ফিরব কোথায়?

রিমি মুৎসুদ্দি



বৃষ্টি আসেনি কাল তবুও সোঁদাগন্ধ। আশেপাশে কোথাও দু’একপশলা হয়েছিল নিশ্চিত! মিঠে হাওয়া আর মাটির গন্ধে এমন মাদকতা যে সেই বিকেল থেকে সারাটা সন্ধ্যে একভাবে কেটে গেল। মাটির গন্ধে বুঁদ হয়ে থাকব এমন বিলাস এ পাথুরেশহরে কিঞ্চিৎ বাড়াবাড়ি হলেও ওই একটুকরো টবের মাটিই শেষমেশ ভরসা।

এর মধ্যেই ভিয়েতনাম যুদ্ধের সিনেমা সিরিজ থেকে ব্যাটেলফিল্ড দেখলাম। নাহ, যুদ্ধ পটভূমি হলেও যুদ্ধের কথা নেই তেমন। যুদ্ধের সঙ্গে জীবন জুড়ে যাওয়া আরেক যুদ্ধের আবেগও নয়। কোয়াং আর নু –এর গল্প। কোয়াং পালাতে চায় ব্যাটেলফিল্ড থেকে। পালিয়ে যে গ্রামের প্রান্তে এসে পড়ে সেখানে ছোট্ট মেয়ে নু। বাবাকে চিঠি লিখত। কোনও গ্রামেই পুরুষ নেই। সবাই যুদ্ধে যেতে বাধ্য হয়েছে। নু’র বাবা হাসিমুখে যুদ্ধে গেছে। অনাহারে দুর্বল কোয়াংকে কাঁকড়ার রস আর মিষ্টি আলু খাইয়ে সুস্থ করতে চায় নু। সেনাদের জন্য মেয়ের খুব গর্ব। একদিন যুদ্ধ জিতে বাবা ঘরে ফিরবেই। কোয়াং তার দুর্বলতা নু-এর সামনে প্রকাশ করতে পারে না। মিথ্যে করে বলে, একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে এখানে লুকিয়ে আছে। নু আর কোয়াং-এর মধ্যে একটা অসম বন্ধুত্ব ও নিজেদের মতো জগত গড়ে ওঠে।

একটা নৌকা বানিয়ে দিতে অনুরোধ করে সে আংকেল কোয়াং-কে। ভিয়েতনামী সেনার হাতে ধরা পড়লে কড়া শাস্তি। তবুও ভয়কে জয় করে ষ্টেশনে যায় কোয়াং, কাঠ আর লোহা দিয়ে ছোটো নৌকা বানিয়ে দিয়ে যাবে নু’কে। এরপর যুদ্ধের নিয়ম মেনে অথবা না মেনে অ্যামেরিকার বম্বিং সেই ছোট্ট নিরীহ গ্রামটিতে। বোমার আগুনের গনগনে আঁচে পুড়তে থাকে ধানক্ষেত, ছোট্ট ডোবা, খড়ের বাড়ি, গৃহপালিত শুয়োর, আর গেরস্থের ঘরে রসদ কুড়িয়ে পাওয়া কাঁকড়া। গ্রামে অবশিষ্ট পুরুষ বলতে জন দুয়েক বৃদ্ধ। কেউ উদভ্রান্তের মতো ছোটে, কেউ আগুন নেভাতে চেষ্টা করে। গ্রামের একমাত্র স্কুলে আটকা পড়েছে দুটো মেয়ে। কোয়াং ভীতু। যুদ্ধক্ষেত্রে মরতে ভয় পায়, তাই পালিয়ে এসেছিল কিন্তু সেই আগুনের ভেতর থেকে মেয়ে দুটোকে কোনক্রমে বার করে আনতে সক্ষম হয়। গ্রামবাসীর কাছে প্রিয় হয়েও শেষপর্যন্ত ধরা পড়ে যায় তার ব্যাটেলিয়ানের কাছে। আবারও পালাতে গিয়ে নু-র কাছেও ধরা পড়ে যায়। এতদিন মিথ্যে বলেছিল, সে আসলে দেশকে বাঁচাতে কোনও সিক্রেট মিশনে নয় বরং ব্যাটেলফিল্ড থেকে পালাতেই ওই গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছিল।

এরপর নু কোয়াং-এর দেখা যখন যুবতী নু শহরের এক ডান্সবারে কাজ করে। কিন্তু গল্প এমন মানসিক টানাপোড়নের মধ্যে দিয়ে খুব ধীর অথচ বলিষ্ঠভাবে এগোয়। আর প্রশ্ন রেখে যায়, সত্যিই কি নু কোয়াং-এর দেখা হয়েছিল? ঘরে ফিরে আসার সেই যে প্রবল ইচ্ছে কোয়াং-কে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল, তা যেন পরিণত বয়সেও একই রয়ে গেছে। তাহলে ঘর আসলে কী? আর কোথায়ই বা সেই ঘর? হোমল্যাণ্ড? পিট সিগারের গলায় Woody Guthrie-এর সেই গান মনে পড়ে ‘This land is your land this land is my land……. This land is made for you and me.’

হো চি মিন-এর পতাকা নিয়ে আনন্দে উচ্ছ্বল তরুণ তরুণীর মধ্যে দিয়ে বয়ে যায় নু-কোয়াং-এর একে অপরকে বিদায় দৃশ্য।

মনে পড়ছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ সিনেমার কথা। যেখানে চাকরি পেতে মরিয়া প্রোটাগনিস্ট যুবককে চাকরির ইন্টার্ভিউ বোর্ডে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে,

-সাম্প্রতিকতম সময়ে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ঘটনা কী?

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চাকুরিপ্রার্থীর উত্তর,

-ভিয়েতনাম যুদ্ধ

পরীক্ষকদের মুখভঙ্গি বদলে যায়-

-চাঁদে পা দেওয়া নয়? চন্দ্রাভিযানের সাফল্য নয়?

যুবকের উত্তর,

-না। চন্দ্রাভিযানের সাফল্য অভিপ্রেত কারণ অনেকদিন ধরেই এর প্রস্তুতি চলছিল। আর এক্ষেত্রে প্রযুক্তির জয় হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মানুষের জয় হয়েছে। যেভাবে গরীব চাষাভুষো মানুষ প্রতিরোধ করেছে বিশ্বের অন্যতম শক্তির বিরুদ্ধে, তাদের সেই আশ্চর্য প্রাণশক্তি আর প্রতিরোধের এই ক্ষমতা কিন্তু গোটা বিশ্বের কাছে প্রত্যাশিত ছিল না।

এর পরের প্রশ্ন-
-Are you a communist?

-I don’t think in order to admire Vietnam War, one has to be a communist.



মনে পড়ল গত ২০ শে জুলাই চন্দ্রাভিযানের একান্ন বছর পার হল। তবুও কতটা বদল হয়েছে না পিছনে ফিরে হাঁটছে সে প্রশ্নের সহজ উত্তরে না গিয়ে বাতাসের চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়ানো দূষণের কথা ভাবতে ভাবতে এরেকা পামগুলোর কচি সবুজ পাতাগুলোর দিকে একবার তাকালাম। এরেকা নাকি বাতাসের সব দূষণ গিলে নিতে পারে! আর আমাদের বাস্তব পরাবাস্তব যাবতীয় সত্যি মিথ্যে প্রতিদিন একটু একটু করে সেঁধিয়ে যাচ্ছে ছায়াপৃথিবীর বিরাট গহ্বরে।

অন্ধকার গাঢ় হলে প্রশ্ন জাগে কখনও যদি ফিরতে চাই? ফিরব কোথায়? কোন ঘরে? কোন দেশে? কোন ভাষায়?

ছবিঃ পার্থ প্রতিম চট্টোপাধ্যায়

ফেসবুক মন্তব্য