বেহুলা

উত্তম বিশ্বাস



ভরা জোয়ার। তার ওপরে বাউলে বাতাস লেগে নোনা নদী উত্তাল। হেতালকে বুকের ওপর রেখে টাল খাচ্ছে অভিরূপ। বাকিরা বোতল গড়িয়ে ছইয়ের নিচের ছলাৎ ছল জলকে রঙিন করে তুলছে। একটি রহস্যময় নারীমূর্তি। আর তাকে নিয়েই আজকের সাগর সারথী সরগরম! মূর্তি ঠিক নয়, যেন কাঠামো থেকে খসিয়ে আনা সাক্ষাত কাঁচা মাটির মণ্ড! কোনও এক অখ্যাত চিত্রকরের কাছ থেকে ছবিটি সংগ্রহ করেছে অভিরূপ। একফালি বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে আছে হেতাল। পরনের কাপড়টুকু হাওয়ায় এমনভাবে উড়ছে, যেন জগন্নাথ মন্দিরের ঝড় লাগা উত্তরীয়। অথচ লোকমুখে প্রায়শই শোনা যায় এই হেতালই নাকি নসিব চরের একমাত্র পুরুষ হন্তারক। সত্যিই কি তাই? এ বিতর্কের অবসান ওই বন্য আদালতেই করবে বলে মুখিয়ে আছে অভিরূপ। স্রোতের সাথে তাল ঠুকে এগিয়ে চলেছে সাগর সারথী - একটি শ্যালো নৌকো। নৌকোটি শহর থেকে এসেছে। ওর খোল ভর্তি ত্রাণ সামগ্রী। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে অভিরূপের চোখদুটো আজ ইলিশ মাছের মতো লাল হয়ে উঠছে। অভিরূপকে তুষ্ট করতে রজ্জুকেও পানপাত্রে একটুখানি গলা ভেজাতে হয়। রজ্জু সাগর সারথীর সেক্রেটারি। কিন্তু অভিরূপের অসম্ভব বাড়াবাড়িতে খানিকটা বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয় তাকে। অভিরূপের হাত থেকে বোতল কেড়ে নিয়ে বলে, “এবার থামতে হবে ভায়া। এসব কাজে ইমেজটা একটা ফ্যাক্টর। একবার চিড় ধরলে সব গেল। তাছাড়া গত সপ্তাহে রিলিফের কাজে এসে বহুত কষ্টে বিশেকে রাজি করিয়েছি। দেখো বস, আমাকে কেস খাইয়ো না।”
ভবানী অভিরূপকে সমানে তাতাতেই থাকে, “সত্যি বলছি অভি দা, একমাত্র মেয়েছেলে ছাড়া ওই চর থেকে কিন্তু কেউ বেঁচে ফেরে না। তাহলে...?”
অভিরূপ তড়াগ করে লাফিয়ে ওঠে, “এক্ষুনি মরে যাব, দেখবি?”
“আরে আরে! করিস কী?” খুব ভয় পেয়ে যায় রজ্জু। কেননা এর আগেও দু-দুবার ঝাঁপ দিয়েছে অভিরূপ। ভবানী মাঝি ও তার সহযোগীরা টেনে তুলেছে। নৌকো ভর্তি ত্রাণ সামগ্রী সবটাই ডোনেট করেছে সে। এর বিনিময়ে কোনো রকম উপঢৌকন নিতে চায়না অভিরূপ। ওর একটাই শর্ত - হেতালের সাথে মধু ভাঙতে বনের গভীরে যাবে সে। এত কাল লোকমুখে যেসব কথাগুলো অভিরূপ শুনেছে, ভবানী সেগুলোর সাথে আরও খানিকটা ভয় মাখিয়ে বলতে শুরু করল, “হেতাল মরা মানুষ নিয়ে সাগরে যায়। কীসব মন্ত্র দিয়ে মাছিদের ঘুম পাড়ায়। মধু ভাঙে। এরপর নৌকোর খোলে শুয়ে থাকা মরা মানুষটি ধোঁয়া ও মধুর গন্ধে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। তারপর...!” কথাটা বলতে বলতে থামিয়ে দেয় ভবানী। আজ অভিরূপ বার বার ঝাঁপিয়ে পড়ছে নদীতে। অঢেল ঐশ্বর্যের মালিক সে। আবেগের সাথে সীমাহীন আতিশয্য মেশালে যেমন ফেনা হয়, তেমনই এলোমেলো হয়ে থাকে অভিরূপ। ঝোঁকের মাথায় আজ সে অনেক গল্প করে ফেলেছে! এসব বিষয়ে ওর দাদু প্রতাপ রুদ্রও নাকি ছিলেন ওর থেকে আরও দুকাঠি ওপরে! অর্থাৎ আন্দামান সমুদ্রের নীল প্রবাল থেকে শুরু করে হিমালয়ের কস্তুরী, এমন শৌর্য সংগ্রহ ও সঞ্চয়ের ইতিহাস নাকি তাদের পারিবারিক আখ্যানে পাতার পর পাতা লেখা হয়েছে। কিন্তু এতদ্‌ সত্ত্বেও কী এক অস্থিরতা অভিরূপকে বিভ্রান্ত করে দেয় - কোথায় সেই সুখ? সবেতেই তো লুকোনো বিস্বাদ। পরমকে চরম রূপে না পাওয়ার এই যে অসুখ সেটা ওকে সর্বক্ষণ তাড়িয়ে ফেরে! অতএব পূর্বপুরুষের প্রাচুর্যের পাহাড় বিকিয়ে এসবই এখন খুঁজে ফেরে অভিরূপ। এখন অদ্ভুত এক নেশা কলম্বাসের কাঁটার মতো কে যেন ওর মাথার মধ্যে গেঁথে দিয়েছে – যেভাবেই হোক সাগরের সবচেয়ে সুস্বাদু আর বিরল প্রজাতির মাছিদের মধু কুটুরি নিজের হাতে ভাঙার স্বাদ নেবে সে! রজ্জুর শিকারী চোখ। এমন আত্মভোলা মানুষের সন্ধান পেলেই খপ করে লুফে নেয়। রজ্জুর কাছে এই অভ্যাসটা এখন একপ্রকার নেশার মতো হয়ে গেছে। তবে সে নিজে একটি পয়সাও ভোগ করে না। যেখান থেকে যেটুকু পায় বিশের মতো মিডিল ম্যানের মাধ্যমে সাগরের চরবন্দি মানুষগুলোর জন্যে সবটুকু বিলিয়ে দেয়।
ছবিটি বুকের ওপর নিয়ে সমানে টাল খাচ্ছে অভিরূপ। নসিব চরে নৌকো পৌঁছতে পৌঁছতে কাল বিকাল গড়িয়ে যাবে। সন্ধ্যা নাগাদ হয়ত হেতালের সাথে দেখা হবে। রাত্রে বিশের ঘরে বিশ্রাম। ভোরেই হেতাল অভিরূপকে নিয়ে পাড়ি দেবে মাতলায়। এরপর হেতালের হাত ধরে নোনা খাঁড়ি বেয়ে একটু একটু করে বনের এক্কেবারে গভীরে!

ভাঁটা। এখানে নদী কতোটা নিচ দিয়ে বইছে বোঝা মুশকিল। বাইনোকুলারে চোখ রেখে অস্থিরভাবে ঘোরাতে থাকে অভিরূপ। হঠাৎ একটা জায়গায় চোখ আটকে এল... মানুষগুলো দাঁড়িয়ে আছে যেন বঙ্গোপসাগরের ভাসমান আগাছা! ওইখানে আজ নৌকোটা এসে দাঁড়াল। ভাঁটার কারণে নদী এখন অনেক ভদ্রভাবে বইছে। তবে বাতাসের বেগ সাঙ্ঘাতিক, যেন কুরুক্ষত্রের শঙ্খ। একই সাথে মানুষের হাঁকডাক, দাতাদের উদ্দেশ্যে ভাসিয়ে দেওয়া দরাজ গলার সম্ভাষণ - সবকিছু মিলেমিশে কান্নার মতো আছড়ে পড়ছে। এসব সামলাতে নৌকোর খোলে বসে হাতমাইক দিয়ে একজন সমানে হেঁকে চলেছে, “সিরিয়াল মেইনটেন করুন। জল চাইলে টোকেন নিয়ে আসুন। ভলান্টিয়ারদের উদ্দেশ্যে বলছি, বাচ্চাকাচ্চার হাতে ব্লিচিং বিলোবেন না। চরবন্দি মানুষের কল্যাণে সাগর সারথী বিগত দিনগুলোতে যেভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ...!” ইত্যাদি।
চারিদিকে ধু ধু করা জল। মাঝখানে একটুখানি ডাঙা জায়গা। এটাই নাকি নসিবের চর। পুরুষের সংখ্যা নেহাত হাতে গোনা। মহিলা ও বাচ্চাকাচ্চাই বেশি। নৌকো দেখতে পেয়ে এতক্ষণ ওরা দৌড়াচ্ছিল। এখন হাঁপাচ্ছে। ওদের মধ্যে কেউ কেউ কাপড় উঁচু করে ঝাঁপ দিচ্ছে। কেউ অণ্ডকোষের সাথে লুঙ্গি দলা করে নিয়ে দোনামোনা করছে। মহিলারা এগোচ্ছে মন্থর গতিতে। এক হাঁটু কাদার মধ্যে এক পা পুঁতে, আরেক পা তুলতে ওদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। দান সামগ্রী বলতে মিনারেল ওয়াটার, মেডিসিন, শুকনো চাল চিড়ে ব্লিচিং আর বেবিফুড। যার বরাদ্দে যেটুকু পড়ছে ওরা সবটুকু একত্রে হাজরা ঠাকুরের পবিত্র ভোগের মালশার মতো মাথায় করে ডাঙায় উঠছে!

নৌকো খালি করতে করতে অন্ধকার নেমে এল। ভবানীকে নৌকোর দায়িত্ব দিয়ে ওরা অভিরূপকে নিয়ে উঠে এল বিশের ঘরে। ঘর বলতে বাঁধের ওপরে হোগলা পাতার ঝুপড়ি। আজ বিশের ঘরে নিমন্ত্রণ। বিশে নসিব চরের বেনিয়া। কাঠ কাঁকড়ার কারবারি সে। রজ্জুর মতো আরও অনেকের সাথে ওর সদভাব। শহর থেকে দান খয়রাতি যেটুকু আসে, বিশের হাত দিয়েই বিলিবন্টন হয়। উঠোনে হোগলা পাতার চাটাই বিছিয়ে দিয়েছে বিশের বউ। বিশে খুব পীড়াপীড়ি করছে,“আজকের রাতটা থেকে ঝান দাদা! বউ কাল ক্যাঁকড়ার ডানলা রাঁধবে বলছে!”
রজ্জু রহস্য মাখিয়ে বলে, “এবার আর কাঁকড়া চিংড়িতে কাজ হবে না। মাছি লাগবে মাছি। অমরাবতীর যত মাছি আছে সব আমার এই সুন্দর ভাইটির মুঠোর মধ্যে এনে দাও তো হে! এর জন্যে তোমাদের যা যা করণীয়....! কী হে অভিরূপ, ঠিক বলছি তো?”
“এ আর কী এমন! বাঘের নোখ হরিণের শিং এসবও একসুমায় এনে দিইচি না!” যতটা পারল কথাগুলোয় রঙ মাখিয়ে বলে দিল বিশের বউ। পাশ থেকে মনোহর মোড়ল বলে উঠল, “ছুড়িডা ছেল বলে দুদলা খেয়ে বেঁচে গেলে! অথচ ভেবে দেখো নসিব চরের ও কেউ না!”
মনোহরের মুখের ওপর পিত্তি থেঁতো করে মাখিয়ে দিতে ইচ্ছে হল বিশের বউয়ের। কেননা অভিরূপের মতো আগন্তুকের আগ্রহ যাতে এতটুকু উবে না যায় সে বিষয়ে সদা সর্বদা যত্নবান বিশের বউ। এবার সে সরু সুর টেনে বলে উঠল, “এটুক করাই যায়। বাবুরা কি আমাদের জন্যি কম করেন! ওর মতোন মন্তর তন্তর আমি ঝেদি জানতাম আমিও ঝেতাম।” অভিরূপ বুঝতে পারে হয়ত হেতালের কথাই উনি বলতে চাইছেন। কিন্তু পুরুষেরা যায় না কেন? কী এমন আছে ওই অমরাবতীর চরে? একথা যতবরই তুলবে বলে ভেবেছে ততবারই কী যেন এক অস্বস্তি ওদের চোখেমুখে লক্ষ্য করেছে অভিরূপ। হাঁড়ির মধ্যে জালসুতো নিয়ে গল্প শুনতে এসেছে মনোহর মোড়ল। গল্প শুনতে ঠিক নয় দেবতার মতো সুন্দর দাতাদের দেখতে এসেছে সে। আগ বাড়িয়ে অনেক গল্প করে মনোহর, “আগে আধ কপালীর চরে ছেলাম। ওডা মুছে গেল। ভাসতি ভাসতি নসিবের চরে এলাম। এখেনে পেত্থম পেত্থম যখন এলাম, না মীন না মনুষ্যি...কিছুই ছেল না। অথচ কীভাবে যে ভালোবেসে ফেললাম! এখন এমন মনে হয় মরে যাব তেঁও স্বীকার তবু এ চর ছেড়ে কোত্থাও যাবনে!”
একজন পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা ম্যাপ বের করল। উনি সম্ভবত রজ্জুর সহকারী। ম্যাপে লেখা আছে বে অফ বেঙ্গল। ভদ্রলোক ল্যাম্পের আলোয় ঝুঁকে পড়ে আঙুল দিয়ে দিয়ে দেখাতে লাগল, “গত তিন দশকে তিরিশটারও অধিক দ্বীপ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আর এই যে চরের কথা বলছেন, আগামী আর কয়েক বছরে এর সাথে আরও বেশ কয়েকটির চিহ্নই থাকবে না। একে একে সবকটা সাগরে মিশে যাবে... তখন?”
“ওই জন্যিই তো আমার মতো ঝারা আছে নিয়ম করে রোজ গাঙের এপার ওপার সাঁতরাই।”
“এই বয়েসে এখনো সাঁতরাতে পারেন?”
“হ্যাঁ গো! ডুবে গেলে চলবে? ভেসে থাকার অভ্যেস করতে হবেনে!” অভিরূপ মনোহরের কথার অর্থ বুঝতে পারেনা। সে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে বিশের দিকে। বিশেও কিছু বলে না। মনোহর গলা ছেড়ে গেয়ে ওঠে,

“ভেসে যাব সে ভরসা নেই। কেউ দেবেনা পিঁড়ি।
জলের নিচে দালান কোঠা, জলেই সকল সিঁড়ি!
কাকে নেব কাকে থোব বনবিবি তোর দায়।
বাঘের সাথে বসত করি ভাইয়ের ঠেকা ভাই!
দোরে কানদে দক্ষিণ রায়! সাগর সুমান খিদে।
ন’মেসে এক নাতি দেলাম গলায় গলসি বেঁধে!”
এমনসময় একটি মেয়ে এসে দাঁড়াল। বিশের বউ ঝপ করে উঠে মাচার নিচ থেকে একটা পুঁটলি বের করে আনে।
“সব দেছ তো?”
“ঝ্যাতটা পেরিচি! এ হপ্তা তো হামেশাই...!” উঠোন থেকে হঠাৎ আলোটা নিভে যায়। অভিরূপ রজ্জুর চোখে চোখ রাখে। রজ্জুও একটিবার তাকায়। সে চাহনিতে উদবেগ নাকি সংশয় কিছুই বোঝা গেল না। অভিরূপ মন্ত্রচালিতের মতো মেয়েটিকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেল।
“তোমার নাম কী?”
“লোনা।”
“লোনা কী?”
“লোনা দরিয়া।”
“তুমি মাছি ধরার মন্ত্র জান?” মেয়েটি অভিরূপের কথার অর্থ বুঝতে পারে না।
অভিরূপ আবার প্রশ্ন করে, “তুমি বনে গেছ কোনোদিন?” উত্তরের অবকাশ না দিয়েই অভিরূপকে নদীখাদে নামিয়ে দিয়ে মেয়েটি অদৃশ্য হয়ে গেল।
একটা মাটির হাঁড়ি কোলে নিয়ে এগিয়ে এল এক শ্যামাঙ্গী। ওটাই কি তাহলে হেতাল? হাঁড়িটার মধ্যে একটা কেরোসিনের ল্যাম্প দপদপিয়ে জ্বলছে। ছোট্ট নারিকেল ফুলের খোসার মতো সুচালো একটি নৌকো। তাতে ছোট্ট একটি ছৈ। ওর খোলে শোয়ানো রয়েছে একটি কুশপুতুল। সাথে ছোটবড় কয়েকটা হাঁড়ি। আলোর হাঁড়িটি অভিরূপের মুখের কাছে উঁচু করে একটুখানি হাসল, “বিশধর তাহলে আপনাকেই ব্যাসাত করলেন?”
অভিরূপ হকচকিয়ে উঠল,“কে বিশধর?”
“ওই এমনি জিজ্ঞেস করলাম। আপনি বিশেদার ঘরে উঠেছেন না?”
“কেন বলো তো?”
পুতুলটির গা থেকে একটা চিটচিটে জামা আর একটা মুখোশ খসিয়ে অভিরূপকে বলল, “নেন। এইডে পরেন।”
“ইনিই কি তাহলে...?”
“হ্যাঁ, লায়ের জুড়ি। লখাই!”
“কিন্তু এই যে শুনি...!”
“ওসব বিশের মতো মানুষের বানানো গল্প। এতে ওদের আয় রোজগার একটু বেশিই হয়!”
“তাহলে এই পুরুষের মুখোশ পরানো এই পুতুলই বা কেন?”
“বলতি বসলি তো রাত কাবার হয়ে যাবেনি। লৈকোয় উঠে বলি?”


এখন অল্প অল্প অন্ধকার। অল্প অল্প ঢেউ। পেটানো থালার মতো ফ্যাকাশে চাঁদ গরানের কোলে গড়িয়ে পড়েছে। মুখোশ পরে দুদিকেই তাল রেখে মুখ নাড়ছে অভিরূপ। হাওয়া আর ঢেউয়ের শব্দে অর্ধেক কথা ভেসে যাচ্ছে। তবু যেটুকু আসছে তাতেই সে তন্ময় হয়ে শুনছে...
“এই চরে তেমন ব্যাটাছেলে আর কোই? থাকলিও ওঠে না। কারণ আমার লৈকোয় একবার ঝে উঠেছে কেউ আর ফেরেনি। ফিরলেও এমন তাল করে ফিরেছে, তাদের এখন জ্যান্ত বলে ভাবতেও ঘেন্না হয়!”
“কোথায় যায় তবে ওরা?”
হেতালের অবজ্ঞা মাখানো উত্তর, “সে কার কপাল জানে! আমার কাজ সাগরে ছেড়ে দেওয়া। যার যেখানে নিয়তি থাকে সে সেখানেই যায়।”
নৌকোটি ধীরে ধীরে বনের গভীরে প্রবেশ করে। অভিরূপ আবারো প্রশ্ন করে, “লোনাকে নিতে আপত্তি কোথায়? নিলে কোনও...?”
কূলপ্লাবিনী নদীর মতো বেজে ওঠে হেতাল, “এক লৈকোয় দুইজন মেয়েছেলে? এ এট্টা কথার মতো কথা হল? বনের বিধাতা মানলেও দক্ষিণ রায় তিনি মানবেন কেন?”
“মাছিদের মধ্যেও কি এমন কোনও চয়েজ আছে?”
“তা আছে বইকি! কিছু আছে নিজেদের বমি নিজেরাই খায়। আর বাকি যারা বিষ বড়াল তাদের কথা না বলাই ভালো। আচ্ছা, মানুষ বনে আসে হয় বাঘের চামড়া না হয় হরিণের লোভে। মাছির জন্যি এমন মাথা পাগল তো কাউকে দেখিনি।”
অভিরূপ উত্তর দিতে ভুলে যায়। ওর কানের লতি লাল হয়ে আসে। গায়ের জামাটা খসিয়ে পুতুলটার ওপর ছুড়ে দিয়ে সে আবার জিজ্ঞাসা করে,“সব সিজেনে সমান মধু দেয়?”
হেতালের সহজ উত্তর, “না। এখন যেমন বর্ষা। ফুলের দেহ ধুয়ে গেলি পরে তাতে কি আর মধু মেলে?”
নগ্ন শরীর নিয়ে গলুইয়ের ওপর গা এলিয়ে দেয় অভিরূপ, “যে মাসে মধু না পাও?”
তারজালি খুঁটি ধরে হেতাল হাসিতে ফেটে পড়ল, “ওই যে খাঁড়ি, ওর মুখে গা এলিয়ে দিই!”
“মানে? কিছুই বুঝলাম না!”
“হুই দ্যাখেন হেতের!” অভিরূপ তখনও বুঝে উঠতে পারেনি হেতাল কী বলতে চাইছে। এবার হেতাল তার হাতের বৈঠা দিয়ে জলের ওপর ঝুঁকে পড়া ডালপালা সরিয়ে বলে উঠল, “দ্যাখেন গুটি কীভাবে হান্তা দিয়ে বসে আছেন!”
অভিরূপের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল, “আরে এ তো বাঘ! কাদায় জাবড় দিয়ে বসে আছে কেন?”
“বাঁচার বুদ্ধি সবাই রাখে। কাদা না মাখলে হুল ফুটিয়ে দেবে না!”
“লে বাবা! এখানে দেখছি ভাগে ভাগে ভাগীদার!”
“হরিণ ভোগ আর কজনের ভাগ্যেই বা লেখা থাকে! পেটের পুড়া সবার আচে না! তা হলিও সবাই যে চাকে হামলা করার জন্যি কাদা মাখে তাও না। এই মনে করেন সবে ভাঁটা শুরু হয়েছে। খাঁড়ির জল নেমে নেমে শেষ হয়ে আলি পর, কাঁকড়া চিংড়ি খরখুলো চামসি যা আসবে চড় দিয়ে দিয়ে মারবে আর খাবে!”
অভিরূপের তখনও ঘোর কাটেনি, “কী সাংঘাতিক! কোর এরিয়ার বাইরে এরা এল কী করে?”
“দেশ দুনিয়ায় মানুষ বুঝি একাই রিফুজি হয়? জলে জঙ্গলে সব জায়গায়ই অনিয়ম আছে না?”
“বল না মাছিরা তখন কী খায়?”
“কী আর খাবে! ত্যাখন ঝে ঝেখানে পারে গে বেরোয়। গুড়ের গাব চিনির পানা যা পায় খেয়ে আসে।”
“বেশ মজার তো!”
“হ্যাঁ তাই তো বলি আপনারাও একটু আধটু ছেটাতি পারেন!”
“মানে?”
“এই ঝ্যামন ধরেন আপনাদের মতো বাবুরা এত্তো এত্তো চাল চিঁড়ে বয়ে বয়ে আনছেন আর সাগরের মানুষগুলোকে দয়া করে যাচ্ছেন, কোই তার বদলে একজন দুজন করে ডাঙার দিকে টেনে নিতিও তো পারেন?”
জলের গভীরে ঝুঁকে পড়ে অভিরূপ বলে, “নিলেই হল? সাগরের ইকো সিস্টেম ভেঙে যাবে না!”
“কীসের সিস্টেম?”
“এই মনে করো এদের নিলে, সাগরে যত কুমীর কামট বাঘ সবাইকেই তো নেওয়া লাগবে। ওরা খাবে কী!”
হেতাল সজারুর মতো গা ঝাড়া দিয়ে উঠল,“কুমীর কামটের সাথে মানষির সম্পর্ক কী?”
“হিসেব তো তাই বলে! মনোহর কাকুর গান শুনে সন্ধ্যায় খানিকটা অবাক হয়েছিলাম বটে! কিন্তু যেটা সত্য তাকে অস্বীকার করি কী করে? তাছাড়া এতো মানুষের অন্ন সংস্থান শহরই বা কীভাবে জোগাবে?”
কামটের মতো চোয়াল চিবিয়ে হেতাল বলে উঠল, “কুমীর খালের নাম শুনেছেন? লৈকো কিন্তু ওর কোল দিয়েই যাচ্ছে! শহরের চাল চিড়ে আদৌ ওদের পছন্দ কিনা একটু পরখ করে দেখি! লৈকোটা এইখানে ডুবিয়ে দিই?” হেতাল নৌকো কাত করে জলে ঘাই দিতেই দূরে বিকট দাঁতের একটা প্রানী ঝটপটিয়ে উঠল। অভিরূপ ভয়ে চিৎকার করে উঠল, “সিরিয়াস বলছি হেতাল, আমি কিন্তু খুব ভালো সাঁতার জানি না। এতো ক্যাজুয়াল হয়ো না!”
“মুখোশটাও খুলে ফেললেন?”
“গন্ধ! গা গুলোচ্ছে।”
“ঝান আপনি শুয়ে পড়েন। লখাইকে গুড়োয় বসিয়ে নিচ্ছি!”
নৌকো টলে উঠল। অভিরূপ অস্থির হয়ে ছুটোছুটি করতে লাগল, “মনোহর কাকু বলছিলেন, তুমি নাকি নসিব চরের কেউ না। তাহলে কে তুমি?”
খোলের জল সেঁচে হেতাল হেসে উঠল, “লোকে বলে, আমি নাকি বাদাবনের বেউলো! কিছু মরাধরা মাছি আর বিশেদের মতো সাপখোপ নিয়ে আমার সংসার। এর বেশিকিছু পরিচয় দেয়ার মতো পুঁজি আমার নেই!”
অভিরূপ কুশপুতুলটাকে স্রোতের মধ্যে চেলে দিয়ে হোহো করে হেসে উঠল, “যাও লখাই বাপ! তোমার আর মধু খেয়ে লাভ নেই!”
একটা ম্যানগ্রোভের মাথায় বাড়ি দিয়ে হেতাল বলে উঠল, “আমি আগেরথে আপনাকে সাবধান করেছি, একমাত্র মরা মানুষ ছাড়া এই খাঁড়িতে কিন্তু...!”
“তোমাকে কামড়াবে না?”
“আমার কথা বাদ দেন। এ রক্ত মধুর চেয়েও মিষ্টি! বিশ্বাস না হলি দেখেন...!” বলতে বলতে নিজেকে অল্প অল্প করে উন্মুক্ত করতে থাকে হেতাল। একটা দুটো করে মাছি উড়ে এসে হেতালের গায়ে বসতে লাগল। অভিরূপের কানের কাছেও কয়েকটা ভনভন করতে লাগল। এবার সে ভয়ে জড়সড় হয়ে এল, “কী সাংঘাতিক! কামড়াবে তো! তাড়াও!” হেতাল কথা কয় না। কণ্ঠি উঁচু করে দেয়। কুন্তল বেয়ে গ্রীবার কাছে গড়িয়ে আসে মাছিরা। একটা কেয়া গাছের মাথা ভেঙে হেতালের গায়ে আচ্ছা করে বাড়ি দিল অভিরূপ। সাথে সাথে বিষাক্ত মাছির ঝাঁক অভিরূপকে ছেকে ধরল। অভিরূপ ছৈয়ের নিচে আছাড় খেয়ে পড়ল।


অভিরূপকে নিয়ে ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে হেতাল। টানা একদিন এক রাত বেঘোরে ঘুমিয়েছে সে। এখনো ধুম জ্বর। গায়ে মাথায় অসম্ভব প্রদাহ। চোখমুখ অসম্ভবরকম ফোলা। গাছগুলো যেন একটার ওপর আরেকটা উল্টেপাল্টে পড়ে আছে। কোনোটার মাথা আছে তো মাজা নেই। কেউ বা শেকড় সুদ্ধ ভেসে যাচ্ছে। কোথা সেই সুন্দরবন? কোথায় সেই বাহারি পাতার গাছ? কোথায়ই বা লুকোনো আছে জগতের সর্বসুখী মক্ষীর কুঠুরি? এমন একটা অসুন্দর বনে হেতালের মতো মেয়ের সাথে কেন ঘুরে বেড়াচ্ছে সে? অভিরূপ মনে মনে ভাবতে চেষ্টা করে। হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসে কারা যেন গান গাইতে গাইতে ভেসে যাচ্ছে। মৃত্যুর আগেও মানুষ যেমন স্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে, তেমনিভাবে ঠেলে উঠল অভিরূপ। দেখল পায়ে শামুকের ঘুঙুর বেঁধে দূরে নৌকোর ওপরে দাঁড়িয়ে নেচে নেচে হাঁক পাড়ছে কয়েকটি মেয়ে,
“এসো এসো দেবতার দল। সুধা খাও চেটে!
স্বর্গ হতে ইন্দু এসো। সিন্ধু দেব বেঁটে!”
“ওরা কারা?”
হেতাল সমুদ্র থেকে মুখ ফিরিয়ে বলল,“ওরা অমরাবতীর বেশ্যা।” অমরাবতীর নাম নিতেই অভিরূপ কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল। নৌকোগুলো দ্রুত গাছের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। অভিরূপ উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করতেই হেতাল অন্য একটা খাঁড়ির মুখে নৌকো নিয়ে ঢুকে পড়ল। অভিরূপ মুহুর্মুহু জিজ্ঞাসা করে, “কী গো, মাছি পেলে?” যেন এক ঝড় বিধ্বস্ত বনের অভিসারিকা হেতাল। কোথায় মাছি পাবে সে? এখন এমন অবস্থা নৌকোটা টেনে বেড়াতেও যেন অনেক অনীহা। অথচ অভিরূপ সেও দাঁড়ে-বৈঠায় কোনও শিক্ষায় শিক্ষিত নয়। প্রায় সারাদিন কেটে গেল মধুর সন্ধানে। ছোটখাটো দুয়েকটা চাক চোখে পড়ল বটে। হেতাল ফুঁ দিয়ে দিয়ে মাছি সরায় আর দেখে, ওদের কোলে সামান্য মোম আর হলুদ বিষ্ঠা ছাড়া বিশেষ কিছু নেই। পড়ন্ত বিকেল। খাঁড়ি পেরিয়ে এল অন্য বনে। এখানে ধুঞ্চে আর নাটা গুল্মের সাথে জট পাকিয়ে আছে বেঁটে বেঁটে তালগাছ। ডেগোগুলোতে যেন কুমীরের মতো কাঁটা। হাঁড়ি বোলেন কাঁখে নিয়ে ঝুঁকে পড়ে কিছু একটা দেখল। তারপর বোলেনে আগুন দিতে দিতে অভিরূপকে বলল, “এই দেখেন। আমি খুঁজে খুঁজে হন্যে হচ্চি! আর বেগমসাহেবা এখেনে ঘরসংসার তুলে এনে দিব্যি তালপাতার হাওয়া খাচ্ছে!”
অভিরূপ এই প্রথম এতবড়ো একটা মৌচাক দেখল। প্রায় ছয় থেকে সাত ফুট উচ্চতা। মাটির কাছাকাছি মাছি গুলোর গা ভিজে চুবুচুবু! হেতাল বোলেনে আগুন দিয়ে বলে উঠল, “খুব সাবধান। এরা কিন্তু মারাত্মক হামলাবাজ! এদের ফুঁ দিয়ে আস্তে আস্তে সরাবেন। তাও সরছে না দেখলে, আমার গায়ে এই ছোট্ট হাঁড়িটা থেকে রস নিয়ে একটু একটু করে চেলে মারবেন।”
অভিরূপ নাক টিপে হাঁড়িটা ঘুলিয়ে ঘুলিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কীসের রস এটা?”
“রমন ফুলের আঠা। মাথা ঠাণ্ডা রেখে যা করার করবেন। একবার উড়তে শুরু করলে সব্বোনাশ হয়ে যাবে!”
অভিরূপ এতশত বোঝে না। সে অস্থির হয়ে বলে উঠল, “উড়লে উড়বে! আমার মধু পাওয়া নিয়ে কথা!” হেতাল এই প্রথম সীমারেখা অতিক্রম করল। সে বাঁহাতে অভিরূপের মুখ চাপা দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল, “চুপ! ওরা ক্ষেপে গেলি সব্বোনাশ হয়ি যাবে! সারা বনে ঢিঢি পড়ে যাবে। তেখন কেউ রক্কে পাবনা! মধুর মোহ সবার আচে না!”
অভিরূপের শরীর বেয়ে তখনো বিষের প্রবাহ বইছে। এসব কথা শুনে এবার ওর শিরায় শিরায় অন্য ভয়ের স্রোত খেলে গেল! এবার সে কিছু একটা চিন্তা করে বলল, “ধোঁয়াটা তুমিই দাও। আমি দাঁড়াচ্ছি।”
“ছেলেখেলা নয় কিন্তু বাবু! কী জানি কোথায় না কনে হেতের হান্তা বাগিয়ে বসে আছে!”
অভিরূপ মরিয়া হয়ে উঠল, “বলছি তো দিয়েই দেখো না। মরণে আমার ভয় নেই!”
হেতাল চোখ বন্ধ করে কীসব মন্ত্র উচ্চারণ করল। এরপর বনতুলসীর পাতা চিবিয়ে ধোঁয়ায় ফুঁ দিতেই মাছিরা ফুরফুর করে অভিরূপের গায়ে মাথায় উড়ে এসে বসতে লাগল। হেতাল ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কামাড়াচ্চে না তো?” অভিরূপের তখন কী যেন উল্লাস, “না না কামড়াচ্ছে না। দারুণ লাগছে! সুড়সুড়ি লাগছে। তুমি যত পার উড়িয়ে আরও আমার কাছে পাঠাও।” কালো কালো মাছিতে মুহূর্তের মধ্যে অভিরূপকে ঢেকে ফেলল। এখন ওর মাথা ভর্তি বাদাবনের ভাষা। কত না অভিযোগ! বহুবিচিত্র দ্বীপের হারানো ইহিতাস, - মুছে যাওয়া যাপিত জীবনের গান, - সব যেন শুনতে পাচ্ছে অভিরূপ!

এখন বনটাকে ঘুরে ঘুরে প্রদক্ষিণ করে বেরিয়ে আসছে হেতালের নৌকো। খাঁড়িতে ভাঙা ভাঙা ঢেউ। হাঁড়ির খোলে টাল খাচ্ছে মধু। কাঁচা সোনার মতো রঙ। অভিরূপের মুখে বিজয়ের হাসি। যেন সাগরের সুধা ভাণ্ডার লুঠ করে ফিরে যাচ্ছে সে। হঠাৎ ওর অনুভব হল আরে, চোখমুখের সেই যে ফোলা শরীরের জ্বালা যন্ত্রণা, সেই যে প্রদাহ, কিছুই তো নেই। সে নিজেকেই যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারল না। অভিরূপ একছুট্টে গলুয়ের কাছে গেল। এবার সে হেতালের হাতখানি নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে ওর চিবুকে চোখে গ্রীবায় চোয়ালে চেপে ধরে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়তে লাগল, “আশ্চর্য! দেখো আমার লুকটাই চেঞ্জ হয়ে গেছে! কোথায় ফোটে অমন রমন ফুল?” কিন্তু হেতালের মুখে হাসি নেই। সে ধস্ত কালিপড়া চোখ নিয়ে একমনে বৈঠা বাইছে। বনের মাথার ওপরে তখনো ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঘুরে ঘুরে মেঘের সাথে মিশে যাচ্ছিল। অভিরূপ কিছুক্ষণ সেই ধোঁয়ার নিশানাটাকে নিরীক্ষণ করতে লাগল। ক্রমশ যেন ধোঁয়াটা লাল হয়ে উঠতে লাগল। বনে দাবানল হলে যেমনটা দেখায়, তেমনি দলা পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠতে লাগল। অভিরূপ ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আগুন নিভিয়ে আসোনি হেতাল?”
“না।”
“কেন?”
ওর সাথে আরও খানিকটা আগুন মিশিয়ে হেতাল বলে উঠল, “কী হবে এসব ক্ষুধার্ত আশ বালাই পুষে রেখে? পুড়ে শেষ হয়ে যাক!”
অভিরূপ মনে মনে এতদিন যে সুন্দরবনটাকে লালন করে এসেছে, মুহূর্তে কেমন যেন ন্যাড়াবোচা আর ক্ষুধার্ত শ্বাপদ সংকুল রূপে ভেসে উঠল ওর মানসপটে। জলের ওপরে হেলেপড়া সারি সারি গাছ আর উপড়ানো শেকড়ের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে নিজের মনেই বহুবার বলে উঠল, “এতো ঝড় বয়ে যায় এদের ওপর দিয়ে? অথচ কোলের মধ্যে কত যত্ন করে আগলে রেখেছিল এই মধুটুকু। তাই না?” হেতাল অভিরূপের চোখে চোখ রেখে এই প্রথম হাসল। সে হাসিতে যেন কেয়াফুলের সুবাস। অভিরূপ মধুর হাঁড়িতে আরও একবার উঁকি মারল। তখনো ওর খোলে কয়েকটি বিদ্রোহী মুখ অনবরত পাক খেয়ে খেয়ে বিষ উগরে দিচ্ছিল। এবার অভিরূপ সংকুচিত চিত্তে বলে উঠল, “এবার ওরা কী খাবে?”
“কারা?"
“যাদের কোল থেকে কেড়ে এই যে আমাকে দিলে!”
অভিরূপকে সে কীভাবে বোঝাবে, আকাল সুকালের এই যে সামান্য একটুখানি সঞ্চয় ওদের কোল থেকে কেড়ে আনতে ওরও যে মোটেও ইচ্ছে করে না। কিন্তু সে তো নিরুপায়। তাই সে সহজ সমাধানের পরিচিত পথটিই অভিরূপের সামনে উন্মুক্ত করে, “কী আর খাবে! ওই যে বললাম, শহরে যাবে। বিশ্বাস না হয় ফিরে গিয়ে দেখবেন। আপনাদের আদাড় কাঁচিয়ে কেউ না কেউ কারেন্টের খুঁটোয় গিয়ে মুখ মোচড়াচ্চে।” কথাগুলো বলতে বলতে গলা ধরে আসে হেতালের। অভিরূপ আরও একবার হেতালের দিকে তাকায়। সন্ধ্যা নেমে এল। রক্তিম মেঘের মতো হেতালের মুখেও যেন কী এক অপরাধের ছায়া। এবার অভিরূপ হাঁড়ি সুদ্ধ মধু স্রোতের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে বনের দিকে ঠেলে দিল। টাল খেতে খেতে হাঁড়িটা ভেসে যাচ্ছে সেই খাঁড়ির মধ্যে।
“হাঁড়িটা ভাসিয়ে দিলেন যে!”
“ওটার বিনিময়ে কী চাও তুমি বলো!”
সে আবারও রহস্য উজিয়ে বলে উঠল,“নসিবের চর থেকে একটা করে আধমরা পুরুষ।”
হাতের দাঁড় ফেলে দিয়েছে হেতাল। এখন জোয়ারের সাথে সমানে ছলকাচ্ছে ওদের নৌকোটি। হেতালের কোলের মধ্যে অভিরূপ তার দেহটা এলিয়ে দিয়ে বলল, “আর যদি আমি মরি... হবে না?” হেতাল কথা কয় না। সহসা দূর সমুদ্রের ওপার থেকে সুন্দরী গাছের ওপর ভেসে আসতে লাগল পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ। এখন শান্ত সমুদ্র ফেনায় হেতালও মিশিয়ে দিচ্ছে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি!

অলংকরণঃ কল্লোল রায়

ফেসবুক মন্তব্য