প্রসঙ্গ কোভিড-১৯

অনিরুদ্ধ সেন

কোভিড-১৯ বা প্রচলিত ভাষায় ‘করোনা’ ভাইরাস রোগকে আজ পরিচয় করিয়ে দেবার দরকার নেই। এই নিবন্ধে কিছু তথ্য ও বিশ্লেষণ সহকারে তার কয়েকটি দিককে একটু সঙ্ঘবদ্ধভাবে উপস্থাপিত করার চেষ্টা হচ্ছে এই আশায় যে সেটা কারও কিছুটা হলেও উপকারে লাগতে পারে। লেখক ডাক্তার বা জীবাণুবিদ নয়, একজন সাধারণ, সচেতন নাগরিক। তথ্যগুলি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে আহরিত, কিন্তু মত ও বিশ্লেষণ লেখকের নিজস্ব। এগুলো স্রেফ কিছু চিন্তার দিশাসূচক। তার কতটা গ্রহণীয়, কতটা বর্জনীয়, পাঠকদেরই বিবেচ্য।

(১) বিশ্বে করোনা প্রসার সংক্রান্ত কিছু সংখ্যাতত্ত্ব:

সম্ভবত ২০১৯র ডিসেম্বরে চিনের উহান অঞ্চলে প্রথম কোভিড-১৯ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। জানুয়ারির মাঝামাঝি ব্যাপারের গুরুত্ব বুঝে চিনা কর্তৃপক্ষ উহান ও সংলগ্ন এলাকায় কঠোর লক ডাউন চালু করে, যা আড়াই মাস স্থায়ী হয়। ইতিমধ্যে চিনের নিকটবর্তী পূর্ব এশিয়ার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান প্রভৃতি কিছু দেশেও এই রোগ ছড়ায়, যদিও তার বাড়বাড়ন্ত হয়নি। তারপর কোভিড-১৯এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ইরানে। প্রায় সাথে সাথেই ইটালির হাত ধরে রোগটি য়ুরোপে ঢোকে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে রোগটি ইটালিতে হু-হু করে বাড়ার সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়ে সংলগ্ন ফ্রান্স ও স্পেনে, তারপর ইউ-কে সহ পশ্চিম য়ুরোপের ব্যাপক অঞ্চলে। আমেরিকায় প্রথম কোভিড-১৯এ মৃত্যু হয় ফেব্রুয়ারির শেষে, সিয়েটেলে। আরও মাসখানেক লাগে আমেরিকার ব্যাপক অঞ্চলে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব হতে। এই পর্যায়ে কোভিড ‘হট বেড’ ছিল নিউ ইয়র্ক। কিছুদিনের মধ্যে চিনে কোভিড নিয়ন্ত্রণে আসার পর বিশ্বে করোনার মূলকেন্দ্র চিন ও পূর্ব এশিয়ার বদলে হয়ে দাঁড়ায় য়ুরোপ-আমেরিকা। এই সময় অবধি দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও ওশিয়ানিয়ায় কোভিড ছড়ালেও ছিল তুলনায় অনেক কম। এশিয়াতেও তখন অবধি কোভিডে মৃত্যুর বেশিটাই ছিল চিন ও ইরানে। তবে রোগটি কুমেরু ছাড়া সব মহাদেশেই কমবেশি ছড়িয়ে পড়ায় ‘হু’ (WHO) মার্চের মাঝামাঝিই তাকে ‘প্যানডেমিক’ বা অতিমারী আখ্যা দেয়। ভারত সহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে এই রোগের মোকাবিলায় অন্যান্য ব্যবস্থার সাথে বিভিন্ন কঠোরতায় ‘লক ডাউন’ লাগু হয়। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত করা হয়। ফলে অনেক দেশেই অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়, রোগাক্রান্ত মানুষদের সাথে যুক্ত হয় অজস্র কর্মহীন মানুষ। এভাবে কোভিড-১৯ অতিমারী বিশ্বে এক অভূতপূর্ব বিপর্যয় ডেকে আনে।
মে’র কিছুদিন অবধি করোনা মূলত য়ুরোপ-আমেরিকায় দাপট চালাবার পর একটা পরিবর্তন আসে। পশ্চিম য়ুরোপে রোগটি ধীরে ধীরে কমে আসে। আমেরিকাতেও রোগটি কমার লক্ষণ দেখা দেয়, বিশেষত নিউ ইয়র্ক অঞ্চলে। দক্ষিণ আমেরিকায় করোনা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, বিশেষত ব্রাজিলে। আবার আধা-এশিয় দেশ রাশিয়া, আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ আফ্রিকা সাধারণতন্ত্র ও এশিয়ার ভারত সহ আরও কিছু দেশে এর প্রাদুর্ভাব বাড়ে। পরে মূলত দক্ষিণ আমেরিকায় দেখা দেয় ‘সেকেন্ড ওয়েভ’। সব মিলিয়ে, আমেরিকা করোনা মৃত্যুতে বিশ্বের অন্যান্য দেশকে অনেক ছাড়িয়ে গেছে। মেক্সিকোও ইতিমধ্যে করোনা অক্রান্তদের প্রথম সারিতে চলে এসেছে। এই মুহূর্তে দৈনিক মৃত্যু সংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীতে এগিয়ে আমেরিকা, ব্রাজিল, মেক্সিকো ও ভারত। সংক্ষেপে, প্রথম পর্যায়ে করোনার মূলকেন্দ্র ছিল চিন ও পূর্ব এশিয়া। পরে তা উন্নত বিশ্ব য়ুরোপ ও আমেরিকায় স্থানান্তরিত হয়। কালক্রমে, এখন করোনা উন্নত বিশ্বে দুর্বল হচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশগুলিতে শক্তিশালী হচ্ছে।
কতগুলো তথ্য দিয়ে ব্যাপারটা দেখানোর চেষ্টা করা যাক। আমি এই তথ্যাদি সংগ্রহ করতে শুরু করি এপ্রিলের শেষ থেকে। সুতরাং তার আগের ‘প্রথম পর্যায়’এর কোনও তথ্য এখানে নেই। তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের ফারাক থাকে। করোনা সংক্রমিতের সংখ্যা কত টেস্ট করা হল তার ওপর নির্ভরশীল। করোনার প্রকৃতিও এমন যে অসংখ্য সংক্রমিত মানুষের কোনও রোগলক্ষণ থাকে না, সাধারণভাবে তাদের বড় অংশই পরীক্ষার বাইরে থেকে যায়। তাই আক্রান্তের সরকারি হিসেবের সাথে আসল হিসেবের বিরাট ফারাক হয়। অন্যদিকে, অতিমারীর প্রবল অবস্থায় এমনকি অনেক উন্নত দেশেও সব মৃত্যুর হিসেব থাকে না। আবার অনেক গুরুতর অসুস্থ মানুষ মারা গেলে তার শরীরে করোনা পাওয়া গেলেই সেটা তার মৃত্যুর আসল কারণ নাও হতে পারে। সব মিলিয়ে, মৃতের সংখ্যায়ও গরমিল হয়। বিভিন্ন মহামারী বিশেষজ্ঞের সমীক্ষা বলে যে করোনায় আসল মৃতের সংখ্যা সরকারি হিসেবের মোটামুটি দেড়গুণ, কিন্তু সংক্রমিতের আসল সংখ্যা সরকারি হিসেবের প্রায় দশগুণ। তাই রোগের তীব্রতা বোঝাতে আমি প্রাথমিকভাবে ব্যবহার করেছি অপেক্ষাকৃত নির্ভরযোগ্য মৃতের সংখ্যাকে। এছাড়া এটা মনে করা যায় যে ভবিষ্যতে করোনা ক্রমে তার মারণক্ষমতা হারাবে। তখন সংক্রমিতের সংখ্যার গুরুত্ব থাকবে না। কিন্তু মৃতের সংখ্যা আশা করা যায় কমবে আর সেটাই হবে মহামারী কমাবাড়ার প্রকৃত ‘সূচক’।
১ম তালিকা চারটি নির্দিষ্ট তারিখে পৃথিবীর তিনটি উল্লেখযোগ্য দেশে (যেখানে অনেক ভারতীয় রয়েছেন) ও প্রত্যেক মহাদেশে করোনায় গড় দৈনিক মৃত্যুর হিসেব দেখিয়েছে। এই হিসেব করতে ঐ তারিখের ৫ দিন আগে থেকে ৫ দিন পরে অবধি প্রতিদিনের মৃত্যুর গড় নেওয়া হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, য়ুরোপ ও ইউ-কে’তে মৃত্যু ক্রমে কমেছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও বিশেষভাবে দক্ষিণ আমেরিকায় তা বেড়েছে। ইউ-এস-এ ও উত্তর আমেরিকায় তা কমে আবার বাড়ছে। ওশিয়ানিয়ায় তা বাড়লেও নগণ্য। সব মিলিয়ে পৃথিবীতেও গড় দৈনিক মৃত্যু কমে আবার জুলাইয়ের ‘সেকেন্ড ওয়েভ’এ বাড়ছে।




১ম তালিকা: সময়ের সাথে বিভিন্ন অঞ্চলে কোভিড-১৯এ গড় দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা

২য় তালিকায় পৃথিবীর অধিক সংক্রমিত বেশ কয়েকটি দেশে ও প্রত্যেক মহাদেশে ব্যাধির প্রসারের কিছু সূচক তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অধিকাংশ টার্মের মানেই সহজাত। আর মৃত্যুহার হচ্ছে সংক্রমিতের কত শতাংশের মৃত্যু হচ্ছে। এটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে ভাইরাসের প্রাবল্য বা চিকিৎসার অব্যবস্থা দুই কারণেই বেশি হতে পারে। আর সুস্থতার হার হচ্ছে সংক্রমিতের কত শতাংশ কোভিডমুক্ত হয়েছে। বাকিদের অধিকাংশই চিকিৎসাধীন এবং তাদের অনেকেই সুস্থ হয়ে যাবে, কিন্তু এই মুহূর্তে কোভিড নেগেটিভ হয়নি। কোনও এলাকায় সুস্থতার হার সংক্রমণের প্রথম স্তরে কম থাকে, পরে উপযুক্ত চিকিৎসাব্যবস্থা থাকলে তা বাড়তে থাকে। যদি প্রতিদিন সুস্থ মানুষের সংখ্যা নতুন করে অসুস্থ মানুষের সংখ্যার কম হয়, তার অর্থ চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ এবার কমছে।



২য় তালিকা: ২৭শে জুলাই, ২০২০তে কিছু দেশ ও মহাদেশগুলিতে আক্রান্ত, মৃত ও সুস্থর সংখ্যাতত্ত্ব

উপরোক্ত সংখ্যাতত্ত্ব থেকে এক বিচিত্র তথ্য সামনে আসে: উন্নত মহাদেশ য়ুরোপ ও উত্তর আমেরিকায় মৃত্যুহার সাধারণভাবে উন্নয়নশীল এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার চেয়ে বেশি – যদিও প্রথমোক্ত অঞ্চলগুলিতে চিকিৎসাব্যবস্থা অনেক উন্নত। কারণটি বিবেচনাসাপেক্ষ। আপাতত মনে হচ্ছে: (১) য়ুরোপ-উত্তর আমেরিকায় রোগটি ছড়ায় আগে অর্থাৎ মার্চ-এপ্রিলে। তখনও এই ‘নতুন’ রোগ ও তার সম্ভাব্য চিকিৎসার ব্যাপারে জ্ঞান অনেক কম ছিল। (২) উন্নত দেশের জীবাণুমুক্ত পরিবেশের ফলে সেখানকার মানুষের জীবাণুর বিরুদ্ধে সহজাত প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, যেটা অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলির মানুষের রয়েছে।

(২) করোনার বিপদ:

একভাবে দেখলে, করোনা অনেক তুল্য ব্যাধির চেয়ে কম মারাত্মক। করোনায় বিশ্বজোড়া মৃত্যুহার কমতে কমতে এখন ৪%এ ঠেকেছে। আর যেহেতু অজস্র লক্ষণহীন রোগী ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন, তাই নানা সমীক্ষার পর অনুমান করা হয় আসল মৃত্যুহার আনুমানিক হারের এক-দশমাংশ, এক্ষেত্রে ০.৪%। ভারতে এই হার আরও কম আর ক্রমে কমছে।
এই মৃত্যুহার সাধারণ ফ্লু-র মৃত্যুহারের (০.১%) চেয়ে এখনও বেশি, কিন্ত সোয়াইন ফ্লু (১-১০%), এবোলা (২২-৫০%), যক্ষ্মা (১০-১৬%) প্রভৃতির মৃত্যুহারের চেয়ে অনেক কম। অধিকাংশ কোভিড-১৯এ আক্রান্তই পরীক্ষা না হলে সংক্রমণের কথা জানতে পারেন না। বাকিদের এক বড় অংশই সর্দিজ্বর, ফ্লুর স্বাভাবিক চিকিৎসায় বা নিজে থেকেই সুস্থ হয়ে যান। সমস্যা শুধু সংক্রমিতদের মোটামুটি ৫-১০% ‘সিরিয়াস’ রোগীদের নিয়ে।
রোগের বিপদের আর একটি সূচক সংক্রমণশীলতা R0. এটি দেখায় একজন রোগী গড়ে ক’জনকে সংক্রমিত করতে পারে। এটা শুধু রোগের ওপর নয়, সামাজিক পরিস্থিতি, জনঘনত্ব ও মহামারীর বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থাদির ওপর নির্ভর করে। কোভিড-১৯এর R0 মোটামুটি ১.৫ থেকে ৩.৫ এর মধ্যে, শোনা যায় ভারতে এটি এখন ১.২। তুলনায় গড়ে সোয়াইন ফ্লুর R0 ১.৫, যক্ষ্ণার R0 ২ আর এবোলার ২। অর্থাৎ, কোভিড-১৯ কিছুটা বেশি ছোঁয়াচে, বাড়াবাড়ি বেশি নয়। তবে কম প্রাণঘাতী বায়ুবাহিত রোগ হাম, চিকেন পক্স বা রুবেলার R0 অনেক বেশি।

তাহলে কোভিড-১৯এর ভয়াবহতা কী, যার জেরে বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে গেল – যা এবোলা, সোয়াইন ফ্লু বা যক্ষ্ণায় হয়নি? ভবিষ্যতে যখন এর ময়না তদন্ত হবে, একটা কারণ বেরিয়ে আসবে – পালাক্রমে কখনও করোনাকে ‘ওভারহাইপ’ করা ও তজ্জনিত আতঙ্ক আবার কখনও তার বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় রোগটিকে অতিরিক্ত উপেক্ষা করা ও তজ্জনিত ক্ষয়ক্ষতি এই আর্থ-সামাজিক বিপর্যয়ের জন্য অনেকটাই দায়ী। কিন্তু সেসব বিষয়ীগত (subjective) কারণ ছেড়ে যেসব বস্তুগত (objective) কারণ পড়ে থাকে তা হচ্ছে: প্রথমত কোভিড-১৯ এক ব্যতিক্রমী রোগ, যেখানে রোগলক্ষণহীন আক্রান্তরাও রোগ ছড়াতে পারে। ফলে রোগলক্ষণ দেখে ‘বিপজ্জনক’ কোভিড-১৯ রোগীকে বিচ্ছিন্ন বা ‘আইসোলেট’ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর দ্বিতীয়ত, কোভিড-১৯ একটি ‘নভেল’ বা ‘অভিনব’ রোগ। আমাদের শরীর এখনও একে চেনে না। আমাদের চিকিৎসাশাস্ত্রও প্রতিনিয়ত এই রোগের আঁকাবাঁকা গতিপথের হেঁয়ালি বুঝতে হিমসিম খাচ্ছেন। আমেরিকান জীবাণুবিদ ড: ফাউচি যেমন বলেছেন – এই রোগের হেঁয়ালি এই যে একই ভাইরাস কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির শরীরে একেবারে আলাদা আলাদা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে?
এই দুয়ে মিলে একদিকে কোভিড-১৯ সংক্রমণ রোখার কাজটা খুব জটিল হয়ে উঠেছে। আবার মাত্র ৫-১০% সিরিয়াস পেশেন্টদের অধিকাংশকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলার পথে নিত্য নতুন সমস্যা দেখা যাচ্ছে। এমন সব প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে যা আগে দেখা যায়নি। হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে কোনও আক্রান্তের মৃত্যুও হচ্ছে।

(৩) চিকিৎসা, প্রতিষেধক:

ওষুধ: অধিকাংশ ভাইরাল ব্যাধিরই সুষ্ঠু ওষুধ নেই। কোনও ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন আছে, কোনও ক্ষেত্রে নানা কারণে কার্যকর ভ্যাকসিনও বানানো যায়নি। অনেক ভাইরাল রোগেই তাই চিকিৎসা মানে উপসর্গ লাঘব করে ভাইরাসের চক্র নিজে থেকেই শেষ হওয়া অবধি রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।
কোভিড-১৯এর ক্ষেত্রেও আপাতত ব্যাপারটা মোটামুটি তাই। নানা চিকিৎসা তার উপসর্গ কমাবার চেষ্টা করে। কোনওটা চেষ্টা করে ভাইরাস আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর দ্রব্যের অতিনিস্ক্রমণ বন্ধ করতে। আবার নির্দিষ্টভাবে কোভিড-১৯ ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনও ওষুধ না থাকলেও কিছু সাধারণ অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ ব্যবহার করা হয় ‘ভাইরাল লোড’ কমাবার আশায়।
শেষোক্তদের মধ্যে আছে এবোলার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত Remdesevir ইঞ্জেকশন, যা এখন ভারতে চিকিৎসার জন্য স্বীকৃত। ফ্লুতে ব্যবহৃত Favipiravir ট্যাবলেট রাশিয়ায় সাফল্যের পর এখন সারা বিশ্বেই স্বীকৃত ওষুধের একটি। ম্যালেরিয়ার ওষুধ Hydroxychloroquine অ্যাকিউট নিউমোনিয়াতেও ব্যবহার হয়। অ্যান্টি-বায়োটিক Azithromycinএর সঙ্গে এর ব্যবহারের চেষ্টা প্রাথমিক সুফল না পাওয়ায় এখন আর তত জনপ্রিয় নয়। তেমনই করোনার কিছুটা সমতুল্য আর-এন-এ ভাইরাস এইচ-আই-ভি’র ওষুধ Lopinavir ও Ritonavir ব্যবহার ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হচ্ছে।
কোভিড-১৯ যদি ফুসফুসকে আক্রমণ করে, তবে ভাইরাস ধ্বংস করতে শরীরের অ্যান্টিবডি Cytokyne রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে। ভাইরাসের সংখ্যা অত্যধিক হলে শরীর বেপরোয়া চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে Cytokyne তৈরি করে, যা অত্যাবশ্যক অঙ্গগুলিকে আক্রমণ করে ‘মাল্টি-অর্গান ফেইলিওর’ ঘটায়। এই পর্যায়ে ইমিউন সিস্টেমকে দমন করার জন্য কিছু কর্টিকোস্টেরয়ড ব্যবহারে সুফল পাওয়া গেছে বলা হয়। তার মধ্যে Dexamethasoneএর ব্যবহার ধীরে ধীরে স্বীকৃতি পাচ্ছে। টেক্সাসের এক চিকিৎসকের দাবি, হাঁপানিতে ব্যবহৃত স্টেরয়ড Budesonide স্প্রে ব্যবহার করে তিনি কোভিড-১৯ রোগীদের ১০০% সারিয়ে তুলছেন। কিন্তু অন্য চিকিৎসকরা স্বীকার করেন না এই দাবির সপক্ষে যথেষ্ঠ তথ্য আছে। তাছাড়া, কোন করোনা রোগীর ওপর স্টেরয়ড প্রয়োগ হবে, হলে কখন, কী ডোজে, এটা খুব যত্ন নিয়ে ঠিক করা দরকার। প্রয়োজনের আগে বা ফুসফুস আক্রান্ত না হলে স্টেরয়ড ব্যবহার শরীরের ইমিউনিটি কমিয়ে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষমতাই শেষ করে দেবে। বাংলাদেশের ডাক্তাররা দাবি করেন, Ivermectin নামে সস্তা কৃমির ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক Doxycycline এর সাথে ব্যবহার করে তাঁরা সুফল পেয়েছেন। আমেরিকা, ভারত সহ বিভিন্ন দেশে এই ওষুধের প্রয়োগ নিয়ে বিচার বিবেচনা চলছে।
করোনা ভাইরাস ফুসফুস আক্রমণ করলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা খুব কমে যায়। একে বলে ‘হাইপক্সিয়া’। এমন হলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মস্তিস্ক অক্ষত রাখতে রোগীকে বাইরের থেকে অক্সিজেন দিতে হয়। এটা দেওয়া যায় প্রথমে সিলিন্ডার থেকে, তাতে না হলে হাতে পাম্প করে (অ্যাম্বু ব্যাগ) বা যন্ত্রে পাম্প করে। কিন্তু এক্ষেত্রে অক্সিজেনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ ম্যানুয়ালি করতে হয়। যিনি অক্সিজেন দিচ্ছেন সেই স্বাস্থ্যকর্মী অভিজ্ঞ না হলে চাপের তারতম্য হয়ে হিতে বিপরীত হতে পারে। আর শেষ পর্যায়ে ভেন্টিলেটর, যা স্বতঃনিয়ন্ত্রিত। কিন্তু তা খরচসাপেক্ষ আর মহামারীর সময় তার জোগানও চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
কোনও রোগীর রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে থাকলে দেহে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে শ্বাসকষ্ট হয়ে জানান দেয়। কিন্তু করোনা প্রায়ই ফুসফুসের কার্বন ডাই-অক্সাইড নিস্ক্রামক অংশ অক্ষত রেখে অক্সিজেন শোষক অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে অক্সিজেন বিপজ্জনকভাবে কমলেও কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে শ্বাসকষ্ট হয় না, রোগী আনন্দে থাকে। তারপর সে হঠাৎ ধপ করে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায় ও প্রায়ই মারা যায়। একে বলে ‘হ্যাপি হাইপক্সিয়া’। এটা এড়াবার জন্য এখন সহজলভ্য যন্ত্র ‘পালস অক্সিমিটার’ প্রতি হাউসিং সোসাইটি বা পরিবারেও রাখার কথা বলা হচ্ছে। সন্দেহ হলে কেউ আঙুলে এই যন্ত্র লাগিয়ে আধ মিনিটেই নিজের অক্সিজেন স্যাচুরেশন জানতে পারেন। তা ৯৫%এর নিচে নামলে বিপদসঙ্কেত, ৯০%এর নিচে নামলে ডাক্তার-হাসপাতাল দরকার। বিভিন্ন মিউনিসিপালিটি বা হাউসিং সোসাইটি এখন এই যন্ত্র ও থার্মাল গান ব্যবহার করছেন রুটিন স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য।
অনেক রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া সত্ত্বেও তাদের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ে না। সাম্প্রতিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, এর কারণ ফুসফুসের ঝিল্লিতে রক্তের সূক্ষ্ণ ‘মাইক্রো-ক্লট’ তৈরি হওয়া। এই ক্লটগুলো সহজেই দূর করা যায় ‘ব্লাড থিনারের’ সাহায্যে। অ্যাসপিরিন বা হেপারিন ব্যবহার করে এমন অবস্থায় ভালো ফল মিলেছে।
হাইপক্সিয়ার রোগীকে চিৎ বা কাতের বদলে উপুড় করে শোয়ালেও তার ফুসফুসের ওপর চাপ কমে কিছুটা রিলিফ হয়।
ইদানীং সেরে ওঠা করোনা রোগীর রক্তের প্লাজমা অসুস্থ রোগীকে দিয়ে ‘প্লাজমা থেরাপি’র ব্যবহারে সুফল মিলেছে। এরজন্য সেরে ওঠা করোনা রোগীদের প্লাজমার ‘ব্যাঙ্ক’ও তৈরি করা হচ্ছে। তবে এই থেরাপিতে প্রবল পার্শ্বক্রিয়াও হতে পারে। তাই গুরুতর অসুস্থদেরই প্লাজমা দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে, করোনার কোনও অব্যর্থ ওষুধ নেই। কিন্তু উপযুক্ত সময় অভিজ্ঞ চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীরা উপযুক্ত ওষুধ দিয়ে ও ব্যবস্থা নিয়ে মৃত্যু অনেক কমাতে পারেন। এভাবে আই-সি-ইউ, ভেন্টিলেটরের ওপর চাপও কমানো যায়।
ভ্যাকসিন: করোনার প্রাদুর্ভাবের সময় থেকেই পাগলের মতো ভ্যাকসিনের চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে এতটা ‘হাইপ’ হয়েছে যে গোটা বিশ্বের মানুষ তাকিয়ে আছে কখন ভ্যাকসিন বেরোবে আর তারা একদিকে এই মৃত্যুর আতঙ্ক, অন্যদিকে বিধিনিষেধের জাল থেকে মুক্তি পাবে। লন্ডনের কেম্ব্রিজ ‘কো-ভ্যাকসিন’এর ২য় পর্যায়ের ট্রায়াল সফল হবার পর এই ‘হাইপ’ আকাশছোঁয়া হয়েছে। কয়েক বছর পর হয়তো এই ভ্যাকসিন (বা ভারত, আমেরিকা, রাশিয়া বা চিনের অন্য কোনও ভ্যাকসিন) কোভিড-১৯কে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলবে। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে নানা সমস্যার জাল কেটে ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে এই ভ্যাকসিন সম্ভবত কোভিড যুদ্ধে আংশিক মদত অবধিই দেবে। তবে অন্যান্য গৃহীত ব্যবস্থা ও রোগের বিবর্তনের সাথে যুক্ত হয়ে সেটুকু মদতই নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।
অতীতে নানা ভাইরাসের ভ্যাকসিন বেরোতে অনেক সময় নিয়েছে। কখনও শতাব্দী, কখনও কয়েক দশক, নিদেনপক্ষে চার বছর। তারমধ্যে আর-এন-এ ভাইরাসের খুব সফল ভ্যাকসিন এখনও বেরোয়নি। সেই কাজটা প্রথমবার কয়েকমাসের মধ্যে উতরে যাবে, এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া মুস্কিল। সন্দেহ নেই, এই ভ্যাকসিনের পেছনে পৃথিবীর সেরা মগজগুলি লড়ছে, অর্থ বিনিয়োগও অঢেল। কিন্তু পরীক্ষানিরীক্ষা করতে, ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি বুঝতেও ন্যূনতম সময় দরকার।
ওষুধ অসুস্থদের দেওয়া হয়। পরীক্ষাধীন ওষুধ প্রায়ই দেওয়া হয় যেসব মানুষ চিকিৎসার বাইরে, তাদের। পার্শ্বক্রিয়া তাই এখানে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভ্যাকসিন দেওয়া হয় সুস্থ মানুষদের। করোনায় মৃত্যুহার এবোলা, পক্স প্রভৃতির তুলনায় অনেক কম। তাই এর ভ্যাকসিনে সামান্য শতাংশ মানুষও যাতে বিপন্ন না হয় সেটা দেখা দরকার। তাড়াহুড়োয় বা ভ্যাকসিন ব্যবসায় অনেক বিনিয়োগ হয়ে গেছে দেখে তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালে (যখন সব বয়সের, সব ধরণের রোগীকে পরীক্ষা করা হবে) কিছু সন্দেহজনক পাওয়া গেলে সেটা উপেক্ষা করা তাই অনৈতিক কাজ হবে।
তারপর এই ভ্যাকসিন ভাইরাসের ক্রমান্বয় বিবর্তনের সঙ্গে তাল রেখে কতদিন কার্যকর থাকবে, সেটাও এখনই বোঝা যাবে না। কোভিড অ্যান্টিবডি কতদিন কার্যকর থাকে তাও এখনও অজানা। তবে লন্ডন কো-ভ্যাক শুধু অ্যান্টিবডি তৈরি করবে না, টি-সেলকে সক্রিয় করে এই ভাইরাসকে ‘মনে রাখতে’ও সাহায্য করবে। অ্যান্টিবডি কালক্রমে মুছে যাবার পর যদি সংক্রমণ হয়, তবে টি-সেল সেই ভাইরাসকে চিনে নতুন অ্যান্টিবডি তৈরির নির্দেশ দেবে।
ধরা যাক সব সামলে ট্রায়াল ভালোয় ভালোয় উতরালো। তবুও বিশ্বের ৭৮০ কোটি (বা ভারতের ১৩৫ কোটি) মানুষের জন্য ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করতে অনেক বছর ঘুরে যাবে। ততদিনে নিয়মিত ব্যবধানে কিছু বাছা বাছা লোক এই সুযোগ পাবেন। সম্ভবত বয়স্ক, অসুস্থ (কো-মর্বিড), স্বাস্থ্যকর্মী, ডাক্তার, পুলিশ প্রভৃতি অগ্রাধিকার পাবেন। যদি এটুকুও হয়, তবে ইতিমধ্যে সংক্রমিত ও লক্ষণহীন সংক্রমিতদের সাথে যুক্ত হয়ে তা বিভিন্ন দেশে ‘হার্ড (herd) ইমিউনিটি গড়তে সাহায্য করবে ও মৃত্যুহার যৎসামান্য করে তুলবে।
তবে তা জাতি যদি সুশৃঙ্খল হয় তবেই। আর সেখানে যদি দালাল, কালোবাজারিরা ভ্যাকসিন নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে নেয় তবে সে আশাও চৌপাট।

(৪) প্রশাসনিক-সামাজিক ব্যবস্থা:

করোনার কোনও পরিচ্ছন্ন ওষুধ বা ভ্যাকসিন এক্ষুণি নেই। করোনা খুব ছোঁয়াচেও বটে। আর এটার সংক্রামক মশামাছি, ইঁদুর নয়, মানুষ। তাই মানুষ থেকে মানুষে এই ছোঁয়াচ বাঁচাবার জন্য প্রশাসনিক-সামাজিক ব্যবস্থা গ্রহণ অন্তত অদূর ভবিষ্যতে অপরিহার্য।
সমস্যা এই যে মশামাছি, ইঁদুর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা যায়। কিন্তু সামাজিক মানুষ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে কীভাবে? লক্ষণহীন সংক্রমণের সংখ্যা প্রচুর, তাই আমি বলতে পারি না কার থেকে দূরে থাকব, কার থেকে নয়। তাই আদর্শ হচ্ছে প্রত্যেক মানুষ অপরের থেকে আলাদা থাকবে, যাকে ‘সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং’ বলা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যক্রমে, এটাকে চরম পর্যায়ে নেওয়া যায় না। কারণ, বাঁচতে হলে সামাজিক, মানবিক, অর্থনৈতিক ব্যাপারগুলোকেও পুরো জলাঞ্জলি দেওয়া যায় না। তাই সবদিকে ভারসাম্য রেখে একটা চলার পথ বের করতে হয়।

এ ব্যাপারে বিভিন্ন দেশ নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলির এক বা একাধিক অবলম্বন করেছে:
(ক) লক ডাউন। এটাই সবচেয়ে ব্যাপকভাবে গৃহীত পথ। প্রায়ই বলা হয়, লক ডাউন ভাইরাস শৃঙ্খল ভাঙে। এটা একটা ‘মিথ’। মানুষ যতক্ষণ তালাবন্দি হয়ে শরীর-মনে দুর্বল হয়, ভাইরাস ধৈর্য ধরে বাইরে অপেক্ষা করে। কারণ, সব মানুষ ঘরে থাকতে পারে না। অত্যাবশ্যক পরিষেবা যারা দেয় (ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, বিদ্যুত-জল-টেলিফোন-ইন্ টারনেট কর্মী, খাদ্য উৎপাদন-পরিবহন-বণ্টন ব্যবস্থার কর্মী প্রভৃতি), ভাইরাস তাদের আশ্রয় করেই টিঁকে থাকবে আর আপনি কবে বাইরে বেরোবেন তার অপেক্ষায় থাকবে। ইতিমধ্যে ভাইরাস ঘরে ঢুকে থাকলে তো কথাই নেই। বদ্ধ পরিবেশে সে মুক্ত পরিবেশের চেয়ে দ্রুত ছড়াবে।
লক ডাউন শুধু একটু সময় দেয়। এই সময়ে আচমকা মহামারীর ধাক্কায় বিপর্যস্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে একটু গুছিয়ে নেওয়া যায়। অথবা উপদ্রুত অঞ্চলে গিয়ে সার্ভে ও পরীক্ষানিরীক্ষা করে রোগীদের আলাদা করা যায়। এসব কিছু না করে বসে থাকলে লক ডাউন উপকারের বদলে সর্বনাশ করে।
আর লক ডাউনের মূল বিপদ, উৎপাদন বিপর্যস্ত হওয়া। দীর্ঘদিন উৎপাদন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করে রাখলে সমাজ ভেঙে পড়বে। সরকারেরও রাজস্ব আদায় হবে না। ফলে এমনকি মহামারীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর অর্থেরও ঘাটতি হবে। তাছাড়া, দীর্ঘ লক ডাউনে মানুষ শারীরিক-মানসিকভাবেও ভেঙে পড়ে। বিশেষত ছোটদের ওপর এর মানসিক প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী।
অদ্যাবধি অধিকাংশ দেশই কমবেশি লক ডাউন করেছে। সবচেয়ে কঠোর লক ডাউন করেছে ভারত, তার তুল্য লক ডাউন সম্ভবত একমাত্র চিন করেছিল। আর রোগ সংক্রমণের চূড়ায় বিভিন্ন য়ুরোপীয় দেশ ও আমেরিকাও কিছু সময়ের জন্য বেশ কঠোর লক ডাউন আরোপ করেছে। দীর্ঘস্থায়ী, কঠোর লক ডাউন সেই দেশের হাতে বিশেষ বিকল্প রাখে না, একটা সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি অনুকূল না হলেও অর্থনীতি খুলে দিতে হয়। তাহলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু রোগে ক্ষয়ক্ষতি কমে না।
(খ) কন্টাক্ট ট্রেসিং, টেস্ট ও আইসোলেশন: রোগ ছড়ানো বন্ধ করার অন্যতম উপায় হচ্ছে, সংক্রমিতরা অন্যদের যথেষ্ট সংক্রমিত করার আগেই তাদের চিহ্নিত করে আলাদা করা। যখন কোনও এলাকায় সংক্রমণ সীমিত বা কোনও অঞ্চল/গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ, তখন সেইসব ‘কন্টাক্ট’দের থেকে শুরু করে তারা যাদের সঙ্গে মেলামেশা করেছে তাদের পরীক্ষা করে যারা সংক্রমিত তাদের আলাদা করে হাসপাতালে বা ‘কোয়ারান্টাইনে’ রাখা আর অন্যদের নজরে রাখা একটি প্রচলিত পদ্ধতি। ‘রিসোর্সের’ সীমাবদ্ধতা এই কাজের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেয়। যত স্বাস্থ্যকর্মী, টেস্ট কিট ও কোয়ারেন্টাইনের জায়গা, টেস্ট-আইসোলেশনও ততটুকুই করা যায়।
করোনা টেস্ট দু’রকম: নাকের সোয়াব নিয়ে অ্যান্টিজেন টেস্ট, যা রোগীদেহে কোভিড-১৯ ভাইরাসের জেনেটিক পদার্থ আছে কিনা দেখে। এর মধ্যে RT-PCR টেস্টই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দেখে সাধারণত করা হয়। কিন্তু তাতে সময় লাগে। র‍্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টে কিছুক্ষণের মধ্যে ফল মেলে। কিন্তু তা ভাইরাসের উপস্থিতি সর্বদা ধরতে পারে না, তাই প্রচুর ‘ফলস নেগেটিভ’ হয়।
এছাড়া আছে রক্তে অ্যান্টিবডির টেস্ট, যা রোগীদেহে কোভিড-১৯এর বিরুদ্ধে অ্যান্টবডি আছে কিনা দেখে। এটাও র‍্যাপিড টেস্ট। কিন্তু এটি ফলস পজিটিভ ও ফলস নেগেটিভ দুইই দিতে পারে। নির্ভরযোগ্য, সস্তা র‍্যাপিড টেস্ট করোনা দমনের এক বড় হাতিয়ার। বিভিন্ন দেশে চেষ্টা চলছে। ভারতের সহায়তায় ইজরায়েলের এক RT-PCRএর মতো নির্ভুল র‍্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট কিটস শিগগিরই বাজারে আসবে বলা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়া ব্যাপক টেস্ট ও আইসোলেশন পদ্ধতিতে কোনও লক ডাউন ছাড়াই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করেছে। আবার জার্মানি সামান্য লক ডাউন করেও মোটামুটি ঐদিকে হেঁটেছে। চিন দেশের একাংশে খুব কঠিন লক ডাউন করে তাকে বাকি দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তারপর সবাইকে টেস্ট করে, বিচ্ছিন্ন করে শেষ অবধি রোগ দমন করেছে। ভিয়েতনাম, তাইওয়ান প্রভৃতি কিছু দেশও প্রথম পর্যায়েই এই পদ্ধতি অনুসরণ করে কার্যত কোনও ক্ষয়ক্ষতি হতে না দিয়েই রোগ দমন করেছে।
(গ) সামাজিক দূরত্ববিধি মানা: উপরোক্ত পদ্ধতিগুলির একটি বা দুটিই গৃহীত হলেও যতদিন রোগ নির্মূল না হয়, অল্পবিস্তর সামাজিক দূরত্ববিধি মানতে হবে। (অনেকে এটাকে আজকাল ‘সামাজিক’ না বলে ‘শারীরিক’ দূরত্ব বলা পছন্দ করছেন।) এরজন্য জানা দরকার, করোনা কীভাবে সংক্রমিত হয়। নির্দিষ্ট করে বললে, তা হয় একজন মানুষের মুখ বা নাক থেকে অন্য মানুষের মুখ, নাক বা চোখের ঝিল্লিতে। তাই এই পথগুলি বন্ধ করা গেলেই করোনা সংক্রমণ অনেকটা আটকাল।
করোনা মূলত ছড়ায় নাক-মুখ থেকে নির্গত থুতু, কফ প্রভৃতির কণা বা ‘ড্রপলেট’ মারফত। এটা বায়ুবাহিত কিনা এ নিয়ে একটা কথা এখন উঠেছে। অনেক জীবাণুবিদ মনে করেন, ড্রপলেটবাহিত না বায়ুবাহিত, এই বিভেদ কৃত্রিম ও অপ্রয়োজনীয় মান্ধাতার আমলের একটা সংজ্ঞা। সব ড্রপলেটই পরিস্থিতিবিশেষে ক্ষুদ্র কণা ‘এয়ারোসল’এ পরিণত হয়ে বড় ড্রপলেট যদ্দুর যেতে পারে তার চেয়ে বেশি দূর যেতে পারে। সাধারণভাবে বলা হয়, ড্রপলেট ছ’ফুট যাওয়ার আগেই মাটিতে পড়ে সংক্রমণ ক্ষমতা হারায়। এয়ারোসল কদ্দুর যায় সেটা পরিস্থিতিনির্ভর।
এখানে একটা জিনিস বলা দরকার: করোনা নিয়ে বিজ্ঞানী ও জীবাণুতত্ত্ববিদরা যা যা বলেন, তা প্রায়ই সম্ভাবনার সীমানা নির্দেশ করে। অর্থাৎ ধরুন কেউ দেখেছেন, করোনা ভাইরাস ২৭ ফুট অবধি যেতে পারে। কিন্তু সেটা হচ্ছে সীমা, যাকে বলে worst case. এখন, করোনা নিয়ে যদি আমরা worst case হিসেব করে চলতে চাই, যাতে সংক্রমণের সম্ভাবনা শূন্য হয়, তবে হয় বাক্সবন্দি থাকতে হবে নয় মরে যেতে হবে। তাই ‘স্বাভাবিক’ সীমাটাও জানা ও মানা দরকার। তাতে সংক্রমণের সামান্য ঝুঁকি থাকে। কিন্তু সে তো বাইরে বেরোলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুরও একটা সামান্য সম্ভাবনা থাকে, নিজে সব ট্রাফিক রুল মেনে চললেও।
এই ‘স্বাভাবিক’ নিয়ম অনুসারে, করোনা সাধারণত ছ’ফুটের বেশি দূরত্বে সক্রিয় থাকে না। তাই মানুষে-মানুষে এই দূরত্ব রাখাই যথেষ্ট। বিশেষ পরিস্থিতিতে এয়ারোসল বাহিত হয়ে এই ভাইরাস আরও দূরে যেতে পারে। এই ‘বিশেষ’ পরিস্থিতি হচ্ছে: (১) মেডিকাল পরিমণ্ডল। (২) বদ্ধ জায়গা, যেখানে বহু লোকের সমাবেশ আর এসি চলছে (রেস্তোঁরা, সঙ্গীত অনুষ্ঠান, মিটিং বা প্রার্থনার হল প্রভৃতি)। সংক্ষেপে, যেসব জায়গায় কোনও বায়ুশোষক যন্ত্র (এসি, আই-সি-ইউ রুমের চাপযন্ত্র প্রভৃতি) চলছে। ডাক্তারি পরিবেশে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীরা পি-পি-ই পড়েন। বদ্ধ এসি এলাকা যথাসাধ্য এড়িয়ে চলা বিধেয়। নইলেও মাস্ক পরে থাকা দরকার। আর হাঁচিকাশি ছাড়া কথার থেকেও ড্রপলেট ছড়ায়। তাই ঐসব এলাকায় কথা কম বলা ও নিচুস্বরে বলা নিয়ম হওয়া দরকার। আর আপাতত অন্তত বদ্ধ অনুষ্ঠানকক্ষে লাইভ গানবাজনা, বক্তৃতা এগুলো না হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
দুর্ভাগ্যক্রমে, ভারতের মতো জনঘনত্বের দেশে রাস্তাঘাটে ঐ ছ’ফুট দূরত্ব রাখা সহজ নয়। সবার মাস্ক থাকলে এক্ষেত্রে কিছুটা রক্ষা। এই মাস্ক সম্বন্ধে বিশ্বের নিদান একমাসে পুরো উল্টে গেছে। আগে বলা হত, মাস্কে ভাইরাস আটকায় না। এখন বলা হচ্ছে, দুজনই মাস্ক পরে থাকলে সংক্রমণের সম্ভাবনা ৭০% অবধি কমে। মাস্ক মূলত নির্গত ড্রপলেট আটকে ভাইরাস ছড়ানো আটকায়। অর্থাৎ আপনার মাস্ক আমার, আমার মাস্ক মূলত আপনার সুরক্ষা। সাধারণ দুই বা তিনফেত্তা কাপড়ের মাস্কই যথেষ্ট। তবে এতে বায়ুচলাচল কম দেখে নিশ্বাস নিতে অস্বস্তি হতে পারে। সার্জিকাল মাস্কের মধ্য দিয়ে অপেক্ষাকৃত সহজে নিশ্বাস নেওয়া যায়। তবে সেগুলো একবারের বেশি ব্যবহার করা যায় না। ‘রেসপিরেটর’ বা ভাল্ব সহ এন-৯৫ মাস্ক আপনার নিশ্বাসবায়ু বাইরে ছেড়ে দেয়। তাই সর্বসাধারণের জন্য এটা নিষিদ্ধ। শুধু ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীরা এটা ব্যবহার করবেন। আর ভাল্ব না থাকলে এন-৯৫ বেশিক্ষণ ব্যবহার করা কঠিন। ফেস শিল্ডও একটা ভালো অস্ত্র, বিশেষত যেখানে কথাবার্তা বলা হয়। তবে এটা সর্বত্র ব্যবহার করা অসুবিধেজনক।
শরীর কাছাকাছি হলেও মুখ মুখের কাছে না নেওয়া আর কথা বলতে বা শুনতে হলে অন্যদিক ফিরে বলা বা শোনা একটা নিরাপদ পদ্ধতি। টিবি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীরাও এটা মানেন। ভাইরাস এক ঝলকের যোগাযোগে ছড়ায় না, একটু সময় নেয়। তাই বাইরে যত কম সময়ে কাজ সারা যায় তত ভালো।
বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, ‘জিনিস’ থেকে করোনা ছড়াবার সম্ভাবনা বাস্তবে প্রায় শূন্য। বিশেষত (শীতকাল ছাড়া) ভারতের আবহাওয়ায় করোনা জীবাণু মানুষের শরীরের বাইরে কিছুক্ষণেই পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হয়। তবু জিনিসপত্র সম্বন্ধে এটুকু সতর্কতা নেওয়া যায়: (১) বাইরে বেরিয়ে মুখমণ্ডলে হাত দেওয়া একেবারেই চলবে না। বাড়ি এসে হাত সাবানে ধুয়ে তবে মুখ ধোয়া ও তারপর মুখ চুলকোনো ইত্যাদি। বেশিক্ষণ বাইরে থাকলে সঙ্গে স্যানিটাইজার নিতে হবে, তাই দিয়ে পরিস্কার করে তবেই মুখে হাত। (২) কোনও জিনিস বাইরে থেকে এলে এক বা একাধিক ‘ডার্টি কর্নারে’ কয়েক ঘণ্টা (পারলে ২৪ ঘণ্টা) রেখে ব্যবহার করলেই চলে। এরমধ্যে পচনশীল দ্রব্যগুলি (মাছ, দুধ ইত্যাদি) সাথে সাথে ভালো করে জলে ধুয়ে ফ্রিজে তুলে তারপর হাত সাবানে ধুয়ে নিলেই যথেষ্ট। আর এটা করোনা-নিরপেক্ষ একটা ভালো স্বাস্থ্যবিধি। (৩) জুতো ধোয়ার দরকার নেই। দূরে কোথাও গেলে এসে জামাকাপড় ডিটার্জেন্টে কাচতে দেওয়া আর স্নান করে নেওয়া ভালো। কাছাকাছি দোকানবাজারে গেলে আর মানুষের সাথে ধাক্কাধাক্কি না হয়ে থাকলে এসব প্রত্যেকবার না করলেও চলে।
আর হ্যাঁ, মাস্কের সাথে চশমা, না থাকলে সানগ্লাসে চোখ ঢাকতে ভুলবেন না।
দেশ নির্বিশেষে আরও বেশ কিছুকাল এই সামাজিক দূরত্ববিধি মেনে চলা দরকার হবে। শুধু পরিবেশ, আবহাওয়া প্রভৃতির তারতম্যে এই নিয়মগুলির কিছু হেরফের হতে পারে।
(ঘ) ‘হার্ড (herd) ইমিউনিটি’র পথ: এই পদ্ধতির লক্ষ্য হচ্ছে বিশেষ কোনও বিধিনিষেধ আরোপ না করে ‘স্বাভাবিকভাবে’ ইমিউনিটি অর্জন করে রোগের মোকাবিলা করা। সাধারণভাবে করোনায় মৃতদের মধ্যে যেহেতু বয়স্ক ও ‘কো-মর্বিড’দের সংখ্যাধিক্য, তাই এই গ্রুপগুলিকে ভিড় এড়িয়ে যথাসাধ্য আলাদা হয়ে থাকতে বলা হয়। আশা করা হয় বাকি সুস্থ-সবল মানুষদের মধ্যে করোনা বিশেষ কাউকে মারতে পারবে না কিন্তু সংক্রমিতদের ইমিউনিটি তৈরি করে দেবে। যখন জনগোষ্ঠীর বৃহদাংশেরই এই ইমিউনিটি তৈরি হবে, তখন সংক্রমিত কারো চারপাশে অসংক্রমিত বিরল হবে, ফলে R0 ১এর কম হয়ে মহামারী নিজে থেকেই থেমে যাবে।
এই তত্ত্ব কিছু ছোঁয়াচে রোগ সম্বন্ধে খাটে। করোনা সম্বন্ধেও খাটবে বলে অনেকে ভেবেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে চেষ্টা করে দেখা গেছে, করোনা অত সহজ ব্যাধি নয়। শুধু বৃদ্ধ ও অসুস্থদের নয়, অন্যান্যদেরও সে মারে। আর ‘হার্ড ইমিউনিটি’র জন্য বসে থাকলে মৃতের সংখ্যা সভ্যদেশের গ্রহণযোগ্যতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। ইউ-কে ও ইউ-এস-এ প্রথমদিকে এই চেষ্টা করেছিল, তারপর মৃত্যুমিছিল শুরু হতেই বিষবৎ এই তত্ত্ব পরিত্যাগ করেছে। কিন্তু ঐ দোলাচলের ফলে ইঊ-এস-এ করোনায় মৃত্যুতে বিশ্বে সর্বোচ্চ ও ইউ-কে য়ুরোপে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ব্রাজিল এখনও এই নীতি নিয়েই চলেছে। ফলে সেখানে মৃতের সংখ্যা এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকার শীর্ষে।
প্রায় একই নীতি নিয়ে সুইডেন কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম রক্তপাতে করোনা নিয়ন্ত্রণ করেছে। কারণ, সেখানে সরকারের নির্দেশে মানুষ নিষ্ঠাভরে সামাজিক দূরত্ব ও অন্যান্য সাবধানতার নিয়ম পালন করেছে।

(৫) আমাদের দেশে:

মার্চে প্রাথমিক গড়িমসির পর কেন্দ্রীয় সরকার হঠাৎ দেশজোড়া লকডাউন ঘোষণা করলেন, যা কালক্রমে পৃথিবীর কঠোরতম লকডাউন বলে স্বীকৃত হবে। এটা মাস আড়াই চলার পরও মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে না হলেও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তবু তারপর অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতায় কেন্দ্রীয় সরকার লকডাউন ধীরে ধীরে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু খোলার সাথে সাথেই আবার করোনা বেশি বাড়তে থাকে। এখন অবধি সেই বৃদ্ধি অব্যহত।
লকডাউন যত কঠোর হবে তত করোনা দমন হবে এটা যে সত্যি নয়, ভারত তার প্রমাণ। বরং ভারত ও ব্রাজিলের দুই বিপরীত অবস্থান ও এই মুহূর্তে এই দুই দেশ করোনা সংক্রমণের শীর্ষে থাকাটা প্রমাণ করে যে এ ব্যাপারে ‘মধ্যপন্থা’ই শ্রেষ্ঠ পথ।
বলা হয়, মানুষ লকডাউন ঠিকমতো মানে না, তাই কাজ হয় না। কিন্তু অধিকাংশ দেশেই মানুষ লকডাউন পুরো মানে না। বিভিন্ন সমীক্ষায় (যাতে গুগল ম্যাপের ডেটাও ব্যবহার হয়েছে) প্রকাশ, ভারতের লকডাউন তার মান্যতা (প্রায় ৭৫%) ধরেও বিশ্বের কঠোরতম। বরং কর্তৃপক্ষের বোঝা উচিত, লকডাউনে অনেক আবশ্যক কাজ জমে যায় দেখেই তা উঠলে মানুষ ঠেলাগুঁতো করে রাস্তায় নামে। কী করে বাজার-ব্যাঙ্ক-পোস্ট অফিসে ভিড় কমানো যায়, কী করে যানবাহনে জড়াজড়ি ভিড় এড়ানো যায় তার বুদ্ধিদীপ্ত সমাধানে তাদের সাহায্য করতে হবে। ভিড় হলে বাজার-ব্যাঙ্ক দুদিন বন্ধ না রেখে বরং পরিষেবা ২৪X৭ করা যায় কিনা ভাবতে হবে।
এই মুহূর্তে আমাদের মৃত্যুহার কম, সুস্থতার হার বেশি বলে আত্মতুষ্টিতে মাতলে কর্তৃপক্ষ বিরাট ভুল করবেন। আমাদের মৃত্যুহার কম য়ুরোপ, আমেরিকার তুলনায়, এশিয়া, আফ্রিকা, ওশিয়ানিয়ার তুলনায় নয়। বরং প্রতিদিন দেশে কোভিড-১৯এ মৃতের সংখ্যা কেন বাড়ছে আর কী করে এটা ঠেকানো যায় সেটা দেখা দরকার।
তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, এই মুহূর্তে দেশে ৬০% স্বাস্থ্য পরিষেবা বেসরকারি। কিন্তু দেশের বড়জোর ২০% মানুষ এই পরিষেবা কিনতে সক্ষম। ফলে সরকারি হাসপাতালে উপচানো ভিড়, অনেক জায়গায় তাই নিয়ে সিট বেচার দালালি দুর্নীতি। আর বেসরকারি হাসপাতালে সীট ফাঁকা, তবু তারা রেট কমাচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি করে মিথ্যে পজিটিভ দেখিয়ে বা সামান্য রোগীকে জোর করে হাসপাতালে ভর্তি রেখে অনেক টাকা খিঁচে নেওয়া হচ্ছে।
এখন যুদ্ধকালীন ভিত্তিতে দরকার: (১) বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে আলোচনা করে, দরকারে এপিডেমিক অ্যাক্ট লাগু করে ও সরকারি ভর্তুকি দিয়ে তাদের সামান্য লাভে করোনা রুগীদের পরিষেবা দিতে বাধ্য করা। এ ব্যাপারে অদ্যাবধি সরকার অত্যন্ত দ্বিধাগ্রস্ত ও ক্ষমাসুন্দর।
(২) সরকারি-বেসরকারি সব স্বাস্থ্য পরিষেবা মিলিয়ে এক একসূত্রী (seamless) করোনা পরিষেবা গড়ে তোলা। এখন অনেক অ্যাপ আছে যাতে কাছাকাছি কোথায় করোনা টেস্ট করানো যাবে, কোথায় বেড খালি তা জানায়। বাস্তবে সেগুলো কাজ করে না, রোগী গিয়ে হয়রান হয়। জরুরীভিত্তিক ব্যবস্থা নিয়ে এই অসঙ্গতি দূর করা দরকার, যাতে রোগী অ্যাপ নির্দেশিত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দ্রুত পরিষেবা পান।
(৩) করোনা বা অন্য রোগ হলেও এখন পরিষেবা পেতে রোগীর হয়রানির শেষ নেই। প্রথম লাইন দিয়ে করোনা টেস্ট করা, দু’দিন বাদে রিপোর্ট পেলে আবার কোথায় ভর্তি পাবে তা নিয়ে মারামারি, সব মিলিয়ে ভর্তি হবার আগেই রোগীর নাভিশ্বাস উঠছে। এটা চলতে পারে না। দরকার যে কোনও চিহ্নিত হাসপাতালে সিরিয়াস পেশেন্ট হাজির হলে আগে ভর্তি, পরে পরীক্ষা। ফল পেলে প্রয়োজনে ভর্তি, নয়তো হোম কোয়ারান্টাইনে পাঠিয়ে টেলি মেডিসিন মারফত চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা পর্যবেক্ষণ।

সম্প্রতি অ্যান্টিবডি টেস্টে দিল্লির ২৩% ও মুম্বইর কিছু বস্তি এলাকার ৫৭% মানুষের রক্তে করোনা অ্যান্টিবডি পাওয়া গিয়েছে। রোগের প্রসার যখন এতটা, তখন দুদিন বা সাতদিনের লক ডাউন অর্থহীন। মুম্বই, দিল্লির উদাহরণ দেখায় যে লক্ষণহীন সংক্রমিতদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এক সময় মহামারীর তেজ কমে আসবে। তার মধ্যে সমস্ত স্বাস্থ্য পরিষেবা সংহত করে যথাসাধ্য প্রাণ রক্ষা করাই এখন সরকার-প্রশাসনের পাখির চোখ হওয়া উচিত। আর এই কাজে সফল না হলে যেসব স্বাস্থ্যকর্মী, ডাক্তার ও স্বেচ্ছাসেবক এই ক’মাসে জীবন বিপন্ন করে কোভিড দমনে ও বিপন্নের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ ব্যর্থ হয়ে যাবে।

(৬) অতঃপর:

করোনার যাত্রা বিশ্বের দেশ থেকে দেশান্তরে। এক অঞ্চলে কিছুদিন তার দাপট। সেটা নিয়ন্ত্রণে এলে সে ছড়িয়েছে অন্য অঞ্চলে – এশিয়া থেকে য়ুরোপ-আমেরিকায়, তারপর দক্ষিণ আমেরিকায়। দেশের মধ্যেও সে ছড়াচ্ছে কখনও (আমেরিকার) উত্তর থেকে দক্ষিণে, কখনও (ভারতের) শহর থেকে শহরতলীতে, পরে গ্রামেগঞ্জে। কোথাও আবার সে ফিরেও এসেছে। কিন্তু এই অবিরাম যাত্রার পথে সে ক্রমে একদিকে তার সংক্রমণ ক্ষমতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে কমাচ্ছে মারণক্ষমতা। এটা অপ্রত্যাশিত নয়। ভাইরাসের নিজের বংশবৃদ্ধির জন্যই ‘হোস্ট’কে বাঁচিয়ে রেখে সংক্রমণ দরকার। মিউটেশন সেই দিকেই চলেছে। একদিন হয়তো এই ভাইরাস সর্দি বা ফ্লু ভাইরাসের মতোই ‘মামুলি’ হয়ে দাঁড়াবে। তবে তারজন্য হাত গুটিয়ে বসে থাকলে সারা পৃথিবীতে অনেক মৃত্যু হবে। তাই অদূর ভবিষ্যতে অর্থনীতি ও চিকিৎসাব্যবস্থা চালু রেখেও (ভ্যাকসিন-ওষুধের বিকাশ ছাড়াও) কিছু সদর্থক ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন:
(ক) জটলা এড়িয়েও উৎপাদন ও সমাজ চালু রাখার জন্য নানা বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থা। যেমন ওয়ার্ক ফ্রম হোম, শিফটে শহর চালানো, ভার্চুয়াল এন্টারটেইনমেন্ট ও র‍্যালি।
(খ) ভাইরাস দমনে পটু অথচ ব্যবহার অস্বস্তিকর নয় এমন সব মাস্ক উদ্ভাবন, যাতে সমস্যার গোড়াতেই আঘাত করা যায়। এমন পিপিই উদ্ভাবন হলে আরও ভালো।
(গ) নির্ভরযোগ্য র‍্যাপিড টেস্ট কিটস উদ্ভাবন। এতে রোগীকে চিহ্নিত করা তো যাবেই। তাছাড়াও ট্রেন-প্লেনযাত্রা, ক্লাস, মিটিং ইত্যাদির আগে অংশগ্রহণকারীদের টেস্ট করে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে।
(গ) এবং অবশ্যই, সাবধানতা শিকেয় না তুলেও করোনার যে অহেতুক অতিরিক্ত আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে তাকে সচেতন প্রচারের মাধ্যমে কমানো। করোনা এতদিনেও যায়নি ও বিশ্বে রোজ ৫-৬ হাজার মানূষ মারা যাচ্ছেন, এটা অস্বস্তিকর। তবে কিছু আতঙ্ক সৃষ্টিকারী পূর্বাভাষ অনুযায়ী (এমনকি বেশ কিছু দেশ অর্থনীতি আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার পরও) কোটি কোটি লোকের মৃত্যু হচ্ছে না, হবেও না। বাইরের যুদ্ধজয়ের আগে ভেতরের ভয়ের সঙ্গে যুদ্ধজয় করতে হবে।
আতঙ্ক নয়, সাবধানতা। দু’বেলা মরার আগে মরব না ভাই মরব না!

এ বিষয়েও সন্দেহ নেই যে করোনার সহজাত দাপট উষ্ণমণ্ডলের দেশগুলিতে শীতল অঞ্চলের দেশগুলির চেয়ে কম। কিন্তু প্রাথমিকভাবে পাওয়া এই সুযোগ অনেক দেশ খোয়াচ্ছে তাদের অনুন্নত ও অসংগঠিত মেডিকাল ব্যবস্থাকে গুছিয়ে নিয়ে পুরো দক্ষতায় কাজে লাগাতে পারার ব্যর্থতায়। তাদের এই কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় করতে হবে আর এ ব্যাপারে উন্নত বিশ্বকেও তাদের জ্ঞান ও অর্থ দিয়ে যতটা সম্ভব সাহায্য করতে হবে। সংযুক্ত বিশ্বগ্রামের কোনও অঞ্চলে যদি করোনা থাকে তা গোটা বিশ্বের কাছেই বিপজ্জনক। সুইমিং পুলের একাংশে কেউ প্রস্রাব করলে সুদূরতম অঞ্চলেও তার স্পর্শ ছড়ায়।

(৭) কিছু তথ্যসূত্র:

https://www.worldometers.info/coronavirus/
https://www.bbc.com/news/world-asia-india-53576653
https://telanganatoday.com/vaccine-trails
https://www.livemint.com/news/india/how-mumbai-s-dharavi-cha sed-the-virus-has-lesson-for-developing-countries-1159210292 9877.html

ফেসবুক মন্তব্য