হারানের হারমোনিয়াম

বৈশালী চট্টোপাধ্যায়



হারমোনিয়ামটা বেশ সস্তায়ই পেয়ে গেল হারান l শখ ছিল বহুদিনের l সেই নবরঙ্গের দিনগুলোয় যখন যদু চক্কত্তির আঙ্গুল হারমোনিয়ামের ওপর ছোটাছুটি করে বেড়াত, সেই ইস্তক l

বাপে ঠ্যাঙানো মায়ে খ্যাদানো হারান তখন পনেরোয় পড়েছে l নবরঙ্গের ম্যানেজার বনমালী সাঁপুই ইস্টিশানে ভিক্ষে করতে দেখে নিয়ে এসেছিল দলে l দলে সেসময় ফাইফরমাশ খাটার একটা অল্পবয়েসী ছেলের খুব দরকার l
সেখানেই হারানের এ শখের শুরু l পালার শুরুতে গিরিধারী দাসের ফুলুটের সুরে অলোক বেরার ব্যায়লা যখন কঁকিয়ে কেঁদে উঠত, ঠিক তখনই যদু চক্কত্তি তার কাটোয়ার ডাঁটার মতন আঙ্গুলগুলোকে তড়বড়িয়ে হারমোনিয়ামের চাবির ওপর চালিয়ে দিত l খানিক সুর ভেজে 'হেএএএ মাধবওওও...' বলে গলা তার সপ্তকে তুলতেই কেষ্ট সাজা শুঁটকো ভজহরি বিড়িতে একটা জোর শেষ টান মেরে তোবড়ানো গাল আরো ভেতরে ঢুকিয়ে, বিড়িটাকে মাটিতে ফেলে আচ্ছা করে পা দিয়ে ডলে স্টেজে গিয়ে উঠত l সেসময় দর্শকের হাততালিতে হারানের লোম বেমালুম খাড়া হয়ে যেত l

ফলে সুর-তাল জ্ঞান না থাকলেও হারান লুকিয়ে চুরিয়ে টেরাই করত মাঝেসাঝে l তখনই বুঝেছিল ওই ব্যায়লা, ফুলুটকে বাগ মানানো সহজ কম্ম নয় l বরং হারমোনিয়াম জিনিসটা বেশ সুবিধের, যদিও গলা তার বিশেষ সুবিধের নয় l কিন্তু ওভাবে আর কদ্দিন সম্ভব! সাধনা না করলে সিদ্ধিলাভ হবে কী করে? যদু চক্কত্তিকে ধরে বসল হারান l পানটা বিড়িটা খাইয়ে রাস্তা তৈরী করতে করতেই হঠাৎ একদিন দুম করে দল ভেঙে গেল l

তলায় তলায় লোকসান যে এত বেড়ে গেছিল ওপরের কথাবার্তায় মোটেও টের পাওয়া যায়নি l তারপর আর কী! পেটের ধান্দায় যে যার মত ছড়িয়ে পড়ল নানান দিকে l ভাসতে ভাসতে হারান এসে ভিড়ল বিপিন দাসের গেঞ্জি কারখানায় l জীবনটা অন্য খাতে বইতে শুরু করল l

গেঞ্জি কারখানার লাগোয়া মালিকের বাড়ির দিকে কাজের ফাঁকে চোখ চলে যেত l কারণ মালিকের বছর পনেরোর আদুরে মেয়ের সঙ্গীতচর্চা l সে হারমোনিয়াম বাজিয়ে "আমি বনফুল গো" গাইলে উসখুস করে উঠত হারান l তার কতটা গানের টানে আর কতটা উঠতি বয়েসের দোষে তা নিজেই ঠাওরাতে পারত না l কিন্তু বিশেষ সুবিধে হল না সেখানে l বারান্দায় দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ানোর সময় হারানের একগাল হাসি তার ভুরু কুঁচকে দিল l এক ঝটকায় চুল সরিয়ে ঘরে চলে গিয়ে কী লাগালো কে জানে! মুহূর্তের মধ্যে মালিক গিন্নি রণরঙ্গিনী রূপে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন l বাপরে! আর কেউ ও পথ মাড়ায়! দরকার কী বাপু গরিবের ঘোড়া রোগে! শেষমেষ কাজখানাই না...

গেঞ্জি কারখানারই একখানা ঘরে চারজন মিলে থাকাখাওয়া আর মাঝে সাঝে একদিনের জন্যে তারাপীঠ বা দীঘায় ঘুরতে যাওয়া l এই করেই দিন কাটছিল l এমন সময় পাড়ায় এক বাড়িতে আয়ার কাজ নিয়ে এল পার্বতী l যাতায়াতের পথে তার কোমরের দুলুনিটুকু হারানের মনে মোক্ষম দোলা দিল l দিনকতক চোখাচোখি করে ও পক্ষের মন মেপে নিল হারান l তারপর একটা দিন স্থির করে চকরাবকরা একখানা গেঞ্জি পরে গলায় বেশ খানিকটা পাউডার ছড়িয়ে পার্বতীর মুখোমুখি হল l মাস তিনেক ফুচকা, ঝালমুড়ি, এগরোল, মেনকা হল আর হেমন্ত, কিশোরের গান বেসুরে গুনগুনিয়ে ব্যাপারটা ঝালিয়ে নিল l দেখা গেল গানের থেকে বাকিগুলোতেই ও পক্ষের উৎসাহ বেশী l যাই হোক, উভয়পক্ষ নিঃসন্দেহ হলে ফয়সালা হল বকুলতলার ওদিকে ঘরভাড়া করে সামনের বোশেখে সংসার পাতবে দুটিতে l

সেসব পর্বের ঝাঁজ রোদে জলে ফিকে হয়ে তেইশটা বছর কেটে গেছে l গেঞ্জি কারখানা ছেড়ে গলির মুখে ছোট মুদির দোকান দিয়েছে হারান তাও প্রায় বছর পনের l এর মধ্যে শিল্পের সাধনা বলতে সারাদিন দোকানে বসে রেডিও এফ এমের গানে একটু আধটু গলা মেলানো আর মাধব গোঁসাইয়ের কীর্তনের দলে ভিড়ে মূল গায়েনের পোঁ ধরা l

কীর্তনের মাঝে গোঁসাইয়ের সেবার সময় সাধারণত পুরনো হিন্দী বা বাংলা গানের সুরে হারান আর ননী একটু হরেকৃষ্ণ গায় l তখনো হারমোনিয়াম ননীর হাতেই থাকে l একবারই শুধু ননীকে তবলায় ঠেকা দিতে বলে হারান "আছে গৌর নিতাই" -এর সুরে হরেকৃষ্ণ গেয়েছিল কিছুক্ষণ l মাইকে গাঁকগাঁক করে হারানের উল্টোপাল্টা হারমোনিয়াম বাজিয়ে তেড়ে গান আর মাধবের আনতাবরি তবলা পিটুনি শুনে মাধব গোসাঁই খাওয়া ফেলে দৌড়ে আসার পথ পাননি l ফলে হারানের হাতে হারমোনিয়াম ছেড়ে ভরসা করার আর প্রশ্নই ওঠেনি কখনো l


সেই মাধব চক্কত্তিই হারানের ইচ্ছে বুঝে বললেন, "নিয়ে নাও ভায়া l খাসা জিনিস l এ দিয়ে আমার বাবা বিশ্বজয় করেছিলেন l"
তা বিশ্বজয় না করুক কীর্তনীয়া হলধর চক্কত্তির এ অঞ্চলে বেশ নামডাক ছিল সেটা ঠিক l হারানের এককালের বিখ্যাত হবার সুপ্ত বাসনা ফের চাগাড় দিয়ে উঠল l দরদস্তুর ঠিকঠাক করেও পার্বতীকে কী বোঝানো যায় ভেবে না পেয়ে হপ্তাখানেক পাঁয়তারা কষলো হারান l ওদিকে মাধব চক্কত্তি তাড়া দিলেন, "নেবে কিনা বল l নইলে আমার অন্য খদ্দের আছে l" শেষে যা থাকে কপালে বলে লুকোনো কিছু পুঁজি ভেঙে হারমোনিয়ামটা কিনেই ফেলে হারান l

রিক্সা করে হারমোনিয়ামখানা কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে হারানের চারপাশের রাস্তাঘাট, দোকানপাট, লোকজন সব ঝাপসা হয়ে এল l পরিষ্কার দেখতে পেল সামনের বিজয়া সম্মিলনীতে পাড়ার ফাংশানে ঘোষণা হচ্ছে, "এবারে আপনাদের সামনে উপস্থিত হচ্ছেন সুবিখ্যাত হারমোনিয়ামবাদক সুকণ্ঠী শ্রীযুক্ত হারানচন্দ্র দাস l"

এই প্রথম হারানের মনে হল তার নামটা অন্য কিছু হলে বেশ হত l এই যেমন হল গিয়ে বিনয়ভূষণ বটব্যাল বা জ্যোতিপ্রকাশ জোয়ারদার l যাক গে যাক, ধপধপে সাদা ইস্তিরি করা পাজামা পাঞ্জাবিতে হারান হাতজোড় করে স্টেজে উঠছে l সামনের মাঠ তখন দর্শকে ঠাসা l হারমোনিয়ামটার সামনে গুছিয়ে বসে দু'বার গলা খাঁকারি দিয়ে দু'চারটে যুতসই কথা বলে শুরু করতে যাবে, এমন সময় ঝাঁকুনি লেগে রিক্সাটা এমন দুলে উঠল যে আরেকটু হলেই হারমোনিয়ামসমেত হারান একেবারে পাশের খানায় গিয়ে পড়ত l

"আরে ভাই একটু কান্ডজ্ঞান নেই! একটা মূল্যবান জিনিস নিয়ে যাচ্ছি l দেখে চালাও!" রিক্সাওলাকে ধমকে হারানের খেয়াল হয় বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে l পার্বতীর মুখটা মনে পড়তেই পাড়ার ফাংশনে ঝপ করে লোডশেডিং হয়ে গেল l

রিক্সাওয়ালা হারমোনিয়ামটা বারান্দায় এনে নামাতেই শব্দ শুনে পার্বতী বেরিয়ে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালো l
"ওখানা আবার কী এল?"
"ওই মাধবদা বললে যে দলের জন্যে নতুন কেনা হবে, তাই... আমি ভালোবাসি... জানে কিনা অনেকদিন ধরে..."
"ভালোবেসে কি মাগনা দিয়ে দিল?"
"না মানে হ্যাঁ মানে সেরকমই প্রায়... খুবই সস্তায়... "
কী ভেবে খানিক চুপ করে, "হুম বুজেচি l" বলে পার্বতী ঘরে চলে গেল l
এত অল্পে ব্যাপারটা মিটে যাবে স্বপ্নেও ভাবেনি হারান l যাক বাবা! বুকের ওপর থেকে যেন একখানা পাথর নেমে গেল l

রাতেই খেয়েদেয়ে উঠে হারমোনিয়ামটা নিয়ে একটু বসল হারান l পার্বতী কাজ সেরে শুতে এসে ঝাঁঝিয়ে উঠল, "বন্ধ করো দিকি! এই এত রাত্তিরে কোথায় একটু শোবো না তোমার প্যাঁপোঁ! এ আপদ হটাও বিছানা থেকে l" অগত্যা একখানা পুরনো লুঙ্গি চাপা দিয়ে হারান ওটাকে খাটের তলায় ঢুকিয়ে রাখে l

পরদিন দোকানে বসে মন পড়ে রইল হারমোনিয়ামের দিকে l বাড়ি ফিরে তাড়াতাড়ি নাওয়াখাওয়া সেরে একটু উসখুস করে হারান নিজের গামছাখানার দুপ্রান্ত হারমোনিয়ামের হ্যান্ডেলে বেঁধে ওটাকে গলায় ঝুলিয়ে তেতলার ছাতে চলে এল l ভাড়াটে বাড়ির এ ছাতে বিশেষ কেউ ওঠে না l সিঁড়ির ঘরের ওপাশটায় বেশ ছায়া l হারান ওখানেই বসে পড়ে l গরম তেমন নেই l ভালো হাওয়া দিচ্ছে আজ l খানিক হাত মকশো করে হারান নীচু গলায় গান ধরে, "চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে... " l
দু'চার লাইন গেয়ে হারানের আর কথা মনে পড়ে না l কী গান গাইবে ভাবতে ভাবতে এমনিই হারমোনিয়ামে এটা সেটা সুর বাজায় বসে বসে l হঠাৎ কে বলে ওঠে, "বাহ্! বেড়ে হচ্ছে l তোফা হচ্ছে l খাসা সুর মশাই l"
অবাক হয়ে চেয়ে দেখে পাশের বাড়ির ভোম্বলদের ছাতে এক টাকমাথা বুড়ো l আলসে ধরে তার দিকে চেয়ে l
"বাজান বাজান শুনি.. " বুড়োটা আবার বলে ওঠে l
ব্যস! হারানকে আর পায় কে? এরপর দিব্যি দিনকয়েক ধরে দুপুরের দিকে ছাতের আসর জমে ওঠে l হারান এ ছাতে হারমোনিয়াম বাজিয়ে যা গায় তাতেই বুড়ো খুশী l মাথা নেড়ে আলসেতে তবলার সঙ্গত দেয় l নিরিবিলি দুই ছাতে ওরা দুজনে ভিন্ন কেউ ওঠেও না l ফলে নির্ঝঞ্ঝাট সঙ্গীতচৰ্চা চলে বিকেল অব্দি l

এ কদিনেই হারানের আত্মবিশ্বাস অনেকটা বেড়ে গেছে l সারাদিন যেন একটা খুশী খুশী ভাব l সর্বক্ষণ একটা গুনগুনানি l বিষ্যুদবার দোকান বন্ধ l তাই সকালের জলখাবারের পাট সেরে হুঁহুঁ করে সুর ভাজতে ভাজতে হারমোনিয়ামটা খাটের তলা থেকে বের করে হারান l পার্বতী রান্নাঘরে l লাল্টু পাশের ঘরে কী যেন করছে l হারান হারমোনিয়ামটায় আদর করে খানিক হাত বোলায় l কত দিনের স্বপ্ন! এমন ভাবে এ বয়েসে পূর্ণ হবে ভাবা যায়! কার কপালে কখন কী যে ঘটে যায় l সত্যি! ফোঁৎ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হারান বাজনা শুরু করে l প্রথমে আস্তে তারপর একটু জোরে তারপর বেশ জোরে l হঠাৎ দড়াম করে দরজা বন্ধের আওয়াজে চমকে দেখে লাল্টু ওর ঘরে দরজা দিয়েছে l

আজকালকার কলেজে পড়া ছেলেপুলে l এরা এসবের দরই বুঝল না l যাক গে যাক! হারান ফের সাধনায় মন দেয় l বারকয়েক আঙুল খেলিয়ে ভেবেচিন্তে খুব প্ৰিয় গান "দিনের শেষে... " দিয়ে শুরু করে l গানটায় বেশী সুরের কেরদানি নেই l বাজাতে বেশ সুবিধে l তাও বার বার আঙুল হেড্ডাবেড্ডা হয়ে সুর যেখানে সেখানে দৌড়ে পালায় আর হারান গানের খেই হারিয়ে ফ্যালে l
"বলি সাতসকালে কী শুরু করলে, হ্যাঁ? এসব প্যাঁপোঁ রেখে বাজারে যাও দিকি l ভেবলিরা আসবে l একটু মুরগীর মাংস নিয়ে এস l"

অন্যসময় হলে মেয়ে জামাইয়ের আসার কথায় হারান খুশীই হয় l জামাইটিকে যদিও তেমন সুবিধের লাগে না l ওষুধের দোকানে সামান্য কাজ করে l প্রেম করে বিয়ে করল l তাও বিয়েতে নয় নয় করে কম জিনিস তো দিতে হয়নি! তবে বছর তিনেকের নাতনি পুঁটি, যাকে রিয়া না বললে ভেবলি রেগে যায়, হারানের বড় নেওটা l তবু আজ তেমন আনন্দ হল না l গোমড়া মুখে হারমোনিয়াম ফের খাটের তলায় ঢুকিয়ে বাজারমুখো রওনা হল হারান l

দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পাট চুকল দেরীতে l আজ আর ছাতে গানের আসর বসানো সম্ভব নয় l হারমোনিয়াম যে ঘরে সে ঘরে দরজা দিয়ে ভেবলিরা শুয়েছে l এমনিতেই ছাতে উঠে এল হারান l দেখল ও ছাতে আজ কেউ নেই l একটু দাঁড়িয়ে নেমে এল ফের l

পরের দিন দুপুরে যথারীতি হারমোনিয়ামটা বের করতে গিয়ে থমকে গেল l কোথায় গেল ওটা? নীচু হয়ে ভালো করে খাটের তলাটা দেখছিল হারান l
"খুঁজচো কী? ওটা ওখেনে নেই l" পার্বতী খাটের ওপর পা তুলে ভালো করে বসতে বসতে
বলে l
"কোথায় l"
"দোকানে দিইচি l পালিশ করাতে l"
হারান ব্যাপারটায় কতোটা খুশী হবে বোঝার আগেই তার হাঁ করা মুখের দিকে চেয়ে পার্বতী বলে, "কাল ভেবলির সাতে কতা হয়েচে l ওর বড্ড শক, মেয়েটাকে গান শেকায় l ওটা সামনের মাসে পুঁটিকে জন্মদিনে দোবো l"
"মানে? আর আমার যে সেই কবে থেকে ... "
"থামো তো! ওই মাধব চক্কত্তির দলে যেমন পোঁ ধরচো ধরো l এই বয়েসে হারমোনি বাজিয়ে আর লোক হাসাতে হবে না l"
"কে বলছে লোক হাসাই?" হারান মনে জোর এনে তীব্র প্রতিবাদ জানায় l "এই তো ভোম্বলদের ছাতে রোজ ওদের কে একটা দাঁড়িয়ে থাকে l কত প্রশংসা করে, তা জানো?"

পান চিবোতে চিবোতে পার্বতী অম্লান বদনে বলে, "কে? অই ভোম্বলের পিসে? বসিরহাট থেকে ডাক্তার দেখাতে এয়েচিল? ও তো বদ্ধকালা !"

অলংকরণঃ কল্লোল রায়

ফেসবুক মন্তব্য