চ্যাটিং উইথ চ্যাটাং চ্যাটাং অনুপম (কবি-লেখক অনুপম মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ইনবক্সালাপ)

অনুপম মুখোপাধ্যায় ও অর্ঘ্য দত্ত




২০১৪ নাগাদ ফেসবুকে আমার নজরে আসেন অনুপম। অনুপম মুখোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে আমার ধারণা তখন‌ও আটকে ছিল সত্তরের দশকের লেখালেখি ঘিরে। তাও বাণিজ্যিক পত্রিকার জনপ্রিয় কিছু কবি-লেখকের লেখালিখিটুকুতেই। আমার সেই প্রাতিষ্ঠানিক বোধভাষ্যটুকু সম্বল করে, আমি যখন ওর ওই দাঁড়ি দিয়ে শুরু করা, শব্দ কেটে কাটা চিহ্ন সহ সেই শব্দ রেখে দেওয়া কবিতাগুলো পড়া শুরু করি তখন আমার একটুও ভালো লাগতো না। ভালো লাগতো না মানুষটাকেও। মনে হত হামবাগ ও উদ্ধত। সন্দিগ্ধ ও আত্মপ্রচারমুখী। গিমিক সর্বস্ব। অথচ ওকে এবং ওর ঐ চ্যাটাং চ্যাটাং কথার ফেসবুক স্টেটাসগুলোকে উপেক্ষাও করতে পারতাম না। ওর বেশিরভাগ কবিতাই আমাকে ছুঁতো না, কিন্তু বিভিন্ন বিষয়ে লেখা ওর পোস্টগুলোর নেশা ক্রমশঃ আমাকে পেয়ে বসছিল।

এমন একটা সময়ে আমি ওর পর্ণমোচী উপন্যাস পড়ি এবং ওকে ইনবক্সে কিছু প্রশ্ন করি। সেই শুরু। প্রায় তিন বছর ধরে নানান সময়ে ইনবক্সে আমাদের যে চ্যাটিং, যে কথাবার্তা তার‌ই ভিত্তিতে এ লেখা। প্রশ্ন বা উত্তর কোনোটাই মুদ্রণের পরিকল্পনা নিয়ে নয়।

একে কি সাক্ষাৎকার বলা চলে? না। অবশ্যই নয়। বরং নির্ভেজাল চ্যাটিং বলা ভালো।

যদিও শুরুটা হয়েছিল প্রকাশ্য পোস্টেই। আমিই শুরু করেছিলাম--
"আমরা যখন ছোট মানে আজ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর আগে, আমার অভিজাত শিক্ষিত দিদিমার মুখেও অনেক 'মাগী' শুনেছি। ঐ সময়েই আমাদের ঠিকে ঝি, দন্ডকারণ্য থেকে আসা উদ্বাস্তু আকুলের মা, কথায় কথায় নিজের মেয়ের প্রতি 'খানকি' ও অন্য আরো তথাকথিত অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করত। মনে আছে, আমাদের সামনে ঐ সব ভাষা ব্যবহারের জন্য মা ওকে বকাবকি করত। তাই 'পর্ণমোচী'-তে তথাকথিত অশ্লীল শব্দের ব্যবহার তাই আলাদা করে কোনো মন্দলাগা অথবা যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করেনি। আপনার এমন উদ্দেশ্যও হয়তো ছিল না। তথাকথিত অশ্লীল শব্দের এই ব্যবহারটুকুই এ উপন্যাসের যা কিছু ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট বলে আমার মনে হয়েছে। তবে কাহিনীটি পাঠের আগ্রহকে ধরে রেখেছিল শেষ পর্যন্ত। ঐ ভাষার ব্যবহার, তার উদ্দেশ্য ও যৌক্তিকতা, এ সব নিয়ে আমার নিজের ভেতরেই নানান প্রশ্ন তৈরি হচ্ছিল, নিজের মতো করে তার উত্তরও খুঁজছিলাম।
আজ দেখলাম ফেসবুকে লিখেছেন, ...'প্রেম' একটা অসভ্য শব্দ আমাদের সমাজে। মানুষ দাঁত, নখ-এর মতো হিংস্র অঙ্গগুলোর নাম মুখে আনতে লজ্জা পায় না, কিন্তু 'যোনি' বা 'লিঙ্গ'-র নাম বলার সময় অনেক বিপ্লবীর কন্ঠস্বরও খাদে নেমে যায়। অথচ বন্ধু এই অঙ্গগুলো থেকে মানুষের জন্ম হয়। মানুষ তার তুঙ্গতম আনন্দ পায় ওদের থেকেই। আসলে মানুষ নিজের জন্মকেই লজ্জা পায়, ভুলে থাকতে চায়। তার চেয়েও বেশি ভয় পায় আরেকজনের মধ্যে ডুব দিয়ে নিজের আনন্দ খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্খাকে।

আসলেই কি তাই? আমাদের সমাজে আজ আর 'প্রেম' সত্যিই কি কোনো অসভ্য শব্দ? কোন সমাজে? হ্যাঁ মানছি, শরীরী প্রেমের পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যবহারে ঐ তথাকথিত অশ্লীল শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার হয়তো অসভ্য বলে গ্রাহ্য হয় আজও। কিন্তু, যোনি আর লিঙ্গ নিয়ে যদি আমাদের লজ্জা বোধ থাকার কোনো যুক্তি না থাকে তাহলে তা ঢাকারই বা কী প্রয়োজন? ঐ দুটি অঙ্গ দিয়ে আমাদের জন্ম এই যুক্তিতে কি আমরা তাহলে ঐ অঙ্গগুলিকে অনাবৃত রাখার সুপারিস করতে পারি, দাঁত নখের মতো? মাতৃ যোনি ও পিতৃ লিঙ্গ থেকে আমাদের জন্ম অতএব তা প্রণম্য এই যুক্তিতে কি আমরা বাবা মায়ের পা না ছুঁয়ে তাঁদের লিঙ্গ- যোনিতে হাত ছুঁইয়ে প্রণাম করতে পারি? বা করি না যে তাকি সত্যিই শুধুমাত্র অকারণ লজ্জায়? কোনো শব্দই অশ্লীল নয় বলে আপনি বারবার যা বলেন তার প্রকৃত অর্থই বা কী, খুব জানতে ইচ্ছে করে।
'আরেকজনের মধ্যে ডুব দিয়ে নিজের আনন্দ খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্খা'-তো আমাদের মূল চালিকা শক্তি, তাকে কে ভয় পায়? এইগুলো আমার সৎ প্রশ্ন। এ নিয়ে যদি কিছু বলেন খুব খুশি হবো।"

অনুপম এর উত্তর দিয়েছিলেন নিজের ওয়ালে, আলাদা পোস্টে।

"আমাকে একজন প্রকাশ্যেই প্রশ্ন করেছেন, আমি কেন সাহিত্যে দাঁত বা নখের চেয়ে যোনি বা লিঙ্গকে অশ্লীল ভাবি না! তাঁর আরো প্রশ্ন, কেন তবে যোনি বা লিঙ্গকে ঢেকে রাখতে হয়! আরো জানতে চেয়েছেন, কেন গুরুজনের পা ধরে প্রণাম করা হয়, যোনি বা লিঙ্গ স্পর্শ করে নয়! প্রশ্নগুলো আগ্রহোদ্দীপক। উত্তরগুলো সংক্ষিপ্ত হবে, কারন প্রবন্ধ লেখার ইচ্ছে বা সুযোগ আমার আপাতত নেই।

.
১। আমি যোনি বা লিঙ্গকে অশ্লীল ভাবিনা, কারন সেটা আমাদের সংস্কৃতিতেই নেই। সংস্কৃতির বিকারের কথা বলছি না। আমি বুঝি কিছু সন্ন্যাসী বস্ত্র ত্যাগ করেন, সেটার কারন তাঁরা সকল বিকার থেকে পরিত্রাণ চান। চিতায় তোলা হয় নগ্ন মৃতদেহকে। আমি খাজুরাহোর মর্মে ঢুকতে চেয়েছি, যতটা বুঝেছি ওঁরা চেয়েছিলেন মন্দিরে ঢোকার আগে মানুষ তার প্রকৃত স্বরূপটা তার বিকারগ্রস্ততার সর্বোচ্চ সীমাটা সহ বুঝে নিক। তাই ওই অসহনীয় ইরোটিক ভাস্কর্যগুলো তৈরি হয়েছিল মন্দিরের গায়ে। আজ অবিশ্যি আমরা অনেকেই ওখানে হনিমুন করতে যাই, যাতে ঠিকঠাক উত্তেজিত (বিকারগ্রস্ত) হতে পারি। আমরা অনেকেই খাজুরাহোকে ব্লু ফিল্ম আর বিকৃত যৌনাচারের অজুহাত বানিয়ে ফেলেছি। আমি লিঙ্গপূজার সংস্কৃতিতে মানুষ, বিরাট বিপুল মন্দির গড়ে সেখানে লিঙ্গ স্থাপন করা হয়। অমরনাথের দুর্গম পথ মানুষ পাড়ি দেয় একটি তুষারনির্মিত লিঙ্গ দেখবে বলে। আমরা গৌরীপিঠে সশ্রদ্ধ মাথা ঠেকাই। রামায়ণ (তুলসীদাস বা কৃত্তিবাসের নয়, মূল বাল্মিকীর) বা মহাভারত যারা পড়েছেন, তাঁদের পক্ষে কামকে লজ্জার চোখে দেখা সম্ভব নয়। লিঙ্গ বা যোনিকে সাহিত্যে অশ্লীল শব্দ ভাবা সম্ভব নয়। মানুষের যে কোনো অঙ্গের মতোই ওরা পবিত্র। ওদের কেউ মূত্রত্যাগের দ্বার ভাববে না আনন্দের দরজা, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি রাস্তার ধারে মুর্গি কাটার দৃশ্যকে অশ্লীল ভাবি। অনেকের ওতে জিভে জল আসে। জিভের জলটাও একটা অশ্লীল ব্যাপার, যদি অনুমতি করেন। জিভ নিজেই একটা অশ্লীল অঙ্গ, যদি সেই চোখে দেখেন, কারন সঙ্গমে তার প্রায় একটি যৌনাঙ্গের মতোই ভূমিকা থাকে। ভেবে দেখলে তো তাহলে জিভ থেকে আসা যে কোনো কিছুই অশ্লীল! যে কোনো শব্দও।
২। আজ যোনি বা লিঙ্গকে ঢেকে রাখতে হয় নিরাপত্তাবোধের অভাবে। বিকারগ্রস্ত সমাজের কারনে। পৃথিবীতে কিছু সম্প্রদায় আছেন, যাদের মেয়েরা স্তন ঢাকেন না। ধরে নেওয়া যায়, তাঁদের সমাজে এর ফলেই পুরুষরা স্তনকে লোভনীয় অঙ্গ ভাবেন না। স্তন তাঁদের পুরুষদের কল্পনায় আসে না। পোশাকের প্রচলন কেন হয়েছিল, এবং কবে হয়েছিল? এ এক প্রশ্ন। যারা জানেন, তাঁরা আলোকপাত করলে ভালো হয়। আমার নিজের ধারণা, পোশাকের প্রচলন লজ্জা নিবারণের জন্য হয়নি। তার প্রচলন হয়েছিল আবহাওয়া নিবারণের জন্য। অনেক পরে বিকার দেখা দিল। মেয়েরা যদি স্তনের বদলে গলা আর ঘাড় ঢেকে রাখতেন, পুরুষের কল্পনা ওদের প্রতিই ধাবিত হত। চিত্তবিকার যেটাকে বলে, সেটা তখন ওই অঙ্গকেই আশ্রয় করত। আজ সমাজের পারভার্সন যোনি-লিঙ্গ-স্তনকে আশ্রয় করেছে। কিন্তু সেই কারনে যদি তাদের যেকোনো নামে সাহিত্যে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া হয়, সেটা জবরদস্তি। সেটা বিকারের চেয়েও বেশি কিছু। সেটা ভণ্ডামি।এবার কেউ যদি বলেন তবে কি মানুষ আজ ন্যাংটো হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়বে? আমি বলব... না। সাহিত্যটা সমাজের দর্পণ, অবশ্যই, কিন্তু দর্পণেও প্রতিচ্ছবিই থাকে, আসল ছবিটা নয়, ডান হাতকে আয়নায় বাঁ হাত মনে হয়।
৩। গুরুজনের পা স্পর্শ করে প্রণামের প্রচলন কবে থেকে এবং কেন হল? এর উত্তরও বিদগ্ধজন দিলে ভাল হয়। আমি অতটা পুড়িনি, থুড়ি, পড়িনি। আমার ধারণা ওটা এই কারণে করা হয় যে মানুষ পা-কে খুব ঘৃণিত অঙ্গ মনে করে। ওটা মাটি ছুঁয়ে থাকে। ময়লা হয় অনবরত। পুরাকালে তো জুতো ছিল না এত ভালো ভালো। খাদিম’স ছিল না। কারো পা ধুয়ে জল খাওয়া তাই একটা বিরাট শ্রদ্ধা প্রদর্শন আমাদের দেশে। মায়ের স্তন স্পর্শ করে প্রণাম, বা পিতার লিঙ্গ স্পর্শ করে প্রণামের প্রথা যদি থাকত, মনে হয় তা দিব্য হত। অনেক উচ্চমার্গের একটা প্রকাশ হত। বিকার অনেক কমত। কিন্তু সে ভেবে লাভ কী? প্রণামই তো উঠে যাচ্ছে ধীরে ধীরে!
.
আমার এটুকুই ধারনা এসব ব্যাপারে। আমি পণ্ডিত নই। খুব সম্প্রতি ফেসবুকেই আমাকে ‘ঘাটাল স্কুলের অর্ধশিক্ষিত গ্রাম্য’ আখ্যায় ভূষিত করেছেন একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। তাঁর ধারণাটাকে আমি খুব ভুল মনে করি না। কিন্তু যতই অশিক্ষিত হই, আমি আমার নিজের অবস্থান অনুসারে লেখালেখি করে যাচ্ছি, নিজের কথা বলে যাচ্ছি। কাম নিয়ে যখন কিছু লিখি, আমি চেষ্টা করি যাতে বাংলা সাহিত্যের কাম নিয়ে যে ধারাবাহিক রূপকথা আর ব্যবসা রয়েছে, সেটাকে ছিঁড়ে দেওয়ার। চেষ্টা করি কাম যেন আরেক রিপু মোহ-র সঙ্গে সাঁট করে সাহিত্যকে বিনোদনমূলক না করে। কামকে তার প্রকৃত রূপে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি। কারন তার আড়াল সরে গেলেই তার আর কোনো অমঙ্গলের শক্তি থাকে না। বিকার অপসৃত হয়। কেউ কেউ স্বীকার করছেন। কেউ কেউ শিকার করতেও চাইছেন। আমি আমার সাধ্যমতো প্রণাম আর আত্মরক্ষাটুকু চালিয়ে যাচ্ছি, যতটা পারি।"



এরপর শুরু হয় নানান সময়ে নানান বিষয়ে আমাদের ইনবক্সে কথা চালাচালি। খেজুরে আলাপ নয়, মূলত তা সাহিত্য সম্পর্কে ওর ভাবনাকে ছুঁতে চেয়েই।



"আপনি লিখেছেন, 'আসলে একজন কবি নষ্ট হয়ে যায় যখন সে কবিতা লিখতে জানে।' একজন কবিও আছেন যিনি কবিতা লিখতে জানেন না? আপনি নিজে জানেন না? "



"সব কবিরই শুরু কবিতা লিখতে জানা থেকে। কিন্তু তার কবিতা লেখা শুরু হয়, যখন সে না-জানার খেলায় পা দিতে পারে। তখন সেই সেই নর্তকের মতো হয়, যে নাচের প্রতিটি মুদ্রাই জানে, কিন্তু মুদ্রারাক্ষস হয়ে উঠেছে। কবিতাই তখন কবিকে গড়ে নেয়। পাঠক তাকে নিতে দেরি করে। অভ্যাস নিয়ে দ্বিধা করে। কিন্তু তাকে না নিয়েও অস্বীকার করতে পারে না। কবি তখন বাড়ির বাইরের ল্যাম্পপোস্ট, শীতের রাতে দাঁড়িয়ে আছে। আর লিখতে জানা কবিটিকে নিভিয়ে পাঠক ঘুমোচ্ছে।"


"আপনার সাহিত্য-ভাবনা নিয়ে গদ্যগুলো, ফেসবুকের পোস্টগুলো পড়তে ভালো লাগে।"

"আপনি কাজের কথাকে গদ্য বলেন কেন? ‘কমলকুমার মজুমদার আর অমিয়ভূষণ মজুমদার কি স্বর্গে শিউরে উঠছেন?"

"কাজের কথাও যখন আর শুধুমাত্র কেজোকথা থাকে না, তাতেও যখন নিজস্ব প্রসাদগুণ পাই..."

"প্রসাদগুণ গদ্যের শত্রু। ওই বিষেই অনেক বড় লেখক শেষ অবধি এন্টারটেইনার হয়ে যান। উদাহরণ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিমল কর। ওটা আসলে কবিদের জিনিস। রবীন্দ্রনাথ শেষ বয়সে বুঝেছিলেন। বঙ্কিম মধ্যবয়সেই বুঝেছিলেন কিন্তু ক্লান্তি আর ব্লাডসুগারে শেষ হয়ে গেলেন। প্রসাদগুণ কবির গুণ, গদ্যকারের দোষ। গদ্যের স্টাইলে সামুরাই সোর্ড লাগে।"

"আচ্ছা, আপনার কালকে পোস্ট করা কবিতাটা যে ছুঁতেই পারলাম না, পাঠক হিসাবে আমার এই ব্যর্থতার কারণ কী বলে আপনার মনে হয়? মেধার অভাব? আবেগ বা অনুভব আমার কম নেই বলেই আমার বিশ্বাস। নাকি কবিতা সম্বন্ধে আমার এতদিনের সংস্কারই এই ব্যর্থতার মূলে?"

"এটা কিন্তু আমার একটা খুব উচ্চাকাংক্ষী লেখা নয়। মজা করেই লেখা। আমার যেটা মনে হয়, আপনি কবিতার ভাষাকেও সামাজিকভাবে পেতে চান। এটা সংস্কার তো অবশ্যই। মেধার অভাব নয়। মেধার প্রাচুর্যই এর কারণ। আপনি বিশ্লেষণের লোক। আমার ওই লেখাটা আমি ছেড়ে দিয়েছি পাঠকের সংশ্লেষের জন্য। আপনি লেখাটাকে নিন। তারপর দেখুন ও কী বলছে। খুব বেশি কিছু বলবে না। হয়ত দেখবেন একটা ঝিলিমিলি নদীতে একটা ব্রিজ তৈরি হচ্ছে। একটি মেয়ে স্নান করছে নদীতে। আপনি পিকনিকে আছেন নদীচরে। মহাপৃথিবীকে পায়ের তলায় পাচ্ছেন। আমি সত্যিই মেধার জন্য লিখি না। সেটার জন্য গদ্য লিখি। আমি কবিতাটা লিখি সংবেদনের জন্য। আর লোকে সেটাকে মেধায় পেতে চায়। আমার একটা ইমেজ আছে কিনা... মেধাবী লোকের ইমেজ। সেটার ভিতর দিয়ে লোকে আমার কবিতাকে দেখতে চায়। প্রথমেই একটা দেওয়াল- আমার ইমেজ। অনুপম যখন লিখেছে নিশ্চয়ই খুব গূঢ় কিছু ব্যাপার আছে। একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে নেয়।এটাকে একটা স্ট্যাটাস করে দিলাম। আপনি আমাকে না চেয়েও উদ্বুদ্ধ করে চলেছেন। "

পাঠকের নিষ্ক্রিয়তায় আঘাত করার অভিপ্রায়ে নাকি শব্দ বা বাক্য কেটে দেন। বলেছেন, ' কাটা অবস্থাতেই শব্দ ও কথাগুলো থাকলো কবিতায়। যে কোনো পাঠক ওই কাটা শব্দ বা কথাকে জুড়ে নেবেন, অথবা আমার কাটাকেই মেনে নেবেন। পাঠকের আলস্য কেটে যাবে। আমাকে আর কোনো পাঠকেরই পাঠ পরিচালনার অলীক ভারটা বইতে হবে না।' কিন্তু শিল্পীর সৃষ্টির রসগ্রহণের জন্য সে সক্রিয় হবে, কবির সৃষ্টিতে অনিশ্চয়তা সে উপভোগ করবে কেন? তাজমহলের সামনের দুচারটে গম্বুজ ভেঙে নিচে ফেলে রাখলে, দুচারটে প্যানেল এলোমেলো করে রাখলেই কি রসিক দর্শক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠবে? নাকি তার রসগ্রহণে বিঘ্ন ঘটবে? আপনার কবিতায় কাটা শব্দ তো আমার বিরক্তি ঘটায়।


"সেটা নির্ভর করছে আপনি কোন স্তরের পাঠক তার উপরে। যে স্তরের পাঠক নিজে কবিতা লিখতে চায়, কিন্তু পারে না, খুব ভালো করে জানে কী করে লেখা হয়, সেটাতেই যে অভ্যস্ত, আমার কাটা শব্দ তাকে বিরক্ত করতেই পারে, কারণ তার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া কবিকে আমার কবিতা প্রশ্ন করবে, জাগাতে চাইবে। সে নিজের দক্ষতার ব্যাপারে যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলে, আমার কবিতা তাতে আঘাত করবে। কিন্তু যে পাঠক লেখে না, কিন্তু পড়ে, যার কবিতার নতুন দিশার প্রতি ঔৎসুক্য আছে, যে নিজে কবিতা লিখলেও তাতে দক্ষতা নয়, আকাঙ্ক্ষা আর বিস্ময়ের উৎসার থাকে, সে এটাকে গ্রহণ করবে। সেরকম পাঠক হয়ত বাংলাভাষায় ৬০-৭০ জন আছে। আপনি এখনও অবধি তাদের মধ্যে পড়েন না। আপনার লেখালেখি আমি দেখেছি। আপনি তাজমহলের যে রূপ দেখেছেন, ভাবুন পাবলো পিকাসোর হাতে পড়লে কী হত? গম্বুজগুলো কিন্তু আর তাদের নির্ধারিত জায়গায় থাকত না। তাই না? এনট্রপি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধর্ম। যে শিল্প যে কবিতা তাকে অস্বীকার করে, সে জীবনের সঙ্গে চলছে না। কে বিরক্ত হল, কে অনুরক্ত হল, সেটা ভেবে তো লিখব না। ওগুলো নিজের থেকেই জুটে যাবে। সেই মহাবিস্ফোরণের পর থেকেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এনট্রপি বেড়ে চলেছে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ছুটছে, প্রসারিত হচ্ছে, দূরত্ব বাড়ছে ক্রমেই। দূরত্ব জীবনের ধর্ম, বেঁচে থাকার শর্ত। তার সঙ্গে বোঝাপড়া করেই বাঁচতে হবে। অগ্রগতি নেই। আছে শুধু বিস্তার। এই যে লেখাটা আপনার দিকে যাচ্ছে, এখানে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি এসে পড়লেই আমার আর আপনার মধ্যে বাঁক ধরবে, সময় আর স্থানের পাঁউরুটিতে আমি-আপনি হয়ে পড়ব অতীতচারী, হতে পারে আমার বয়স তার ফলে কমে যাবে আপনার চেয়ে, অথবা আপনিই হয়ে যাবেন সাহিত্যের শিশু। আমার আর আপনার সাধের পাঁউরুটিতে তৃতীয় ব্যক্তি একজন ছুরি ছাড়া তো কিছু নন। আর যদি আমি-আপনি ভবিষ্যতে যেতে পারি, তৃতীয় ব্যক্তিকে বুড়ো করে দেওয়া যায়। শেষ অবধি অতীত বলুন, আর ভবিষ্যৎ, সে তো এখানেই আছে, এখনই অতীত, এখনই ভবিষ্যৎ।"


"লিখেছেন,'নিজের পছন্দের বাইরের কবিতাকে ধ্বংস করার, অপমান করার প্রবণতা পাঠকের মধ্যে মাথা চাড়া দেয়।' কিন্তু আমার ধরণা বেশিরভাগ রসিক পাঠকই বিপরীত ধর্মী কবির কবিতা অক্লেশে উপভোগ করেন। বরং এই মৌলবাদ পাঠক নয়, কবিদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়।"


"আপনি বিপরীতধর্মী কবিতা আর পছন্দের কবিতা ঘুলিয়ে ফেলেছেন। পছন্দের বাইরের কবিতাকে ধ্বংস করার যে প্রবণতা, সেটা এখানে অর্গলমুক্ত হয় নিন্দা আর গালিগালাজের মাধ্যমে। মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, সুনীল, জয় কেউই সেটা থেকে রেহাই পাননি। এখানে যুক্তি কাজ করে না। জিতের ফ্যান ক্লাব আর দেবের ফ্যান ক্লাবের মতো হয়ে যায় ব্যাপারটা। রসিক পাঠককে নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু বাংলা বাজারে যারা ঘোরাফেরা করে, আপনি আমি যাদের নাম জানি, পরিচিত, প্রায়ই দেখা হয়ে যায়, তারা খুব কম ক্ষেত্রেই রসের সন্ধানে কবিতায় এসেছে। তারা এসেছে গুড় আর পাটালির খোঁজে। পাটালির রং আর আকার এদিক সেদিক হয়ে গেলে তাদের ব্যবসায়িক বা সাংসারিক বিঘ্ন দেখা দেয়। মুখ থেকে 'বিপ্‌ বিপ্‌' বেরোতে থাকে তখন তাদের।"


"একজন কবি তার শৈলী ছাড়া কিছু নয়।" আপনি বারবার কবিতার আলোচনায়, পুনরাধুনিকের আলোচনায় রামপ্রসাদের কথা বলেন। রামপ্রসাদকে যদি কবি নাও বলেন, একজন সেক্সপীয়র, রবীন্দ্রনাথ বা সিলভিয়া প্লাথ যে টিকে আছেন, আমরা যে তাদের কাছে বারবার যাই সে শুধুই শৈলীর জন্য?"


"রামপ্রসাদ কবি নন? কে বলে? রামপ্রসাদ একজন অতুলনীয় কবি। এমনকি রামকৃষ্ণও একজন কবি। নাহলে কালো মেঘের সামনে উড়ে যাওয়া বকের সারি তাঁকে সমাধিস্থ করতে পারত না। আপনি এই মুহূর্তে বসে যদি রামপ্রসাদের দিকে তাকান, তাঁর শৈলী দেখতে পাবেন না, কারণ আপনি সেটায় অভ্যস্ত হয়েছেন, আপনার চোখেই পড়বে না। কিন্তু যদি মুকুন্দরামের সাপেক্ষে তাকান, দেখবেন একটা নতুন শৈলী, যা তাঁর আগে ছিল না। শৈলী কখনও খোয়ানো যায় না, খোয়ালে কবির কিছু থাকে না। এমনকি নগ্নতার মধ্যেও একটা শৈলী থাকে। সেটা অতিরেক থেকে মুক্ত হওয়ার শৈলী, গয়না খুলে ফেলার শৈলী। ইয়েটস তাঁর 'the coat' নামক কবিতায় বলেছিলেন 'there is more enterprise in walking naked।' সেই এন্টারপ্রাইজটা খেয়াল করুন। দেখবেন সিলভিয়া প্লাথের ওই রিক্ততাও একটা শৈলী। যে সাধনা লাগে একজন জেন সাধকের একটা ক্ষুদ্র কবিতায় পৌঁছতে। কবির সাধনা হল শৈলী আর বিষয়ের একীকরণে পৌঁছনো। কিন্তু অনভ্যস্ত পাঠক এসে প্রথমেই শৈলীটা দ্যাখে। তার মনে হয় ওটা তার মাতৃভাষা বা মাতৃদুগ্ধ নয়, বরং এসিডিক কিছু যাতে তার ভাষাপৃথিবীর ছানা কেটে যেতে পারে। বিষয়টাই শৈলী। শৈলীই বিষয়। "

"তা কী করে সম্ভব? দুটোই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, এক কী করে হয়, বুঝিয়ে বলুন।"


"যেভাবে মঞ্চে নর্তকী তার নাচের সঙ্গে এক হয়ে যায়, তার অর্জন আর তার স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যে কোনো ভেদ থাকে না। কিন্তু যারা নাচ বলতে গোবিন্দা বা দেব বোঝে তাদের সমস্যা।"


"কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ততা এক জিনিস আর ব্যতিক্রমী হতে চেয়ে নর্তকীর এমন কিছু করা যা রসগ্রহণে বিঘ্ন ঘটায়..."


"দর্শক ধাক্কা খেলে স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিন্তু একরকমের অসাড়তা। বুনুয়েলের 'আন্দালুশিয়ান ডগ' দর্শককে ধাক্কা দিয়েছিল। লোকে অকথ্য প্রতিক্রিয়া দিয়েছিল। মনে করেছিল ইচ্ছাকৃতভাবে সাজিয়ে কাজটা করেছে যাতে শকড হয় দর্শক। আজ কি সেটা মনে হয়? স্বতঃস্ফূর্ততা মানে তো স্বাভাবিকতা নয়। সেখানে নির্মাণ তো থাকবেই। সিদ্ধান্ত থাকবে। তাই না? পটি করা আর কবিতা লেখা তো এক জিনিস হতে পারে না।"


"বলছেন, সে রকম পাঠক হয়তো বাংলা ভাষায় ৬০/৭০ জন আছে। ব্যাস? একমাত্র এরাই আপনার উদ্দিষ্ট পাঠক?"


"হ্যাঁ, ঐ ৬০-৭০ জন পাঠক আমার লক্ষ্য। কিন্তু তাঁদের কাছে পৌঁছতে হলে তো বাংলার সমগ্র জনসংখ্যা পেরিয়েই পৌঁছতে হবে। কাজেই যে কোনো পাঠকই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।"


"অঞ্জন চৌধুরী বা সুখেন দাসকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা বা খিল্লি করার প্রতিবাদে আজ দেখলাম পোস্টে লিখেছেন, 'সংস্কৃতিতে কোনো কিছুকেই খিল্লি করে ব্রাত্য করে রাখা চলে না, যদি তার জনগ্রাহ্যতা থাকে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে জনগ্রাহ্য কবিতা বা গল্প লিখিয়েদের নিয়ে নিজে খিল্লি করেন কেন?’

"আমি মনে করি এই যে যাত্রাপালা ব্যাপারটা প্রায় মুছেই গেছে, তিনদিক খোলা মঞ্চে যাত্রা আজকের জেনারেশনের ছেলেমেয়েরা দেখেনি, এটা এটা বিরাট ক্ষতি। যাত্রা ছিল বাঙালির ভাবমোচনের একটা খুব সুন্দর পথ। সেই পথেই এসেছিলেন সুখেন দাস, অঞ্জন চৌধুরীরা। এখন দেখুন, আপনি নিশ্চয়ই একটা জমজমাট যাত্রাপালার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নাটকের তুলনা করতে যাবেন না? ‘তিন পয়সার মা’ বা ‘সতীর চিতা জ্বলছে’-র সঙ্গে কেউ ‘রক্তকরবী’র তুলনা করে না। করাটা উচিত নয়। যে যার জায়গায় আছে। সুখেন দাসের জায়গা আর সত্যজিতের জায়গাও একই নিশ্চয়ই নয়। গল্পলিখিয়েদের জীবনেও খিল্লি করিনি। বরং গল্প লিখতে বসেও গল্প না বলে স্টাইলের পাঁয়তারা করাটাই আমার বরদাস্ত হয় না। উমবের্তো একো, ওরহান পামুক, পাউলো কোহেলো, হারুকি মুরাকামিও কিন্তু গল্পই বলেন। এই যে কোহেলোর নাম বাকিদের সঙ্গে একত্রে করলাম এতেও কারো আপত্তি হতেও পারে। বাঙালি আঁতেলদের কথায় খুব কিছু এসে যায় না। কার্লোস ফুয়েন্তেস বা গার্সিয়া মার্কেসও কিন্তু গল্পটাই সুন্দর করে বলেন। কাহিনি জিনিসটা বাঙালিদের কাছে তো বহুযুগ ধরেই সাহিত্য সংস্কৃতির‌ই অঙ্গ। একদা পাঁচালি লেখকরা যা করেছেন, মঙ্গলকাব্যের প্রণেতারা, সুখেন আর অঞ্জন সেটাও করেছেন। ওঁরা এমন করে গল্পটা বলেছেন যে সমাজের সকল স্তরে যেতে পেরেছেন। স্মরণজিত চক্রবর্তী বা প্রচেত গুপ্তদের সেই সাধ্যি নেই। আমি পড়ার চেষ্টা করে দেখেছি ওঁদের তো বাংলা লেখাটাই ঠিকঠাক রপ্ত হয়নি! অথচ আজ না কি ওঁরাই মস্ত সব লেখক। মিডিয়া ওঁদের চাপিয়ে দিয়েছে, আর জনসাধারণ গ্রহণ করেছে। এটা সাহিত্য নয় বলব না। এমন সাহিত্যেরও প্রয়োজন হয়ত আছে। কিন্তু সেই প্রয়োজন আজকের নয়। সেই প্রয়োজন কাদের? যারা আজও গল্পটা শুনতে চায়, কিন্তু গল্প বলার লোক খুঁজে পাচ্ছে না। তাদের সাহিত্যের বোধটাই জন্মায়নি, মিডিয়াকে ছাপিয়ে প্রকৃত লেখকদের খোঁজ তারা পাচ্ছে না, চেতনার বিকাশও হয়নি একটা বিশেষ সীমার পরে, এইসব লেখকদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান সেইসব পাঠকদের খদ্দের বানায় আর সুবিধা লাভ করে। সুখেন বা অঞ্জনের ক্ষেত্রে সেটা বলা যায় না। সিনেমার একটা বিরাট দিক হল ম্যাস এন্টারটেইনমেন্ট। জনতাকে ফূর্তি দেওয়া। জনতাকে কান্নার আনন্দ দেওয়া। জনতাকে আবেগের সুযোগ দেওয়া। অর্থাৎ ক্যাথারসিস। যেটা একসময় যাত্রাপালাগুলো করত। এখন ডেইলি সিরিয়ালগুলো করছে। সাহিত্যের তো আজ আর সেই দায় নেই। কোনো সাহিত্যিক আজ সেই দায় নিলে তাঁকে বাজারি বলতেই হবে। সমস্যাটা হল, এই বাজারি সাহিত্যিকদের যখন বড় লেখকের জায়গা দেওয়া শুরু হয়। স্মরণজিত যদি বড় লেখক হন, মলয় রায়চৌধুরী তাহলে কী? এই উত্তরটা তো দরকার, তাই না? বিশেষ করে যখন বাংলাভাষা আর সাহিত্যটা টিকবে কি না, এই নিয়েই চারদিকে প্রশ্ন শুরু হয়ে গেছে। বাজার মানেই খারাপ নয়। কিন্তু কীসের বাজার সেটা দেখতে হবে। আর, এত সস্তা সাহিত্য করেও বাজার কি সত্যিই ধরা যাচ্ছে? আজ শারদ সংখ্যাগুলো কত কপি বিক্রি হয়? ত্রিশ বছর আগে কত কপি বিক্রি হত?"

"দেবানন্দের অশীতিপর বয়সে চার্জশিট বা সেন্সর-এর মতো ব্যর্থ সিনেমা বানানোকে ডিফেন্ড করে বলেছেন, উনি রিটায়ার করতে চাননি, পাস্ট টেন্স হয়ে থাকতে চাননি। নিজের ক্রিয়েটিভিটির তলানিটুকু সম্বল করে লড়তে চেয়েছেন, খেলায় থাকতে চেয়েছেন, স্বপ্নে বাঁচতে চেয়েছেন।' বৃদ্ধ কবিদের ক্রিয়েটিভিটির তলানিটুকু, তাদের স্বপ্নে বাঁচতে চাওয়াটুকুকে এক‌ই সম্মান দিতে চান না কেন?"

"দেবানন্দ অশীতিপর হনইনি। উনি ভানুসিংহের মতো চিরতরুণ। মৃত্যুর আগে দেবানন্দ যে সিনেমাগুলো বানিয়েছেন সেগুলোর ব্যর্থতাকে আপনি ভারতীয় সিনেমার সাপেক্ষে মাপলে ভুল করবেন, ওঁর আকাঙ্ক্ষার সাপেক্ষে মাপলে বোঝা যাবে সেগুলো ব্যর্থ নয়, সেগুলো একটা মানুষের নিজেকে সেলিব্রেট করার অসামাজিক চেষ্টা। উনি বিশ্বাস করতেন উনি তখনও ‘গাইড’-এর মতো একটা সিনেমা বানিয়ে ফেলতে পারেন। মরার আগেও সেই চেষ্টা ছাড়েননি। তাতে কার কী ক্ষতি হয়েছে? উনি তো কোনোকিছু আটকে সেই চেষ্টা করেননি! কে বলল আমি বৃদ্ধ কবিদের সম্মান চাই না। তারা যখন তরুণদের পথে এসে দাঁড়ায় তখন তাদের ভ্যাম্পায়ার বলি। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, আলোক সরকার, সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, এঁদের প্রতি আমি একটুও অসম্মান দেখিয়েছি কি? দেবানন্দ আজীবন কাজ করেছেন, করে যেতে চেয়েছেন, ক্যামেরার সামনে না আসতে পারলে সম্ভবত অনেক আগেই উনি মরে যেতেন। কিন্তু তাতে কোনো তরুণের আত্মবিকাশের বা প্রতিষ্ঠার অসুবিধা হয়েছে কি? দেবানন্দ কোনোদিন তরুণদের অস্বীকার বা রোধ করার প্রয়াস করেছেন কি? দেবানন্দের হাত ধরে, ‘নবকেতন’ ব্যানার থেকে কতজন স্টারের জন্ম হয়েছে একবার শুধু হিসাব করুন। তাঁর শেষ ছবিতেও তরুণদেরই সুযোগ দিয়েছেন। দেবানন্দের সঙ্গে কোবিদের তুলনা হয় না। জীবনের প্রায় অন্তিম ক্ষণ অবধি তো রবীন্দ্রনাথও লিখে গেছেন। তাঁর সেইসব কবিতার মূল্য তিরিশের দশকের কবিদের চেয়ে ঢের বেশি। বয়স ফ্যাক্টরই নয়।"


"আজ মলয় রায়চৌধুরীর জেল না হলেও কি উনি হাংরির মুখ হয়ে উঠতেন? উনি কি ঐ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ এখন‌ও আত্মপ্রচারের জন্য অপ্রয়োজনেও ব্যবহার করেন বলে মনে হয় না?"

"আমার যতদূর জানা আছে, মলয় রায়চৌধুরীই তো আহ্বায়ক ছিলেন ওই মুভমেন্টের। বাকিরা অনেকেই পরে ওঁকে ল্যাং মেরেছিল। কিন্তু আজ তারাই হাংরির খ্যাতিতে ভাগ বসাতে চায়। মলয়দা এখনও দারুণ লিখছেন। মলয়দার যদি জেল না হত, তাহলে কী হত? জানি না। যেমন জানি না রবীন্দ্রনাথ নোবেল না পেলেও ২৫শে বৈশাখে ইস্কুল কলেজে ছুটি থাকত কি না। মলয়দা জানেন যদি নিজের অমরত্বের আয়োজন উনি নিজেই না করে যান, ওঁর হয়ে সেই ব্যবস্থা কেউ করবে না। এটা রবীন্দ্রনাথও করে গেছেন। বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাত। তার কুলীনতা নেই, অন্তত সেন আমল অবধি। এটা সম্ভবত একটা সমষ্টিগত মানসিক সমস্যা আমাদের সমাজে। বাঙালির অতীতে যেহেতু আর্যাবর্তের গৌরব নেই, সে তার অতীত ভুলতেই চায়। এখানে তাই যাঁরা বড় বাঙালি, তাঁরা নিজেদের স্মৃতিরক্ষার আয়োজন নিজেরাই করে যেতে বাধ্য হন, অন্যথায় তাঁদের মুছে যেতে হয়। মলয়দা সেটাই করছেন। যদি তিনি অনবরত হাংরি নিয়ে কথা না বলে যেতেন, দেখতেন সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ও নিয়ে আলোচনাই হত না। যেমন ফেসবুকে দেখবেন পবিত্র মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে কোনো কিছু উচ্চারিত হয় না। অথচ পবিত্রদাও ষাটের দশকে ধ্বংসকালীনের মতো মুভমেন্ট করেছিলেন, ‘কবিপত্র’-এর মতো পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন অর্ধশতক ধরে। তাঁকে নিয়ে কথা কই? আমি নিজেও যদি ফেসবুকে নিজের ঢাক তুমুল না বাজাতাম, সম্ভবত আপনি জানতেন না অনুপম বলে কেউ আছে, বা তার ইন্টারভিউ নেওয়া যায় নিজের কাগজের জন্য।"

"আপনার নাকি অনেক শত্রু। আপনার লেখা উড়িয়ে দেয় ফেসবুক থেকে। আপনার জনপ্রিয়তাকে ঈর্ষা করে। আপনার ক্ষতির চিন্তা করে। আপনি নিজেই নিয়মিত এসব লিখে পোস্ট করতে থাকেন। আমার তো সন্দেহ হয় এসব আপনার আত্মপ্রচারের স্ট্র্যাটেজি।"

"দেখুন শত্রু তো রাস্তার কুকুরেরও থাকে। আমি আদৌ জনপ্রিয় নই। এই মুহূর্তে বাংলা কবিতায় কেউ জনপ্রিয় কবি নন। কিছু মিডিয়া কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সেলিব্রিটি অবশ্যই আছেন। তাছাড়া জনপ্রিয়তার জন্য যেমন ঈর্ষার শিকার হতে হয়, জনপ্রিয়তা না থাকার জন্যও হয়। দুটো মেরু থাকে। দুটো মেরুর দিকেই ঈর্ষা পড়ে। আমার ক্ষতির চিন্তা করার লোক আছে কি না, সেটা কিছুদিন আমার ফেসবুক একাউন্ট আপনার হাতে থাকলেই জানতে পারবেন। আমার লেখার প্রশংসা করুন, একটা রিভিউ করুন আমার বইয়ের, ইনবক্সেই তাদের দেখা পেয়ে যাবেন। লিংক উড়ে গিয়েছিল এটা সকলেই দেখেছে। যাতে সেই লিংক আর না ওড়ে সেজন্য এবার 'বাক্‌' প্রকাশ করার আগে আমি নিজে ছাড়া কাউকে জানাইনি কবে বা কখন বেরোবে। বেরোবার পরেও বলা ছিল যেন মেসেঞ্জারে লিংক না দেওয়া হয়। এবং এবার সেটায় কাজ হয়েছে। উড়েছে অনেক পড়ে। ওড়ার পরে যখন সেটা নিয়ে আলোচনা শুরু হল, তারা হয়ত দেখল এতে শাপে বর হয়ে যাচ্ছে। লিংক ফিরে এল। তার আগে বালুরঘাটের দুজনকে ব্লক করেছিলাম। ব্লক করার ৫ মিনিটের মধ্যে লিংক ফিরে আসে। এটা কাকতালীয় হতে পারে। কাকাতালীয়ও হতেই পারে। সন্দেহ করি। যদি নির্দিষ্ট জানতাম সাইবার সেলে গিয়ে ডায়েরি করে দিতাম। আমি যে জনপ্রিয় নই, এর ফলে অনেক কিছুই সহ্য করতে হয়। সেটা হয়ত জনপ্রিয় হলে থেমে যেত, কিন্তু, তখন অন্য আক্রমণ শুরু হত। এটাই হয়ে থাকে।"


"দেখলাম আজ পোস্ট দিয়েছেন, 'সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত এখন করছি জনসাধারণের জন্য কবিতা লিখে, এমন কবিতা যা সকলেই বুঝবে। আবার হয়তো অন্য পথে যাবো কিছুদিন এমন লিখে।...' ইচ্ছা না হলে কিছুদিন কবিতা লিখবেন না, কিন্তু একদিনের জন্যও বা এমন কবিতা লিখবেন কেন যা সবাই বোঝে? এমন কবিতার বিরুদ্ধেই যে এতদিন এত কথা বললেন সে সব‌ই কি তাহলে অর্থহীন হয়ে যায় না?"

"আপনি সম্ভবত শ্লেষটা বোঝেননি। আইরনিটা বোঝেননি। কবিতা কখনওই সবাই বোঝে না। সুকুমার রায়ের কবিতাই তো বাঙালি বোঝে না। বাচ্চাদের জন্য মজার ছড়া ভাবে। বাদ দিন। কুমুদরঞ্জন মল্লিকের সরল কবিতাও বোঝে না।"

" শুধু কবিতা কেন, কোনো কিছুই সবাই বোঝে না। সব প্রেমপত্রও কি যাদের উদ্দেশে লেখা তারা সবাই বোঝে? সবাই বোঝে বলতে আমি সেই লেখা বুঝিয়েছি যার শৈলী জটিল নয়।"

"কবিতাকে যদি ইনকাম ট্যাক্সের হিসাবের মতো বুঝতে যায়, তাহলেও বিপদ। সবাই বোঝে এমন কবিতা লিখছি, এটা বলা যায় না। এটাকে বাচ্যার্থে নিলে আমি কবি নই, আর আপনিও কবির ভাষা বোঝেন না। আমার এখনকার কবিতা আগের চেয়েও দুরূহ। 'প্রকল্প ও স্ফটিক'-এ শৈলীর জটিলতা ছিল, কিন্তু যা বলার ছিল সেটা খুবই সরল, এবং সেটা শৈলীকে অনুসরণ করলেই পাঠক ধরতে পারবে। আমার এখনকার কবিতায় শৈলী উহ্য হয়ে গেছে। আমি এখন আর আগের মতো লিখছি না। কিন্তু, যেহেতু আমি ঠোঁটকাটা ও অহংকারী, এই কবিতা বুঝতে হলেও ভিতরে কম্পাস এবং মানচিত্র এবং শুকনো মাংস ও শাকসব্জি থাকা চাই।"


"না, সবাই বুঝবে কথাটা আমি বাচ্যার্থে নিই নি। শৈলীর জটিলতা থেকে বিষয়ের জটিলতা অনেক শ্রেয় বলে আমার মনে হয়। আপনার কী মত?"


"বিষয় আর শৈলী এক হয়ে যাওয়াই সবচেয়ে ভাল, যেখানে দুটোকে নিয়ে আলাদা করে কথা বলতে হবে না। জটিলতা তো একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। উৎপলকুমার বসুর মতো করে বলতে গেলে, পাহাড় দেখবেন আর জটিল হবেন। জীবন স্বয়ং এত জটিল, সেই জীবন থেকে উঠে আসা কবিতা সরল কী করে হবে? হ্যাঁ, সহজ হতেই পারে। যেমন রবীন্দ্রসঙ্গীত। শুনতে কত সহজ লাগে, কিন্তু ডুব দিলে অতল। কোন মহৎ কবি সরল কবিতা লিখতে পেরেছেন বলুন? চেষ্টাকৃত জটিলতা, আর চেষ্টাকৃত সরলতা, দুটোই প্রতারণা। সেই প্রতারণা কবিতার জন্ম দেবে, এমন স্বর্গীয় কিছু নয়। নেহাত কেরামতি মাত্র।"


"আপনার স্ত্রী ছাড়া পরিবারের অন্য কাছের মানুষেরা যেমন বাবা-মা, বোন, শাশুড়ি, এরা আপনার উপন্যাস পড়েছেন? আপনার মেয়েকে কোন বয়সে পর্ণমোচি উপহার দিতে পারবেন?"

"আমার বোন নেই। বাবা এই মুহূর্তে সেরিব্রাল স্ট্রোকের কারণে বেশ অচলাবস্থায় আছে। মা আজকাল খবরের কাগজ ছাড়া কিছু পড়ে না। শাশুড়ির সাহিত্যের প্রতি কোনরকম আগ্রহ নেই। 'পর্ণমোচী'-র যে কপিগুলো প্রকাশক দিয়েছে, সেগুলো প্রকাশ্য জায়গাতেই রাখা আছে। মেয়ে ইচ্ছে করলেই পড়তে পারে। ওর বয়স প্রায় ১৪। এখন পড়তেই পারে। বছর তিন-চার আগে হলে পড়তে দিতাম না। যেমন এখন ওকে তন্ত্রসাধনা বা বাউলদের জীবন নিয়ে কিছু পড়তে দেব না। মাথা ঘুলিয়ে যেতে পারে। ধরুন পঞ্চাশ বছর বয়সী কোনো মানুষকে আপনি তো 'হাঁদা-ভোঁদা' সাজেস্ট করবেন না। এই কারনে নয় যে তার পড়তে নেই। এই কারণেই, যে তার মন হয়ত ওই কমিকসের প্রতি সজীব হবে না। তেমনই সব সাহিত্য সব মানুষের জন্য নয়। আপনার কি মনে হয়, পরে আমার মেয়ে তো বটেই, আমার মেয়ের সঙ্গে যার প্রেম বা সংসার হবে সে 'পর্ণমোচী' পড়বে না? কেন পড়বে না? ওই উপন্যাস অনেক উপন্যাসের চেয়ে সভ্যতার বেশি কাছাকাছি। ওই উপন্যাসের প্রতি মানসিকতা থেকে আজকের একজন বাঙালির চরিত্র আর সামাজিক অবস্থান বোঝা যায়। বোঝা যায় তার মন কতটা অশ্লীল।"

"আপনার সঙ্গে গত প্রায় তিন বছর ধরে যত কথা বলেছি ইনবক্সে ভাবছি বম্বেDuck-এর এবারের বইমেলা সংখ্যায় সেগুলো একসঙ্গে ছাপিয়ে দেব। আপত্তি আছে? জানাবেন।"


"সিওর। আপনি অনেক গোলমেলে প্রশ্ন করেছেন কিন্তু।"


"হ্যাঁ, করেছি। আপনি উত্তরও দিয়েছেন। রাগ-টাগ করেননি বিশেষ। ধৈর্য হারাননি। হা হা হা...।"


"আপনার সঙ্গে কথা বলাটা এনজয় করি। করেছি। আমাদের কথাবার্তা ছাপালে বেশ অস্বস্তিজনক কিছু প্রশ্ন করুন দেখি।"


"না না, সে সব তো এতবছর ধরে অনেক করেছি। আপনি বরং আপনার পুনরাধুনিক ভাবনা সম্বন্ধে সহজ করে কিছু বলুন।’

"এটা নিয়ে ছোট করে বলা মুশকিল। ‘কবিতীর্থ’ থেকে আমার একটা বই আছে- ‘পুনরাধুনিক বাংলা কবিতা কী কেন এবং কীভাবে’। সেখানে সবিস্তারে আছে। খুব সংক্ষেপে বলতে পারি, পুনরাধুনিক কোনো আন্দোলন নয়। এটা একজন কবির ব্যক্তিগত ব্যাপার। পুনরাধুনিক হল একজন কবির একলা জার্নি। সামাজিক আর সাংস্কৃতিক ফাঁদগুলোয় পা না দিয়ে সে চলবে। একজন লিখতে শুরু করলেই তাকে একটা খুড়োর কলে জুড়ে দেওয়া হয়। সেই কলে একজন পুনরাধুনিক কবি বাঁধা পড়বেন না। এটা পোস্টমডার্ন এবং পোস্ট কলোনিয়াল পরিসর। কিন্তু একজন পুনরাধুনিক কবির যাত্রাটা হবে আধুনিক মানুষ হয়ে ওঠার লক্ষ্যে। অর্থাৎ, নতুন আধুনিক। প্রত্যেক যুগের একটা আধুনিকতার দাবি থাকে। যুগে যুগে সেই দাবিটা পালটায়। পুনরাধুনিক কবি তার সময়ের দাবিটা বুঝবে। সামাজিক চক্করে না পড়েও সে সমাজের প্রতি সজাগ থাকবে এবং নিজের দায় পালন করবে। একটা উদাহরণ হয়ে ওঠার দায়িত্ব তার আছে। তাকে ফলো করে যেন আরো কিছু কবি সামাজিক পাঁক থেকে বেরোতে পারে, যদিও সে নেতা নয়, একজন উদাহরণ মাত্র। সাফল্যের চেয়ে সার্থকতাকে সে অধিক গুরুত্ব দেবে। প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার, এমন কি প্রাতিষ্ঠানিক বাঁধা গতের বাইরে গিয়ে নতুন এবং আলোকিত একটা প্রতিষ্ঠান করে তুলবে নিজের জীবনযাপনের পদ্ধতিকেই। সে স্বপ্রতিষ্ঠ হবে। মঞ্চ এড়িয়ে চলবে। কিন্তু নিজের জন্য মঞ্চ বানাবে, যেখান থেকে সে নিজের কথাগুলো বলবে। সে পুরস্কার নেবে না, কিন্তু নিজের চোখে সম্মানিত থাকবে। হতাশাকে সে নিজের পানীয় বানাবে। বিশেষ কোনো পলিটিকাল দলের অংশ হবে না। ক্রমাগত এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দুতে সরতে থাকবে, যে বিন্দুগুলোকে সংযুক্ত করলে আধুনিকের দিকে তার যাওয়াটা স্পষ্ট হবে। সে একজন বৈজ্ঞানিক। একজন কর্মী। এর বেশি জানতে হলে আমার বইটা পড়তে হবে- এটুকু বিজ্ঞাপন দিয়ে দিই।"


                                   

ফেসবুক মন্তব্য