিটামিনের জেরে রসময় সাহস করে বাগানের পায়খানার চাবি চায়। কী আশ্চর্য, ক্যাপ্টেন নিজে এসে তাকে নিয়ে যায়। আসল নাম নিখিল, প্রশ্নহীন আনুগত্য দেখাতে সেই সুপারি কিলারকে সবাই ক্যাপ্টেন বলে। এই প্রথম তাকে কথা বলতে শোনে রসময়। একমাত্র সে-ই সবসময় চুপচাপ থাকে। গম্ভীর ভাবসাব। প্রভাবশালী মহলে নাকি ওঠাবসা ছিল। নামকরা কিছু দাদাদের সহচর। পাঁচিলের কোণে বসে একদিন নাকি কাকে কী কী কাণ্ড কোথায় করেছে বলছিল। তারপর বোঝাচ্ছিল অনুমান আর সতর্কতা কেমন করে বাড়াতে হয়! রন্টার কান জোরালো, ফাঁকা বসতের নীরবতা মাপা তার কাজ। সামান্য শব্দ ধরা পড়ে যায়। আজকাল সে নাকি অনেক দূরের কথাও শুনতে পায়! সে দিব্যি গেলে বলেছে সেদিন পাঁচিলের কোণে ক্যাপ্টেন দস্তুরমতো ক্লাস নিয়েছে, কী করে প্রমাণ লোপাট করে ফেলা যায়। তবে গুপ্তবিদ্যা শিখিয়ে ভিজিট নিয়েছে কিনা তা সে জানে না। ... এ সব ভাবনার মাঝে অনেক দিন পরে বিনা কষ্টে তার কোষ্ঠসাফ হতে থাকে। আর ইনসাফ পাবার সুখে তার জানতে ইচ্ছে যায় কথাটা সুপারি কিলার কেন?

নিশানাথ জয়েন করে চিরুবাবু ও রসময়ের সাথে দেখা করে। দীর্ঘ সময় কথা হয়। তার পর থেকে সে বেশির ভাগ সময় ভেতরের চত্বরে ঘুরতে পারে। খাতির আরও বাড়ে। সেদিনই ভায়েরা দশ হাজার নিয়ে চিরুবাবুকে দেয়। সব মিলিয়ে এ যেন এক পৃথক পৃথিবী! একেক জন আসে আর না-বলা দুঃখের ঝাঁপি উপুড় করে যায়। কেউ পরামর্শ নেয়। অপরাধহীন দুনিয়ার সুলুকসন্ধান চায়। অতিষ্ঠ হয়ে চত্বর জুড়ে ঘুরে বেড়ায় রসময়। তখনি বেগার খাটার নানা দৃশ্য তার চোখে পড়ে। বন্দীরা সাফ করে চলেছে নালা, পায়খানা, বাগান। কাঠ কাটা, পাকশালায় ফাইফরমাস খাটায় ব্যস্ত।

রাতে গানের জবর আসর বসে। অন্য হাজত থেকে শুধু গায়ক নয় বাদকও আসে।গানে নাচে পুলিশের দু’এক জনও যোগ দেয়। জলসায় মজে শ্রীলঙ্কাবাসী তামিল তার ভাষার সমস্যার নিত্য গোলযোগ ভুলে উদ্দাম দুলতে থাকে। শেষে পাঞ্জাবি গায়ক আর থাকতে পারে না। মজলিশের দখল নিয়ে একাই একশো হয়ে ওঠে।

এক ফাঁকে কখন রন্টা পাশে এসেছে। ... আমি জানি কাল তোমার জামিন মিলে যাবে।...ছুটি। তোমাকে আর নরকে ফের ঢুকতে হবে না।...আমি কি কখনো ইঁটভাটায় গিয়ে কাজ করার সুযোগ পাব! বাঁচতে পারব এই কালো দুনিয়ার বাইরে?চোখ মোছে রন্টা। ভেতরে দৈবাৎ এসে তুমি কী দেখে গেলে বলো তো! পর্দার আড়ালে একটা ছোটো মাপের আসল চেহারা!...গণতন্ত্র নয় গো, ঘনতন্ত্র! আঁধারে ঘন হয়ে আটকে আছে!

অলংকরণঃ কল্লোল রায়

ফেসবুক মন্তব্য