লকডাউন চ্যালেঞ্জ

পল্লব গাঙ্গুলি



গত কয়েকদিন ধরেই মাস্কটা পিছু নিচ্ছে নবনীতার।

দুপুর ছুঁইছুঁই সময়ে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেলে বরাবর এরকমই হয়। একটা বিষণ্ণ মাঝদুপুর গল্প করতে চলে আসে ওর সঙ্গে। খাওয়ার পর দক্ষিণের বারান্দায় একা হলো ও। ডায়ারি আর লাল কলমে। বৃষ্টি থেমেছে অনেকক্ষণ। দিনের শেষ রোদটা যেন স্নানের পর আরও সুন্দরী হয়ে উঠেছে।

নিঃঝুম দুপুর। কয়েকটা নারকেল, সুপুরি ও ছোটবড় গাছ এক ফালি বাগানে। এক আধফোঁটা জল তখনও বিলম্বিত লয়ে উপর থেকে নীচের পাতায় এসে পড়ছে টুপ টুপ করে। ঐ সামান্য শব্দ নৈঃশব্দ্যঠে যেন আরও বেশি প্রকট করে তুলছে।

অলস মনের গহন থেকে কী যেন একটা ছায়া ছায়া উঠে আসছিল নবনীতার। শব্দে অক্ষরে তারা ডানা মেলতে চায়। ও জানে, এইবার একটা আড়বাঁশির সুর উঠে আসবে ওর ভেতর থেকে। শব্দের ছায়ায় ছায়ায় নির্জনতা খুঁজে পেতে চাইবে সে সুর। হয়তো ওর নিরুচ্চার প্রেম! নতুবা লুকোনো কোন কষ্ট জেগে উঠবে ঘুম থেকে। কয়েক মুহূর্তের একটা জাদুস্পর্শ ! ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে গোটা সংসার থেকে। কলম চলবে আগুপিছু ডায়ারির পাতায়। জন্ম নেবে নিটোল একটা...

নাহ্! ঠিক এই সময়েই তার অনিবার্য আবির্ভাব! গত কয়েকদিন ধরে এমনই চলছে! শব্দদের অলীক সৃষ্টির মুহূর্তেই তার আবির্ভাব হচ্ছে। বার বারই ঘটছে এমনটা। কেটে যাচ্ছে সুর, তাল, লয়! একটা মুখোশ! আর সঙ্গে সঙ্গেই পাক খেয়ে খেয়ে একটা পোড়া গন্ধ যেন উঠে আসে নবনীতার ভেতর থেকে।

‌ খুব চেনা চেনা লাগছে যেন চোখদুটো। হ্যাঁ, মাস্কের পেছন থেকে লক্ষ্মীদি তাকিয়ে আছে অপলক। স্কুলের পথে ট্রেনে যাতায়াতের সময় কেনাকাটা আর পরিচয়। ট্রেনে ট্রেনে হজমি, জোয়ান, শুকনো আমলকী বিক্রি করেন লক্ষ্মীদিॠ¤ স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে। দুটো ছেলেমেয়ের লেখাপড়া। জন্ম থেকেই শারীরিক ভাবে প্রতিস্পর্ ধী এক ননদ। ঘরভাড়া সংসার সব ঐ ফেরিতেই। সেদিন ফোনে ফুঁপিয়ে উঠেছিল। থাকে আরও ছটা স্টেশন ওপাশে। ট্রেন বন্ধ। স্কুল, অফিস কবে খুলবে, ট্রেন কবে চলবে জিজ্ঞাসা করছিল। আর কী বলতে চায় পরিষ্কার বোঝাতে পারল না। শুধু বলল বাড়িওয়ালা চাবি কেড়ে নিয়েছে। তবে ও নাকি à¦ªà§‹à§œà¦¾à¦—à¦¨à§à¦§à§‡à ° চাবি পেয়ে গেছে। নবনীতা ও ওর সহযাত্রীরঠমিলে একটা ফান্ড করেছে। পরিচিত হকার ভাইদের সাহায্যের à¦‰à¦¦à§à¦¦à§‡à¦¶à§à¦¯à§‡à ¤ লক্ষ্মীদিঠ° ব্যাঙ্ক ডিটেইলস চাওয়ার আগেই ফুঁপিয়ে ওঠা কান্নার মাঝেই লাইনটা কেটে গেল।
‌
‌ কলমটা আটকে গেল নবনীতার। কবিতাটা হারিয়ে গেল আস্তে আস্তে। লেখাটা আর ধরা দিল না। কেটে দিল দু'একটা শব্দ, যা লিখেছিল। ওর পেলব পেলব à¦¶à¦¬à§à¦¦à¦—à§à¦²à§‹à¦•à ‡ বড্ড সঙ্কুচিত লাগছিল লক্ষ্মীদিঠ° ঘোলাঘোলা চাউনির সামনে। জীবনের জটিল প্রতিস্পর্ ধা যেন গাঢ় পরিসর খুঁজে নিতে চাইছিল শব্দের আশ্রয়ে। অথচ ঐ আবেগ সংহত হয়ে কবিতার মুহূর্ত হয়ে ধরা দিচ্ছিল না। কেন? পাক খাচ্ছিল প্রশ্নটা। মাটি-মাখামঠ¾à¦–ি অনুভূতি কতটা গাঢ় হলে ঐ ঘোলা চোখ একটা কবিতার মুহূর্তকে ছুঁতে পারত? নিজেকেই জিজ্ঞাসা করল নবনীতা। তারপর একসময় আশ্বস্ত করল নিজেকে। যাক বাবা। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। এই নির্মম বাস্তবের বিপ্রতীপে ওর নিশ্চল বিষণ্ণতাকৠযেন বড্ড ঠুনকো আর স্বার্থপর লাগে। হাজার হাজার মানুষের দৈনন্দিন যন্ত্রণাকৠপাশ কাটিয়ে বাস্তব আর পরাবাস্তবৠর মাঝে ওর ঐ নির্লিপ্ত চলাচল হয়তো নৈতিক অপরাধই হত একরকম।
‌
‌ কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না। কবিতাই ওর গাঢ় নিঃশ্বাসেঠখোলা বারান্দা। ওর বেঁচে থাকার অবলম্বন। বেরোতেই হবে এই অচল অবস্থা থেকে।

‌ অস্বস্তি কাটাতে নবনীতা ঠিক করল, ফোন করবে মলয়দাকে। ওর কলেজ রাজনীতির à¦¦à§€à¦•à§à¦·à¦¾à¦—à§à¦°à à¥¤ কাব্যচর্চঠয় ফ্রেন্ড, ফিলোসফার এন্ড গাইডও!


‌কী সৃজনশীল সমাপতন! ঠিক তখনই টুং করে à¦¨à§‹à¦Ÿà¦¿à¦«à¦¿à¦•à§‡à¦¶à ¨! ফেসবুক লগ ইন করা ছিল। নোটিটা ওপেন করতেই নবনীতা তাকিয়ে দেখল নব্বই দশকের খ্যাতিমান কবি মলয় ব্যানার্জৠ" লকডাউন চ্যালেঞ্জ" ; এর কড়া মোকাবিলায় সাত দিনে সাত সিনেমার খেলায় ওকে আমন্ত্রণ à¦œà¦¾à¦¨à¦¿à§Ÿà§‡à¦›à§‡à¦¨à ¤

মনটা তেতো হয়ে গেল ওর à¦¨à§‹à¦Ÿà¦¿à¦«à¦¿à¦•à§‡à¦¶à ¨à¦Ÿà¦¾ দেখে। তবু ঠিক যখন করে রেখেছে, "রাইটার্স ব্লক" এর ব্যাপারে পরামর্শটা নেওয়াই যাক। ফোনে ধরল মলয় ব্যানার্জৠকে।
‌
‌ দু' এক মিনিটের মধ্যেই বোঝা গেল অধ্যাপক-à¦•à¦¬à ¦¿ আপাতত রঙীন জলে ডুবিয়ে শব্দদের ওড়া শেখাবেন।
‌
‌-- শোন্। যেটা নিয়ে কয়েক হাজার কবিতা লেখা হয়ে গেছে সেটা নিয়ে লিখে বাংলা সাহিত্যের কী উন্নতিটা হবে শুনি? নতুন কিছু লেখ। তবে তো মানুষ পড়বে। তোরা শূন্য দশক। পোস্টমডারৠনের সেমি অ্যাডভান্ঠড স্টেজ! আগে বেসিকসে আয় বাবু। নয়ের ঘরের ধারাটুকুতৠআগে বোঝ্। বৌদ্ধিক মুক্তিটা ভেতর থেকে ফিল কর আগে... বুঝলি?
‌
‌ মলয়দার এই রেটোরিকটা নবনীতার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। আসলে মলয়দারা আটকে à¦—à¦¿à§Ÿà§‡à¦›à¦¿à¦²à§‡à¦¨à ¥¤ পুঁজি শেষ। তাই পরের দশককে ছুঁতে পারছিলেন না! দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। তাই পুনরাবৃত্ত ি। আর পুনরাবৃত্ত ি!
‌
‌ নবনীতা জানে এরপরের কথাগুলো ভাঙা রেকর্ডের মত বাজবে।

‌-- শোন, এইসব ব্লক, ডেডলক কিছুই না। সমস্যাটা অন্য জায়গায়। ঐ অলৌকিক তত্ত্বের মায়া এবার কাটিয়ে ওঠ্। পোস্ট মডার্নিজম বিশেষ আদর্শের দাসত্ব করে না। ঠিক সুনীলদের কলাকৈবল্য নয়। তবু নিজেদের শর্তে সময়কে নিজেদের মত নির্মোহ দেখতে শেখ এবার। à¦—à§à¦²à§‹à¦¬à¦¾à¦²à¦¾à¦‡à œà§‡à¦¶à¦¨à¦Ÿà¦¾ ধরার চেষ্টা কর। ভাঙচুরগুলৠ‹ দ্যাখ। বার্লিন পাঁচিল, স্বপ্নের সোভিয়েত, টিটোর দেশ, বাবরি। সব নয়ের দশকে ভাঙল। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুঠ্তির বিপ্লব... ব্রান্ড প্রোডাক্ট নিয়ে পাগলামি তৈরি হচ্ছে। ডিজিটাল পার্স এসে পড়বে পড়বে করছে। কেবল্ চ্যানেল জাঁকিয়ে বসছে। ভাষার পাঁচিল উঠে যাচ্ছে। মিলেমিশে যাচ্ছে সব। এসব নিয়েই আমাদের লড়াই ছিল। এটা আগে আত্মস্থ কর। তারপর তোদের সময়টাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করবি।
‌
‌... তুই তো নির্মম বাস্তবের কথা বলছিস। আরে বাবা, এখনও অলৌকিক তত্ত্বের গেড়োয় আটকে আছিস। এটা অন্য মুক্তির দশক রে! ইন্ট্যালেঠ•à¦šà§à§Ÿà¦¾à¦² ইমান্সিপেঠ¶à¦¨! এভাবে ভাব, না? ইউটোপিয়ায় আটকে থাকলে চলবে কী করে? এটা à¦¹à¦¿à¦Ÿà§‡à¦°à§‹à¦Ÿà§‹à¦ªà ¿à§Ÿà¦¾à¦° দশক। বিনির্মাণ চাইরে। বিনির্মাণ! ছয়ের দশক রিয়ালিটি ধরেছে। সত্তরের দশক বদল চেয়েছে। আর আমরা ভেবেছি রিয়্যালিটি উইদিন রিয়ালিটি। সেখান থেকে এলিমেন্ট তুলে এনে সময়কে ডিকনস্ট্রঠক্ট করতে হবে রে! à¦—à§à¦²à§‹à¦¬à¦¾à¦²à¦¾à¦‡à œà¦¡ ভাষায়। বুঝলি কিছু?

ফোনের এ প্রান্তে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে নবনীতা। ওর বরং মনে পড়ে যায় অন্য কিছু। সেবার মলয়দার স্টাডিতে বসে এই ভাঙা রেকর্ডের মধ্যেই নবনীতা বলেছিল,

--মলয়দা, চে-র মুখ আঁকা টিশার্টটা যত্নে রেখেছ তো?
ভুরু à¦•à§à¦à¦šà¦•à¦›à¦¿à¦²à§‡à ¦¨ নব্বই দশকের কবি মলয় ব্যানার্জৠ।
-- ভুলে গেলে? সেদিন আমরা সবাই যুব সংগঠনের অফিসে। কলেজ সার্ভিস কমিশনের à¦°à§‡à¦•à¦®à§‡à¦¨à§à¦¡à¦¶à ¨ লেটারের কপিটা ওখানেই ডেলিভারি নিলে। চিঠি খুলে বড় করে শ্বাস নিয়ে বলেছিলে, 'যাক্! এতদিনের সংগ্রাম সার্থক।' ঈশ্বরে অবিশ্বাসী তুমি চোখ বুঁজে চিঠিটা টিশার্টের চে-র ছবিতে ঠেকিয়ে বলেছিলে, 'চে লক্ষ লক্ষ মানুষকে মুক্তির স্বপ্ন দেখতে à¦¶à¦¿à¦–à¦¿à§Ÿà§‡à¦›à§‡à¦¨à ¥¤ এই পয়া টিশার্ট সারাজীবন যত্ন করে রাখব।'

নবনীতার কথা শুনে মাথা নীচু করেছিলেন একসময়ের জেলা যুবসম্পাদঠকবি মলয় ব্যানার্জৠ। অস্বস্তি কাটাতে নবনীতা বলেছিল, 'কবিতা পড়ো বরং মলয়দা।'

মলয় পড়েছিলেন নবনীতার প্রিয় কবি পিনাকি ঠাকুরের কবিতা। তারপর নিজের কবিতা শুরুর আগে মলয় ব্যানার্জৠধরতাইয়ে à¦«à¦¿à¦°à§‡à¦›à¦¿à¦²à§‡à¦¨à ¤

-- শোন, আন্দোলন ফান্দোলনে কবিতা হয় না। বুঝলি? ঐসব স্যুররিয়াল িজম বল বা সিম্বলিজম, অথবা অস্তিবাদ, ওসব ফাঁকা কচকচি! পণ্ডিতদের কৃমিঘাঁটাॠশুধু আদর্শ আদর্শ করে বুকের বাঁ-দিক চিনচিন করলে হবে? টাইমের ফ্লো-টা যে ওপেন এন্ডেড! সেটা বোঝার চেষ্টা কর আগে। সুভাষ সমরদের মত লিনিয়ার বা ওয়ান ডাইমেনশনাঠ² হয়ে গেলে মুশকিল। লজিক্যাল ক্র্যাফ্টঠুলো ধরতে হবে তো!

--উঠি গো আজ। না হলে সাতটা পাঁচের ডাউন নৈহাটিটা পাব না। হাই তুলতে তুলতে বলেছিল সেই সন্ধ্যেয়। নবনীতা বর্তমানে ফেরে।

ফোনটা কখন যেন কেটে দিয়ে নবনীতা ডুবে গেল নিজের ভেতর। অবক্ষয়ের ক্লান্ত নিঃশ্বাস ছুঁয়ে একটা ছায়াতৃষ্ণঠগাঢ় হয়ে উঠছে ওর মনে। শব্দের ছায়ায় ছায়ায় একটু নির্জনতা চায় ওর মন! কলম ডায়ারি হাতে তুলে নেয়। ....কিন্তু ও কী? আবার যে একটা মাস্ক! চোখ দুটো চেনা চেনা যেন! হ্যাঁ হ্যাঁ, রামবিলাস চাচা। রামবিলাস সাউ। স্কুলের উল্টোদিকে তিনটে ব্যাঙ্ক। দুটো সরকারি অফিস। স্কুল। ওরা স্বামী স্ত্রী মিলে কাঠের বেঞ্চ টেবিল পেতে রুটি সবজি বিক্রি করত সকাল দুপুর! কোথায় ওরা এখন? কী খাচ্ছে? পরিযায়ী হয়ে হেঁটে ফিরে গেল দেশে? কীভাবে চলছে ওদের? একদিন বলেছিল দুই মেয়ের বিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল ওরা। খেতি করার মত জমি সব বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। তাহলে? ...নবনীতার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে।

ওদিকে অনলাইন ছিল à¦•à¦¾à¦¨à§‡à¦•à¦¶à¦¨à¦Ÿà¦¾à ¤ ফোনটা কাটতেই পর্দায় মলয় ব্যানার্জৠর সাম্প্রতিঠস্ট্যাটাসট া ঝলমল করে উঠল। অমিতাভ রেখার ছবির জ্বলজ্বলে পোস্টারেরঠ° ওপরে চার পাঁচ লাইনের ক্যাপশন! নিজেকে ও বন্ধুদের উদ্দীপ্ত করতে চান নয়ের দশকের অধ্যাপক কবি। প্রতিশ্রুত িবদ্ধ! সিনেমা সিনেমা খেলায় 'লকডাউন চ্যালেঞ্জ' এর কড়া মোকবিলা তিনি এবার করেই ছাড়বেন যে!

অলংকরণঃ কল্লোল রায়

ফেসবুক মন্তব্য