হরিপদকাকু

অতনু দত্ত



একবার আমাদের পাড়ায় এক গুমোট বিকেল ভেঙে একটা ওলটপালট ঝড় এসেছিল বড় বড় গাছগুলোর মাথা দুলিয়ে। অনেক ডাল ভাঙ্গল, চাল উড়ল, অনেক পাখি মরল। সবাই বললে কালবোশেখি। সেই ঝড়ের ঠিক পরে, লাল মোরামের রাস্তায় বয়ে যাওয়া কাদাজলে লাথি মেরে নোংরা হওয়ার খেলায় যখন আমরা মত্ত, তখন দেখেছিলাম হরিপদকাকু ও তার মেয়েকে প্রথমবারের মত।

হরিপদকাকু, বুকের খাঁচা সর্বস্ব, নুয়েপড়া শনের দড়ির মত পাকানো একটা নিঃস্ব মানুষ। সাথে শালুক ফুলের মত ঢলঢলে মুখের কিশোরী মেয়ে সোহাগী। আমাদের ছোট্ট পাড়া যেখানে সবাই সবাইকে চেনে, সেখানে দু দুটো আগন্তুক। কৌতূহল জাগানোর মত ব্যাপারই বটে। সবাই জানতে চায়, সবাই গল্প খোঁজে। গল্প একখানা ছিল বটে। কিন্তু আমাদের কেউ বলেনি তখন। আমরা নাকি ছোট। বুঝব না।

কিছুদিন পরে হরিপদকাকু যখন আমাদের বাড়ি কাজ ধরল আর আমার সাথে ভাব হয়ে গেল, তখন অনেক কথাই বলত আমাকে হরিপদকাকু নিজের ভাষায় নিজের মত করে। কিছু বুঝতাম কিছু বুঝতাম না। আমি অবশ্য উপলক্ষ্য মাত্র ছিলাম, আসলে কথা বলত নিজের সাথে। বলত দেশের কথা, মাটির কথা, শেকড়ের কথা, প্রাণের বন্ধু সোরাব আলির কথা এবং সব চেয়ে বেশী, দেশের জমিতে চাষবাসের কথা।

“ছোটবাবু, আমাদের দেশের মাটি কত সরেস জানো, যাই চাষ করবে সোনা ফলবে। এখানকার এই শুকনো লাল কাঁকড়ের রুক্ষ মাটির মত না। এখানে তো জলই নেই। মাটি তো মা। মায়ের বুকে রস না থাকলে সন্তান বড় হবে কি করে বল তো?"

আমি বলতাম, “কেন এত তো ফসল ফলছে আমাদের এখানে?"

কাকু বলত, “আরে এ ফসল আবার ফসল নাকি। ফসল ফলত আমাদের দেশে।"

“তাহলে দেশ ছেড়ে আমাদের এখানে এলে কেন?" রেগে গিয়ে আমি বলতাম।

“সে কথা তুমি বুঝবে না ছোটবাবু। তোমার সে বয়স হয় নি এখনো।" খানিকক্ষণ চুপ করে যেন নিজে নিজেই কথা বলত, “ইজ্জতের দাম অনেক, বুঝলে ছোটবাবু, সব দেওয়া যায় ইজ্জত দেওয়া যায় না। তবু ইজ্জত বাঁচলো কই। সব গেল, হায় সোরাব আলি, সব গেল" বলেই চোখমুখ ধোয়ার জন্য কুঁয়োর পাড়ে চলে যেত।

হরিপদকাকু পাড়ার স্বচ্ছল বাড়িগুলোতে দিন মজুরের কাজ শুরু করল ধীরে ধীরে। পাড়ার শেষে ফাঁকা খাস জমিতে একটা ছিটেবেড়ার মাথা গোজার ঠাঁই বানালো নিজের হাতে। আর সোহাগী ধরল কয়েক বাড়ি ঠিকে ঝিয়ের কাজ।

গ্রীষ্ম গিয়ে বর্ষা এল। বর্ষার পরে দূর্গা পুজো কালী পূজো পেরিয়ে শীত। ইতিমধ্যে হরিপদকাকু আর সোহাগী আমাদের ছোট্ট পাড়ার সদস্য হয়ে উঠেছে যেন। মিষ্টি মুখ ও স্বভাবে মিতভাষী সোহাগী পাড়ার গিন্নী মহলে বেশ প্রিয় ততদিনে। কাজের শেষে বাড়ি ফেরার সময়, বাড়তি খাবার, বাড়ির গাছের ফল, পুরনো শাড়ি ও সোয়েটার উপহার হিসেবে পেতে শুরু করেছে।

সেই শীতে হরিপদ কাকু আমাদের এবং পাড়ার অনেকগুলো বাড়িতে এতকাল পড়ে থাকা দামড়া খেজুর গাছ গুলো কেটে রস বের করে সবাইকে খাওয়াতে শুরু করল। সে এক দারুণ মজার ব্যাপার। দু পায়ের পাতায় একটা দড়ির রিং লাগিয়ে লম্বা খেজুর গাছে ব্যাঙের মত লাফিয়ে উঠে যেত। আর কোমরে গুঁজে রাখা একটা অদ্ভুত দর্শন কাটারী দিয়ে যেটাকে কাকু ছ্যাং বলত, খেজুর গাছের পাতলা একটা পরত চেঁছে দিত দু-তিন দিন বাদে বাদে। প্রতিদিন এসে হাড়ি নামিয়ে রস ঢেলে আমাদের বেশীরভাগটা দিয়ে কিছুটা নিজে নিয়ে চলে যেত। সবার বাড়ি থেকে সংগৃহীত রস দিয়ে গুড় বানিয়ে আবার পাড়াতেই বিক্রি করত। মোদ্দা কথা চলছিল বেশ। আমাদের পাড়াটাকে বেশ নিজের নিজের ভাবতে আরম্ভ করেছিল হরিপদকাকু। দেশ খুঁজে পেয়েছিল আবার।

সোহাগীর মায়ের কথা কোনদিন বলেনি কাউকে হরিপদ কাকু। কেউ জিজ্ঞেস করলেই এড়িয়ে যেত। যদিও কোন এক বাকপটিয়সী গিন্নীর পাল্লায় পড়ে সোহাগী একদিন বলে ফেলল সেই কথা, আর তা পাঁচকান হতে মোটেই দেরী হল না। হরিপদকাকুর সেই ফেলে আসা দেশের বাড়িতে সোহাগীর সুন্দরী মায়ের ওপর নাকি গ্রামের বিত্তবান মোড়লের নজর ছিল বহুদিনের। তবু সংখ্যালঘু হরিপদদের বুকে আগলে বাঁচিয়ে রেখেছিল বাল্যকালের বন্ধু সোরাব আলী। চাষের ফসল বিক্রীর কাজে সোরাব আলী এবং হরিপদকাকুর অনুপস্থিতিতে সোহাগীর মাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল সেই মোড়ল। সেদিন হয়তো সোহাগীও বাঁচত না, যদি না ওর মা বুদ্ধি করে ওকে ঠিক সময়ে বার করে দিত ঘর থেকে।

তার পরের দিন সোহাগীর মায়ের লাশ পাওয়া গেছিল গ্রামের বাইরে খানিক দূরে ক্ষেতের মাঝে এবং তার ঠিক দুদিন পরে গাঁয়ের মোড়লের লাশ নিজের চাষের জমিতে ভর বিকেল বেলায়। গলার নলি কাটা অবস্থায়।

সোরাব আলীর সাহায্যে এক কাপড়ে দেশ ছেড়েছিল হরিপদকাকু। অনেক কষ্টে, যে কটা জমানো টাকা ছিল তাই দিয়ে তারকাঁটার বেড়া টপকে, ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েছিল আমাদের পাড়ায় একটা কালবোশেখি ঝড়ের পরে। পেয়েছিল আরেকটা দেশ। নিজের দেশ।

গল্পটা এখানে শেষ হলেই বোধ হয় ভাল হত। কিন্তু যা চাই তাই কি আর হয় সব সময়? কাজেই হরিপদকাকুর গল্পও এখানে শেষ হয় না।

মাস ছয়েক পরে এক দিন সকালে খবর এল, সোহাগী নিরুদ্দেশ। সাথেই আদিবাসী পাড়ার এক উজবুক ছোকরা। পাড়ার গিন্নীরা সব ছি ছি করে উঠল। সবাই আফশোষ করতে লাগল এতদিন দুধকলা দিয়ে সাপ পোষার জন্য। সাথেই স্বস্তি পেল নিজেদের স্বামীপুত্র এই দুশ্চরিত্রা মেয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে বলে। দুয়েকবার খোঁজ খবর নেওয়ার চেষ্টায় বিফল হয়ে, হরিপদ কাকু একদম গুম মেরে গেল তারপর। শুধু নেশা করার মাত্রাটা গেল বেড়ে, সাথেই বেড়ে গেল “হায় সোরাব আলী, সব গেল," বলে হাহুতাস এবং চোখ মুখ ধোয়া।

আরো ছমাস পরে আদিবাসী পাড়ার সেই উজবুক ছেলে ফিরে এল, সাথে এল সোহাগীর মৃত্যু সংবাদ। সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে নাকি কিসব জটিলতায় এবং রক্তাল্পতার কারণে সোহাগীর আর বাঁচা হয় নি। অপুষ্টির বাচ্চাটাও বাঁচে নি। সবচেয়ে বড় খবর যেটা জানা গেল, বাচ্চাটা সোহাগীর সাথে পালিয়ে যাওয়া ছেলেটার না। আমাদেরই এই ছোট্ট পাড়ার কোন মাতব্বরের সন্তানের জবরদস্তির ফল। ওই উজবুক আদিবাসী ছেলেটা সব জেনে শুনেই ওকে বিয়ে করে পালিয়েছিল।

“আমি চললাম ছোটবাবু, আর কোনদিন দেখা হবে না," বাড়ি ছাড়ার আগে বলেছিল হরিপদকাকু আমাকে। চলে যাওয়ার খবরটা কার কাছে পেয়েছিলাম আমার মনে নেই, কিন্তু খবর পেয়েই, মনে আছে দৌড়ে গিয়েছিলাম কাকুর ভাঙা ঘরে। দেখেছিলাম কাকুর শরীরটা যেন আরো নুয়ে পড়েছে।

“কেন চলে যাচ্ছ কাকু? কোথায় যাবে? থেকে যাও না এখানে। আমরা সবাই তো আছি," আমি বলেছিলাম।

“নাঃ। টান চলে গেছে। এই বয়সে আর রক্তারক্তি ভালো লাগে না। চলেই যাবো। যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাবো। আর থিতু হব না কোথাও।"

“কেন কাকু, তুমি না বলতে এখন এটাই তোমার দেশ…"

“গরীবের কোন দেশ হয় না ছোটবাবু, জাত হয় না। গরীবের কোন ইজ্জত হয় না। হায় সোরাব আলী, শেষ হয়ে গেল, সব শেষ হয়ে গেল…"

প্রথম দেখলাম হরিপদকাকু সোরাব আলীর নাম নিয়েও মুখ না ধুয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কোটরে চলে যাওয়া ঘোলাটে চোখের ভেতরে যে অত জল থাকে, জানতাম না আমি…

অলংকরণঃ কল্লোল রায়

ফেসবুক মন্তব্য