দোয়েল

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী



লকডাউনের বাজারে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল এক দোয়েলপাখি।

অবাক হয়ে গেল মাধব। আবার ভালও লাগল তার। কারণ আর কিছু নয়, যে-সব গাছের বড় পাতাটির নীচে দেখা যেত ভোরের এই দোয়েল—সেইসব গাছ তাদের এখান থেকে কবেই কেটে দেওয়া হয়েছে।

মাধবদের বহু পুরনো আবাসন-বাড়ি। বাড়ির পিছনেই ছিল বড় বড়, ঘন পাতার জবাগাছ। টগরফুলের গাছ। সঙ্গে কল্কে ফুল, পেয়ারা গাছের ছায়া আর আম-কাঁঠালের মায়া। সব গাছ কি তাদের? না। ফাঁকা জায়গা থাকায় অনেক প্রতিবেশীরা বসিয়ে যায় গাছ। কারণ আর কিছুই নয়। সকাল-সকাল টাটকা ফুলটা পুজোর জন্য পাওয়া যায়। গাছ বড় হয়, ফল-ফুলে ভরে যায় সে। তখন গাছও হয়ে ওঠে তাদের প্রতিবেশী। আর এদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে নানান জাতের পাখিদের।

মাধবদের বাড়ির সামনে একটি নতুন করে ঘর হল। যে আবাসনে মাধবরা থাকে, সেখানের সকলেরই ঘর বাড়ল একটি করে। বেশ বড় ঘর, লম্বা, টানা বারান্দা ও একটি বাথরুম—বেশ খোলামেলাও হল। তিনটি জানালা থাকার সুবাদে আলোবাতাসের অভাব রইল না। রোদও আসতে লাগল সেখানে, বিশেষত জৈষ্ঠ্যর রোদ। শীতে একটু রোদ পেলে ভাল হত; হয়নি যখন আর কী করা যাবে! এই ভেবে মাধব দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জৈষ্ঠ্যের রোদে সে বালিশ রাখে। মাথার ঘামে বালিস ভিজে যায়। রোজ তো আর কভার কাচা সম্ভব নয়, স্যানিটাইজার কিনতেই গুচ্ছের টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। রোদগন্ধের বালিশে মাথা দিতে তার বেশ লাগে।

কিন্তু এই ঘরের জন্য বাড়ির সামনের কিছু গাছ কাটা পড়ল। জারুল, জবা, টগর, বেল—ইত্যাদি। ফলে হল কী, যে গিরগিটিকে পুরানো বারান্দা থেকে এইসব গাছে-গাছে কথাবার্তা ফিরি করে বেড়াতে দেখত মাধব—সেও নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। যে ছোট্ট টুনটুনি কচি পাতার পাশে বসে ফুলেদের সঙ্গে নানান দেশের কথা কইতো আর সরু, লম্বা ঠোঁট-টি ডুবিয়ে দু’চার ছটাক মধু তুলে নিত—তাকেও আর দেখা যায় না। কোথা গেল সে?

এই অবসরে ফিরে এলো একলা দোয়েল।

কিন্তু এ পাখিটা মাধবের চেনা নয়। পিছনের দিকের কিছু গাছপালা যখন বর্ষার জল জমার কারণে মারা যায় ও নষ্ট হয় তখন থেকেই হারিয়ে গেছিল যে দোয়েল—এ পাখি সে পাখি নয়। এর বয়েস অনেক কম। মনে হল, এ কী তবে সেই নিরুদ্দেশ দোয়েলের বাচ্চা—যে এখন বড় হয়ে তার মায়ের ভ্রমণস্থান খুঁজে নিতে এসেছে?

মাধব ভাবল, হ্যাঁ, এমনটি তো হতেই পারে। সে যখন ছোট্ট তখন থেকেই সে গল্প শুনে যাচ্ছে তার মায়ের কাছে। নানা গাছ ও ফল-পাকুড়ের গল্প। অনেকটা আকাশ আর রোদের গন্ধের কাহিনি। সেই মন কেমন করা কাহিনি শুনে তার ছেলে হয়ত দেখতে এসেছে—মায়ের সেই জায়গাটা কেমন আছে। হয়ত সেই মা-দোয়েল এখন অসুস্থ, অথর্ব—সে ফিরে গিয়ে মাকে গল্প বলবে—গাছ কাটার পর কেমন আছে এখন মায়ের সেই পুরনো জায়গা।

এখন তো লকডাউন। এখন মানুষের উজাড় হবার সময়। দেশকাল নেই, সময়-অসময় নেই—উজার হয়ে যাচ্ছে মানুষ। ইতালি, আমেরিকা, ফ্রান্স, ব্রিটেন—উন্নত এইসব দেশও করোনাভাইরাস নিয়ে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে! তাই পৃথিবীর মানুষ এখন ঘরবন্দি। তবু ভালও লাগে যখন শোনে, নদীরা ফিরে পাচ্ছে তাদের সেই দূষণহীন প্রবাহ। সুদূর পাঞ্জাব থেকেই দেখা যাচ্ছে হিমালয়ের চূড়া—আকাশ এত পরিস্কার। সে এখন পাখিদের দখলে। সমুদ্রতীরে নিশ্চিন্তে ডিম পেড়ে যাচ্ছে কচ্ছপ। এমন পৃথিবীই তো চেয়েছিল তারা সবাই। পৃথিবীর সকলে। তার জন্য কত কোটি টাকার মিটিং, মিছিল, সেমিনার। এক ঝটকায় প্রকৃতিই ঠিক করে নিল নিজের সবকিছু—ব্রাত্য হয়ে রয়ে গেল কেবল মানুষ। মাঠে মাঠের দূর্বাঘাসেরা গজিয়ে উঠছে আবার—যারা মিলিয়ে গিয়েছিল বিষাক্ত ঘাস মারার স্প্রে-তে; ধুলোধোঁয়া-র আবরণহীন পত্রপুষ্পসকল কেমন যেন ঝিলকিয়ে উঠছে। এভাবেই না পৃথিবী বাঁচবে।

আর এই লকডাউন-ই ফিরিয়ে আনল এক হারানো দোয়েল।

লকডাউনের জানালায় একটি ভোরের দোয়েল ও বন্দি-মাধব বসে থাকে চুপ করে। রোজ। সে জানালায় এসে বসে, সেখানে রাখা বিস্কুটের টুকরো খায়; জল খায়; ইতিউতি তাকিয়ে জানালার রডে এসে বসে। ছিক ছিক করে ডাকে। লকডাউনের দিনে এমনি সকাল—ভোরের আলো সুন্দর হয়ে ওঠে। মাধবের করোনাকম্পিত হৃদয়ে এ-যেন এক সুসংবাদের প্রলেপ। তার দিকে তাকিয়ে যেন দোয়েল বলে, আসব?

সে বলে, এসো, সুসংবাদে এসো। আমি ত এখন বেরুতে পারি না। এই লকডাউন যে কবে শেষ হবে!

পাখি সে-সব কথায় যায় না। যেন বলে, আমি তোমাকে মুক্ত পৃথিবীর গল্প শোনাব।

বেশ হয় তাহলে।

মনে মনে বলে মাধব।

কেমন করে নদী বইছে, বাতাস ঘুরছে, গাছের পাতা খসছে—সব বলব তোমায় এক-এক করে।

মাধব বলে, তাই বোলো।

পাখি যেন বলে, মনে আছে তোমার— এখন ঘরের যেখানে চেয়ার পেতে বসে আছ, আগে একটি বৃদ্ধ সাদা টগর গাছ ছিল সেখানে? তার গুঁড়িটা পাকিয়ে-পাকিয়ে উঠেছিল আর তাতে অজস্র সাদা ফুল ফুটত বছরভর? গাছ তো নেই, তবে ওই চেয়ারটাতে আমাকে বসতে দেবে একবার? ওখানে সেই সাদা টগরের গায়ের গন্ধ লেগে আছে। যেনো ওখানে এখনো ফোটে থোকা-থোকা টগরের ফুল। একটু ভালও করে তাকালে হয়তো তুমি সেই টুনটুনি আর গিরিগিটিটাকেও দেখতে পাবে। তারা যদি কিছু বলে তোমায়, শুনে রেখ, মনে রেখ তা—আমি রোজ ভোরে এসে সেই গল্প তুলে নেব তোমার থেকে। ফিরে গিয়ে মা-কে শোনাব। মা বড় খুশি হবে।

তোমার মা?

হ্যাঁ। সেই কেটে ফেলা গাছেই মায়ের দিন কাটত যে।

মা এখন—

ঘরবন্দি—তোমার মতন। আমি খাবার নিয়ে যাই, তবে মা খেতে পায়। বয়স হয়েছে মায়ের।

মাধবের মনে হল, হ্যাঁ। এই হয়। মানুষের জীবন—বড় কিছু নয়—সে-যে পাখিদেরই জীবন। কতশত পরিয়ায়ী শ্রমিকেরা পায়ে হেঁটে ঘরে ফেরার পথে মারা যাচ্ছে; লংকা বাগানে কাজ করা কোনো কিশোরী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে—তার কাছে গিয়ে তুমি একবার দাঁড়াতে পারতে না তুমি একলা দোয়েল? তাকে গিয়ে বলতে পারতে না, ঘরের কাছাকাছি এসে সে থেমে গেল কেন? কেন স্তব্ধ হল তার পা? বনজঙ্গল দিয়ে হাঁটার সময় সে কী সঙ্গী হিসেবে কোনো দোয়েলকে পায়নি? সেই দোয়েল তাহলে তাকে পিঠে বয়ে নিয়ে পৌঁছে দিত তার ঘর।

দোয়েল চুপ থাকে। ঘরে ঢোকে না, জানালাতেই বসে থাকে সে। মাধব তাকে বলে, তুমি এখানেই থেকে যাও একলা দোয়েল। আমি বাসা করার জায়গা করে দিয়েছি বারান্দায়, আরও দেবো—এখানেই বাস করো তুমি। একাকী বসবাস করতে করতে দেখবে—ঠিক কোনো না কোনো সঙ্গী তুমি পেয়ে যাবে। লকডাউন মিটে গেলে হয়ত দেখবে কোনো এক ভোরে বড় কোনো এক পাতাটির নীচে সে বসে আছে তোমারই প্রতীক্ষায়।

শুনে সে খানিক চুপ করে থাকলে। একটু লজ্জাও পেলে বলে মনে হল। তার পর বললে, আসব। আগে গাছ পোঁত।

মাধব বলল, পুঁতেছি তো, এক অক্ষয়বট পুঁতেছি। আজ ভোরে উঠেই ওই দিকে পুঁতে দিয়ে এসেছি। আজ যে অক্ষয়তৃতীয়া।

পাখি বলল, তবে যাই, দেখে আসি। ফিরে এসে অনেক গল্প বলব তোমায়। মুক্ত পৃথিবীর কাহিনি শোনাব আরও অনেক। অপেক্ষায় থেকো।

এই বলে দোয়েল সে গাছ দেখতে চলে গেল। পাখি এসে কী বলে, তা জানার জন্য জানালার পাল্লা খুলে দাঁড়িয়েই রইল মাধব।

ছবিঃ পার্থ প্রতিম চট্টোপাধ্যায়

ফেসবুক মন্তব্য