বাংলা লিপি, ধ্বনি ও বানান সংস্কার

অনিরুদ্ধ সেন


প্রথমে বলা নেওয়া দরকার আমি পেশাদার ভাষাতত্ত্ববিদ নই, প্রযুক্তিবিদ। তবে ভারতীয় ভাষায় কম্পিউটার স্পীচ তৈরির (speech synthesis) প্রকল্পের সুবাদে আমার ভাষাতাত্ত্বিক (linguist)দের সাথে যৌথ গবেষণা ও বিকাশের কাজ করার সুযোগ হয়েছে। সেই সূত্রে ভাষাতত্ত্ব (linguistics) ও বাংলা সহ কিছু ভারতীয় ভাষার ধ্বনিতত্ত্বর (phonetics) কিছু প্রাথমিক পাঠও নিতে হয়েছে। এই প্রবন্ধে উত্থাপিত বিষয়াদি সাধারণভাবে সঠিক হলেও আমি এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না হবার দরুণ পরিভাষায় ও অন্যান্য খুঁটিনাটিতে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে যেতে পারে। তার জন্য আমি আগাম ক্ষমাপ্রার্থী। প্রবন্ধটি পূর্ণাঙ্গ করতে কিছু প্রামাণ্য চিত্র ও তালিকা দেওয়ারও দরকার ছিল। সময়াভাবে আপাতত তা হল না। পরে কখনও সব মিলিয়ে প্রবন্ধটি আরও পরিমার্জিত রূপে প্রকাশের ইচ্ছা রইল। পরিশেষে, এই প্রবন্ধে যে মতামত দেওয়া হয়েছে তা নিতান্তই লেখকের ব্যক্তিগত। সম্পাদকমণ্ডলী তার জন্য দায়ী নন।

(১) দেবনাগরী লিপি ও ধ্বনি

ভারতের সমস্ত মূল ভাষার আদি ভাষা কি সংস্কৃত? উত্তরটি সম্ভবত হ্যাঁ এবং না। সংস্কৃত নাম থেকেই বোঝা যায় এটি ‘পরিশুদ্ধ’ ভাষা অর্থাৎ এক বা একাধিক প্রচলিত ভাষার পণ্ডিতদের দ্বারা পরিশীলিত রূপ। কাজেই সংস্কৃত ‘আদি’ বা প্রথম ভাষা নয়। আবার সংস্কৃতের লিখিত রূপ ও উচ্চারণ দুইই কঠিন নিয়মের নিগড়ে আবদ্ধ, যাকে কঠিন অনুশীলনের দ্বারাই আয়ত্ত করা সম্ভব। সংস্কৃত বা ‘দেবভাষা’ তাই সর্বসাধারণের নয়, ‘এলিট’দের ভাষাই ছিল। সেই উদ্দেশ্যেই তাকে তৈরি করা হয়েছিল।
ভাষার কথ্য ও লিখিত দুটি রূপ। কথ্য ভাষা মূলত মানুষের মুখে মুখে তৈরি হয় ও অনবরত রূপান্তরিত হয়। অন্যদিকে লিখিত ভাষা মূলত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের, বিশেষত ভাষাতাত্ত্বিকদের দ্বারা সৃষ্ট ও বিকশিত। সংস্কৃতের আগেপরে ও সাথে সাথে পালি, প্রাকৃত, অর্ধমগধী প্রভৃতি ভাষার চল ছিল। পালি সংস্কৃতের তুলনায় সহজবোধ্য বলে বুদ্ধদেব পালিতে তাঁর বাণী প্রচার করতেন, সেগুলো লেখাও হয়েছে পালিতে। অনেক রাজার নির্দেশেও পালি ব্যবহৃত হয়েছে। আবার দক্ষিণ ভারতের তামিল প্রভৃতি ভাষা সংস্কৃতের থেকে উদ্ভুত নয়। বরং বলা হয় তামিল সংস্কৃতের চেয়েও প্রাচীন।
এখন আমরা যেসব আঞ্চলিক ভাষা দেখি, যেমন হিন্দি, বাংলা, মরাঠি, তার কথ্য রূপ সৃষ্টি হয়েছে মূলত যুগ যুগ ধরে অজস্র মানুষের বাগবিনিময়ে। কিন্তু লিখিত রূপ বিদ্বান ব্যক্তিরা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তৈরি করেন। আরও অনেক চেষ্টার পর সেসব সাধারণ মানুষ মেনে নেন। যেহেতু এই বিদ্বানদের অধিকাংশই ছিলেন সংস্কৃতজ্ঞানী এবং যেহেতু সংস্কৃতের লিপি একটি শক্তিশালী লিপি, তাই আধুনিক ভারতের অনেক আঞ্চলিক ভাষার লিপিই সংস্কৃতে অনুসৃত দেবনাগরী লিপির অনুসরণে তৈরি।
‘লিপি’ (script) হচ্ছে ভাষার বিভিন্ন ধ্বনির লিখিত রূপ, যা বর্ণমালা (alphabet)কে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। সংস্কৃত বর্ণমালার শক্তি হচ্ছে এটি ধ্বনি অনুসারী বা phonetic অর্থাৎ এর প্রতিটি বর্ণ এক একটি স্বতন্ত্র ‘ধ্বনি’ নির্দেশ করে। ধ্বনি বা phoneme হচ্ছে উচ্চারিত শব্দের ক্ষুদ্রতম স্বতন্ত্র খণ্ডাংশ, যেমন লিখিত ভাষার ক্ষুদ্রতম স্বতন্ত্র খণ্ডাংশ হচ্ছে অক্ষর বা বর্ণ। দেবনাগরীতে ‘অ’, ‘এ’, ‘ক’, ‘প’ ইত্যাদি বর্ণ এক একটি নির্দিষ্ট এবং স্বতন্ত্র ধ্বনি নির্দেশ করে।
তুলনায়, ইংরেজি বা অন্যান্য ল্যাটিন উদ্ভুত ভাষাগুলির বর্ণমালা ধ্বনি অনুসারী নয়। অর্থাৎ প্রতিটি বর্ণ এক একটি নির্দিষ্ট ধ্বনিকে নির্দেশ করে না। যেমন, bat, ball Kapil শব্দগুলিতে ‘a’ বর্ণটির উচ্চারণ ভিন্ন ভিন্ন। বস্তুত, ইংরেজি কথ্য ভাষায় স্বরধ্বনি বা vowel মোটামুটি ১৫টি। কিন্তু লিখিত ভাষায় এই পনেরোটি উচ্চারণকে মোটে a, e, i, o, u এই পাঁচটি অক্ষর বা তাদের সমষ্ঠি দিয়ে নির্দেশ করা হয়। আবার ‘ক’ ধ্বনির জন্য k থাকতেও c বা ch কখনও ‘ক’ কখনও ‘চ’ নির্দেশ করে। অনুরূপভাবে, ‘জ’ ধ্বনির জন্য j থাকতেও g কখনও ‘গ’, কখনও ‘জ’ নির্দেশ করে। এ ছাড়াও রয়েছে ব্যঞ্জনসমষ্ঠি বা consonant cluster (যেমন gh), অনুচ্চারিত বা silent ব্যঞ্জনবর্ণ (যেমন psalm-এর p ও l), Xavier ও Taxiতে x-এর ভিন্ন উচ্চারণ, আরও কত জটিলতা।
সংক্ষেপে, সংস্কৃতে প্রতিটি বর্ণের উচ্চারণ জানলে কোনও লিপি নির্ভুলভাবে পাঠ করা সম্ভব, আবার কোনও বাক্যের উচ্চারণ জানা থাকলে সেটা লিখে ফেলাও সম্ভব। কিন্তু ইংরেজিতে এটা সম্ভব নয়। লিখিত লিপির উচ্চারণ জানতে বক্তাকে নানা উচ্চারণের নিয়ম শিখতে হবে। তার পরও অনেক শব্দের উচ্চারণ স্রেফ মুখস্থ করতে হবে। আর এখানেই ‘ফোনেটিক’ বা ধ্বনি অনুসারী বর্ণমালার বাড়তি শক্তি। তার জন্য অবশ্য দেবনাগরীতে বর্ণের সংখ্যা ইংরেজির চেয়ে অনেক বেশি (২৬-এর জায়গায় পঞ্চাশাধিক)।
এবার দেবনাগরী বর্ণমালার আর এক চমৎকারিত্বের কথা বলছি – এটা ধ্বনির কতগুলি নির্দিষ্ট গুণ অনুসারে সজ্জিত, যা আধুনিক ধ্বনিতত্ত্ব বা phonetics-এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই সজ্জা বুঝলে সংস্কৃত ধ্বনিগুলি উচ্চারণ করাও সহজ হয়ে যায়। বিস্তারিত বোঝাতে শব্দবিজ্ঞান ও ধ্বনিতত্ত্বের কিছু মৌলিক আলোচনা করা যাক।

(২) ধ্বনিতত্ত্ব

আমরা জানি, কোনও কম্পনশীল বস্তুর থেকে শব্দের উৎপত্তি হয়। অবশ্য শব্দ শ্রবণযোগ্য হবার জন্য উৎসকে সেকেন্ডে ২০ থেকে ২০০০০ বারের মধ্যে কাঁপতে হবে। আমাদের গলায় রয়েছে একটা স্বরপর্দা বা vocal cord, যার কম্পন হচ্ছে কথার ধ্বনির মূল উৎস। তবে স্বরপর্দা না কাঁপিয়েও মানুষ নানা ধ্বনি সৃষ্টি করতে পারে – বাতাসকে ঠোঁট বা জিভের সাহায্যে আটকে তারপর দ্রুত ছেড়ে অথবা এক অপ্রশস্ত ফাঁক তৈরি করে তার মধ্য দিয়ে বাতাস একনাগাড়ে ছেড়ে। সেক্ষেত্রে বাতাসের এলোমেলো (র‍্যানডম) আলোড়নই হবে ধ্বনির উৎস।
স্বরপর্দার কম্পন বা এলোমেলো আলোড়নে সঞ্চালিত বাতাস গলা ও মুখের গহ্বরের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসে। এই দুই গহ্বর মিলে vocal tract বা স্বরনালি। যে কোনও নালি বা টিউবের এক বা একাধিক স্বাভাবিক কম্পাঙ্ক থাকে। কোনও উৎসের কম্পনের শব্দে এক মূল কম্পাঙ্ক (fundamental) ও তার গুণিতক কম্পাঙ্কের উপসুর (harmonics) থাকে। সেগুলোর মধ্যে স্বরনালি তার স্বাভাবিক কম্পাঙ্কগুলির কাছাকাছির উপসুরগুলিকে বাড়িয়ে তোলে। জিভ, ঠোঁট প্রভৃতি অঙ্গ নাড়িয়ে আমরা গলনালির আকৃতি তথা স্বাভাবিক কম্পাঙ্কগুলির হেরফের করতে পারি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ আমাদের শ্রবণযন্ত্র এই অন্তর্নিহিত উপসুরগুলির হেরফের ধরতে পারে, ফলে কোন ধ্বনি উৎপন্ন হচ্ছে সেটাও বুঝে ফেলে। এটা ধ্বনি সৃষ্টির একেবারে গোড়ার কথা। অনেক ধ্বনি মিলে কথা সৃষ্টি। সেটা বোঝার সামগ্রিক প্রক্রিয়া আরও অনেক জটিল এবং এই প্রবন্ধের সীমার বাইরে।
এবার আসি বিভিন্ন ধ্বনি ও তার প্রকারভেদে। ধ্বনিগুলিকে চিহ্নিত করা হয় দুটি ব্যাপার দিয়ে – প্রথমত, তা কী পদ্ধতিতে সৃষ্টি করা হয়, দ্বিতীয়ত তার উচ্চারণের ‘স্থান’ কোনটা। একটু ব্যাখ্যা করা যাক।
‘পদ্ধতি’ বা manner অনুযায়ী ধ্বনিকে যে যে শ্রেণীতে ভাগ করা হয় তা হচ্ছে:
(১) স্বরধ্বনি বা vowel, যা এককথায় ‘খোলা মুখে’ উচ্চারিত ধ্বনি। দেবনাগরী বর্ণমালায় মোটামুটি ‘অ’ থেকে ‘ঔ’ অবধি স্বরবর্ণ। অবশ্য আধুনিক ধ্বনিতত্ত্ব অনুসারে এর মধ্যে ‘ঐ’ আর ‘ঔ’ হচ্ছে যুগ্মস্বর বা dipthong, যা আদতে দুটি হ্রস্ব স্বরধ্বনির মিলন। সংস্কৃতে ঐ = এ+ই আর ঔ = অ+উ। আবার সংস্কৃতে ‘ঋ’ হচ্ছে ‘র’-এর স্বরধ্বনি (যেমন Harvard-এর ‘r’)। সংস্কৃতে ‘লি’ (৯) বলে যে স্বরটি ছিল তা ছিল ‘ল’-এর স্বরধ্বনি, যা এখন কোনও ভারতীয় ভাষায় উচ্চারিত হয় না বলে আধুনিক বর্ণমালার থেকে বাদ গিয়েছে। এ ছাড়া ‘অ্যা’ (যেমন rat-এ) আদতে একটি স্বরধ্বনি, কিন্তু সংস্কৃতে তার কোনও সংস্থান নেই।
বিভিন্ন স্বরধ্বনি সৃষ্টি করা হয় জিহ্বাকে সামনে (ঈ,ই,এ) বা পেছনে (অ্যা,আ) নিয়ে ও মুখগহ্বরকে বেশি (আ) বা কম (ই,উ) খুলে। কখনও ঠোঁটকে বাইরে প্রসারিত করে (উ,ঊ,ও)।
স্বরধ্বনি ছাড়া অন্য সব ধ্বনিই ব্যঞ্জনধ্বনি বা consonant. স্বরধ্বনি আলাদাভাবে উচ্চারণ করা যায়। কিন্তু ব্যঞ্জনধ্বনি বোধগম্যভাবে উচ্চারণ করতে সাথে কোনও স্বরধ্বনি আবশ্যক।
(২) অর্ধ্বস্বরধ্বনি বা semi vowel, যা প্রায় স্বরের মতো মুখ খুলে, কিন্তু সামান্যই খুলে উচ্চারিত হয়। সংস্কৃতে অন্তস্থ ‘ব’ আর ‘য’ অর্ধস্বর।
(৩) অনুনাসিক ধ্বনি বা nasal, যা উচ্চারণের সময় মুখগহ্বর প্রায় বন্ধ থাকে, কিন্তু নাকের গহ্বর দিয়ে বাতাস বেরোয়। ঙ, ঞ, ণ, ন, ম হচ্ছে অনুনাসিক ধ্বনি। এছাড়া, অনুস্বর ং ও চন্দ্রবিন্দু ঁ বর্ণ হচ্ছে অনুনাসিকের চিহ্ন।
(৪) উষ্মধ্বনি বা fricative, যা উচ্চারণের সময় মুখ বা গলার কোথাও সামান্য ফাঁক রেখে তার মধ্য দিয়ে নিশ্বাসবায়ু দ্রুত ছাড়া হয়। শ, ষ, স ও হ হচ্ছে উষ্মস্বর।
(৫) পার্শ্বিক ধ্বনি বা lateral ল, যা উচ্চারণের সময় মুখের কোথাও বাধা সৃষ্টি করে ঠোঁটের পাশ দিয়ে হাওয়া ছাড়া হয়।
(৬) রণিত ধ্বনি বা trill ‘র’, যা উচ্চারণের সময় জিভ বারবার দ্রুত টাকরায় লাগে ও নেমে আসে। ‘র’ ধ্বনির এটাই মূল রূপ হলেও আরও নানা রূপ আছে।
(৭) এছাড়া রয়েছে stop consonant, উপযুক্ত প্রতিশব্দের অভাবে তাকে স্পর্শধ্বনি বলা যাক। এগুলো হচ্ছে ‘ক’ থেকে ‘প’ বর্গের বর্ণের মধ্যে অনুনাসিকগুলি বাদে বাকিগুলির ধ্বনি। এই ধ্বনি উচ্চারণ করা হয় মুখ বা গলায় কোথাও একটা বাধা সৃষ্টি করে তারপর সেই বাধা হঠাৎ সরিয়ে উচ্চচাপের নিশ্বাসবায়ু দ্রুত ছেড়ে দিয়ে। এই স্পর্শধ্বনিকে আবার অঘোষ/ঘোষ (unvoiced/voiced) ও অল্পপ্রাণ/মহাপ্রাণ (unaspirated/aspirated) হিসেবে ভাগ করা যায়। যেসব স্পর্শধ্বনি সৃষ্টির সময় স্বরপর্দা কাঁপে না (‘ক’ থেকে ‘প’ বর্গের প্রথম ও দ্বিতীয় ধ্বনি) সেগুলো অঘোষ আর যেগুলোতে কাঁপে (বর্গের তৃতীয় ও চতুর্থ ধ্বনি) সেগুলো ঘোষ। আর প্রতি বর্গের দ্বিতীয় ও চতুর্থ স্বর উচ্চারণের সাথে সাথে গলা থেকে ‘হ’-গোছের শব্দও নির্গত হয়। এগুলো হচ্ছে মহাপ্রাণ ধ্বনি। আর প্রথম ও তৃতীয় ধ্বনিতে তেমন হয় না দেখে তাদের বলে অল্পপ্রাণ ধ্বনি।

এবার আসছি ‘উচ্চারণস্থান’ বা place of articulation নিয়ে। এটা মূলত প্রযোজ্য ব্যঞ্জনধ্বনি সম্বন্ধে। ব্যঞ্জনধ্বনি সৃষ্টির জন্য মুখ বা গলার গহ্বরে কোথাও জিভ বা ঠোঁটের সাহায্যে বাধা সৃষ্টি করতে হয়। যেখানে এই বাধা সৃষ্টি করা হয় তাকে বলে উচ্চারণস্থান। ‘প’ বর্গের ধ্বনিগুলির ক্ষেত্রে ঠোঁট দিয়ে মুখনিসৃত হাওয়া আটকে তারপর তা দ্রুত ছাড়া হয়। তাই এগুলো হচ্ছে ওষ্ঠধ্বনি বা labial. ‘ত’ বর্গে এই বাধা সৃষ্টি করা হয় দাঁতের ওপর জিভ রেখে, ‘স’-এর ক্ষেত্রেও তাই। তাই এগুলো দন্তধ্বনি বা dental. ‘ক’ বর্গের ধ্বনিগুলির ক্ষেত্রে কোথায় এই বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে, সেটা সহজবোধ্য নয়। আসলে সেটা করা হয় জিভের পেছন দিয়ে গলার মধ্যে। উষ্মস্বর ‘হ’র উচ্চারণস্থানও ঐ কণ্ঠ। তাই এগুলো কণ্ঠধ্বনি। ‘চ’ বর্গের বাধাটা সৃষ্টি হয় তালুতে, ‘শ’-এর ক্ষেত্রেও তাই। এগুলো তাই তালব্য ধ্বনি। আর ‘ট’ বর্গের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হয় তালুর ভেতরের দিকে, ‘ড়’ আর ‘ষ’-এর ক্ষেত্রেও তাই। এক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যবশত নামকরণটা উচ্চারণস্থানকে নির্দেশ করে না। সংস্কৃতে এগুলো হচ্ছে মূর্ধাধ্বনি, কারণ ধরা হতো এই ধ্বনিগুলি মূর্ধা অর্থাৎ মাথা থেকে আসছে। আর ইংরেজিতে এগুলো হচ্ছে retroflexed, যার আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে (এক্ষেত্রে জিভ) বেঁকিয়ে পেছনে নেওয়া।
সংস্কৃত স্বরধ্বনির সংখ্যা ইংরেজি স্বরধ্বনির চেয়ে কম। সংস্কৃতে ‘ঐ’ ও ‘ঔ’ যুগ্মস্বর বাদ দিলে মোট দশটা স্বরধ্বনি আর ইংরেজিতে এটা ১৫টার কম নয়। তাই সংস্কৃত ভিত্তিক ভারতীয় ভাষায় অভ্যস্ত অনেকে ইংরেজি উচ্চারণের ক্ষেত্রে স্বরধ্বনিতে বেশি ভুল করেন। ইংরেজি স্বরধ্বনির উচ্চারণ ইংরেজি হিসেবেই শিখতে হয়। আবার সংস্কৃতে ব্যঞ্জনধ্বনি অনেক বেশি। ইংরেজিতে মহাপ্রাণ ও অল্পপ্রাণ স্বরের (যেমন ‘ক’ ও ‘খ’র) তফাত নেই, দন্ত ও মূর্ধা ধ্বনিরও (‘ত’ ও ‘ট’ বর্গের) ফারাক নেই। তাই ঐ ধরণের উচ্চারণগুলির তফাত ইংরেজি ভাষাভাষীদের কান ধরতে পারে না। এছাড়া সংস্কৃতে আছে অনুনাসিক স্বরধ্বনি। এই স্বরধ্বনিগুলি উচ্চারণের সময় আংশিক বাতাস নাকের মধ্য দিয়ে বেরোয়। অনুনাসিক স্বরধ্বনিকে স্বরবর্ণ বা যে ব্যঞ্জনবর্ণে ঐ স্বরবর্ণটি মাত্রা, তার ওপর চন্দ্রবিন্দু দিয়ে বোঝানো হয়। যেমন ‘আঁকশি’, ‘চাঁদ’। অনুস্বর সংস্কৃতে অনুনাসিকের সাধারণ চিহ্ন, যা ওপরে বিন্দু হিসেবে বসে। ‘চ’ বর্গের কোনও ধ্বনির পর বসলে এর উচ্চারণ ‘ঞ্‌’, ‘ট’ বর্গের পর ‘ণ্‌’, ‘ত’ বর্গের পর ‘ন্‌’, ‘প’ বর্গের পর ‘ম্‌’ আর অন্যত্র ‘ঙ্‌’।
কিছু অতি সরলীকরণ এই ব্যাখ্যায় রয়ে গেল। যেমন ‘চ’ থেকে ‘ঝ’ আসলে স্পর্শধ্বনি ও উষ্মস্বরের মাঝামাঝি এক ধরণ, যাকে ইংরেজিতে বলে affricate. আবার ‘র’ ও ‘ল’র নানা রূপভেদ হয়। তবে সব মিলিয়ে ব্যাপারটার একটা প্রাথমিক ধারণা আশা করা যায় হল।

(৩) সংস্কৃত লিপির শক্তি ও দুর্বলতা

প্রবন্ধের মূল আলোচ্য লিপি ও বানান। তাই এখানে মুলত সংস্কৃত ভাষার অন্তর্বস্তু নয়, তার লিপি ও বর্ণমালার শক্তি ও দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করছি। লক্ষ করবেন, উপরোক্ত ধ্বনিতত্ত্বের আলোচনায় সংস্কৃতের ক্ষেত্রে ধ্বনি ও বর্ণ শব্দ দুটি একে অপরের বদলে অনায়াসে ব্যবহার করা গেছে। যেমন ‘শ’ হচ্ছে উষ্মবর্ণ, আবার ‘শ’ হচ্ছে উষ্মস্বর। এটা সম্ভব হচ্ছে, কারণ সংস্কৃতের বর্ণমালা দেবনাগরী হচ্ছে ধ্বনি অনুসারী অর্থাৎ প্রত্যেক ধ্বনি এক একটি স্বতন্ত্র বর্ণদ্বারা চিহ্নিত। ইংরেজি ও অন্যান্য অধিকাংশ ভাষার ক্ষেত্রে এটা অসম্ভব। তাই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে International Phonetic Alphabet (IPA)তে ধ্বনি বা phonemeদের চিহ্নিত করতে কিছু ইংরেজি বর্ণ, কিছু বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার হয়। (http://www.internationalphoneticalphabet.org/ipa-sounds/ipa -chart-with-sounds/) তাছাড়া, দেবনাগরী বর্ণমালায় বর্ণগুলি উচ্চারণের ধরণ ও স্থান অনুযায়ী বৈজ্ঞানিকভাবে সাজানো। প্রথমে ‘অ’ থেকে ‘ঔ’ স্বরবর্ণ। তারপর স্পর্শবর্ণ, যেগুলো আবার তাদের উচ্চারণস্থান বরাবর সাজানো – কণ্ঠ, তালু, মূর্ধা, দন্ত ও ওষ্ঠ, বলতে গেলে বাধার স্থান ভেতর থেকে বাইরে আসছে! এরপর অর্ধ স্বরবর্ণ, তারপর র, ল, তারপর উষ্মবর্ণ। ধ্বনিগুলো উচ্চারণের নিয়ম সম্বন্ধে এই সজ্জা সহজাত ইঙ্গিত দেয়।
অবশ্যই আধুনিক ধ্বনিতত্ত্বের প্রেক্ষিতে এই সজ্জার অল্পসল্প অসঙ্গতি চোখে পড়ে – ঐ, ঔ ও ‘চ’ বর্গের গোলমালের কথা ২য় অনুচ্ছেদে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু সব মিলিয়ে ধ্বনির ধরণ অনুসারী বর্ণমালা ও বর্ণমালার বৈজ্ঞানিক সজ্জা তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো ধারণা, বিশেষত অত শতাব্দী আগে!
বর্ণমালার এই সুবিধার জন্যই পরবর্তী যুগে যখন বিভিন্ন সংস্কৃতজ্ঞ বিদ্বজ্জন নিজ নিজ মাতৃভাষার লিপি রচনা বা সংস্কারে মন দিলেন, তখন দেবনাগরী বর্ণমালাকেই প্রামাণ্য ধরলেন। হিন্দি, মরাঠি প্রভৃতি ভাষায় মূলত দেবনাগরী অক্ষরগুলিই ব্যবহৃত হল আবার বাংলা প্রভৃতি কিছু ভাষায় প্রত্যেকটি অক্ষরের চিহ্ন হল আলাদা। বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার ধ্বনি তালিকা বা phoneme set-এ কিছু ধ্বনির হেরফের আছে, সেই অনুযায়ী কিছু বর্ণ যোগ হল বা বাদ গেল। যেমন মরাঠিতে ‘মূর্ধণ্য ল’ রয়েছে, আবার দাক্ষিণাত্যের কিছু ভাষায় একাধিক ‘র’ রয়েছে, তার জন্য আলাদা বর্ণ যোগ হল। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার অনেকগুলির বর্ণমালাই তাই এভাবে মূলত দেবনাগরী অনুসারী। এদিক থেকে দেখলে সংস্কৃতকে এ যুগের আঞ্চলিক ভারতীয় ভাষাগুলির লিখিত রূপের ‘আদি’ বলা যেতে পারে।
দেবনাগরী বা তার অনুসারী বর্ণমালার সুবিধা হচ্ছে, এগুলো আমরা ‘যেমন বলি, তেমন লিখি’ নীতিতে তৈরি। অর্থাৎ এতে কথ্য ও লিখিত বাক্যের মধ্যে এক সহজ সাযুজ্য থাকা সম্ভব। প্রত্যেকটি বর্ণের উচ্চারণ জানলে লিপি বা টেক্সট পড়ে ফেলতে অন্য কোনও জ্ঞানের দরকার হয় না। আবার কোনও কথা শুনে তাকে লিপিবদ্ধ করতেও কোনও অসুবিধা নেই।
সংস্কৃত লিপির যেগুলো দুর্বলতা বলা যেতে পারে তা হচ্ছে মাত্রা, যুক্তাক্ষর আর ইংরেজির তুলনায় বেশি সংখ্যক বর্ণ। ইংরেজি প্রভৃতি ল্যাটিন বর্ণমালা একমাত্রিক। তাতে বর্ণের সংখ্যাও কম। (ইংরেজিতে ২৬টি অক্ষর, ছোটো ও বড়ো হাতের।) ফলে ছাপাখানা ও টাইপরাইটার উদ্ভবের সময় ইংরেজি ও অন্যান্য ল্যাটিন বর্ণমালা তার সাথে সহজে খাপ খেয়ে গেল। তুলনায় দেবনাগরী ভিত্তিক ভারতীয় ভাষাগুলিকে কীবোর্ডে ও লেটার প্রিন্টে আনা বেশি শ্রমসাধ্য। এই একমাত্রিক ও কম অক্ষর হওয়ার স্বাভাবিক সুবিধার জোরে কম্পিউটার প্রযুক্তির উদ্ভবের যুগেও ইংরেজি মৌরসিপাট্টা করে বসল, বিশেষত কম্পিউটার ল্যাংগোয়েজগুলিতে।
সেই মৌরসিপাট্টা আজও আছে। কিন্তু কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার শক্তিশালী হবার ফলে এখন তাতে জটিল কী-বোর্ড ও লিপিও কার্যকর করা সহজ। তাই কম্পিউটার সিস্টেমের কাজ এখনও ইংরেজিতে হলেও প্রয়োগ বা অ্যাপ্লিকেশনে আঞ্চলিক ভাষাগুলিও স্থান করে নিচ্ছে এবং নেবে। তবে ইংরেজিতে টাইপ করার চাইতে বাংলা বা হিন্দিতে টাইপ করতে অপেক্ষাকৃত বেশি শ্রম ও দক্ষতা লাগে।
সবশেষে বলি, বিদ্বানদের দ্বারা ও বিদ্বানদের জন্য সৃষ্ট সংস্কৃত কোনও দিন সাধারণ মানুষের ভাষা হয়ে ওঠেনি, হবেও না। সময়ের সাথে সাথে তার কোনও পরিবর্তনও নেই। এটাকে কাটানোর সহজ উপায় নেই। এদিকে ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার অনেক বিবর্তন হয়েছে ও হচ্ছে। কিন্তু ‘জনতা’র চেষ্টায় বিবর্তিত কথ্য ভাষা পণ্ডিতদের চেষ্টায় বিবর্তিত লিখিত ভাষার চেয়ে বদলাচ্ছে অনেক দ্রুত। ফলে সংস্কৃতে যেখানে লেখা ও বলায় সরাসরি সাযুজ্য ছিল, সংস্কৃত অনুসারী ভারতীয় ভাষাগুলিতে এই দুয়ের মধ্যে ধীরে ধীরে উল্লেখযোগ্য ফারাক তৈরি হয়েছে। এ যুগে যখন সাধারণ মানুষকে লিখিত ভাষায় শিক্ষিত করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন এই ফারাক সীমার মধ্যে রাখাও এক চ্যালেঞ্জ। সমস্যাটা ভাষা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু পরবর্তী অনুচ্ছেদে সুবিধের জন্য মুলত বাংলা ভাষা নিয়েই আলোচনা করা হবে।

(৪) বাংলা ও সংস্কৃত

বাংলা ভাষা সংস্কৃত অনুসারী, আবার নয়ও। এই ভাষার বর্ণমালা দেবনাগরী অনুসারী, কিন্তু বর্ণগুলোর প্রতীক দেবনাগরীর থেকে আলাদা। বাংলা বর্ণমালার আর এক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার যুক্তাক্ষরসমূহ – যার অনেকগুলির জন্যই আলাদা প্রতীক রয়েছে, যা দেখে সেটা কোন দুই বর্ণের যুক্তাক্ষর বোঝা যায় না। একই সমস্যা সংস্কৃতেও আছে, তবে অত নয়। হিন্দি ভাষায় যুক্তাক্ষর লেখার নিয়ম সরল করে সেগুলোকে অনেক সহজবোধ্য করা হয়েছে। বাংলার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। ফলে যারা প্রথম লিখিত ভাষা শেখে, তাদের গুচ্ছের যুক্তাক্ষর (যেমন ক্ত, ত্ত, ত্থ) মুখস্থ করতে হয়। তাই অনেক শিক্ষার্থীই বহুদিন যুক্তাক্ষরে আটকে থাকে।
বাংলা ভাষা তার বিষয়বস্তুতেও অনেকটাই সংস্কৃতের সাথে সম্পর্কিত। বাংলার শব্দসম্ভার বা vocabularyতে রয়েছে তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দ। যে শব্দ সংস্কৃত থেকে অবিকৃত অবস্থায় বাংলায় স্থান পেয়েছে তা তৎসম। যেমন বিদ্যা, আলোক, চন্দ্র। আর যা সংস্কৃত বা তার সমান্তরাল কোনও আদি ভারতীয় ভাষা থেকে কিছুটা বদলে বাংলায় ঢুকেছে তা হচ্ছে তদ্ভব। যেমন (চন্দ্র থেকে) চাঁদ, (হস্ত থেকে) হাত। দেশি শব্দগুলি মূলত প্রাকৃত অথবা স্থানীয় প্রচলিত শব্দের থেকে নেওয়া। যেমন ঝাঁটা, কুড়ি, পেট। বিদেশি শব্দের মধ্যে আছে আরবি, ফারসি, ইংরেজি প্রভৃতি শব্দ। যেমন আদালত, খোদা, স্টেশন। প্রতিদিন আরও নতুন নতুন শব্দ বাইরের থেকে ও স্থানীয় প্রয়োগের ফলে ভাষায় যুক্ত হয়ে তাকে সমৃদ্ধ করছে, প্রচলিত নানা শব্দের রূপও পাল্টাচ্ছে।
বাংলার ব্যাকরণও অনেকটা সংস্কৃতের অনুসারী। সন্ধি, সমাস, কারক, প্রত্যয় সব কিছুই সেই অনুযায়ী শেখানো হয়। সুতরাং বলা যায় বাংলা সংস্কৃতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কিন্তু এই যোগসূত্র বা ‘নাড়ির টান’ বাংলার পক্ষে ভবিষ্যতে কতটা উপযোগী? একে একে নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা যাক।
(১) বর্ণমালা: আমরা যে দেবনাগরী ভিত্তিক বর্ণমালা ব্যবহার করি, তার সহজাত সুবিধেগুলির বিষয়ে আগে বলা হয়েছে। তবু আর একটু লিখছি, কারণ একটা উটকো দাবি উঠছে যে ভারতীয় ভাষাগুলির টেক্সটকে মাতৃভাষার বর্ণমালার বদলে ল্যাটিন (ধরুন, ইংরেজি) বর্ণমালায় লেখা হোক। কারণ, এখন ছেলেমেয়েরা মাতৃভাষার বদলে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছে, তাই মাতৃভাষা লিখতে শিখছে না। অথচ তারা প্রায়ই মাতৃভাষায় কথা বলে, বন্ধুদের মধ্যে বার্তা বিনিময় করে, কম্পিউটার-মোবাইলে প্রায়ই মাতৃভাষা ‘ইংরেজি’তে কোড করে পাঠায়। তাই সেগুলো ইংরেজি বর্ণমালায় লিখতে শেখালে ল্যাটা চুকে যায়।
আগের অধ্যায়ের আলোচনায় দেখানো হয়েছে, দেবনাগরী ভিত্তিক বর্ণমালা ফোনেটিক বা ধ্বনি অনুসারী, ইংরেজি তা নয়। একটা শক্তিশালী বর্ণমালার থেকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল বর্ণমালায় যাওয়া নিতান্ত বাধ্য না হলে বাঞ্ছনীয় নয়। এটাও দেখানো হয়েছে, ইংরেজি ও দেবনাগরীর ধ্বনিসমূহ বা phoneme set অভিন্ন নয়। তাই অনেক বাংলা ধ্বনি সংশয়হীনভাবে (unambiguously) ইংরেজি বর্ণমালার সাহায্যে দেখানো সম্ভব নয়। যেমন ghatak ঘাতক বা ঘটক হতে পারে। আবার gan হতে পারে গান বা গাঁ। তাই (দেবনাগরী অনুসৃত) বাংলা বর্ণমালা বাংলায় রাখাই সঙ্গত। তবে তাতে নানা যুগোপযোগী পরিবর্তন করা দরকার। প্রথমত, বাংলা উচ্চারণ আজ আর সম্পূর্ণ সংস্কৃত অনুগামী নয়। তাই দেবনাগরী ভিত্তিক লিপির যে মূল সুবিধা ‘যেমন বলি, তেমন লিখি’ তা আমরা অনেকটা হারিয়ে বসেছি। এটা শোধরাতে গেলে বানান সংস্কার দরকার। দ্বিতীয়ত, বাংলা বর্ণমালায় যুক্তাক্ষর প্রায়ই দুর্বোধ্য। এই সমস্যা দেবনাগরী বর্ণমালায়ও আছে, তবে কম। তাই বাংলায় যুক্তাক্ষরের সংস্কারও আশু দরকার। এসব নিয়ে পরবর্তী অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হচ্ছে।
(২) শব্দসম্ভার: বর্তমান বাংলা ভাষা লক্ষ করলে দেখি, তৎসম শব্দ ও সমাসবদ্ধ শব্দ বেশি ব্যবহার করেন শিক্ষিত সম্প্রদায়। সাধারণ মানুষ সাধারণ কথোপকথনে বেশি ব্যবহার করেন তদ্ভব শব্দ (সেগুলো কোত্থেকে এসেছে তার তোয়াক্কা না করেই), দেশি শব্দ, ইংরেজি শব্দ ও হিন্দি শব্দ। তাই লিখিত ও সাহিত্যিক ভাষার সঙ্গে চলতি কথ্য ভাষার এক বড় ফারাক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এখানে সমস্যা হচ্ছে, ভাষা সচল। কিন্তু কঠিন নিয়মাবদ্ধ সংস্কৃত আর সচল ভাষা নয়। তাই সময়ের সাথে সংস্কৃতের সঙ্গে আঞ্চলিক ভারতীয় ভাষাগুলির ফারাক বেড়েছে, ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। এই বাস্তবতাকে মনে রাখতে হবে। তার মানে এই নয় যে তৎসম শব্দাবলী সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে বা করলে ভালো হবে। মনে রাখতে হবে, ভাষার উপযোগ বহুবিধ। অনেক কাজে তৎসম শব্দ অপরিহার্য, কোথাও উপযুক্ত প্রচলিত শব্দ। সমাসবদ্ধ তৎসম শব্দাবলীর শক্তি হচ্ছে এক মূল শব্দ (root word) থেকে অনেক উদ্ভুত শব্দ (derived word) নিয়মের সাহায্যে তৈরি করা যায়। ওভাবে লিখলে ভাষা সংক্ষিপ্ত ও ছিমছাম হয়, সুবোধ্যও হতে পারে। ইংরেজির এই ক্ষমতা আছে, কিন্তু চলতি বাংলার তা নেই। মাইকেল নামধাতু (যেমন, ‘প্রবেশ করিলা’র জায়গায় ‘প্রবেশিলা’) প্রচলনের চেষ্টা করেছিলেন, চলেনি – ইয়ার্কি করে বলা ফোনাচ্ছি, ফেসবুকাচ্ছি ইত্যাদি ছাড়া। সব মিলিয়ে, কোনও ‘ফর্মাল’ ব্যবহারে (বিজ্ঞানের লেখা, আইনি লেখা, দলিল ইত্যাদি) ও সাহিত্যের কিছু শাখায় তৎসম শব্দের ব্যবহার এখনও অপরিহার্য। তবে মনে রাখতে হবে সব তৎসম শব্দ সুপ্রচলিত ও সহজবোধ্য নয়। আর ‘ইনফর্মাল’ কমিউনিকেশন ও সাহিত্যের অন্য কিছু শাখায় কথ্য বাংলা শব্দ ব্যবহার করলে তাতে কাজ সহজ হয়।
(৩) ব্যাকরণ: সংস্কৃতের অন্যতম শক্তি তার নিটোল নিয়মাবদ্ধ ভাষা, যেখানে ব্যাকরণের নিয়মাবলী শিখলে অবলীলায় বাক্য ও শব্দ রচনা করা যায়। এমন একটা ধারণাই সে যুগের তুলনায় ছিল বৈপ্লবিক। কিন্তু এই শক্তিই আবার তার দুর্বলতা। কোনও ভাষা নিয়ম মেনে বেড়ে ওঠে না। যে মানুষ সেই ভাষা ব্যবহার করে, নিয়ম ভাঙাই তাদের নিয়ম। তাই কিছুদিন পর চলতি ভাষা ও ব্যাকরণে ফারাক দেখা দেয়। যেহেতু শুধু বিদ্বজ্জনেরাই নিয়ম সৃষ্টি করেন, তাই তাঁরা সেগুলো ভাষার প্রচলনের সঙ্গে তাল রেখে বদলাতে ব্যর্থ হন। তাই ব্যাকরণ ও বাস্তবের ফারাক সময়ের সাথে বেড়েই চলে এবং ব্যাকরণ শিক্ষার্থীদের সম্বল না হয়ে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
সংস্কৃতের সন্ধি, সমাস, কারক-বিভক্তি, প্রত্যয় প্রভৃতির শক্তিশালী নিয়মগুলি বাংলা শব্দের ক্ষেত্রে কতটা খাটে? দুর্ভাগ্যবশত, অনেকটাই নয়। বিদ্যা+আলয় = বিদ্যালয়, কিন্তু কচু+আলু+আদা = কচ্যাল্যাদা নয়, এটা আমরা স্কুলে পড়েছি। কিন্তু এর কারণ যে প্রথমোক্ত শব্দগুলি তৎসম ও শেষোক্তগুলি তদ্ভব বা দেশি (বা বিদেশি), সেটা আমাদের শেখানো হয়নি।
সংক্ষেপে, বাংলাকে যদি যুগোপযোগী হতে হয় ও জনসাধারণের মধ্যে লিখিত বাংলার প্রসার যদি লক্ষ্য হয়, তবে তাকে সংস্কৃতের লাঠি ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। অবশ্যই সংস্কৃতের থেকে যা কিছু উপযোগী আমরা নেব। তবে যা এখন আর উপযোগী নয়, তার সংস্কার করতে হবে।

(৫) বাংলা উচ্চারণ ও বানান

সংস্কৃতে মোটামুটিভাবে প্রতিটি বর্ণ এক একটি ধ্বনির প্রতিরূপ। এই বর্ণগুলির উচ্চারণ কীভাবে করতে হবে, সেটাও বর্ণমালায় তাদের অবস্থান থেকে বোঝা যায়। এটা এই বর্ণমালার অন্যতম সুবিধা। কিন্তু বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় সময়ের সাথে সাথে লেখা ও বলার মধ্যে ফারাক তৈরি হয়েছে। কোনও কোনও বর্ণের উচ্চারণ সম্বন্ধে একাধিক সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে, কোনও কোনও উচ্চারণের লিপিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রেও একাধিক সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। এই ফারাক হিন্দি, মরাঠি প্রভৃতি ভাষাতেও রয়েছে, তবে বাংলায় রয়েছে অনেক বেশি। সেটা নিয়ে একটু বিশদ আলোচনা করা যাক।
(১) অ: এই স্বরটি উচ্চারণের সময় আমাদের ঠোঁট, জিভ প্রভৃতি বাচনাঙ্গ স্বাভাবিক বিশ্রামের অবস্থায় থাকে। একে তাই ইংরেজিতে বলে neutral vowel. আলাদা কোনও ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণ করতে আমরা তার শেষে এই ধ্বনি যোগ করি। যেমন, প = প্‌+অ। আবার লেখায় কোথাও ব্যঞ্জনবর্ণের পর কোনও মাত্রা না থাকলে ধরে নেওয়া হয় সেখানে ‘অ’ আছে। যেমন কামনা = ক্‌+আ+ম্‌+অ+ন্‌+আ। ভাষা অনুসারে ‘অ’র উচ্চারণে সামান্য ফারাক হয়। যেমন হিন্দি বা মরাঠিতে এটা প্রায় হ্রস্ব-আ’র মতো। কিন্তু বাংলায় ‘অ’র উচ্চারণ অ (aw, যেমন অজয়) অথবা ও (o, যেমন অলি) হয়। আবার যেখানে ‘অ’ লুপ্ত মাত্রা হিসেবে থাকে, সেখানে সেটা আদৌ উচ্চারিত নাও হতে পারে। যেমন সমর = স্‌+অ+ম্‌+অ+র্‌+অ। কিন্তু প্রথম ‘অ’র উচ্চারণ ‘অ’, দ্বিতীয়টির ‘ও’ আর তৃতীয়টি লুপ্ত। অর্থাৎ আদতে উচ্চারণ হচ্ছে সমোর্‌। ফলে অ বা লুপ্ত অ-কারযুক্ত কোনও শব্দ পড়তে হলে আমরা দেবনাগরী লিপির স্বাভাবিক সুবিধে পাচ্ছি না, অর্থাৎ দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারছি না এর উচ্চারণ কী। সুতরাং সব অ-মাত্রার শব্দের উচ্চারণ আমাদের শিখতে হবে। আবার ‘সমোর’ শুনে তাকে ‘সমোর’ না ‘সমর’ লিখব, সেটাও শিখতে হবে।
(২) ই-ঈ, উ-ঊ: ধ্বনিতত্ত্ববিদরা বলেন, বাংলায় হ্রস্ব-দীর্ঘ ই, উ’র উচ্চারণে এখন কোনও প্রভেদ হয় না। অর্থাৎ আমরা এই দুইকে আলাদা ধ্বনি হিসেবে উচ্চারণ করি না, এই স্বরগুলিকে দীর্ঘায়িত করি শুধু ভাবাবেগ প্রকাশের জন্য। অথচ আমাদের ভাষায় ই-ঈ, উ-ঊ আলাদা বর্ণ হিসেবে আছে। বাংলা বানানে বেশি ভুল হয় এই হ্রস্ব-দীর্ঘ ই-উ নিয়ে। উচ্চারণে যেহেতু আমরা এগুলো আলাদা করি না, তাই বানান মুখস্থ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
(৩) ঋ: ঋ’র উচ্চারণ সংস্কৃতে, আগেই বলেছি, স্বর ‘র’। বাংলায় আমরা একে ‘রি’ উচ্চারণ করি। হিন্দিতেও তাই হয় আবার মরাঠি প্রভৃতি কিছু ভাষায় এটা ‘রু’ উচ্চারিত হয়। লেখায় ‘ঋ’ বা ঋ-কার থাকলে পড়তে তাই অসুবিধা নেই। কিন্তু কথায় ‘রি’ শুনলে বানান ‘ঋ’ নাকি ‘রি’, সে সংশয় থাকে।
(৪) এ: ‘এ’র উচ্চারণ স্থানবিশেষে ‘এ’ (যেমন ছেলে) বা ‘অ্যা’ (যেমন খেলা) হতে পারে। এটাও লেখা দেখে বোঝা যায় না। প্রসঙ্গত, বাংলায় ‘অ্যা’ একটি স্বরধ্বনি, কিন্তু এর কোনও স্বতন্ত্র প্রতীক নেই। তাই শব্দের প্রথমে অ-তে ও অন্যত্র ব্যঞ্জনবর্ণে ‘য’-ফলা আকার দিয়ে (অ্যাকসিডেন্ট, ক্যারাম) এই উচ্চারণ বোঝানো হয়। কিন্তু এর সাথে য-ফলার উচ্চারণের আদতে কোনও সম্বন্ধ নেই!
(৫) ঐ, ঔ: এই যুগ্মস্বর দুটির সংস্কৃতে উচ্চারণ এ+ই এবং অ+উ। এই উচ্চারণ মরাঠি প্রভৃতি ভাষায় মোটামুটি তাই আছে। কিন্তু হিন্দিতে এ+ই = ‘অ্যা’ (যেমন ঐশ্বর্য  অ্যাশ্বর্য) আর অ+উ = ‘অ’ (যেমন ঔরত  অরত) হিসেবে উচ্চারিত হয়। বাংলায় অবশ্য ঐ = ও+ই আর ঔ = ও+উ আর মূল সংস্কৃতের থেকে আলাদা উচ্চারণ হলেও এখানেও কোনও সংশয় নেই।
(৬) শ, ষ, স: সংস্কৃতে শ-র উচ্চারণ ইংরেজি sh ও স-র উচ্চারণ ইংরেজি s-এর মতো হয়। ষ-র উচ্চারণের কোনও আলাদা ইংরেজি বিকল্প নেই। তবে শ-র সাথে তার পার্থক্য: ষ retroflexed অর্থাৎ উচ্চারণের সময় জিভ বেঁকে টাকরার ভেতর দিকে লাগে আর শ উচ্চারণের সময় সেটা টাকরার বাইরে লাগে। বাংলা ভাষায় কিন্তু শ ও ষ-এর আলাদা উচ্চারণ হয় না। তাই বানান লেখার সময় এর কোনটা হবে, তা নিয়ে অনেকে গোলমাল করে ফেলে। শ আর স-এর উচ্চারণও সংস্কৃত অনুসারে যথাক্রমে sh ও s হলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু আদতে অনেক ক্ষেত্রে শ-এর উচ্চারণ হয় s (যেমন শ্রীমতী, সুশ্রী) আর স-এর উচ্চারণ প্রায়ই হয় sh (যেমন সজল, সর্বদা)। কিছু নিয়ম শিখে বাংলায় শ-স উচ্চারণের প্রভেদ কিছুটা বোঝা যায়, সবটা নয়। তাই এক্ষেত্রেও উচ্চারণ বা বানান ‘মুখস্থ’ করা ছাড়া গতি নেই।
(৭) সংস্কৃতে অন্তস্থ ব আর য অর্ধস্বর বা semi-vowel. এগুলি যথাক্রমে ইংরেজি w ও yর অনুরূপ। কিন্তু বাংলায় য’র উচ্চারণ হয় জ’র মতো ও অর্ধস্বর য’র বদলে ব্যবহৃত হয় ‘য়’। আর অন্তস্থ ব বা w-র অনুরূপ উচ্চারণ বাংলায় নেই। তাই বর্গীয় ব ও অন্তস্থ ব উভয়ই উচ্চারিত হয় ব (b) হিসেবে। এ অবধি এক রকম। কিন্তু ব-ফলা ও য-ফলা অর্থাৎ অন্তস্থ ব ও য’র যুক্তাক্ষর বাংলায় উচ্চারিত হয় সংশ্লিষ্ট ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হিসেবে। যেমন বাক্য  বাক্ক, বীরত্ব  বীরত্ত। এর ফলে বাংলা লেখা পড়বার সময় সংশয় হয় না, কিন্তু শব্দের উচ্চারণ জানা থাকলে তার বানান নিয়ে সংশয় হয়। যেমন ধরুন উচ্চারণ হল স্‌+অ+ত্‌+ত্‌+অ, সেটার বানান সত্ত, সত্য, সত্ব, এমনকি সত্ত্ব হতে পারে। সুতরাং এখানেও সেই ‘মুখস্থ’র ব্যাপার। আবার ব-ফলা বা য-ফলা যদি শব্দের প্রথম অক্ষরের সাথে থাকে তবে দ্বিত্ব না হয়ে সেটা লুপ্ত হয়ে যায়। যেমন শ্বাপদ  শাপদ, দ্যুলোক  দুলোক। কাজেই উচ্চারণ শুনে তাতে ব-ফলা, না য-ফলা, না কিছুই নেই তা বোঝা অসম্ভব।
(৮) ণ, ন: সংস্কৃতে ‘ণ’ উচ্চারণের সময় জিভ বেঁকিয়ে টাকরার ভেতরদিকে ছোঁয়াতে হয় আর ‘ন’ উচ্চারণের সময় জিভ দাঁতের ওপর থাকে। হিন্দি, মরাঠিতে ‘ণ’ আলাদা ধ্বনি হিসেবে আছে। কিন্তু বাংলায় তার মোটামুটি বিসর্জন ঘটেছে। কিন্তু বানানে ‘ণ’ এখনও সগৌরবে বিরাজমান। তাই এখানেও প্রায়ই বানানের ভুল হয়।
(৯) র, ড়, ঢ়: ‘ঢ়’ এখন আর উচ্চারিত হয় না, শুধু বানানে আছে। কিন্তু ‘র’ আর ‘ড়’র ভেদ বাংলা বানান ভুলের আর এক বড় ক্ষেত্র। বাংলায় ‘র’ আর ‘ড়’র উচ্চারণভেদ একেবারে লুপ্ত হয়ে যায়নি। শিক্ষিত বাচনশিল্পী ও অন্য যাঁরা উচ্চারণ যত্ন করে শেখেন, তাঁরা এই দুয়ের উচ্চারণের ফারাক করে থাকেন। ‘ড়’ বলার সময় ঐ জিভ বেঁকিয়ে টাকরার ভেতরে ছোঁয়াতে হয় আর ‘র’ বলার সময় একটু বাইরে। কিন্তু সাধারণ মানুষ অত যত্ন করে বলে না, হয়তো শোনেও না। তাই এক্ষেত্রেও প্রায়ই বানান ভুল হয়। বস্তুত, বানান ভুলে ই-ঈ, উ-ঊ সংশয়ের পরই এই র-ড় সংশয়ের স্থান।
বাংলায় আরও কিছু লিখন আর উচ্চারণের অসঙ্গতি আছে, বিশেষত যুক্তাক্ষরের উচ্চারণ নিয়ে। সেগুলো গৌণ দেখে এখানে ক্ষান্ত দিলাম।

(৬) বাংলা বানান ও বর্ণমালার সংস্কার

বাংলা বানান ও বর্ণমালার আশু সংস্কার দরকার। কারণ, অন্য অনেক আঞ্চলিক ভাষার মতো লিখিত বাংলার প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ ক্রমক্ষীয়মান। আর তাদের ও নিরক্ষরদের লিখিত ভাষায় আগ্রহী করার পথে বানান ও যুক্তাক্ষর এক অন্যতম প্রতিবন্ধক।
শিক্ষিত ও বয়স্ক বাঙালিসমাজ হয়তো এটা মানবেন না। “আমরা কষ্ট করে বানান, যুক্তাক্ষর শিখেছি, আর এখনকার বাবু-বিবিরা পারবে না!” এই ‘মাদার-ইন-ল’ কম্পপ্লেক্স থেকে তাঁরা বলেন, “আসলে নতুন শিক্ষার্থীদের দরকার একনিষ্ঠতা, বাংলার প্রতি ভালোবাসা, আগ্রহ।” তারপর তাঁরা “মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ” ইত্যাদি কোট ঝাড়েন – এটা ভুলেই যে রবীন্দ্রনাথ শুধু ওই বাণী দিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি, সদাব্যস্ততার মধ্যেও ‘সহজ পাঠ’ লিখেছিলেন, সাধ্যমতো বানান সংস্কারও করেছিলেন।
সে যুগ আর এ যুগের তফাতও আছে। আজ একদিকে যেমন ইংরেজির ধাক্কায় আঞ্চলিক ভাষাগুলি কোনঠাসা, তেমন অডিও-ভিজুয়ালের ধাক্কায় ইংরেজি সহ সব লিখিত ভাষাই ব্যাকফুটে। কিন্তু লিখিত ভাষার প্রয়োজন ছিল, আছে ও থাকবে। মানুষ আগে ছবি আঁকতে শিখেছে, তারপর শিখেছে কথা বলতে, তারও পর লিখতে। কারণ লেখা এক অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম, বিশেষত জটিল ও বিমূর্ত বিষয়কে ধরে রাখার জন্যে। কী পণ্ডিতের অঙ্কে, কী ড্রাইভারের জন্য পথনির্দেশিকায়, ছবির চেয়ে লেখা বেশি উপযোগী। লিখিত ভাষার প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ হারিয়ে গেলে মানুষের এত শতাব্দীতে অর্জিত অনেক মূল্যবান দক্ষতা ও ক্ষমতাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।
এটা যাতে না হয় তার জন্য দরকার যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ভাষাকে সহজ করা। প্রয়োজনে নতুন প্রজন্মকে ‘প্যাম্পার’ করা। তাই আজ সব ভাষার ক্ষেত্রেই চেষ্টা চলছে, কী করে তাকে আর একটু সহজ করে সর্বসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য করা যায়। এই সময়ে বাংলা ভাষাবিদ ও বুদ্ধিজীবিরা গজদন্ত মিনারে বসে ‘ক্যাওড়া পাবলিক’দের দিকে উপেক্ষার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই লিখিত বাংলা লুপ্তপ্রায় হয়ে যাবে, যাতে কেবল কিছু কবি পরস্পরকে কবিতা লিখে শোনাবেন।
অবশ্য শুধু বানান ও লিপি অর্থাৎ ভাষার বহিরঙ্গের নয়, অন্তর্বস্তুরও সরলীকরণ করা দরকার। তবে এই প্রবন্ধে আমরা যথারীতি প্রথমোক্ত দিকেই মোটামুটি সীমাবদ্ধ থাকছি। শুধু এটুকু বলা দরকার যে যেই সংস্কৃতকে লিখিত বাংলার ‘আদি’ ভাষা বলা হয়, একদিকে যেমন তার কঠিন নিয়মের নিগড়ে বাংলাকে আটকে না রেখে শব্দসম্ভার ও ব্যাকরণে আধুনিকত্ব ও ‘বাঙ্গালিত্ব’ আনা দরকার, অন্যদিকে সংস্কৃতের অত্যন্ত শক্তিশালী ধ্বনি অনুসারী বা ‘ফোনেটিক’ লিপি, যার থেকে আমরা অনেকটাই সরে এসেছি, সেখানেই আবার ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করা দরকার। এভাবেই আরও বেশি মানুষের কাছে বাংলার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। আজকের যুগে কোনও ভাষা শুধু অল্পসংখ্যকের কাছে গ্রহণযোগ্য হলে চলে না। যে যে আধুনিক রাষ্ট্র ক্ষমতাবান হয়েছে, তারা সেটা করতে পেরেছে অধিকাংশ মানুষের শিক্ষা ও কার্যক্ষমতার উন্নয়ন ঘটিয়ে। ‘এলিটিস্ট’ শিক্ষাব্যবস্থা আজকের দিনে কোনও জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে না।
নির্দিষ্ট কী করতে হবে, সে নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তবে বানান সংস্কার ও লিপি সংস্কার যে তার মধ্যে অন্যতম, তাতে সন্দেহ নেই। দুই বাংলার সাহিত্য আকাদেমি ও আরও নানা দায়িত্বশীল সংস্থা এ নিয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন ও নিচ্ছেন। কিন্তু হয়তো তা যথেষ্ট নয়।

লিপি সংস্কারের ক্ষেত্রে এখন ছাপার ফন্টে যুক্তাক্ষর ও মাত্রা এমনভাবে লেখার কথা বলা হচ্ছে, যাতে তা কোন দুটি স্বরের সমাহার তা বোঝা যায়। যেমন ‘রু’, ‘রূ’র বদলে র’র নিচে উ/ঊ-কার দেওয়া। আবার ‘ত্থ’, ‘ক্ত’র বদলে ‘ত্‌থ’, ‘ক্‌ত’। তবে শেষ অবধি এই নিয়মগুলিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দরকার হবে।
বানান সংস্কারে অভিমুখ হওয়া দরকার ঐ ‘যেমন বলি, তেমন লিখি’। অর্থাৎ বর্ণমালাকে সাম্প্রতিক উচ্চারণের সঙ্গে তাল রেখে (সংস্কৃতের মতো) ধ্বনি অনুসারী বা ‘ফোনেটিক’ করে তোলা। পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদের আলোচনার প্রেক্ষিতে এবার কিছু সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে:
(১) ‘অ’ বর্ণ বা লুপ্ত অ-কার যেখানে ‘ও’ উচ্চারিত হয়, সেখানে ‘ও’ বা ‘ও’কার দেওয়া। যেখানে ‘অ’-কার বিলুপ্ত হয়, সেখানে হসন্ত দেওয়া।
(২) ঈ, ঊ’র বিলোপ, তার বদলে ই-উ। পশ্চিম বাংলা সাহিত্য একাডেমি এ ব্যাপারে বলছেন, তৎসম শব্দে ই-ঈ, উ-ঊ যেমন আছে রাখতে, কিন্তু অন্যান্য শব্দে মূলত ই আর উ লিখতে। এটা নীতি হিসেবে ভালো শোনায়, শুধু তাতে আনকোরা শিক্ষার্থীদের উপকার হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাদের তখন গুচ্ছের ই-ঈ, উ-ঊ বানানের বদলে কোনটা তৎসম শব্দ আর কোনটা নয়, সেটা মুখস্থ করতে হবে। কাজেই ও ল্যাটা চুকিয়ে দিলেই ভালো।
(৩) ‘ঋ’ বর্ণ ও ঋ-কারের বিলোপ, তার বদলে ‘রি’ বা র-ফলা হ্রস্ব-ই (যেমন ঋষি  রিষি, কৃতি  ক্রিতি)।
(৪) ‘অ্যা’কে একটা স্বরধ্বনি হিসাবে স্বীকার করে তার আলাদা চিহ্ন ও মাত্রার প্রবর্তন। যেখানে ‘এ’র উচ্চারণ ‘অ্যা’, সেখানে সেই বর্ণ বা মাত্রা দেওয়া। ইউনিকোডের জন্য নতুন স্পেস পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আমরা যদি ঈ, ঊ বিলোপ করি, একটার জায়গায় ‘অ্যা’ রেখে ফন্টগুলি বদলে নেওয়া যায়।
(৫) ‘ষ’র বিলোপ, তার বদলে শ। যেখানে উচ্চারণ sh, সেখানে শ আর যেখানে s, সেখানে স ব্যবহার করা। যেমন, সুস্রি, শেলাই।
(৬) অন্তস্থ য ও ব’র বিলোপ, বদলে বর্গীয় ব (একই চিহ্ন!) ও জ লেখা। মাত্রা হিসেবে অন্তস্থ ব-ফলা ও য-ফলার বিলোপ। যেখানে ওগুলো ব বা জ হিসেবে উচ্চারিত হয়, সেখানে সেভাবেই যুক্তাক্ষর লেখা। আর যেখানে এর ফলে দ্বিত্ব হচ্ছে, সেখানে আগের বর্ণের দ্বিত্ব হিসেবেই লেখা। যেমন কার্য  কার্জ, আদিত্য  আদিত্তো, সত্ত্ব  সত্তো।
(৭) ‘ণ’ ও ‘ঢ়’র বিলোপ, বদলে ন ও ড়। ‘ড়’ নিয়ে সময়ে সময়ে সমীক্ষা করে দেখা যেতে পারে, তা বিলোপ করার সময় এসেছে কিনা।

এগুলো একটা মোটামুটি ছক, দিকনির্দেশের জন্য। ঠিক এমনটাই করতে হবে, তা নয়। মোদ্দা কথা, আমাদের দেবনাগরী-ভিত্তিক লিপির সুবিধা ফিরিয়ে আনতে বাংলা বর্ণমালাকে ‘ফোনেটিক’ করতে হবে ও এই প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে চালু রাখতে হবে। এপার-ওপার বাংলার বিভিন্ন দায়িত্ববান সংস্থা ও পণ্ডিত ব্যক্তি সংস্কারের চেষ্টা করছেন। কিন্তু স্বাভাবিক কারণেই সেসব প্রক্রিয়া মন্থর হবে। ভাষার গতিশীলতার সাথে তাল রাখার একমাত্র উপায় মূল লক্ষ ঠিক রেখে ‘জনতা’র উদ্যোগ তাতে যুক্ত করা। একটা উপায়, বানান ও ব্যাকরণের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতার দাবি না করে একটু উদার হওয়া, একটা ‘সহনশীলতার সীমা’ রাখা। হোক না ভুল, মানে বোঝা গেলেই হল! কোথায় কাজ হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে না বুঝে মানুষ নিজেই নিজেকে সংশোধিত করবে। এভাবে ‘আসল’ ভাষার বারোটা বাজবে যাঁরা ভাবেন তাঁদের জনতা-সৃষ্ট এনসাইক্লোপিডিয়া ‘উইকিপিডিয়া’র নজির মনে রাখতে বলি।
সার্বিকভাবে আজ যেমন দরকার ভাষা, বানান ও লিপি সংস্কার, তেমন দরকার আধুনিকীকরণের জন্য বাংলাকে কম্পিউটার, নেট ও মোবাইলে নিয়ে আসার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত ও সহজ করা। এই চেষ্টাও চলছে, বিশেষত ওপার বাংলার সক্রিয়তায়। বানান সংস্কারের সাথে সাথে ভালো স্পেল চেকার, অনলাইন অভিধান, বাংলা উইকিপিডিয়ায় আরও অনেক এন্ট্রি, ইত্যাদি দায়িত্ব থেকে যায়। তবে সেসব গল্প আর একদিন।
যে যে বিষয় উত্থাপিত হল, তা নিয়ে আলোচনার সৃষ্টিই এ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। নির্দিষ্ট যেসব সমাধানসূত্র দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, সেটা নিয়ে আলোচনা করা যায়। এ নিয়ে বা আরও কিছু জানার থাকলে পাঠকরা ‘বম্বেডাক’ মারফত যোগাযোগ করতে চাইলে খুশি হব।

অলংকরণঃ অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়

ফেসবুক মন্তব্য