গাড়োয়ালের সুনামি

পার্থ প্রতিম চট্টোপাধ্যায়



১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭, প্রায় ৪ বছর পর আবার কেদারনাথে। শেষবার এসেছিলাম ২০১৩-র জুন মাসে, গৌরীকুন্ড থেকে ঘোড়ার পিঠে চড়ে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে করতে এসে পৌঁছেছিলাম কেদারনাথের দর্শনে। সারা রাস্তা মুগ্ধ হয়ে ছবি তুলতে তুলতে পৌঁছেছিলাম কেদার উপত্যকাতে। আর আজ, প্রায় চার বছর পর এখানে, মেলাতে পারছিলাম না আগে দেখা দৃশ্যের সঙ্গে। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো| রামবাড়া গ্রাম, যেখানে প্রায় কয়েক শ মানুষের বাস ছিল তা আজ সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন।

মনে পড়ে গেল ২০১৩-র ঘটনাগুলো| ১৮ই জুন ২০১৩, দেরাদুন থেকে মুম্বাইয়ের ফ্লাইট ছাড়ার পর নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পেরেছিলাম প্রায় ৭২ ঘন্টা পরে। গত কয়েকদিন কাটিয়েছি প্রায় বিনিদ্র রজনী। বলা যায় কোনো রকমে এড়িয়ে যেতে পেরেছিলাম এক ভয়াবহ ঘটনা।


২০১৩ দেখা মন্দাকিনি


২০১৩ তোলা ছবি


২০১৩ তোলা ছবি

ঘটনার সূত্রপাত, ১৫ই জুন। গত কয়েক দিন ধরে আমি আর বন্ধু, অঞ্জন গাড়োয়াল হিমালয়ের কেদারনাথ, চোপতা, বদ্রীনাথ হয়ে ১৩ তারিখে রাতে এসে পৌঁছেছি, গংগারিয়াতে। ১৪ তারিখে, সকল ৭টায় বেরিয়ে সারাদিন "Vally of Flowers" ট্রেকিং করে ফিরেছি সন্ধ্যাবেলা। ঠিক ছিল ১৫ তারিখ সকালে হেমকুন্ড সাহিব যাব। কিন্তু, মাঝরাত থেকে শুরু হলো আকাশভাঙ্গা বৃষ্টি। ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ পাথর পড়ার আওয়াজে, চিন্তা হতে লাগলো হেমকুন্ড যেতে পারবো কিনা? রাতে আর ঘুম এলো না, দুজনে ঠিক করলাম সকালে যত তাড়াতাড়ি হয় গোবিন্দঘাটে নেমে যেতে হবে, পরে কখনো হেমকুন্ড আসার চেষ্টা করা যাবে। বাকি রাতটা প্রায় জেগে কাটিয়ে, আলো ফুটতেই হোটেলের বাইরে বেরিয়ে এলাম। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই, কিন্তু আমাদের যে কোনো প্রকারে ১৪ কিমি নিচে নামতেই হবে তাড়াতাড়ি। সকল ৭:৩০ নাগাদ শুরু হল হাঁটা। প্রায় ১ কিমি হাঁটার পর হেলিপ্যাডের কাছাকাছি পৌঁছতেই হেলিকপ্টারের আওয়াজ কানে এলো, শুরু হয়েছে হেলিকপ্টার সার্ভিস। হেলিপ্যাডের কাছাকাছি পৌঁছে দেখি অপেক্ষা করছে প্রচুর লোক, আমাদের সুযোগ আসতে হয়তো লাগবে প্রায় ৩-৪ ঘন্টা। নাম লিখিয়ে অপেক্ষা করছি আর মাঝেমাঝে তদ্বির করে চলেছি। হঠাৎ সুযোগ এসে গেল ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই। ৯টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ১৪ কিমি নিচে গোবিন্দঘাটে। ইতিমধ্যেই আমাদের গাড়ির ড্রাইভার রাজেশভাই গাড়ি নিয়ে এসে গেছিলেন। একসঙ্গে ধরলাম ফেরার রাস্তা।

সন্ধ্যের আগে পৌঁছলাম রুদ্রপ্রয়াগে। অলকানন্দা আর মন্দাকিনীর সঙ্গমস্থলের থেকে কিছুটা দূরে নদীর ধারে এক হোটেলে উঠলাম আমরা রাত কাটানোর উদ্দেশ্যে। পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙল হোটেলের জেনারেটরের আওয়াজে। উঠে দেখি লোডশেডিং হয়ে গেছে। ঘরের বারান্দায় বেরিয়ে এসে দাড়াঁতেই এক ভয়ঙ্কর দৃশ্যের সম্মুখীন হতে হলো। যে অলকানন্দাকে পাশে রেখে কয়েকদিন ধরে রাস্তায় চলেছি তার যে এইরকম ভঙ্ককর রূপ হতে পারে স্বপ্নেও ভাবতে পারা যাবে না। নদীর জলের স্তর অনেক উপরে, কাছের ব্রিজটা প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। আর শয়ে শয়ে গাছ বয়ে চলেছে নদীতে। সমগ্র রুদ্রপ্রয়াগ শহর লোডশেডিংয়ে অন্ধকার হয়ে আছে। তখনো বুঝতে পারিনি কী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। কিছুক্ষন বাদে জেনেরেটর ও বন্ধ হয়ে গেল।

কোনোরকমে তৈরী হয়ে নেমে এলাম ৬:৩০ নাগাদ, বেরোব বলে। রাজেশভাইকে ডেকে গাড়িতে ব্যাগ তুলতে যাবো, শুনলাম রাস্তা বন্ধ। সামনের শহর শ্রীনগরের রাস্তা ভেঙে গেছে, এগোনোর উপায় নেই। এবার চিন্তা হতে শুরু করল। যদিও এখান থেকে হরিদ্বার যেতে সময় লাগে ৪-৫ ঘন্টা, কিন্তু এগোবো কি করে? হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে পাচ্ছি, উলটো দিকের পাহাড় থেকে মাঝে মাঝেই পাথর গড়িয়ে পড়ছে। রাজেশভাই ক্রমাগত ফোন করে চলেছেন রাস্তার খবর জানার জন্য, ১০টা নাগাদ খবর পাওয়া গেলো শ্রীনগরের উলটোদিকে কীর্তিনগরের রাস্তা খুলেছে, সেই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। হোটেল থেকে কিছু খাবার আর জল নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম। যতই এগোচ্ছি ততোই দেখতে পাচ্ছি প্রকৃতির ধ্বংসের লীলা। মাঝে মাঝেই পাহাড়ের বিভিন্ন অংশের রাস্তা ভেঙে গেছে, খুব সাবধানে গাড়ি নিয়ে এগোতে হচ্ছে, উপর থেকে মাঝে মধ্যেই পাথর পড়ছে। গাড়ি চলার সময় তাকিয়ে আছি উপর দিকে, যাতে পাথর পড়তে দেখলে রাজেশভাইকে সাবধান করতে পারি। প্রায় ৪ ঘন্টার চেষ্টায় এসে পৌঁছলাম কীর্তিনগরের কাছাকাছি, কীর্তিনগর পেরোতে লেগে গেল আরো প্রায় দেড় ঘন্টা। এরপর দেবপ্রয়াগ হয়ে মোট প্রায় ১৪ ঘন্টার চেষ্টায় হরিদ্বার এসে পৌঁছলাম। আর সঙ্গে নিয়ে এলাম এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। জায়গায় জায়গায় রাস্তা প্রায় নিশ্চিহ্ন, আর সঙ্গে চলা অলকানন্দা ও গঙ্গাতে ভেসে চলেছে অগুনতি গাছ। হৃষিকেশে পৌঁছনোর পর থেকেই ক্রমাগত ফোন পেতে শুরু করেছি। ইতিমধ্যে টিভির মাধ্যমে সবাই জেনে গেছে এই অঞ্চলের ভয়াবহতার কথা। কিন্ত আসল ঘটনা ঘটল পরের দিন। কেদারের উপরে গান্ধী সরোবরের ভেঙ্গে শান্ত মন্দাকিনী ভাসিয়ে দেয় কেদার উপত্যকাকে। আর বদ্রিনাথের রাস্তাও রেহাই পায়নি। অলকানন্দাও ভাসিয়ে নিয়ে যায় বেশ কয়েকটি জায়গাকে। এই ভয়াবহ ঘটনাতে গাড়োয়াল হিমালয় জুড়ে কয়েক হাজার লোকের মৃত্যু হয় আর কয়েক লক্ষ মানুষ আটকে পড়েন পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে। আমরাও, আর এক দিন দেরি করলে বা হেমকুণ্ডে যাবার জন্য অপেক্ষা করলে হয়ত আটকে থাকতাম পাহাড়ে। এর পরের ঘটনা প্রায় সবার জানা, বেশ কিছুদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গাড়োয়ালের জীবন। সেই বছরের মতো বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো “চার ধাম যাত্রা”। কেদারনাথ, বদ্রিনাথ যাওয়ার রাস্তা বহু জায়গাতেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বহু লোক জীবিকা বিহীন হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এই ভয়াবহ বিপর্যয় বেশিদিন টলাতে পারেনি অসম সাহসিক গাড়োয়ালিদের মনোবলকে। ঘুরে দাঁড়ায় তারা কিছুদিনের মধ্যেই। পরের বছর থেকেই খুলে যায় বিভিন্ন রাস্তা, আবার প্রাণ আসে পাহাড়ে।



২০১৫ তে প্রায় দু বছর পর বদ্রীনাথের রাস্তা



২০১৫ তে প্রায় দু বছর পর বদ্রীনাথের রাস্তা



রুদ্রপ্রয়াগ




পাণ্ডূকেশ্বরের একটি বাঁধ

আমি, মুম্বাই ফেরার পর ঠিক করেছিলাম আবার ফিরে আসবো কেদারনাথে আর বদ্রীনাথে। ২০১৫তে আমি আবার ফিরে যাই গাড়োয়ালে। সেবার কেদার যেতে পারি নি, গিয়েছিলাম বদ্রীনাথে। পথের বিভিন্ন স্থানে তখনো দেখতে পাই সেই ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলার চিহ্ন। ঠিক করেছিলাম আসতে হবে আবার কেদারে। ২০১৭ তে তাই আবার ফিরে আসি গাড়োয়ালের পাহাড়ে, আর এবারে শুধু কেদার বা বদ্রীনাথ নয়, যমুনোত্রী, গঙ্গোত্রী ঘুরে কেদারে। প্রতি জায়গায় দেখতে পাই কী পরিমান কাজ করে অন্য রাস্তা তৈরি করা হয়েছে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই। ২০১৩ ধ্বংসের চিহ্ন আছে কিছু কিছু জায়গাতে ঠিকই, কিন্তু তা দমাতে পারেনি মানুষের অদম্য ইচ্ছাকে। প্রাণ ফিরে এসেছে গাড়োয়ালে।






কেদারনাথ - ২০১৭


বদ্রীনাথ - ২০১৭

ফেসবুক মন্তব্য