নির্জন রাস্তাটি

রঞ্জন চট্টোপাধ্যায়



ওই নির্জন রাস্তাটি দিয়ে গল্প শুরু হতে পারে ।

রাস্তাটি সোজা ।

সরল ।

এবং নাটকীয়তাহীন ।

এ বাদে রাস্তাটি যেন সকলের চোখের সামনে থেকেও পর্দার আড়ালে রয়ে যাওয়া চতুর্থ শ্রেণীটির মতো । যেমন আটপৌরে বৌ রাস্তা দিয়ে চলে গেলেও কেউ চেয়ে দেখে না ।

সপ্তাহের ছদিনে শুধুমাত্র সকাল আর রাত্রেই রাস্তাটিকে দেখা । এ বাদে সকালে যে সময়ে বেরোতাম, স্বভাবতই সে সময়ে লোকচলাচল কম । সবে মফস্বলের ঘুম ভাঙছে । জীবন বলতে তখন কয়েকটি রাস্তার কুকুর আর অতি উৎসাহী মুদিখানাওলা ------- যারা কিছু প্যাকেটের দুধের ব্যবসা করে নেয় দোকান খোলার আগেই । যখন রাতে ফিরতাম, তখন রাস্তার বিশ্রামের সময় । সুতরাং হাতে রইল পেন্সিল – সেই রবিবারটি । সেটি তো ছিল নিজেরই বিশ্রামের দিন । সুতরাং রাস্তাটিকে কোনদিন পরিপূর্ণ দেখা হয় নি ।

একটি নির্জন দুপুরে তাই দেখার ছিল রাস্তার মধ্যবর্তী সহমর্মী কে? জ্যৈষ্ঠের গরম হাওয়ায় সকলেই বেরোতে পারেনা। যার উপায় নেই , সেই বেরোয় । এ সময়ে বালখিল্যতা বলতে কয়েকটি নোংরা কাগজ আর মচকানো পাতার হঠাৎই হাওয়ার ঘূর্ণি তুলে পাশে সরে যাওয়া । কেউ হয়ত লক্ষ্য করে না । কিন্তু তাতেও তাদের জীবিত ভাবা যেতে পারে। এছাড়া সহমর্মী বলতে কোন ভাল মানুষকে ভাবা সম্ভব হয় না।

বালখিল্যতা এটুকু সময় পর্যন্ত গ্রহণীয় । যখন সময়ের সাথে সাথে বয়স বেড়ে বয়ঃসন্ধিতে গিয়ে দাঁড়ায় তখন তাকেও কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করার দরকার হয়ে পড়ে। আর ঠিক এই কাজটিই করার জন্য মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে আবাসনের হাতে টানা লোহার ভারী ভারী গেটগুলো । ঘূর্ণির জোর যখন শেষ হয়ে আসে, শক্তিহীন পাতা আর কাগজগুলো টুপটুপ করে পড়ে যায় গেটগুলোর পায়ের কাছে। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে এসব পরিষ্কার দেখা যায়।

রাস্তা এবং গেট -- এ দুয়েরও কিন্তু সাড়ে বত্রিশ ডিগ্রির পৌনঃপুনিক সম্পর্ক থাকে । গেট এবং রাস্তা কেউই কারো দিকে চায় না । আবার জায়গা ছেড়েও যায় না । দুজনেই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। তাই ভাল লাগে একটি নির্জন দুপুরে এই দুজনের দ্বিপ্রাহরিক নৈশব্দ । এত কাছাকাছি, পাশাপাশি থেকেও প্রকাশিত হবার অব্যক্ত অনুভূতি । যাই হোক তবু এই লকডাউনের আবহে এমনটা দেখারও সৌভাগ্য হওয়া চাই।

এরকমই এক নির্জন দুপুরে কারা যেন গেটের মুখে একটি ফ্লেক্স লাগিয়ে দিয়ে গেল --- “ প্রবেশ নিষেধ !!! প্রবেশ নিষেধ !!! কোভিড প্রতিবন্ধিত ক্ষেত্র !!!” কেউ দেখতে পেল না। কিন্তু রাস্তা দেখতে পেল। মুখ বাঁধা কিছু লোক। যারা নিয়মের অনুসারী । আবাসন ঘুরে ঘুরে বাঁশের ব্যারিকেড আর ফ্লেক্স বাঁধতে বাঁধতে চলেছে। রাস্তা জানল একথা । কারণ রাস্তাই তো তাদের আসতে দিল গেট পর্যন্ত। লোকগুলো এল এবং চলে গেল। গেট রইল নির্বাক। রাস্তা অসহায় । মূক ।

নির্বাক সময় একটু একটু করে গড়াল বিকেলের দিকে। সময়ের কী দোষ। সময় যে থেমে থাকতে জানে না। উল্টোদিকের আবাসনের ব্যালকনি থেকে লোকজন উঁকিঝুঁকি দিল এবার । যেন এক্ষুনি কোন মাদারির খেল শুরু হবে। অথবা স্পেনের বুলফাইট । যারা একটু বেলা করে শুয়েছিল, তারাও গরম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ব্যলকনিতে দাঁড়াল একটু পরে । সবাই দেখছিল। কিন্তু কোথাও কোন নাটকীয়তা ছিল না। কোন বুলফাইট না। সাদা ফ্লেক্সটি হাওয়ায় উড়ছিল। ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছিল । পথচারী চলছিল । কিছু লোক দাঁড়াচ্ছিল । সকলে জানতে পারছিল কোন একটি মানুষ বা মানুষেরা কোভিড আক্রান্ত । কেউই কিন্তু সেই মানুষ বা মানুষদের দেখেনি। সকলে দেখছিল একটি আবাসন এবং তার গেট । বাকীটা কল্পনা করে নিচ্ছিল।

স্বভাবতই কিছু মানুষ মাতব্বর থাকলে কিছু গুজব তৈরী হয় ।

প্রশ্ন উঠল কে ? বা কারা?

এবং প্রশ্ন উঠল –------------- কেন?

সরাসরি কারোকে দোষী ঠাওরানো যায় না।

প্রথমত জানতে হয় লোকটি বা লোকগুলির সামাজিক প্রতিপত্তি কেমন। যদি দেখা যায় আক্রান্ত লোকটি একজন সফল রাজনীতিক বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত , বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা লোকটি একজন রাজপেয়াদা --- তাহলে এরকম সিদ্ধান্ত হবে ---- এ তো খুব মামুলি ব্যাপার। এ অসুখ যখন খুশি যার খুশি হতে পারে। সুতরাং সাবধানে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

যদি এসবের কিছুই না হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত হবে, লোকটি নিশ্চয় কোন ভুল করেছিল। কোন ভুল জায়গায় গিয়েছিল। কোন ভুল লোকের সংস্পর্শে এসেছিল। কোন ভুল, কোন ভুল । কোন ভুল একটা খুঁজে বার করতেই হবে । এটা তখন প্রমাণযোগ্য এবং বিশ্বাসযোগ্য , এ অসুখ সচরাচর, সাধারণত , কোন সাধারণ মানুষের হয় না । আমরা সকলেই সুরক্ষিত। এ অসুখ হওয়ার মূল কারণ যেন লোকটা নিজে।

গুজব থেকে প্রথম প্রশ্নের যে উত্তরটি পাওয়া গেল, লোকটি একটি ফার্মেসি কোম্পানির কর্মী। রোজ দশটা পাঁচটা অফিস যায়, তাও আবার কোম্পানির বাসে চড়ে। রবিবার ছুটি। লকডাউনের বাজার। তাই রবিবার বেড়াতে যাওয়ারও উপায় ছিল না। কিন্তু অত্যাবশকীয় সেবা । তাই ঘরে বসে থাকতে পারে নি। অফিস যেতেই হয়েছিল।

লোকটার সামাজিক প্রতিপত্তি নেই। আবার লোকটার সবিশেষ দোষও নেই। কিন্তু এমন করে তো সরলবর্গীয় সমাধানও হয় না। মাতব্বরদের মাতব্বরিটা দেখানো যাবে কোথায়। তাই এ প্রশ্নের সিদ্ধান্ত হল, আজকালকার জমানা, কে কখন কোথায় কিভাবে থাকে , কেউ কি কিছু জানতে পারে।
কখনো কখনো কেনর উত্তরটা কে বা কারার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। যুগ বদলেছে। ব্যাকরণের পদপ্রকরণ অনুযায়ী চলতে গেলে বিশেষ্য - বিশেষণ - সর্বনামের সঙ্গে প্রশ্নসূচক বাক্যের সম্পর্কগত জটিলতা সৃষ্টি হয়।

যেদিন মুম্বই উপনগরী হয়ে উপগ্রহনগরী পর্যন্ত শেষ লোকাল ট্রেন চলল, সেদিন খুব হাঁচি হয়েছিল লোকটার । সেটা ছিল মার্চ মাসের শেষদিক। কিছুদিন আগে পর্যন্ত হোয়াটসঅ্যাপে উহানের ভিডিও আসছিল । রাস্তাঘাট শুনশান । শুধু বাড়ি আর বাড়ি । ঠিক যেন কোন হরর ফিল্মের শুটিং। যদি বা কারোকে সেখানে দেখা যায়, তো তারাও কোট পরে টুপি পরে বেরিয়েছে । সুতরাং নিত্যযাত্রীরা মনে মনে বদ্ধমূল ছিল এমন রোগ এদেশে থানা গাড়তে পারবে না । আমাদের তো গরমের দেশ । সোয়াইন ফ্লু, বার্ড ফ্লুর মতো এও একদিন খেই হারিয়ে ফেলবে এ দেশের অতিদূষণ সহ্য করে নেওয়া মানবশরীরে প্রবেশ করে । আমরা যে মারী নিয়ে ঘর করি । কেউ কেউ তবু তড়িঘড়ি মাস্ক পরে নিয়েছিল। অনেকেই পরে নি। একজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ নিত্যযাত্রী আমাদের সঙ্গে যেত । সে বলল , কত মাস্ক পরবে ? সারাদিন আমাকে হসপিটাল থেকে হসপিটালে ঘুরতে হয় । কত আটকাব । যার সংক্রমণ হবার তার হবেই । আমরাও অমনি নেচেগেয়ে বললাম, চালাও পানসি বেলঘরিয়া । আমরা শেষদিন পর্যন্ত আনন্দে ছিলাম । সেই লোকটাও আমাদের সঙ্গে হয়তো কোথাও মিশে ছিল। আমরা জানতে পারিনি । এমনি করে লোকাল ট্রেন শেষদিন পর্যন্ত চলে ছিল মুম্বই উপনগরী হয়ে উপগ্রহনগরী পর্যন্ত ।

যেদিন হাঁচি হল, সেদিন খুব ভয় করেছিল লোকটার । কি জানি, আবার হয়ে গেল না তো । চারবার ঢোক গিলে দেখল, কোন অসুবিধে হচ্ছে কি না । নাহ , কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না । নাকি যাচ্ছে । নাক দিয়ে জলও তো পড়ল । গলায় শ্লেষ্মা । কিন্তু বলছে তো শুকনো কাশি তার আসল লক্ষণ । থমথমে মুখ, চোখ লাল নিয়ে লোকটা যখন ঘরে ফিরল, ঘরের লোকও সন্দেহে আড়চোখে দেখল লোকটাকে । পাশে সরে গিয়ে বাচ্চাকে বলল, বাবার সামনে বেশি আসিস না । লোকটা শুনল , কিন্তু মাথা নিচু করে থাকল । তখন তো সবে ঊনআশি । তাও সারা ভারতবর্ষের নিরিখে । এরপরে মোমবাতি জ্বালাতে জ্বালাতে , থালাবাসন বাজাতে বাজাতে সবাই সব ভুলে গেল । সকলের চোখের সামনে থেকেও আড়ালে আড়ালে লোকটা সেরেও উঠল । আসলে অসুখটা ওই নির্জন রাস্তাটির মতোই আটপৌরে । দেখেও যাকে দেখতে পাওয়া যায় না । সকলকে হয়তো কাবুও করতে পারে না । কিংবা অসুখটা হয়তো অসুখটা নয় । বোঝা যায় না । মামুলি সর্দি কাশি । এগুলো শুধু মানবশরীর বোঝে । কোনটা অসুখ । আর কোনটা অসুখ নয় । শরীর খারাপ । লকডাউনের প্রথম তিরিশ দিনে সম্পূর্ণ সুস্থমানুষ লোকটা কিন্তু দিব্যি হেসেখেলে বাজার দোকানও করেছিল । ওই গেট দিয়ে বেরিয়ে, ওই রাস্তা দিয়ে হেঁটে , চলে ………। আটপৌরে মানুষ বর্তমানেই বেঁচে থাকে । অতীত মনে থাকে না । ভবিষ্যৎ পড়ে থাকে পরে চিন্তা করার জন্য ।
আমাদের লোকটাও ভবিষ্যতের জন্য চিন্তা করে নি । বীমা কোম্পানির বিজ্ঞাপনগুলো ছাড়া কে-ই বা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে শেখায় । তার ওপর লোকটা আবার উপগ্রহনগরীর নিত্যযাত্রী । দিনের মধ্যে পাঁচ ঘণ্টা তো ট্রেনেই কেটে যেত । দাদা কোন স্টেশনে উঠবেন , তবে একটু বসার জায়গা পাব ----- পিছনের লোকটা ইচ্ছে করে বেশি চাপ দিচ্ছে না তো, নাকি আজ সত্যিই বেশি ভিড় --------- এসব অতি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মাঝে ভবিষ্যৎ ভাবার সময় কোথায় ।

পেটের দায় বড় দায় । লকডাউন একটু উঠতেই তাই অফিসের ডাক এসেছিল । নিয়ম মেনে মাস্ক পরে , সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কোম্পানির বাসে চড়েছিল লোকটা । আরো কয়েকজন সহকর্মীও বাসে ছিল । সকলেই দূরত্ব বজায় রাখছিল । সকলেরই মনে ছিল কী – জানি-কী -হবে - ভাব । তবু সকলকে যেতে হয়েছিল ।

S M S – স্যানিটাইজার – মাস্ক - সোস্যাল ডিস্ট্যান্সিং । খুব সহজবোধ্য ভাবে একটা কথা মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হল । সোস্যাল ডিস্ট্যান্সিং – সামাজিক দূরত্ব । বলা যেতে পারা যেত – শারীরিক দূরত্ব । বলা হলো না । লকডাউনের ফাঁকা রাস্তায় যেতে যেতে কারণটা বুঝতে পারছিল লোকটা । গাড়ি বলতে কোম্পানির বাসটির মতোই আরো কয়েকটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন যানবাহন । জায়গায় জায়গায় পুলিশের গাড়ি । এবং অবিরত ছিন্নমূল , পরিযায়ী মানুষের স্রোত । মাত্র চারঘন্টা আগে দেশে স্বাধীনতাও ঘোষণা হয় নি । আর এখন তো মানুষ মূলত জীবিকার কারণেই ছিন্নমূল, পরিযায়ী । উন্মত্ত প্রাদেশিকতার জেরে মানুষ এখন নিজ দেশে পরবাসী । মাত্র চারঘন্টা আগের একটি ঘোষণার জেরে বাঁধভাঙা মানুষের স্রোত অলীক আশায় বয়ে চলেছে রাস্তা দিয়ে । অলীক আশা, হয়তো কোন একদিন পৌঁছবে নিজভূমে । হয়তো কোনদিন নিরাপদে একটু ডালভাত -- নিরাপদ নিজের ছেড়ে যাওয়া তক্তপোশটি -- হয়তো নসীব হবে । হয়তো কোনদিন এত কষ্ট করে বাঁচতেও হবে না । অবশ্য নিজভূম যে কোনটা সেটাই ওই পথচলা মানুষের কাছে একটি গুলিয়ে যাওয়া ধারণা । এতদিন পরবাসী হয়ে থাকার পর কবে যেন জন্মভূমিটাও পরভূম হয়ে যায় । শুধু বেঁচে থাকাটা কেবলই বাহুলতা । হ্যাঁ, কিছু কিছু স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেলস রাস্তা উজিয়ে চলে যাচ্ছে শোঁও শোঁও করে । মাঝে মাঝে কোন কোনটা থেমেও যাচ্ছে রাস্তার ধারে । চোখে সানগ্লাস, সাদা মাস্ক, সাদা গ্লাভস পরা পরমাসুন্দরীরা নেমেও আসছেন সেইসব গাড়ি থেকে । হাতে তাঁদের খাবারের প্যাকেট, মিনারেল ওয়াটার । যেন দেশব্যাপী মুম্বই ওয়াকাথন হচ্ছে । হন্টন প্রতিযোগিতা । আর এই শখের সহানুভূতিশীলারা রাস্তায় নেমে এসেছেন ফল মূল জল দিয়ে প্রতিযোগীদের সাহায্য করার জন্য । যারা হাঁটছেন তাঁদের কিন্তু কারো করোনা হয় নি । যারা সাহায্য করছেন তারাই কিন্তু দেশ বয়ে নিয়ে এসেছেন এই করোনার জীবাণু । রাস্ট্রযন্ত্র বলে দিল – এই সামাজিক দূরত্বটা হবে ওই সাহায্যকারী আর সাহায্যপ্রার্থী দের মধ্যে । কারণ আর কিছুদিন বাদে সাহায্যপ্রার্থীরা বিনা নোটিশে মরবে । রাস্ট্রযন্ত্র আগেই হিসাব করেছে দাতব্য চিকিৎসার মতো পর্যাপ্ত অর্থ তহবিলে বেশি নেই । আর ভগবান না মারলে মরবে না ওই সাহায্যকারীরা । তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা তারা নিজেরাই করে নিতে পারবে । শারীরিক দূরত্ব হয় না । হতে পারে না । আবার শারীরিক দূরত্ব না হলে এ জীবাণু থামেও না । শত শত মানুষ রাস্তা দিয়ে হাঁটছে । কারো মুখে মাস্ক নেই । কারো সঙ্গে কারো কোন দূরত্ব নেই । কোভিড হয়ে মরে যাওয়ার ভয়টা যেন কোন ভয়ই নয় । ওর থেকে বড় ভয় ক্ষুধা । ওর থেকে বড় ভয় মাথার ওপর ছাদহীনতা । পরিবারের নিরাপত্তাহীনতা । যার পেটে ভাত নেই , কি হবে তার শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ।

কী করে সংক্রমণ লেগেছিল মনে নেই । কার থেকে মনে নেই । লোকটা তো অফিসেই ছিল । আর অফিসের লোকগুলো চেনাজানা । হাওয়া থেকে ? বাতাস থেকে ? তবে শেষ লোকাল ট্রেন থেমে যাওয়ার দিন এর থেকে বেশি অসুস্থ ছিল । এটুকু মনে পড়ে ।
শুধু একটু হালকা জ্বরের মতো । হেমন্তের বিকেলের মতো ছুঁয়ে যাওয়া শিরশিরানি…… সারা শরীর জুড়ে । কারোকে কিছু না বলেই সরকারী চিকিৎসা কেন্দ্রে লাইন দিয়েছিল । দুদিন বাদে বাড়ির সামনে সরকারী অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়িয়েছিল । পরিবারের হতবাক মুখে ছেয়ে ছিল নানারকম সন্দেহের ছায়া । লোকটা বুঝেছিল এরাও সেই সমাজেরই অংশ ।

লোকটাকে আমি আজ পর্যন্ত দেখতে পাই নি ।

তাই তার মধ্যবর্তী টানাপোড়েনের গল্প আমার পক্ষে বর্ণনা করা অসম্ভব ।

আমি শুধু রাস্তাটিকে দেখেছি । এবং গেটটিকে ।


এর মধ্যে অবশ্য গেট এবং রাস্তার মধ্যে পৌনঃপুনিক সখ্যতা হয়েছে । কোয়ারান্টাইন পিরিয়ড শেষ হতে চলল প্রায় । নিশান ওড়ানো সাদা ফ্লেক্সটা এখন ধুলো লেগে অর্ধ মলিন । রাস্তা এবং গেটের অন্তর্লীন নরম সম্পর্কটা এখন ফেক্সটাও বেশ উপভোগ করে । হাওয়ার সঙ্গে ধুলো উড়ে এসে গেটে লাগতে এলে ফ্লেক্স সে ধুলো ঢেইয়ে দেয় রাস্তার দিকে । রাস্তাও বসে থাকে অনুকূল বাতাসের অপেক্ষায় । সুযোগ পেলেই বুঝিয়ে দেয় , সেও কম যায় না । পথচারীর কাছে এখন ফ্লেক্স যেন স্বার্থপর দৈত্যের মতো । দিনে দিনে নিজের গুরুত্ব কমিয়ে হালকা হয়ে উঠছে । আর মাত্র কটা দিন । এখান থেকে এবার তল্পিতল্পা গোটাতে হবে ।

ফ্লেক্স চায়না, রাস্তাও চায়না, গেটও চায়না --- আবার কোন নতুন ফ্লেক্স গেটের মুখে লাগুক ।

ছবিঃ পার্থ প্রতিম চট্টোপাধ্যায়

ফেসবুক মন্তব্য