রক্তবীজ

অতনু দে



“দোকানটা আর রাখা যাবে না রে!” চেয়ারে বসতে বসতে ক্লান্ত কণ্ঠে বললো রফিক।
আজকের মতো রফিকের কফিশপের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গেছে। তার মানে অবশ্য এই নয় যে কাজ শেষ – বরং ঠিক উল্টো। দোকান বন্ধ হবার পর দোকান পরিষ্কার করে পরদিনের গোছগাছ করতে প্রায় আরও ঘণ্টা দুয়েক লাগে। রফিকের বাবা এই সময়টায় বাড়ি থেকে এসে দোকানটা সামলান আর জোর করে রফিককে একটু ছুটি দেন। যদিও উনি রিটায়ার করেছেন, তবু এ দোকান তো ওঁর হাতেই তৈরি – কাজেই ঘাঁতঘোঁত সব ওঁর জানা। রফিক তো সবে এই বছর পাঁচেক হল এ দোকানের হাল ধরেছে।
রোজকার এই একচিলতে অবকাশে রফিক পিছনের ছোট্ট পোর্টিকোটায় বসে, একটা বিয়ার নিয়ে। বন্ধুদের কেউ না কেউ আসে এই সময় - সারাদিনের কাজের পর আড্ডা দিতে। আজ যেমন শিবু এসেছে।
শিবু একটা হাসপাতালের প্যাথোলজি ডিপার্টমেন্টে সাপোর্ট স্টাফ হিসেবে কাজ করে। হাসপাতাল থেকেই আসছে – সঙ্গে একটা বড় আইসবক্স, যাতে স্যাম্পেল থাকে। বাড়ি ফেরার পথে অন্য ল্যাবটাতে এগুলো জমা দিয়ে ও বাড়ি চলে যাবে। শিবু কারোর সঙ্গে বিশেষ মেশে না – রফিকের কাছেই আসে কখনো সখনো। আজ সেরকম একটা দিন।
রফিক এসে দেখলো শিবু বরাবরের মতো চোখ বুজে একমনে সিগারেট টানছে। রফিক জানে ওটা সাধারণ সিগারেট নয়, ওতে ঠাসা আছে মারিজুয়ানা, যাকে ক্যানাবিসও বলে অনেকে। তাতে অবশ্য দোষের কিছু নেই – এদেশে ওটা বেআইনি নয়।
শিবুর পাশের চেয়ারে বসে পাদুটো লম্বা করে ছড়িয়ে দিলো রফিক। তারপর হাতের বিয়ারের গেলাসে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে আবার বললো "দোকানটা আর রাখা যাবে না। এদ্দিনকার দোকানটা…"
“হুম” বলল শিবু। "কেন, ভালো চলছে না? ভিড় তো মন্দ হয় না দেখি। তাছাড়া তোরা তো এখন লাঞ্চও দিচ্ছিস…”
“আরে না, তা নয়। ওই কাল যেটা হল না?”
“কী হল?”
বিয়ারের গ্লাসটা নিচে নামিয়ে বন্ধুর দিকে তাকালো রফিক। “তুই কোন জগতে থাকিস? পরশুর ওই কাণ্ডের পর কালকে এতো বড় একটা প্রোটেস্ট হয়ে গেলো এখানে, আর তুই কিছু জানিস না?”
শিবু একটু মুচকি হাসলো। “আমি, জানিসই তো, একটু নিজের দুনিয়ায় থাকি। কীসব গোলমাল হচ্ছিলো বটে – দেখলাম দূর থেকে। পুলিশ, লাঠি-চার্জ, টিয়ার-গ্যাস। তা এসবের মধ্যে তুই গিয়ে পড়লি কী করে?”
“লোকগুলো পুলিশের মার খেয়ে পাগলের মতো দৌড়োচ্ছে, টিয়ার গ্যাসে ওদের চোখ জ্বলছে দেখে আমি আর থাকতে পারলাম না। যে ক’জনকে পারলাম, ঢুকিয়ে নিলাম আমার কফি শপে। একটু জল দিলাম, মুখ মোছবার টিস্যু, একটু সোডা বা কোল্ড কফি। প্রায় দুঘণ্টা বাদে যখন গোলমাল কেটে গেছে, তখন ওরা সব চলে গেল।"
শিবু হাই তুললো। তারপর বললো “এ আর এমন কী ব্যাপার। তুই নিজে তো আর প্রটেস্টে যোগ দিস নি।”
“আরে, আমি যে ওদের সাহায্য করেছি, সেটা পুলিশ মার্ক করেছে। আজ সকালে একজন পুলিশ এসে বলে গেছে যে এর ফল ভালো হবে না।" বলল রফিক।
“আরে ছাড় তো – ও এমনি চমকাচ্ছে। কিছু হবে না।“
“না রে শিবু, আমার মন বলছে ওরা আজ রাত্রে অ্যাটাক করবে। এখানকার পুলিশদের তো জানিস।"
আবার হাই তুললো শিবু। “করলে করবে। দোকানের ইন্সিওরেন্স নেই? তার থেকে মোটা টাকা পেয়ে যাবি। মিটে গেল।"
“ধুর শালা, তোর সঙ্গে কথা বলার মানে হয় না।"
খ্যাকখ্যাক করে হাসলো শিবু। তারপর পায়ের কাছে রাখা নিজের স্লিং-ব্যাগ থেকে একটা সিরিঞ্জ বের করে সিরিঞ্জটাতে ছুঁচ পরাতে লাগলো। সিরিঞ্জটা রেডি হয়ে যাবার পর ব্যাগ থেকে বেরলো একটা স্পিরিটের বোতল, যেটা একটুকরো তুলোতে ঢেলে নিয়ে শিবু নিজের হাতের একটা জায়গায় মন দিয়ে ঘষতে লাগলো।
রফিক এসব আড়চোখে দেখছিল, এবার কাটা কাটা কণ্ঠে প্রশ্ন করলো, “এই নেশাটা আবার কবে ধরলি?”
শিবু উত্তর দিল না। রফিকের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে সিরিঞ্জটা এক ঝটকায় নিজের হাতে গেঁথে দিলো। তারপর অসীম মনোযোগে নিজের শরীর থেকে টেনে নিলো খানিকটা রক্ত। তারপর ওই আইসবক্স থেকে একটা ভায়াল বের করে নিজের রক্তটা তাতে বিন্দু বিন্দু করে ঢেলে দিল।
ভায়ালটা কিন্তু খালি ছিল না। সেটাতে আর কারও রক্তের স্যাম্পেল ছিল। সেটার সঙ্গে শিবুর রক্ত মিশে গেল।
ভায়াল থেকে সিরিঞ্জের ছুঁচটা বের করে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে শিবু ভায়ালটা রফিকের হাতে তুলে দিলো।
রফিক একটু হকচকিয়ে গেল। তারপর বলল “এটা কী? রক্ত নিয়ে আমি কী করবো?"
মাথা নেড়ে গান গাইতে গাইতে শিবু ততক্ষণে সিরিঞ্জ-স্পিরিট সব গুছিয়ে রাখছে। গান থামিয়ে বললো “এটা তোর দরজার মাথায় একটা সুতো দিয়ে টাঙ্গিয়ে রাখ। খুব পাতলা সুতো দিয়ে। ব্যাস।"
“ব্যাস – চমৎকার! তা এতে কী হবে শুনি?" রাগত গলায় বললো রফিক। “তোদের না – এইসব তন্ত্র-মন্ত্র-মারণ-উচা টন আমার একদম পোষায় না। আমায় এসব থেকে বাদ দে।"
“ইচ্ছে হলে লাগাস – নইলে লাগাস না। আমার কী!" পরের সিগারেটে গাঁজা ঠুসতে ঠুসতে বলল শিবু।


বাড়ি যাবার সময় রফিক শেষমেষ ভায়ালটা ঝুলিয়েই রাখলো একটা সরু সুতো দিয়ে। শিবুর কথা অনুযায়ী।

***

“তুমি শিওর যে কেউ নেই ভেতরে?" জিগ্যেস করলো ডেভিড।
“১০০%। ওই বাংলাদেশি ফ্যামিলিটা এখানে থাকে না, থাকে হপকিন্সের দিকে। রাতে দোকানটা খালি থাকে।" উত্তর দিল রিচার্ড।
“ভেরি গুড। তাহলে কাজে লেগে পড়া যাক।" বলল ডেভিড।
ডেভিড এবং রিচার্ড দুজনেই স্টেট পুলিশ ডিপার্টমেন্টের অফিসার। আজ অবশ্য দুজনেই প্লেন ড্রেসে। কালো জ্যাকেট, মাথায় হেলমেট – কোনটাই পুলিশ ডিপার্টমেন্টের নয়। আজকের কাজটায় যে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের হাত আছে, সেটা কোনমতেই জানাজানি হতে দেওয়া যাবে না।
ডেভিড সিনিয়ার, তায় এই অপারেশনের নেতৃত্বে আছে সে। সেই নির্দেশটা দিল,
“আমরা প্রথমে সামনের দরজা আর জানলার কাঁচগুলো ভেঙে দেবো। লোহার রডের কয়েক ঘা – ব্যাস। তারপর একটা হ্যান্ডগ্রেনেড ভেতরে ছুঁড়ে দেবে তুমি। চিন্তার কিছু নেই, ট্রেনিং ক্যাটেগরির গ্রেনেড – বেশি ক্ষতি হবে না। কিন্তু মেসেজটা যাবে – লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার।"
“লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার”, বললো রিচার্ড। “শালা বাংলাদেশিটার একটু বেশিই দরদ।"
“ওদিকে বেন গাড়িটা রেখেছে পাশের গলিতে। কাজেই কাজ শেষ করেই আমাদের খানিকটা দৌড়তে হবে। কারণ ততক্ষণে আশেপাশের বাড়ির লোক জেগে উঠতে পারে। কপি?"
“কপি।"
লোহার রডের ঘায়ে কাঁচের দরজা-জানলাগুলো খানখান হয়ে ভেঙে পড়লো। তারপরে গ্রেনেডটির সশব্দ উচ্চারণ শোনা গেল – আদিগন্ত কাঁপানো।
সেই সঙ্গে শিবুর ভায়ালটা ছিটকে মাটিতে পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। ক’ফোঁটা রক্তও পড়লো মাটিতে।
তারপর ওই বোমা-বিধ্বস্ত বিচূর্ণ রেস্তোরা থেকে বেরিয়ে এলো বেশ লম্বা-চওড়া একটা লোক।
“হোয়াট দ্য ফাক, রিচার্ড! তুমি যে বললে কেউ নেই এখানে?"
“আমি... আমি..."
“শুট হিম। সাক্ষী রাখা যাবে না কোনমতেই।"
গুলি চলল নির্ভুল নিশানায়, একেবারে লোকটার বুকবরাবর। সেই গুলির ধাক্কায় ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল লোকটা। আর কিমাশ্চর্যপরম – সেই লোকটির মৃতদেহ থেকে উঠে এলো একই চেহারার দুটো লোক। তারা ধীরগতিতে এগোতে থাকলো ডেভিড আর রিচার্ডের দিকে।
রিচার্ডের পরের গুলিটা লাগলো বাঁদিকের লোকটার কাঁধে। কাঁধ চেপে বসে পড়লো সে, আঙুলের ফাঁক দিয়ে রক্ত পড়তে লাগলো ফিনকি দিয়ে। আর মাটিতে পড়া রক্তবিন্দু থেকে এবার উঠে দাঁড়ালো চারটে লোক। তারা সকলেই হুবহু একই রকম দেখতে।
রিচার্ডের কলারে টান পড়লো। ডেভিড। পেছন থেকে টানছে। ওর মুখ সাদা হয়ে গেছে।
“রান!"
ডেভিড পিছু ফিরে দৌড়তে আরম্ভ করেছে। রিচার্ডও, তার দেখাদেখি। কারণ ওরা দুজনেই ওই লোকগুলোকে চিনতে পেরেছে।
সবকটা লোক – যারা হুবহু একই রকম দেখতে – তারা সকলেই আসলে ওই পরশুদিনের লোকটার মতো দেখতে। যে লোকটা মরে যাবার আগে বারবার শুধু বলছিল “অফিসার, আই কান্ট ব্রিদ।"
মিনিয়াপোলিসের পুলিশবাহিনীর ডেভিড আর রিচার্ড পাগলের মতো দৌড়েচ্ছে। পালাতেই হবে ওদের - যে করে হোক।
আর এদিকে নিশ্চিত পদক্ষেপে একদল কালো লোক হেঁটে চলেছে। রক্ত থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছে তারা। তাদের মিছিলের দৈর্ঘ্য ক্রমশ বাড়ছে।
আশেপাশের বাড়িগুলো জেগে উঠছে। বারান্দার দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে মানুষ। বারান্দার আলো পড়ছে তাদের মুখে... সাদা... কালো... হলদে... খয়েরি... আরও কতো রঙের মানুষ সব।
আলো পড়ে রাস্তাটা ঝলমল করে উঠছে এই অন্ধকারেও।
ডেভিডের চারদিকের অন্ধকার জমাট বেঁধে উঠছে। পাথরের মতো এই অন্ধকার, বরফের মতো ঠাণ্ডা আর নিয়তির মতো অমোঘ। আর ক্রমশ এই অন্ধকার দুপাশ থেকে চেপে ধরছে ওকে... সাঁড়াশির কতো চেপে ধরছে ওর গলা। ডেভিড প্রাণপণ চেষ্টা করছে চিৎকার করতে, কিন্তু ওর আর্তনাদ হারিয়ে যাচ্ছে ঝড়ের মুখে একটুকরো অগ্নিশিখার মতো। শুধু ঘ্যাসঘ্যাসে বিশ্রী একটা আওয়াজ বেরিয়ে আসছে ওর গলা দিয়ে,
“আই কান্ট ব্রিদ!"

অলংকরণঃ কল্লোল রায়

ফেসবুক মন্তব্য