ইঁদুর

যুগান্তর মিত্র



খবরের কাগজটা চোখের সামনে মেলে রেখেছে অরিন্দম। চা শেষ। কাপটা টেবিলের ওপরে একটু ঠেলে দিয়ে কাগজের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল সে। তখন তার চোখ ছিল করোনা ভাইরাসের আক্রমণে বিশ্বজুড়ে বিপন্ন মানুষের পরিসংখ্যানের দিকে। প্রথম পাতার বাঁদিকে বক্স করে পরিসংখ্যান দেওয়া আছে।
অতিমারির কারণে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছে। পেশা বদলে অনেকেই কোনওক্রমে টিকে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আচমকা অরিন্দমের মনে হল পায়ের কাছ দিয়ে কিছু-একটা দ্রুত তাদের শোবার ঘর থেকে বারান্দা পেরিয়ে সোজা চলে গেল পাশের ঘরে।
করোনার মারাত্মক অভিঘাতের মধ্যেই ঘটে গেছে আমফান নামে এক মহাঝড়ের দাপট। বহু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তাতেও। সেসবও প্রায় ফিকে হয়ে এসেছে। চলছে তা নিয়ে রাজনৈতিক তরজা। এসব কারণেই আজকাল আর টিভি দেখতে ইচ্ছে করে না অরিন্দমের। তবু অভ্যেসবশত খবরের কাগজে চোখ রাখে সে। নীচতলায় বাবার ঘরে টিভি চলতেই থাকে সারাক্ষণ। একা মানুষ টিভির খবর ও সিরিয়ালে নিজেকে আটকে রাখেন, তাই টিভি চলা নিয়ে কিছু বলারও থাকে না অরিন্দমের, তা সে যতই খারাপ লাগুক না কেন। এই কারণেই এখন আর বেশিক্ষণ নীচতলায় থাকতে পারে না অরিন্দম। দোতলায় কাটায় বেশিরভাগ সময়।
সে নিজেও মাস তিনেকের ওপর ঘরের চৌহদ্দিতে আটকে আছে প্রায়। লকডাউনের জন্য অফিস বন্ধ। ট্রেন একেবারেই বন্ধ। বাস চললেও তাতে বাদুড়ঝোলা ভিড়। কলকাতা শহর থেকে তার বাড়ি এতটাই দূরে যে অফিসে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যারা শহরতলিতে থাকে তারা অফিসে যাচ্ছে, খবর পায় সে। তার অফিস যাওয়ার পথ খোলা নেই।
অরিন্দম টুকটাক বাজার যাওয়ার অছিলায় বাইরে যায় মাঝে মাঝে। এগুলো আসলে অছিলাই। কেননা সাইকেল ভ্যানে করে নানা ধরনের আনাজপাতির পসরা সাজিয়ে কিছু লোক প্রতিদিনই আসে সকালের কিছু পরে। কেউ কেউ সন্ধ্যাতেও আসে। টোটো চালাত সুখেন। লকডাউন আর আনলক পর্বে টোটো থেকে তেমন আয় হয় না তার। তাই সেও সবজি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সকাল-সন্ধে। সুখেনের মতো অনেকেই পেশা বদলে ফেলেছে। বদলে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় পরিচিত সুখেন হাঁক দিয়ে জানতে চায় কিছু লাগবে কিনা। ভোরের আলো খানিকটা স্পষ্ট হয়ে যখন সকাল হয়ে ফুটে ওঠে, তখন থেকেই মাছওলারা সাইকেলে বা ভ্যানে মাছ নিয়ে হেঁকে যায়। এদের থেকেই প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় জিনিস দিব্যি নিয়ে নেওয়া যায়। তাছাড়া মুদি দোকান হাতের কাছেই, আনা যায় প্রয়োজনীয় সামগ্রী। দূরে যাওয়ার দরকার পড়ে না মোটেই। তবু অরিন্দম সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে মাঝেমাঝেই।



লকডাউনের সম্ভাবনা যখন উস্কে দিচ্ছিল মিডিয়া বা সরকার, দেশ-বিদেশের করোনা সংক্রান্ত খবরাখবর আছড়ে পড়ছিল হাওয়ার ডানায় ভর করে, বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল সমূহ বিপদের নানা জানকারি, তখন থেকেই মানুষে-মানুষে আতঙ্কের ছায়াবাজি চলছিল। ‘কী হচ্ছে’ আর ‘কী হতে পারে’ নিয়ে চাপা ফিসফাস কখনও একে অপরের সঙ্গে, কখনও নিজের সঙ্গেও; সেইসময়ই, অতিরিক্ত চাল, ডাল, তেল, নুন, আটা, ময়দা, সুজি, চা-পাতা, দুধ, বিস্কুট, চিনি, মুড়ি, আচার, চকোলেট ইত্যাদি প্রভৃতি রসদ অনেকটা করেই ঘরে মজুত করে রেখেছিল অরিন্দম। সেই সঙ্গে মাসখানেকের জন্য বাবার নিত্যদিনের আর তাদের সম্ভাব্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় ওষুধও কিনে রেখে দিয়েছিল সে, কিছুটা নিজের তাড়নায় আর বাকিটা বাবা, স্ত্রী, কন্যার ইচ্ছেতে। এসবই মজুত রাখতে পেরেছিল, কেননা তার পক্ষে এসব মজুত করে রাখবার মতো সামর্থ ছিল। আর যাদের তেমন সামর্থ ছিল না, এইসমস্ত কেনাকাটার সময় মনেও পড়েনি তাদের কথা, কিংবা মনে পড়লেও সেসবে আমল দেওয়ার ইচ্ছে হয়নি। কেনার মতো যথেষ্ট সামর্থ থাকলেও, প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় রসদ কিনে রাখার মতো দূরদর্শিতা দেখাতে পারেনি যারা, অথবা ‘আজ কিনব’ ‘কাল কিনব’ করে অপেক্ষায় ভাসিয়ে দিচ্ছিল সময়, তাদের প্রতি করুণা ছুঁড়ে দিয়ে, আমি অনেক বেশি বুদ্ধিমান প্রমাণ দিয়ে নিজেকেই, নিজের অন্দরমহলে প্রশান্তির বুদবুদ্ তুলেছিল অরিন্দম, আর আত্মশ্লাঘায় ডুবে গিয়েছিল বেমালুম। তাই তার পক্ষে একটু অন্যরকম চানাচুর নিয়ে আসি, অথবা, একটু বেকারির বিস্কুট খাওয়া যাক, এইসব ভেবে বাইরে যাওয়ার অছিলা খুঁজে ফেরা ছাড়া উপায় ছিল না। এই সুযোগে বাইরে বেরিয়ে, খানিকটা মুক্তির স্বাদ অনুভব করেছিল সে। সাইকেলের হ্যান্ডেলে বা বাইকের ডিকিতে, ছোট্ট একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট ঝুলিয়ে নিয়েছিল। তাতে থাকত ওষুধের স্ট্রিপ ও প্রেসক্রিপশন, যাতে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করলে, ওষুধ কিনতে যাচ্ছি বলে রেহাই পাওয়া যায়। মুখে মাস্ক লাগিয়ে, অনেকটা সিরিয়ালে বা সিনেমায় দেখা জঙ্গিদের মতো চেহারা নিয়ে, ঘর থেকে বেরিয়েছিল অরিন্দম। প্রথমেই সোজা চলে যেত কোনও সিগারেটের দোকানে, যারা সেইসময় সরকারি নির্দেশিকার তোয়াক্কা না-করে, দোকান আধ-খোলা রেখে, বিক্রিবাটা চালিয়ে গিয়েছিল গোপনে। যদিও পছন্দের ব্র্যান্ডের সিগারেট সে বেশি করে কিনে রেখেছিল, তবু দামি কিং সাইজ সিগারেট কিনে, কোনও গাছতলায় দাঁড়িয়ে, আয়েশ করে ধোঁয়া টেনে নিয়েছিল বুকের ভেতরে। একটা অন্যরকম আনন্দ তাকে ঘিরে ধরছিল সেইসময়। একটু বাইরে বেরোতে পেরে অরিন্দম ভেতরে ভেতরে টের-পাওয়া হাঁসফাঁস ভাব কাটাতে পেরেছিল খানিকটা।
যেহেতু করোনা সংক্রান্ত ভয়াবহ সংবাদে বিতৃষ্ণা জেগে ওঠে তার, তাই অরিন্দম এইসব খবরের হেডিং ছাড়া আর কিছুই পড়ে না এখন আর। কিন্তু স্বভাবদোষে কাগজটায় চোখ বোলায়। মানুষের অবিমৃষ্যকারিতায় বিরক্ত হয়। রাজনীতিকদের ওপরচালাকি দেখে ক্লান্ত লাগে। ফলে চোখের সামনে বিশ্বসংসারের সংবাদভাষ্য নিয়ে খবরের কাগজ হাট করে মেলা থাকলেও, অরিন্দমের পক্ষে অন্যমনস্ক হওয়া স্বভাবিক ছিল। সে অন্যমনস্ক ছিলও। আর সেই কারণেই পাশ দিয়ে কিছু-একটা চলে যাওয়া, তার চেতনায় ধাক্কা মারে সহজেই। চোখ সরু করে চকিতে একবার সম্ভাব্য চলে যাওয়ার দিকে চোখ রাখে সে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরে কিছুই দেখতে না-পেয়ে আবার কাগজের মধ্যে চোখ রাখে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও। তার চোখ আটকে যায় পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিনরাজ্যে আটকে পড়ার খবরে। এর মধ্যেই একদিন ট্রেনের সহযাত্রী ফোনে জানায়, গণেশ নামের এক পরিচিত হকার গলায় দড়ি দিয়ে মরে গেছে। গভীর দুখযন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়েছিল অরিন্দম। তার দিন দুই পরে খবর পেল, তাদের এলাকার সত্যেনদা ইঁদুর মারা বিষ খেয়ে মরে গেছে। সত্যেনদার ছিল বাজারে একটা মণীহারি দোকান। লকডাউনে একেবারে বন্ধ ছিল দোকান। আনলকের পরে তাও কোনোক্রমে ধুঁকতে ধুঁকতে চলছিল দোকানটা। আমফান ঝড়ে দোকানের চাল উড়ে গেছে। দোকান সারিয়ে নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তার ছিল না। তবু বাজারে ত্রিপল পেতে আনাজপাতি বিক্রির চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ভরা সংসার চালানোর মতো এতটা আয় সে করতে পারেনি। ফলে ইঁদুর মারার বিষই হয়ে ওঠে তার আশ্রয়।
চারিদিকের নানা ঘটনা তাকে ভয়ংকর এক বিপন্নতায় ফেলে দেয়। প্রথম মাসের বেতন তার অ্যাকাউন্টে ঢুকে গিয়েছিল। তার পরের মাসে অর্ধেক বেতন পেয়েছিল। তারপর থেকে সেটুকুও নেই। আদৌ তার চাকরি থাকবে কিনা সেই সংশয়ে সে সারাক্ষণ কাঁটা হয়ে থাকে। ফলত অরিন্দম আবার অন্যমনস্ক হয়। বারবারই নানা চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এবং সেই সুযোগে আরও একবার কিছু-একটার চলাফেরা তার চেতনায় হানা দেয়। এবার তার রোখ চেপে যায়। কী চলে গেল দেখতেই হবে, এমন একটা ভাবনা তাকে পেয়ে বসে। বেশিক্ষণ সেই ভাবনা তার মনে করাত চালাতে পারে না। অরিন্দম একটা ইঁদুরকে নড়েচড়ে বেড়াতে দেখতে পায় পাশের ঘরের পর্দার নীচ দিয়ে। সে আবিষ্কার করে, এই ইঁদুরটাই তার শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে চেয়ারের পাশ দিয়ে চলে গিয়েছিল অন্য একটা ঘরের দিকে। ইঁদুরটা যখন আবার ফিরে আসতে চাইছিল, তখনই অরিন্দমের চোখ পড়ে তার ওপর।
ইঁদুরটা কি অরিন্দমের চোখ দেখে ভয় পেয়েছে? তা না-হলে অরিন্দম যখন তাকিয়েছে তার দিকে, তখন ইঁদুরটা ঠিক ঠিক অরিন্দমের দিকে চোখ রাখবে কেন? আর তাকিয়েই ছোটা থামিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল কেন? ঘরের মেঝে ও পর্দার মাঝামাঝি চার-ছয় ইঞ্চি মতো ফাঁক আছে। সেই ফাঁকের মধ্যে ছোট্ট ধূসর শরীরটা জায়গা করে নিতে পেরেছে অনায়াসে। পর্দা ও মেঝের মধ্যবর্তী অবস্থানে নিজেকে রেখে ইঁদুরটা দু-পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারপর অন্য দুপা দিয়ে তার গোঁফের ওপর ঘসে নিল কয়েকবার। লালচে চোখে জুলজুল করে দেখল অরিন্দমকে। যদিও অরিন্দম চুপ করে তাকিয়েই ছিল তার দিকে; নড়াচড়া করেনি, চোখ পাকিয়ে তাকায়নি একবারও। তার হাত যথাস্থানেই ছিল। ইঁদুরের মতো পা নাড়ায়নি সে। নিঃশ্বাসও নিয়েছে স্বাভাবিক ছন্দেই। কোনও অস্বাভাবিকত্ব ছিল না। তবু ইঁদুরটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। আচমকা ছুটে পালিয়ে গেল সেই ঘরটার একেবারে ভেতরে।
লকডাউন বা আনলকে সেই অর্থে কোনও কাজই নেই বাড়িতে। তাদের অফিসের কাজের সঙ্গে অনলাইনের কোনও সম্পর্ক নেই। ফলে অন্য অনেকের মতো অনলাইন সার্ভিসেরও সুযোগ তার নেই। বাড়িতে বাসন মাজার মেয়েটিকে ছুটি দিতে হয়েছে। ঘর মোছার দিদিও আসবে না। তারও ছুটি। তাই কাজের লোকেদের ঘরে টেনে আনা ঝুঁকিপূর্ণ বলে তাদের সবেতন ছুটি দিতে হয়েছে, যেমন করে অরিন্দম নিজেও সবেতন ছুটি উপভোগ করেছে কিছুদিন। বাসন মাজার দায়িত্ব মল্লিকা, তার স্ত্রী, নিজেই নিয়েছে। রান্না, মেয়েকে পড়ানো, স্কুলের অনলাইন ক্লাশ, বাবাকে ওষুধ খাওয়ার জন্য গরম জল এগিয়ে দেওয়া এবং অন্যান্য কাজের পাশাপাশি এই কাজটা করতে হচ্ছে বলে মল্লিকা সারাদিনই খিটখিটে মেজাজে থাকে। ঘর ঝাঁট দেওয়া ও মোছার দায়িত্ব পড়েছে অরিন্দমের ওপর। এই কাজটা করতে যদিও তার খুব-একটা খারাপ লাগছে না। লম্বা ঝাড়ন দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দিব্যি ঝাঁট দিতে পারছে সে। হাতলওয়ালা মপ দিয়ে ফিনাইল মেশানো জলে অতি দ্রুত ঘর মুছে ফেলতে পারছে। এর জন্য তাকে খুব বেশি ঝুঁকেও পড়তে হচ্ছে না। ঘরের কাজ করে আমি মল্লিকার অনেক উপকার করে দিচ্ছি, এমন একটা শ্লাঘা অনুভব করার সুযোগ কিছুতেই ছাড়া যাবে না, বুঝে গেছে সে। তাছাড়া ব্যাঙ্কে জমানো টাকায় হাত দিতে বারণ করেছে মল্লিকা। সে মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষিকা। তার বেতনেই একপ্রকার সংসার চলে যাচ্ছে। ফলে এই কাজটুকু করে দিয়ে কিছুটা হীনমন্যতা কাটাতে পারে সে। এই সামান্য কাজ অতি দ্রুত সারা হয়ে যায়। তাই তার হাতে থাকে অঢেল সময়। এতটা সময় কীভাবে কাটাবে এই ভাবনা মাঝে মাঝেই তাকে চিন্তিত করে। তবু কখন যে দুলতে দুলতে সকাল হেলে পড়ে দুপুরের দিকে, আবার দুপুর হুমড়ি খেয়ে পড়ে বিকেলে, বুঝতেই পারে না সে। সন্ধ্যাবেলাটা কখন আসে বোঝার আগেই রাত নেমে আসে গুটিগুটি।
অলস সময় হাতে আছে বলে ইঁদুরের গতিবিধি দেখার চেষ্টা অরিন্দমকে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়তে সাহায্য করে। যে ঘরটায় কেউই থাকে না, ঘরের মধ্যে দিয়ে সারাদিনে কয়েকবার যাতায়াত করা ছাড়া আর ব্যবহারই হয় না, সেই ঘরেই ইঁদুরটা ঢুকেছিল, ভয় পেয়ে আবার সেখানেই ঢুকে গেছে। এই ঘরে মেয়ের জন্য বিস্কুটের কৌটো রাখা থাকে। তাদের তিন বছরের মেয়ের খিদে পেলে এই বিস্কুট দিয়ে তখন সামাল দিতে হয়, তড়িঘড়ি নীচতলায় নামার প্রয়োজন পড়ে না। মেঝেয় পড়ে-থাকা বিস্কুটের গুঁড়োর জন্য ইঁদুরটা আসে এখানে, অরিন্দম এইরকম একটা যুক্তি খুঁজে নেয়।
ইঁদুরটাকে দেখার জন্য টর্চ হাতে নেয় অরিন্দম। কেননা আলো জ্বালালেও ঘরে যে খাটটি পেতে-রাখা আছে, তার নীচে আলো পৌঁছয় না। একটা আলনা আছে, যাতে তার মেয়ের স্কুলের পোশাক এবং অন্যান্য জামাকাপড় সাজানো থাকে, তার নীচে এবং পাশেও চাপা অন্ধকার জমে থাকে। ঘন অন্ধকার না-হলেও ইঁদুরকে খুঁজে পাওয়ার মতো যথেষ্ট আলো নেই সেখানে। তাই টর্চ তাকে হাতে তুলে নিতেই হয়েছে।
উবু হয়ে বসে অরিন্দম আলনার নীচে খোঁজে প্রথমে। কারণ তার মনে হয়েছিল, যে দ্রুততায় ইঁদুরটা ছুটে গেছে, তাতে আলনার আড়ালে চলে যাওয়াই স্বাভাবিক। কেননা আলনাটা দরজার প্রায় সোজাসুজি। কিন্তু সেখানে ইঁদুরের কোনও অস্তিত্ব খুঁজে পেল না অরিন্দম। এবার অনিবার্যভাবে খাটের নীচে খুঁজতে হল ইঁদুরটাকে। এবং অল্প খোঁজাখুঁজির পরে পেয়েও গেল তাকে।
অনেকটা ইটের মতোই আয়তাকার কাঠের টুকরো খাটের প্রতিটি পায়ার নীচে সেট করা আছে। অথবা বলা যেতেই পারে, খাটটাকে সেট করার জন্যই কাঠের টুকরোগুলো রাখা আছে। এইরকম একটা কাঠের টুকরোর আড়ালে ইঁদুরটাকে খুঁজে পায় অরিন্দম। ইঁদুরের লেজ নাড়া দেখে প্রথমে শনাক্ত করে ফেলে। তারপর দ্রুত উঠে এসে ঘরের কোণ থেকে ঝুলঝাড়নের লম্বা লাঠি বাড়িয়ে দেয় ইঁদুরটার দিকে। এইসময় ইঁদুরের ত্রস্ত ছোটাছুটি দেখে খুশি হয় আরিন্দম। কিন্তু একসময় খাটের নীচেই কোনও একটা আড়ালে লুকিয়ে পড়ে সে। অরিন্দমের হাতের টর্চ ঠিকঠাক অনুসরণ করতে পারে না ইঁদুরের গতিবিধি। ফলে কিছুক্ষণের চেষ্টার পরেও ইঁদুরটাকে দেখতে না-পেয়ে সরে আসতে বাধ্য হয় সে।
আবার তার মনে গণেশ ও সত্যেনদার আত্মহত্যা ছায়া ফেলে। তাদের কথা ভাবতে থাকে সে। শেষ কবে গণেশকে দেখেছে সে, মনে করার চেষ্টা করে। সত্যেনদার দোকানে সে পারতপক্ষে যায় না। তার স্ত্রী মল্লিকাই ওখান থেকে কেনাকাটা করে। অরিন্দম দু-একবার তার প্রিয় স্যান্ডেল সাবান কিনতে গিয়েছিল। তবু সত্যেনদার মুখটাই ভেসে ওঠে চোখের সামনে। দুজনেই বিপন্ন হয়ে পড়েছিল, তাই আত্মহনন বেছে নিতে হয়েছে। দুই বিপন্ন মানুষের মধ্যে নিজের মুখ খুঁজে পেয়ে অস্বস্তি হয় তার।
সাইকেলে বা হাঁটাপথে মুখোশ-পরা কতিপয় লোকজনের চলাচল দেখতে দেখতেই টের পায় ইঁদুরটা বেরিয়ে এসেছে ভয় সরিয়ে, এবং বারান্দায় তার পায়ের কাছ দিয়েই চলে গেছে অন্যদিকে। তার মানে ইঁদুরটা খাবারের সন্ধান করছে ইতিউতি। যে-কোনও সময় তার নাগালে এসে মারা যেতে পারে জেনেও ইঁদুরের ছোটাছুটি লক্ষ্য করে স্থির হয়ে বসে থাকে অরিন্দম। হঠাৎই সে আবিষ্কার করে, মৃত্যুভয়ের থেকেও খিদে অনেক বড়। আর এই ভাবনাই তাকে ক্রমশ আড়ষ্ট করে দেয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে সে। করে নাকি করত বলবে? চাকরিতে কি আর তাকে নেবে মালিক?
ইতিমধ্যে মল্লিকা তাকে ঘর ঝাড়ামোছার কথা মনে করিয়ে দিয়ে আবার নেমে গেছে নীচে। উঠব উঠব করেও উঠতে পারে না সে। চেয়ারের মধ্যেই আটকে থাকে প্রবল অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও। ইঁদুরটা এদিক-ওদিক খাবারের সন্ধানে ছুটে বেড়ায়, অরিন্দমের উপস্থিতিকে পাত্তা না-দিয়েই। সেও ইঁদুরটাকে নড়েচড়ে বেড়াতে দিয়ে চুপ করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। ইঁদুর নয়, অরিন্দম নিজেকেই দেখতে পায় ইঁদুরের চেহারায়।

ফেসবুকে দেখেছে নিরন্ন দরিদ্র মানুষদের পাশে দাড়াচ্ছে অনেকেই। এসব দেখে বেশ ভালো লাগে তার। কিন্তু মধ্যবিত্ত মানসিকতায় বেড়ে ওঠা অরিন্দম তো পারবে না কারও কাছে হাত পাততে! গণেশের মতো বা সত্যেনদার মতো তারও কি পরিণতি হবে? তার তো এতটা খারাপ অবস্থা নয়! তবু কেন সে নিজেকে এতটা বিপন্ন মনে করছে!
আবার অরিন্দম খবরের কাগজের ওপর ঝুঁকে পড়ে। কাদের ছবি ছাপা আছে ভুলে যায় সে। সেখানে একটা চৌকো আধো অন্ধকার সুড়ঙ্গ আঁকা হয়ে যায় খবরের কাগজের পাতায়, যেখানে গণেশ আর সত্যেনদা হাত ধরাধরি করে হেঁটে যায় তার দিকে পেছন ফিরিয়ে। ওদের পিছন পিছন গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে চলেছে সেই ইঁদুরটাও। অরিন্দম সেই গভীর সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে পড়ে, ইঁদুরের পেছন পেছন সেও চলতে থাকে…

অলংকরণঃ কল্লোল রায়

ফেসবুক মন্তব্য