জংশন

কমল সরকার



(১)


'বাচ্চাটারে চুপ করাইবি, হারামজাদি? তখন থাইক্যা খালি ট্যা ট্যা ট্যা ট্যা!'

কথাটা বলে মুখ বাঁকায় সুখেন। ডান হাতটা খপ করে বসিয়ে দেয় বাঁ উরুর কাছে। তালুর ভেতরে আটকে গিয়ে মাছিটা ফররর ফররর আওয়াজ করতে থাকে। সুখেন হাতটা চেপে দিয়ে পিষে দেয় মাছিটাকে, 'মর শালা!' হাতটা তুলে দেখে ডানা খসে গিয়ে ঠ্যাঙ কেতরে ওর উরুর কাটা জায়গাটায় পেঁচানো ন্যাকড়ার উপর লেপ্টে আছে মাছিটা। দুই আঙুলে তুলে নিয়ে মাছিটাকে ছুঁড়ে ফেলে বিরক্তি সহকারে তাকায় ঘরের দিকে, 'কী রে ছায়া ? কথা কানে যায় না?'

যাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলা তার, অর্থাৎ ছায়ার, তেমন কোনো হেলদোল দেখা যায় না। রোজ রোজ সুখেনের মুখ খারাপ করাটা সে সয়ে নিয়েছে। এক বিঘৎ মাপের ঘোলাটে আয়নাটা বেড়ায় গুঁজে শরীরটাকে খানিকটা ঝুঁকিয়ে এনে মুখ দেখছে সে। কালচে হয়ে যাওয়া চিরুনিটা বারকয়েক টেনে টেনে আঁচড়ে নেয় খসখসে চুলগুলো। পাশেই চৌকিতে শোয়ানো বাচ্চাটা হাত পা ছুঁড়ে কাঁদছে। সাড়ে পাঁচ মাসের ছেলে। ওর দিকে একবার তাকায় ছায়া। কেমন চাঁদপানা ফর্সা টুকটুকে মুখটা! চোখ দুটো কী দুষ্টুমিতে ভরা! তবু একটুও মায়া হয় না লোকটার। আহা রে! খিদে পেয়েছে। চিরুনিটা রেখে বিছানায় এসে বসে ছায়া। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ডান উরুতে মাথা রেখে শোওয়ায়। ব্লাউজের হুকগুলো বাঁ হাতের আঙুলে টান দিয়ে খুলে ডান দিকের মাইটা গুঁজে দেয় বাচ্চাটার মুখে। ক্লপ ক্লপ আওয়াজ করে বোঁটা চুষতে থাকে বাচ্চাটা। বাঁ হাতের তালুতে বাচ্চার মাথাটা ধরে রাখে ছায়া। ওই অবস্থাতেই ডান হাত বাড়িয়ে আয়নাটা আবার টেনে নেয়। নিজের মুখটা দেখে। চোখের নিচে কালি পড়েছে। গাল খসখসে। গলার কাছে ঘাম জমে আছে। আয়নাটা বিছানায় বিছিয়ে রেখে আঁচল দিয়ে ঘামটা মোছে। বাচ্চার পেট একটু ভরে গেলে মাই ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায় ছায়া। বাচ্চাটা আবার ওঁয়া ওঁয়া করে কেঁদে ওঠে। বেড়ায় বাঁধা তক্তাটার থেকে বাদামি রঙের শিশিটা নামিয়ে নেয় ছায়া। শিশিটা খুলে এক ঢোঁক তরল ঢেলে দেয় বাচ্চাটার মুখে। তরলটা টাহ্ টাহ্ করে চেটে খেয়ে নেয় বাচ্চাটা। ধীরে ধীরে চোখের পাতা মুদে আসে। যাক! ঘন্টা তিনেকের জন্য নিশ্চিন্তি। ব্লাউজের হুকগুলো লাগিয়ে আঁচলটা ঠিক করে পরে নেয় ছায়া। সিঁদুরের কৌটোটা হাতে নিয়ে খানিক থমকায়। পরবে কি? অনেকদিন থেকেই তো পরে না ভালো মতোন। আজ কেন যেন একটু সাজতে ইচ্ছে করছে তার। যেখানে সে যাচ্ছে সেখানে সাজগোজের প্রয়োজন পড়ে না। বরং নোংরা কুৎসিত থাকলেই লাভ। তবু কী ভেবে এক চিলতে সিঁদুর সে ছুঁয়ে নিল সিঁথিতে। হাতের হলদেটে হয়ে যাওয়া শাখা দুটোতেও সামান্য ছোঁয়ালো। দুই হাত ভাঁজ করে মাথায় ঠেকাল। তারপর বাচ্চাটাকে তুলে নিয়ে শুইয়ে দিল বাঁ কাঁধে।বিছানায় পেতে রাখা কাঁথার তলা থেকে কাপড়ের বটুয়াটা বের করল। ভেতরে শিশিটা ভরে নিয়ে বটুয়াটা গুঁজে নিল কোমরের ঘুনসিতে। দরজার আড়াল থেকে ব্রাশ-ঝাড়ুটা নিয়ে বেরিয়ে এলো। বাইরে সুখেন বসে বিড়ি ফুঁকছে। পাশে পড়ে আছে পান্তাভাতের এঁটো গামলা আর জলের গ্লাস। সেদিকে না তাকিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেল বাইরে।

ছায়ার ওইভাবে চলে যাওয়াটা দেখে মাথাটা গরম হয়ে গেল সুখেনের। গলা চড়িয়ে বলতে লাগল, 'আর আসবি না বইলা দিলাম। যেইদিকে দুই চোখ যায়, যা গা'। হারামজাদি খানকি!'

ছায়া কথাটা শুনলো বলে মনে হল না সুখেনের। প্রত্যুত্তর না পেয়ে সে আরও খেপে গেল। গজগজ করতে লাগল। তবু চেয়ে রইল বাইরে যতক্ষণ না ছায়া তার দৃষ্টির অগোচর হলো।

চোখের সীমা থেকে ছায়া অদৃশ্য হয়ে গেলে বুকটা হু হু করে উঠল সুখেনের। আহা! এমনি করেই তো সে চেয়ে থাকতো ছায়ার চলে যাওয়ার দিকে। কতদিন! সে চুড়ি আয়না ফিতে ক্লিপ ফেরি করতো সাইকেলে পাড়ায় পাড়ায়। ছায়া থাকতো ওর মামার বাড়ি। অনাথ মেয়ে। মামির সংসারে দিনরাত খাটে। কী কষ্ট তার! তবু চোখে কী মায়া! কী জাদু! সেই জাদুতেই না কাত হলো সুখেন। রাস্তায় সাইকেল দাঁড় করিয়ে হাঁক দিয়েছে সে, 'চুড়ি নিবা গো, চুড়ি? আয়না, কিলিপ, পাউডার, মেন্দি... '। ঘর থেকে ছুটে ছুটে এসেছে সে। এটা ওটা নেড়েঘেঁটে দেখেছে। দামাদামি করেছে। পছন্দসই জিনিস নিয়ে আবার ছুটে গেছে ঘরে। সেই দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকেছে সুখেন। ছায়া বুঝেছে তার চোখের ভাষা। তারপর একদিন সময়-সুযোগ বুঝে চলে এসেছে ওর সঙ্গে।

আলিপুরদুয়ার জংশনের কাছে রেলবস্তিতে একটা জংলা জায়গা সাফসুতরো করে ঘর তুলেছে। একটু বেশি রোজগারের আশে সুখেন সাইকেল বিক্রি করে দিয়ে হরেকরকম মালপত্র কিনে ট্রেনে ট্রেনে হকারি শুরু করেছে। ভালোই চলছিল সবকিছু। তারপর কী অলক্ষুণে দিন এলো একটা! বানারহাট স্টেশনে ট্রেনের এক কামরা ছেড়ে আরেক কামরায় ওঠার মুহূর্তে ট্রেনের গতি বেড়ে গেল। সুখেন পা হড়কে পড়ে গেল নীচে। মুখটা প্ল্যাটফর্মে থুবড়ে পড়ল আর পা দুটো লাইনে। পিষে দিয়ে গেল ডাউন ক্যাপিটাল এক্সপ্রেস। রেলের লোকই ওকে নিয়ে এলো আলিপুরদুয়ার হাসপাতালে। উরুর থেকে দুটো পা-ই কেটে বাদ দিতে হলো। হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে দেবার সময় বলেছিল বাইরে ড্রেসিং করিয়ে নিতে পুরোপুরি না শুকোনো অব্দি। সেসবের উপায় কী? রোজগেরে লোকটাই যখন অচল হয়ে পড়ে আছে পয়সা আসবে কী করে? মাঝেমধ্যে অন্য হকাররা এসে কিছু সাহায্যটাহায্য দিয়ে গেছে। কিন্তু ওই করে আর কয়দিন! রেলের থেকে কিছু টাকা দেবে বলেছিল। কিন্তু তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট কই? সে ব্যবস্থা আর হয়নি। না পেরে শেষে ছায়াকেই উঠতে হয় ট্রেনে।
ছায়া ট্রেনের ডাব্বাগুলোয় প্যাসেঞ্জারদের পায়ের তলায় পড়ে থাকা বাদামের খোসা, লজেন্সের র‍্যাপার, বিড়ির মোথা, আরও কত কী যে ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করে! তারপর হাত পাতে প্যাসেঞ্জারগুলোর কাছে। এক টাকা, দু টাকা যার যেমন খুচরো থাকে, দেয়। তবু তাতে সংসার চলে কই! কিছুদিন সে হিজড়েদের দলেও ভিড়েছে। হিজড়েদের কামাই ভালো। হাত ঠুকে গা ঘেঁষে দাঁড়ালে খুব একটা 'না' করতে পারে না কেউ। পাঁচ টাকা, দশ টাকা জন প্রতি আদায় হয়। ছায়াকে অবশ্য হাত ঠুকে কিছু করতে হয়নি। সঙ্গে থেকে দল ভারী করেছে শুধু। কিন্তু তাও সইলো না। সে তো আর হিজড়ে নয়। প্রথম প্রথম সুখেনের অবস্থা বিবেচনা করে দয়াদাক্ষিণ্য দেখিয়েছে ওরা। পরে দলে একসময় অসন্তোষ দেখা দেয়। ওর মুখের উপরে কেউ কিছু না বললেও ছায়া বুঝতে পেরেছে। বুঝে নিজেই সরে এসেছে। এই হিজড়েদের দলে থাকতে থাকতেই পেটে আসে বাচ্চাটা। সুখেন হিসেব মেলাতে পারে না। এখানে আসার তিন মাসের মাথায় পা কাটা গিয়ে সে অচল হয়ে আছে। সুস্থ সবল হতে মাস দুয়েক লাগল আরও। তার মধ্যেও যে দিনকয়েক মিলন হয়নি তা নয়। শরীরের কষ্টের চেয়ে খিদেটা বেশি চাগাড় দিয়ে উঠলে সুখেন উঠে এসেছে ছায়ার উপরে। চেষ্টা করেছে প্রবলভাবে। ছায়াও সঙ্গত দিয়েছে যথাযথ। তবু সময়ের হিসেবটা তার মেলে না। সন্দেহ হয়। বাচ্চাটাকে দেখলে রাগ হয়। ছায়াকে সেজেগুজে বেরোতে দেখলে মাথায় আগুন জ্বলে। কিন্তু রেগেই বা সে করবে কী? বাচ্চাটাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে কাঁধে ফেলে রেখে ট্রেনে ঝাড়ু চালিয়ে তিন তিনটা মানুষের পেট চালাচ্ছে সে। ভিক্ষে তো করছে না। ভিক্ষে একদম পছন্দ করে না সুখেন। না খেয়ে থাকবে তবু খালি খালি হাত পাততে পারবে না কারো কাছে। কিন্তু সারাদিন নিষ্কর্মার মতো কত আর বাড়ি বসে থাকা যায়! সুখেন তাই বেরোয় মাঝেমধ্যে। এখানে ওখানে যায়। আজও একবার 'নবদিগন্ত' ক্লাবে যাবে মনোস্থির করলো সে।

যথাসময়ে ড্রেসিং আর ফলো-আপ ট্রিটমেন্ট হয়নি বলে কাটা পা-দুটো নিয়ে ভুগে আসছে সুখেন। মাঝে মাঝেই একটা দুটো ঘায়ের মতো হয় কাটার খোলা অংশে । পুঁজ বেরোয়। রক্ত বেরোয়। মাছি বসে ভনভন করে। ন্যাকড়া দিয়ে পেঁচিয়ে রাখে সে। এই মুহূর্তে সে ন্যাকড়া পেঁচিয়ে নিয়েছে কাটা উরুর মাথায়। তারপর ছেঁড়া কাপড় গোল করে বানানো বিড়াদুটো গলিয়ে নেয় দুই হাতে। বিড়ার উপরে হাতের ভর দিয়ে শরীরটাকে শূন্যে ভাসিয়ে এগিয়ে যায়। নবদিগন্ত ক্লাবে আসে। ক্লাবের ভেতরে ছেলেগুলো ক্যারাম খেলছে। টিভি চলছে। খবরে প্রচার হচ্ছে মা-মাটি-মানুষের সরকারের জনদরদি প্রকল্পগুলি। সুখেন একটা হাঁক দেয় ক্লাবের বারান্দায় উঠে। প্রথমটায় ওকে কেউ লক্ষ করেছে বলে মনে হয় না। বারকয়েক আওয়াজ দেয় সে। একটা কমবয়সি ছেলে এসে দাঁড়ায় সামনে। সুখেনকে দেখে ছেলেটা বলে, 'অ! তুমি আসছো আবার?' তারপর ভেতর দিকে মুখ ঘুরিয়ে আওয়াজ দেয়, 'ও সজলদা! দেখে যাও তো একটু।' বছর তিরিশের এক যুবক টিভির রিমোট হাতে বারান্দায় আসে। ডান হাতে স্টিলের বালা চকচক করছে, কবজিতে কতগুলো লাল সুতো পেঁচানো, কানের উপরে ন্যাড়া করে ছাঁটা, মাথার মাঝখানে কাকের বাসার মতো বিক্ষিপ্ত এক ঝাঁক চুল। সুখেনকে বলে, 'বলো কী ব্যাপার?'
--- দাদা! বলছিলা যে একটা টাই-সাইকেল দিবা! এক বছর ধইরা খালি আসতাছি আর যাইতাছি। আইজও পাইলাম না।
--- আরে হবে হবে। একটু সময় লাগবে। আসলে কী হইচে বলোতো! প্রতি বচ্ছর দিদি তো ক্লাবে ক্লাবে দুই লাখ কইরা টাকা দেয়। তয়, আমরা এই বচ্ছর পাই নাই। তার মইধ্যে তুমি আবার এইখানের ভোটার না। তোমারে যে দিবো, তাতে আমাদের কী লাভ? তুমি তারচে' এক কাম করো। তুমি একবার 'মানবিক মুখ'-এর সঙ্গে দেখা করো। ওরা তোমারে নিশ্চই কিছু সাহায্য করবো।
সুখেন বুঝলো এখানে কিছু হবে না। অনেকদিন ধরেই খালি খালি আশা দিয়ে যাচ্ছে। এদের কাছে মানুষ হওয়ার আগে ভোটার হওয়া জরুরি । তার তো কোনো কাগজপত্তরই নেই৷ অগত্যা অন্যখানেই যাওয়া ভালো । মুখে বলে, 'ওই ক্লাবটা কই গো?'
--- ক্লাব! কোন্ ক্লাব?
--- ওই যে বল্লা, মানবিক মুখ না কী য্যান!
--- আরে ওইটা ক্লাব না। এনজিও।
--- অ। তা কোন্ জা'গায় ওইটা?
---ওদের অফিস তো এইখান থাইকা অনেকটাই দূর। তুমি যাইতে পারবা?
--- পারবো না, না?
কাটা পা দুটোর দিকে তাকিয়ে নিজের অক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হয় সুখেন। বিমর্ষ মুখে বলে, 'আইচ্ছা। থাক তাইলে। তোমরা কোনো ব্যবস্থা করতে পারবা না, না?'
--- বললাম যে টাকা পাই নাই এইবার। পাইলে তোমারে খবর দিবো। এখন আসো।
'আইচ্ছা'। মুখে তা-ই বলে সুখেন। মনে মনে বলে, 'গুয়া মারি তোর টাকার। শালা!'
সুখেন চলে আসতে চাইলে সজল তাকে আবার ডাকে। 'তুমি রাজি থাকলে অন্য একটা ব্যবস্থা কইরা দিতে পারি।'

সুখেন ফিরে তাকায়। সজল কমবয়সি ছেলেটাকে ইশারায় ভেতরে পাঠিয়ে নিজে চলে আসে সুখেনের কাছে। ঝুঁকে গিয়ে সুখেনের মুখের কাছে মুখ এনে বলে, 'তোমার তো বউ আছে। বয়স কম। চেহারাটাও সলিড। তা কই কী, আমাদের তো হোটেলের ব্যবসা আছে। যদি দিনের বেলায় এক দুই ঘন্টার জন্যও আসে, ভালোই কামাই হবে। আর যদি রাতে থাকতে পারে তাইলে তো গুটি লাল! বুঝলা?'
সুখেন বোঝে। ভেতরে ভেতরে রাগতে থাকে। রাগটা বাইরে প্রকাশ করতে না দিয়ে তাকিয়ে থাকে সজলের দিকে। সজল বলে চলে,' ভয়ের কিছু নাই। পুলিশ তো আমাদেরই লোক। জানাজানিরও চান্স নাই। খালি বাইরের কাস্টমার আসলেই ডাক দিবো। লোকাল কেউ জানবোই না। কলেজের অনেক সুন্দরী সুন্দরী মেয়ে, ভালো ভালো বাড়ির স্ট্যান্ডাড বউ এই লাইনে আসছে। কেউ কি জানে? তুমি বউরে রাজি করাইতে পারলে বইলো। আর তুমি না পারলে আমিও বলতে পারি।'

সুখেনের বলতে ইচ্ছে করছে, 'বিপদে পড়ছি, মানলাম। তাই বইলা অ্যাতো খারাপ অবস্থা হয় নাই যে বউরে বেইচা প্যাট চালাইতে লাগবে।' আর ইচ্ছে করছে ঘুষি মেরে ওর বত্রিশটা দাঁত ফেলে দিতে। কিন্তু নিজের অসহায়তার কথা মনে করে ইচ্ছেগুলোকে খুব কষ্টে দমন করল সুখেন। মুখে বলল, 'অনেক ধন্যবাদ তোমারে। আসি। নমস্কার।'
রাস্তার দিকে ফিরতে থাকে সুখেন। পেছন থেকে সজলের গলা ভেসে আসছে, 'কথাটা ভাইবা দ্যাখো সুখেন। এরম চান্স কিন্তু আর পাইবা না।' কথাটায় কান গরম হয়ে ওঠে সুখেনের। শরীরটাকে টেনে টেনে দ্রুত রাস্তায় চলে আসে। মনটা হঠাৎ বিহ্বল হয়ে ওঠে তার। ছায়ার জন্য কেমন একটা মায়া অনুভব করে। কী যে করছে বউটা! কোথায় যে আছে এখন সুখেনের ছায়া... সুখের ছায়া...


(২)

দলগাঁও স্টেশনে দিনহাটা-শিলিগুড়ি ডেমুটা দাঁড়ালে পেছনদিকের কামরা থেকে প্ল্যাটফর্মে নেমে এলো ছায়া। সামনে তাকাতেই লোকটাকে আজ আবার দেখতে পেল সে। ইঞ্জিনের দিকের একটা কামরা থেকে লোকটা নীচে নেমে দাঁড়িয়ে আছে। বুকটা ধক করে উঠল ছায়ার । এর আগেও দিন কয়েক দেখতে পেয়েছে। কিন্তু দূর থেকেই। সবগুলো কামরা এক এক করে পেরিয়ে গিয়ে লোকটাকে আর ধরতে পারেনি। হয় লোকটা আগেই নেমে গেছে, নয়তো তাকেই নেমে যেতে হয়েছে কোনো কারণে। আজ সে ঠিক করেছে যে করেই হোক, লোকটার মুখোমুখি হবে। ঘুমন্ত বাচ্চার মাথাটা এক হাতে আর অন্য হাতে ঝাড়ুটা শক্ত করে ধরে দ্রুত পা চালিয়ে সামনের কামরাগুলোর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে ছায়া। তার মনে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়তে থাকে বছর দেড়েক আগের দৃশ্যগুলো।

ছায়া তখন হিজড়েদের দলে। আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে শিলিগুড়ি জংশন পর্যন্ত ওদের এলাকা। এনজেপি থেকে অন্য দলের অধিকার। বিকেলের ট্রেনে শিলিগুড়ি পৌঁছে টাকাপয়সার ভাগবাঁটোয়ারা সেরে ফিরতি ট্রেনের অপেক্ষায় বসে থাকে দলটা। আপ-মহানন্দা বরাবরের মতোই অস্বাভাবিক লেট করে স্টেশনে আসে। ভীড় খুব বেশি নয়। নিত্যযাত্রীরা ইন্টারসিটি এক্সপ্রেসে চলে গেছে। ফলে শিলিগুড়ি থেকে নিউ মাল জংশন ভায়া হয়ে আলিপুরদুয়ার লাইনে যাওয়ার লোক একেবারেই কম। ছায়া দলটার সঙ্গে একেবারে শেষ কামরায় উঠেছে। জেনারেল কামরা। পরের স্টপেজে পরের কামরায় উঠবে। ট্রেনটা এমনিতেই অনেক লেট। আর একবার লেট হলে সে আরও লেট করবে। প্রতিটা স্টেশনে দাঁড়াচ্ছে। উল্টোদিক থেকে আসা এক্সপ্রেস, মালগাড়ি, ডেমু সবগুলোকেই ক্রসিং বা হল্ট দিচ্ছে এই ট্রেনটাকে দাঁড় করিয়ে। ট্রেনটা যখন বিন্নাগুড়ি পৌঁছালো তখন স্টেশনের ডিসপ্লে ঘড়িতে রাত বারোটা আট।

ছায়াদের দলটা তখন সামনের দিকের স্লিপার কামরাগুলোয় কালেকশন করছে। যেহেতু বার্থগুলো ফাঁকা ফাঁকা, একজন প্যাসেঞ্জার এখানে তো আরেকজন অন্য মাথায়, ফলে ছায়াদের চারজনের দলটাও ছন্নছাড়া হয়ে গেল। একটা কামরায় ছায়ার সঙ্গে হিজড়ে দলের একজন। বাকি দুজন উঠেছে আগের কামরায়৷ এই কামরাটায় একজনমাত্র যাত্রী। লোকটা ওদের সঙ্গে গল্প জুড়েছে। ট্রেন ছেড়ে দেবার মুহূর্তে লোকটার থেকে টাকা নিয়ে হিজড়ে সঙ্গিনী নেমে যায় আগের কামরায় ওঠার জন্য। ছায়াও পেছন পেছন গিয়ে দরজার কাছে পৌঁছে থমকে যায়। ট্রেনের গতি বেড়ে গেছে। চলন্ত ট্রেনে ওঠানামায় এখনও ততোটা অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি সে। তাছাড়া দরজার সামনে এলেই ওর মনে পড়ে সুখেনের কথা। সেও তো এইভাবেই...

ছায়া নামে না। ফিরে আসে। লোকটা জানলা দিয়ে লক্ষ্য করেছে ব্যাপারটা। ছায়াকে ডেকে বসায় সে। মুখোমুখি সিটে বসে তারা। লোকটা ছায়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলে, 'একটা কথা জিজ্ঞাস করি। ঠিক করে বলবে?'
ছায়া কোনো জবাব দেয় না। লোকটা বলে, 'তোমাকে তো ওদের মতো লাগে না! তুমি কি...'
ছায়া ঘাবড়ে যায়। ভেতরে ভেতরে কাঁপতে থাকে। কী বলবে সে ভেবে পায় না। লোকটা বলতে থাকে, 'ভয় পেয়ো না। আমার তোমাকে দেখে সন্দেহ হয়েছে তাই জিজ্ঞাস করলাম। তুমি সত্যি বলো।'
ছায়া দেখলো মিথ্যে বলে লাভ নেই। খুব মৃদু গলায় বলল, 'আমি হিজড়া না।'
লোকটা প্রায় লাফিয়ে উঠল যেন, 'ঠিক ধরেছি। তা তুমি ওদের দলে কীভাবে আসলে? বলো শুনি। ওরা তো যদ্দুর জানি অন্য মানুষকে দলে নেয় না।'
--- নিরুপায় হয়া আসছি গো। না আইসা উপায় আছিল না।
--- হুম। তা নামবা কোথায়?
--- শেষ মাথা। আপনে?
--- তার আগেই। কালচিনি।
--- আইচ্ছা।
দুজনের গল্প চলে কিছুক্ষণ। ছায়া জানায় তার ইতিহাস। সুখেনের অ্যাকসিডেন্টের কথা। সব শুনে লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর মানিব্যাগ হাতড়ে বের করে একটা পাঁচশো টাকার নোট। দুই আঙুলে নোটটা ধরে রেখে বলে, 'এইটা তোমাকে দিতে চাই। কিন্তু এমনি এমনি তো দেওয়া যায় না। তুমি বুঝতে পারছো?'
ছায়া বোঝে। একটু একটু ভয় করে তার। খুব নীচু অথচ দৃঢ় গলায় বলে, 'আমি ওইরকম মেয়েছেলে না। '
--- সে আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু ভেবে দেখো, তোমার নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে। স্বামী পঙ্গু। সে তো এখন কিছু পারে না বোধহয়। আর আমি মানুষটাও বিয়েশাদি করিনি। ছত্রিশ বছর বয়স হলো। বুঝতে পারলে?'
একটা অদ্ভুত দোলাচলে পড়ে ছায়া। পাঁচশোটা টাকা! শুধু ওর একার ভাগে। এই সময় টাকাটা খুব দরকার। সুখেনের জন্য ওষুধ কিনতে পারছে না অনেকদিন হলো। তাছাড়া সদ্য বিয়ে, শরীরের বর্ষা এখনো ঝমঝম করে। সুখেনের অ্যাকসিডেন্টের পর থেকে তো খরা চলছে। মুখে কিছু বলে না ছায়া। জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। লোকটা ওর পাশে এসে বসে। বলে, 'আমি জোর করবো না। রেপ করবো না তোমাকে। তুমি নিজের ইচ্ছায় রাজি হলে বলো। ফাঁকা ট্রেন। কেউ কিচ্ছু জানবে না।' কথাটা বলে ছায়ার কাঁধে আলতো করে একটা হাত রাখে লোকটা। ছায়া কেঁপে ওঠে। লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলে। কিন্তু হাতটা সরিয়ে দেয় না। লোকটা এবার দুই হাত ছায়ার দুই কাঁধে রেখে আলতো টান দেয়। আর তখনি ওদের কামরাটা একটা লোহার ব্রিজে ওঠে। ভারী ধাতব শব্দ এসে ভরে দেয় কামরাটা। ছায়ার বুকের ভেতরেও যেন একটা ট্রেন ছুটে যায় লোহার সেতু দিয়ে। একইরকম শব্দ হয় ওর বুকে, ঠপক ঠপ.. ঠপক ঠপ...

শব্দটা অনেকদিন পর আবার শুনতে পাচ্ছে ছায়া নিজের বুকের মধ্যে। বুকে ঝাড়ুহাতটা ধরে সে দেখে ইঞ্জিনের পেছনে দু নম্বর কামরাটায় উঠলো লোকটা। ছায়া এগিয়ে যেতে যেতে সিগন্যাল পড়ে গেল। হুইসেল পড়ল। ছায়া তাড়াতাড়ি একটা কামরায় উঠে পড়ে। আর তিনটে কামরা পরেই লোকটা। ট্রেন চলতে শুরু করে। পরের স্টেশন বিন্নাগুড়ি। এই স্টেশনেই তো লোকটার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আবার কি একই স্টেশনে দেখা হবে তার সঙ্গে? একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে টয়লেটের পাশে হেলান দিয়ে বসে থাকে ছায়া।
ট্রেন থামল। বাচ্চা আর ঝাড়ু নিয়ে নীচে নামল ছায়া। প্ল্যাটফর্মের লোকজনকে এড়াতে এঁকেবেঁকে এগিয়ে গিয়ে পরের কামরাটায় উঠলো। ভেতরে ভেতরে খুব উত্তেজনা অনুভব করছে সে। কেন সে লোকটাকে খুঁজছে, কী চায় তার কাছে, কেন তার মুখোমুখি হতে চায়, কী বলবে সে লোকটাকে, আদৌ তার বলার মতো কিছু আছে কি না --- সব কেমন তালগোল পাকিয়ে গেছে। ধীর পায়ে ছায়া এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিটা বার্থের প্যাসেঞ্জারগুলোকে দেখতে দেখতে, লোকটাকে খুঁজতে খুঁজতে। দুটো বার্থ পেরিয়েই কামরার মাঝদরজার পাশের বার্থে পেয়ে গেল লোকটাকে। হ্যাঁ, সেই লোকটাই। চিনতে একটুও ভুল হচ্ছে না তার।
লোকটার পাশে জনা চারেক দিদিমণি আর দুজন লোক যারা ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে। আজ শনিবার বলে দুপুর-বিকেলের ডেমুটা ধরে ফিরছে। মুখোমুখি লম্বা সিট দুটোয় ছড়িয়েছিটিয়ে বসেছে তারা। লোকটা বসেছে ট্রেনের মুখের উল্টোদিকে জানালা ঘেঁষে। ছায়া দুই সিটের মাঝ বরাবর এগিয়ে যায় জানলার দিকে। হাঁটু মুড়ে বসে লোকটার সামনে। কিন্তু তার মুখের দিকে তাকায় না। ঝাড়ুটা হাত থেকে নামায়। সিটের নীচে ঝাড় দেবার আগে বাচ্চাটাকে ঠিকমতো কোলে বসানোর বাহানায় সবার অলক্ষ্যে একটা চিমটি কেটে দেয়। ওঁয়া করে কেঁদে ওঠে বাচ্চাটা। এবার সে তাকায় লোকটার দিকে। কান্না শুনেই যেন লোকটা তাকিয়েছে বাচ্চাটার দিকে। লোকটা কি চিনতে পারছে তার নিজ সন্তানের কান্না? লোকটা কি বাচ্চাটার মুখে দেখতে পাচ্ছে নিজের মুখের আদল? একজন পুরুষ কি দেখেশুনে বুঝতে পারে তার অবৈধ কোনো শিশুসন্তানকে?
লোকটার মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখতে পায় না ছায়া। তবু একটা অদ্ভুত শান্তি, একটা অন্যরকম তৃপ্তি অনুভব করে সে মনে মনে। এক সন্তানকে সে তার পরিচয়হীন জন্মদাতার, জন্মদাতাকে তার অজ্ঞাত অপত্যের মুখোমুখি সে করতে পেরেছে। মন থেকে একটা ভার যেন কমে গেল তার। এটাই যেন সে চাইছিল! ঝাড়ুসহ বাচ্চাটাকে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। ঝাড় না দিয়েই চলে আসতে থাকে। ওর এই নাটকীয় আচরণে জনৈকা দিদিমণি বলে ওঠে, 'অ্যাই। অ্যাই। শোনো, শোনো। দাঁড়াও, দাঁড়াও।'
ছায়া দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকায়। দিদিমণি বলে, 'তুমি, তুমি আগে হিজড়াদের সঙ্গে থাকতে না? হ্যাঁ?'
ছায়া কিছু বলতে পারে না প্রথমে। ধরা পড়ে যাওয়ার আতঙ্কে যেন চুপসে যাচ্ছে। তবু প্রাথমিক জড়তাটা কাটিয়ে বলে, 'আমি? না, না। আমি না। '
--- হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমিই। আমি ঠিক চিনেছি। তা হিজড়া থেকে মানুষ হয়ে গেলে কী করে? হ্যাঁ?'
দিদিমণির কথাটা শুনে লোকটা তাকালো ছায়ার দিকে। মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হল দুজনের। লোকটা কি চিনতে পারলো ? মনে আছে কি তাকে? বুঝতে পারে না ছায়া। তাকে এখন ঘিরে ধরেছে দিদিমণিরা।
--- সব ধাপ্পাবাজের দল।
--- বাচ্চাটা কার? তোর? উঁহু! মনে তো হচ্ছে না।
---- উম্ম। এমন সুন্দর বাচ্চা এঁর হবে কী করে? নিশ্চই অন্য কারুর বাচ্চা।
---- ঠিক করে বল কার বাচ্চা। চুরি করেছিস?
ছায়া বলে যায়, 'আমার বাচ্চা। আমি জন্ম দিছি। চুরি করি নাই।' কিন্তু সকলের সমবেত আক্রমণ সে সামলে উঠতে পারে না। ছায়াকে তারা ধরে রাখে। বাচ্চাটাকে ছিনিয়ে নেয়। ছায়ার কোমর থেকে বটুয়াটা কেড়ে নেয় একজন। তার ভেতর থেকে বের হয়ে আসে কিছু খুচরো পয়সা আর ঘুমের ওষুধের শিশিটা। পাশের বার্থ থেকে তামাশা দেখতে আসা এক মোটাসোটা রাগি মহিলা ছায়াকে চড়থাপ্পড় দিতে উদ্যত হলে লোকটা বলে, 'আহা! গায়ে হাত দেবেন না। থাক। গায়ে হাত দিতে হবে না। পুলিশের হাতে তুলে দিলেই হবে।' লোকটা চিনলো কি ছায়াকে? মারের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল দয়া দেখিয়ে! ছায়া বুঝতে পারে না। তাকে নিয়ে একটা শোরগোল পড়ে গেছে কামরাটায়। একজন ফোন করে শিলিগুড়ির 'চাইল্ডলাইন'-এ। সেখান থেকে জানায় বাচ্চা ও মহিলাকে ধরে রাখতে। থানায় ফোন করে জানাচ্ছে তারা। দিদিমণিরা বাচ্চা কোলে নিয়ে মোবাইলে ছবি তুলছে। কেউ কেউ ভিডিও করছে। শিলিগুড়ির 'সিসিএন' লোকাল চ্যানেলে আর 'উত্তরবঙ্গ সংবাদ'-এ প্রকাশিত হবে ঘটনাটা। এসব হৈহট্টগোলের মধ্যে ছায়া বসে আছে নীচে, পা ছড়িয়ে, আঁচল খসিয়ে।

শিলিগুড়ি আসতে এখনো ঢের দেরি। দেখা গেলো এই বার্থের থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যাচ্ছে দুই দিদিমণি আর এক ভদ্রলোক। আর লোকটা। অন্য বার্থেও তেমনি একজন বা দুজন। বাকিরা নেমে গেল নিজ নিজ গন্তব্যে। দিদিমণিরা বাচ্চা রেখে অভ্যস্ত নয় বলে ছায়ার কোলেই দিল আবার। রাখতে দিল শুধু। শিলিগুড়ি জংশনে 'চাইল্ডলাইন'-এর লোকেরা নিয়ে নেবে। ছায়া বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আঁচল দিয়ে ঢাকে। ব্লাউজের হুক খুলে মুখে মাই গুঁজে দেয়। বাচ্চাটা শান্ত হয়ে খেতে থাকে। চোর ধরার, ধাপ্পাবাজ ধরার রোমাঞ্চকর কাহিনির ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে লাইক কমেন্ট গুনতে থাকা দিদিমণিরা খেয়াল করে না এক শিশুকে স্তন্যপান করিয়ে যাচ্ছে তার খাঁটি ও অকৃত্রিম মা।

নিউ মাল জংশনে ট্রেন ঢুকছে। নামার প্যাসেঞ্জার দরজার প্যাসেজে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওঠার প্যাসেনঞ্জাররা প্ল্যাটফর্ম বরাবর ব্যাগপত্র নিয়ে তৈরি হচ্ছে। দিদিমণি আর উল্টোদিকের ভদ্রলোক ফোনে ব্যস্ত। লোকটা তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে।হকাররা উঠে পড়েছে চলন্ত গাড়িতে। 'অ্যায় সিঙারা, গরম সিঙারা' হেঁকে যাচ্ছে। ছায়া আঁচলের আড়ালে মাই থেকে বাচ্চার মুখ ছাড়ায়। হুক লাগায়। বাচ্চাটা ঘুমিয়ে পড়েছে আবার। ধীরে ধীরে বাচ্চাটাকে সরিয়ে নীচে শুইয়ে দেয়। লোকটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসে। তারপর হঠাৎ করে উঠে দাঁড়িয়ে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকজনকে ঠেলেঠুলে দৌড়ে চলে যায় দরজায়। ট্রেন স্লো হয়েছে কিন্তু থামেনি। তবু ভয়টাকে আমল দিচ্ছে না সে। সামনের দিকে তাকিয়ে নেমে যায় প্ল্যাটফর্মে। শাড়ি পায়ে জড়িয়ে পড়ে যায়। হাঁটু ছড়ে গিয়ে রক্ত বের হয়। পেছন থেকে আওয়াজ আসে, 'আরে মরবে নাকি?'
--- অ্যাই চোর চোর!
--- অ্যাই ধর ধর ধর ধর!
--- অ্যাই পালাইলো পালাইলো।
ছায়া কোনরকমে উঠে দৌড়ে চলে যায় প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে বাইরে। ট্রেনের ভেতরে চিৎকার চেচামেচিতে বাচ্চাটা উঠে গিয়ে কাঁদতে থাকে। ছায়া শুনতে পায় না সেই কান্না। সে শুধু দেখে দিনের শেষ আলোটুকু নিয়ে দূরের আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে গোলাপি-সাদা কয়েকটা খেলনাবাক্স।


(৩)

রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেলেও ছায়া ফিরছে না দেখে সুখেন উসখুস করছে। কোনো ট্রেনের আওয়াজ কানে আসছে না, তবু সে জানালার পাল্লাটা খুলে তাকাচ্ছে রেললাইনের দিকে। নিঃশব্দে চলে এলো নাতো কোনো গাড়ি! উত্তেজনায় ভয়ে আশঙ্কায় স্বাভাবিক যুক্তিবোধ হারিয়ে ফেলছে সে। এতোটা উদ্বিগ্ন সে হয় না সচরাচর। এমনকি মাঝে মাঝে এমনও ভেবেছে যে ছায়া ফিরে না এলেই মঙ্গল। কোথাও চলে যায় যদি, যাক। গিয়ে বাঁচুক। ওর কাছ থেকে কী আর পাবে সে! ওর আর কিচ্ছু তো দেবার ক্ষমতা নেই। ছায়া চিরতরে চলে গেলে একটু শান্তিতে মরতে পারবে সে। কিন্তু তা হয়নি। যতই রাত হোক, ট্রেন যতই লেট হোক, ছায়া ঠিক ফিরে এসেছে। তবে, আজ সুখেনের মনটা বড়ো উতলা। কু ডাকছে। সজলের নজর পড়েছে ছায়ার উপর। হে ভগবান! তুমি দেখো। আমার ছায়ার উপর থেকে শকুনের নজর দূর করে দাও। বেড়ায় লটকে থাকা ছেঁড়া ক্যালেন্ডারে শিবঠাকুরের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে সুখেন। চোখ বন্ধ করে ধ্যানে বসে আছে শিবঠাকুর। কিছু দেখতে পাচ্ছে কি? সুখেন জানে না।

বারোটা দশ। আলিপুরদুয়ার জংশনে ট্রেন ঢুকল। এক ও দুই নম্বর প্ল্যাটফর্ম খালি। ট্রেনটা তবু পরিত্যক্ত গোডাউন ও জংগলঘেরা তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালো। একরাশ বিরক্তি নিয়ে নেমে এলো ছায়া। পেছনদিকে এগিয়ে লাইন পেরোলো। ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরে হেঁটে বাড়ির সামনে এলো। সুখেনকে দেখতে পেলো হ্যারিকেন জ্বালিয়ে বাইরে বসে আছে। একটু থমকালো ছায়া। তারপর নিঃশব্দে এগিয়ে গেল, রোজ যেমন যায়।
--- আসলি?
ছায়া জবাব দেয় না। ঘরে ঢোকে। সেদিকে তাকিয়ে সুখেনের টনক নড়ে। ভেতরে ঢুকে চিৎকার করে, 'ছায়া! বাচ্চাটা কই? কী করলি বাচ্চাটারে?'
ছায়া কোনো কথা বলে না। বালতি মগ নিয়ে বাইরে বেরোতে গেলে সুখেন পথ আটকায়, 'কথা বলিস না ক্যান? কী করলি বাচ্চাটারে?'
--- রাস্তা ছাড়ো। সান করবো।
কথাটা বলে বেরিয়ে যায় ছায়া। আধা শরীরে আটকাতে পারে না সুখেন। রাগে গজগজ করতে থাকে, 'হা ভগবান! কী করলি বাচ্চাটারে? বেইচা দিছিস? না মাইরা ফেলছিস? ও ভগবান!'
চাপাকল থেকে বালতিতে জল ভরে মগ দিয়ে গায়ে ঢালে ছায়া। সুখেনের কথায় পাত্তা না দিয়ে স্নান সারতে থাকে। পরনের সায়াটা টেনে বুক পর্যন্ত তুলে নেয়। ভেজা শাড়ি ব্রা ব্লাউজ চিপে জল ঝেড়ে পেঁচিয়ে কাঁধে ফেলে ঘরে আসে। শুকনো গামছায় চুলের জল ঝাড়ে। তারপর প্লাস্টিকের জগ থেকে গলায় ঢেলে ঢক ঢক করে আধাজগ জল খেয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়।
ছায়ার কান্ডটা দেখে ভয়ানক খেপে যায় সুখেন। শরীরটাকে টেনে ছেঁচড়ে বিছানায় তোলে। দুই হাতে ছায়ার শরীরটাকে চেপে ধরে ঝাঁকায়, 'আমার কথার উত্তর দে। বাচ্চাটা কই? বেইচা দিছিস? কত টাকায় বেচলি? দেখি, টাকা দে দেখি কত টাকা!'
ছায়া এবার ফোঁস করে ওঠে, 'হ্যাঁ, বেইচা দিছি। বাচ্চাটা আর জ্বালাবো না তোমারে। হইল শান্তি তোমার? তুমি তো বাচ্চাটারে দুইচোক্ষে দেখতে পারতা না। তুমি তো বলতা ওইটা তোমার বাচ্চা না। আপদ বিদায় কইরা দিছি। তোমার তো খুশি হওয়ার কথা।'
সুখেন হতভম্ব হয়ে যায়। বিশ্বাস করতে পারে না ছায়ার কথাগুলো। নিজেকে তবু শান্ত করে। ভেতরে ভেতরে চূড়ান্ত ভেঙে পড়ে সে। বাইরে তবু যতটা সম্ভব স্বাভাবিক স্বরে বলে, 'ওরে! তুই খালি আমার রাগটাই দেখলি? আমি রাগ দেখাই, বাচ্চাটারে হিংসা করি যাতে তুই যাসগা আমারে ছাইড়া। আমি তোরে কী দিতে পারবো? আমার আর কোনোদিক দিয়াই কোনো ক্ষমতা নাই। আমারে তুই সারাজীবন কী কইরা টানবি? তুই গিয়া যদি ভালো কইরা বাঁচতে পারিস তো যা গা'। সেইজন্যই গাল পাড়ি তোরে।'
সুখেন একটু দম নিয়ে আরও বলে, 'আর বাচ্চাটা আমার কি অন্য মানুষের, যারই হোক, তুই তো মা। মা হয়া তুই কী কইরা পারলি নিজের সন্তানরে বেইচা দিতে? বাচ্চাটারে বেইচা দিলি, এখন তুই কী নিয়া থাকবি রে ছায়া, কী নিয়া থাকবি তুই..."
কথাটা ছায়ার বুকে গিয়ে বেঁধে। আজকের ঘটনাটা সে বলতে পারে না সুখেনকে। বলতে পারে না যে বাচ্চাটাকে সে রেখে এসেছে তার আসল বাবার পায়ের কাছে। বাবা তার ছেলেকে নিক না নিক, একটা ভালো ব্যবস্থা তবু করবে দিদিমণিরা যেমন বলছিল। বাচ্চাটার একটা হিল্লে তো হলো। সেটুকুই শান্তি। তবু, সুখেনের কথায় ওর মনটা আর্দ্র হয়ে আসে। এতোক্ষণ ধরে চেপে রাখা রাগ অভিমান কান্না নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নেমে আসে চোখের ধারায়। উপুড় হয়ে তেলচিটচিটে বালিশে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে ওঠে সে। বহুদিন পর ছায়া কাঁদে। সুখেনের জন্য। বাচ্চাটার জন্য। নিজের জন্য।

ছায়ার পাশে কাত হয়ে শোয় সুখেন। আলতো করে হাত রাখে ছায়ার মাথায়। নিজের আঙুলগুলো দিয়ে ছায়ার খসখসে চুলে বিলি কেটে দিতে বলে, 'চিন্তা করিস না। কালকে আমিও যাবো তোর সাথে। বাচ্চাটারে ফিরায়া নিয়া আসবো, যেইভাবেই পারি।' কথাটা বলে ছায়াকে নিজের দিকে টানে একবার। ছায়া ঘুরে চিৎ হয়। সুখেন ছায়ার গালে মুখে ঠোঁটে হাত বুলায় নরম করে। আস্তে আস্তে হাতটা নামিয়ে আনে ছায়ার বুকে। মাইদুটোয় আলতো করে চাপ দেয়। ছায়া কোনো বাধা দেয় না। কোমরে ভর দিয়ে সুখেন এবার দুটো হাতেই ছায়াকে আদর করতে শুরু করে। হাতে মুখে ছায়ার শরীরে ঘষতে ঘষতে নিচে নামে। নিজের শরীরটাকে শূণ্যে তুলে ছায়ার উপরে আসে। ছায়াও জড়িয়ে ধরে সাহায্য করে তাকে। সুখেন চেষ্টা করে। উরুর কাটা অংশটা টাটিয়ে ওঠে। ঠোঁট চেপে কষ্টটা গোপন করে সে। বারকয়েক ঘষটেই হাল ছেড়ে দেয়। নিজের অক্ষমতাটা আরও একবার প্রকট হয় সুখেনের কাছে। ছায়াকে ছেড়ে দিয়ে পাশে কেতরে শুয়ে থাকে। ভাবে তাদের বেঁচে থাকার কথা। কীভাবে কী! বাচ্চাটার কথা মনে করে। বাচ্চাটা ছিল বলে এতোদিন ছায়া বেশ দয়াদাক্ষিণ্য পেয়েছে লোকের। ভিক্ষে করেনি, ট্রেনে ঝাড়ু চালিয়েছে। বাচ্চাটার প্রতি মায়া দেখিয়ে দু'চার পয়সা বেশিই দিয়েছে লোকে। এখন কী করবে ছায়া? সে নিজেই বা কী করবে? কীভাবে একটু সুখ দেবে ছায়াকে? তাহলে কি সজলের কথাটা...
নাহ। কিছুতেই না। ওকে নষ্ট হতে দেবে না সে। ওকে আর বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না। ছায়ার দিকে করুণ চোখে তাকায় সুখেন। ফুপিয়ে ফুপিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ছায়া। সুখেন ঘুমোতে পারে না। জেগে থাকে। ভোর হয়ে আসে। দিনের আলো ঘরের ফাঁকফোকর দিয়ে ভেতরে ঢোকে। সুখেন বিছানা থেকে নেমে পড়ে। বাইরে গিয়ে পায়খানাপেচ্ছাপ সারে। ঘরে আসে। ছায়া তখনও ঘুমোচ্ছে উপুড় হয়ে। ছায়াকে ডাকে না সে। বহুদিন পর একটু ঘুমোচ্ছে বউটা। থাক, ঘুমাক।

উরুর কাটা অংশে শক্ত করে ন্যাকড়া পেঁচিয়ে নেয় সুখেন। বিড়াদুটো হাতে গলিয়ে নেয়। তারপর বাইরে বেরিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দেয়। শরীরটাকে টেনে ছেঁচড়ে রাস্তায় ওঠে। স্টেশন থেকে ঘোষণা ভেসে আসছে। এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে দুদিকে দুটো ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ছাড়বে একটু পরেই। লোকজনের যাতায়াত শুরু হয়ে গেছে। সুখেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্টেশনের বাইরে এসে পৌঁছায়। পুঁজরক্ত বেরিয়ে উরুর ন্যাকড়া ভিজিয়ে দিচ্ছে অল্প অল্প করে। সেদিকে নজর না দিয়ে সে স্টেশনে ঢোকার মুখের অশ্বত্থ গাছটার তলায় আসে। গোড়ায় বাঁধানো সিমেন্টের বেদির নিচে বসে পড়ে। সুখেন একবার চোখ বন্ধ করে শ্বাস নেয়। হাতের বিড়াদুটো খুলে রাখে পাশে। তারপর, যে কাজটা সে খুব ঘৃণা করে মনেপ্রাণে, সেটাই করে বসে। কাঁপা কাঁপা দুটো হাত ধীরে, খুব ধীরে, মেলে ধরে চলমান জনতার দিকে।
অশ্বত্থ গাছটার পাতার ফাঁক দিয়ে নরম রোদ এসে পিছলে যায় সুখেনের মেলে ধরা হাতের তালুতে।

অলংকরণঃ কল্লোল রায়

ফেসবুক মন্তব্য