সহচর

মানবেন্দ্র সাহা



ফ্ল্যাটের জানালা থেকে শহরের অনেকখানিই দেখা যায়। দীর্ঘ লকডাউনে আপাতত এটাই আমার পৃথিবী। আকাশ ঝরঝরে হলে হাওড়া ব্রিজও উঁকি দেয় মাঝে মাঝে। তবে আর কতদিন দেখা যাবে সন্দেহ। মুক্ত বাণিজ্যনীতি মেনে মাথা তুলছে শহর, হয়তো ভবিষ্যতে আকাশ দেখতেও পয়সা লাগবে। বাইপাশ লাগোয়া একটা পুকুর ছিল। পুকুরটি এখন কলেবর পালটে পঞ্চাশ তলায় উঠেছে। এ হল স্থাপত্যশৈলীর নিয়ম মেনে পুকুর চুরি। সবই ট্রাম্পের হাতসাফাই।

অঝোরে বৃষ্টি নামলে কোলকাতার উঁচু উঁচু বাড়িগুলোও কেমন নিমেষে ভ্যানিস হয়ে যায়।
তখন শুধু সাদা আর সাদা। উত্তর দিকের জানালাটা ঈষৎ খুলে দিলাম। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ঝাট আমার গালে মাথায় চড়ে বসলো কাঁচা পাকা চুলের পাশে।
-- কি গো বয়সের ধর্মটা ভুলে গেলে? প্রথম বর্ষায় এভাবে ভিজলে সামলাতে পারবে?
-- তোমার জ্ঞান তুমি গুঁজে রাখো নিজের কাছায়। তোমার মিলিটারি শৃঙ্খলা ধুয়ে জল খাও দুবেলা। কি পেয়েছো সারাটা জীবন ঘানির বলদের মত গোল গোল ঘুরে? নিজেও ঘুরেছো আমাকেও ঘুরিয়েছো। তোমার ও কক্ষপথে আর পা রাখছি না।

দু একবার এরকম ঝাঁঝিয়ে কথা বললেই লোকটা চুপ মেরে যায়। লোকটা নিরিহ, বিশ্বস্তও বটে। তবে দোষের মধ্যে বড্ড সাবধানী। লড়াইকে দেখেছে খুব কাছ থেকে, তাই লড়াইয়ের মধ্যে থেকেই শিখেছে অধিকারটাকে অর্জন করতে। ওর কাছে অধিকার বস্তুটি ভীষণ ওয়েল ডিফাইন্ড। মাঝে মাঝে উপদেশ দেয় যে সব কিছু নাকি জানতে নেই। কিছু জিনিস তোমার অধিকারের বাইরে। উপদেশ গুলোর যুক্তি আছে ঠিকই, কিন্তু যুক্তি বড় ম্যাড়মেড়ে, বে-রঙ, লোকটার না কামানো গালের মত। তাই আমল দিই না বেশি। একমাত্রিক সময়ের সরণি বেয়ে নিয়মমাফিক বর্ষাযাপন এ আমার কম্ম না। ওসব হিসাব তুমি কষো পাকাচুলের খড়ি দিয়ে। আমার কাছে বর্ষা মানে অসংখ্য বৃক্ষের আড়ালে একটুকরো সিক্ত অঙ্গার। কৃষ্ণচুড়ার পাপড়ি থেকে চুঁইয়ে পড়া ফোঁটা ফোঁটা জল বাষ্পীভূত হয়ে যাবে নিমেষে প্রেয়সীর কর্ণমূলে।
আমার কাছে বর্ষা মানে উথলে ওঠা কোপাই,
আমার কাছে বর্ষা মানে ব্যাগের মধ্যে ছাতা লুকিয়ে রেখে কপট অসহায়তা বান্ধবির কাছে।
আমার কাছে বর্ষা মানে ফুল চিকেন তন্দুরি, টেঙরি কাবাব।
আমার কাছে বর্ষা মানে অনধিকারের গন্ডি পেরিয়ে অজানার রসাস্বাদন চেটেপুটে।

লোকটা মিনমিনে গলায় বলল
-- যখন ছোট ছিলাম, খুব ছোট তখন মাঝ রাতে মা ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। আমার চোখ খুলতে চাইতো না ঘুমে। মার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াতাম। মা বলতেন একটু কষ্ট কর। বাবা একটা চৌকি কিনবে ঠিক। আরও কিছু বলতেন হয়তো কিন্তু খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে টিনের চালের ঝমঝম শব্দ শুনতে শুনতে আবার ঘুমিয়ে পড়তাম। মার সব কথাগুলো শোনা হতো না। বাকি রাতটা কোথায়
ঘুমোতাম কোনদিন জানতে চাই নি। একটুকরো খোলা বারান্দাটাই ছিল আমাদের শোওয়ার ঘর। পরদিন সকালে বাবা যখন গামলা দিয়ে উঠোনের জল সিঁচতেন আমি কাছে গিয়ে বলতাম বাবা একটা নৌকো বানিয়ে দেবে, কাগজের নৌকো? বাবা বলতেন কাগজের নৌকো টেকসই হয় না। আমরা কাঠের নৌকো বানাবো। মস্ত বড় নৌকো। যেখানে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়।

একটা দমকা হাওয়া জানালার পর্দা নাড়িয়ে দিল। ছিটকে ফেলে দিল আমার চশমা। আবছা চোখে দেখলাম লোকটা উঠে গিয়ে জানালাটা বন্ধ করে দিল। সযত্নে চশমাটা হাতে তুলে নিয়ে পড়িয়ে দিল চোখে। জানালার ওপারে কাঁচের গা বেয়ে তখন বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে নিচে, অনেক নিচে। যেন ভীষণ কোন ঝঞ্ঝা অতিক্রম আমাদের বহুতল নৌকো ভেসে চলেছে। আর বিকল্প জীবিকার আশায় অনভিজ্ঞ অপটু ফেরিওয়ালাদের জেলে ডিঙিগুলো ক্রমশ ঢুকে যাচ্ছে এক একটা ঢেউএর ভিতর...

ছবিঃ পার্থ প্রতিম চট্টোপাধ্যায়

ফেসবুক মন্তব্য