টেলিফোন, যখন তখন

শবরী রায়




ব্রাহ্মমুহূর্ত কী যেন সব বলে আমি ঠিক বুঝতে পারিনা। তাই চোখ বুজে থাকি এই সময়। ঠিক এই সময়েই আমার মন শান্ত হয়ে আসে। রাতজাগা চোখের ওপর না আসা ভোর পালক বুলিয়ে দেয়। আমি নিঝুম পড়ে থাকি। ঠিক এইসময় ফোন বেজে ওঠে। ওহ রাতে ওকে নিঃশব্দ করতে ভুলে গেছি কাল। ভোরের ফোনকে আমার বড় ভয়। রাত শেষ হলে যেসব ফোন আসে তাতে খারাপ খবর ভরে থাকে। এই ভোররাতেই মৃত্যু সংবাদ আসে। ঝমঝম করছে ফোন। না, কিছুতেই আমি এই ফোন তুলবো না। বালিশে কান চেপে রাখি। বেজে বেজে থেমে যায়। আমার চোখ আবার আবছা অন্ধকারের পালকের আরাম পায়। ব্রাহ্মমুহূর্ত আমি বুঝি না। নির্ঘুম রাত পেরোলে আমার গা গোলায়। রাতভর যত লেখা, যত ছবি পোড়াতে ইচ্ছে হয় এসময়। পোড়ালেই শান্তি। ওইসব লেখা থেকে অম্লবমনের গন্ধ ওঠে। আমি ব্রাহ্মমুহূর্তকে বলি আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আবার ফোন বেজে ওঠে ঝমঝম। চোখ বুজেই তুলে হ্যালো বলি। অচেনা গলা। গলায় কম্পন। ঠিক ভেবেছি মৃত্যু সংবাদ। কে? কে? সন্দীপ? কে সন্দীপ? সন্দীপ মিশ্রা ভাবিজী। এক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলি রং নাম্বার। ভুল নাম্বারে খারাপ খবর জানিয়ে আমার ব্রাহ্মমুহূর্তকে জাগিয়ে দিল। আমি উঠে বসি। বমির গন্ধওয়ালা এ ফোর শিট ছিঁড়ে ফেলি। ট্যাব চেক করে ডিলিট করে দিই রাতের কবিতা। উঠে ব্যালকনিতে দাঁড়াই। জানলা খুলে দিলে ঠাণ্ডা হাওয়ায় আমার চুল উড়তে থাকে। আকাশ কেমন সবুজ সবুজ।ধূসর থেকে কেমন যেন সবুজ মত হয়েছে। ফিরে গিয়ে কফির জল বসাই। নতুন পৃষ্ঠা খুলি। লিখে ফেলতে হবে। কে ফোন করল? কোন এক সন্দীপ আজ তার দাদাকে পথ দুর্ঘটনায় হারিয়ে ফেললো। আর ভুল করে আমাকে খবর দিল। ভুল ডায়াল করলো? এখন কি কেউ ভুলভাল ডায়াল করে? সবাই সবাইকে সেভ করে রাখে ফোনে। সবাই সবার গচ্ছিত ধন। তাও ডায়াল করলো। আর ভুল ডায়াল। এই ব্রাহ্মমুহূর্ত আমার বাবাকে নিয়ে গেছে, আমার শ্বশুরকে এবং শাশুড়ি মা-কেও। আমি একদম ব্রাহ্মমুহূর্ত পছন্দ করিনা। ওটা পোড়ার সময়। পোড়ানোর সময়। মৃত্যুর গন্ধ ছড়ানোর সময়। আর তারপর... সেই তার পরের পর একটা প্রশ্ন চিহ্ন আকাশে দুলতে দুলতে সূর্যের আলো দিয়ে ওই ধূসর সবজে আকাশ মুছে দেয়, আমাদের ভুলিয়ে রাখে। আমাদের কাজ করায়। অনর্থক যত কাজ। রান্না বাটির সংসার। ছেঁড়া পুতুলের সংসার। খুদকুঁড়ো ছড়ানোর সংসার, চাবি হোল্ডারে রাখার সংসার। কফিপান করে আবার ঘুমিয়ে পড়ার উদ্যোগ নিই বাইরের ঘরের সোফায়, পর্দা টেনে। আলো ফোটেনি। লকডাউন চলছে। করোনাভাইরাস। একটা নতুন শব্দ কতগুলো শব্দকে সঙ্গে নিয়ে এল। সেই সব শব্দরা এখন বহুল প্রচলিত হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। ঘুমিয়ে পড়ি। এখন না উঠলেও চলবে। ঘুম। ঘুমেই একমাত্র শান্তি এখন। আমি স্বপ্নও দেখিনা যে একটু স্বপ্নের শিউলিতলায় ঘুরে বেড়াবো। তাই ঘুম।

আজ সবই আজব। ঘুমোতেই দেখলাম আমার তরুণ বাবাকে। এত বছরে আর দেখিনি তাকে। দেখলাম আমার বন্ধুর মাকে সেই বড় খয়েরী টিপ। মাখন শরীরে চাঁপাফুল শাড়ি। পাহাড়ি ভেজা পথে গাড়ি থামিয়ে আমরা কাচের গ্লাসে চা খাচ্ছি। পাশের সুন্দর কাঠের রঙিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল আমার তরুণ বাবা। আমার চেয়েও ছোটই হবে। অথচ আমাকে চিনতে একটুও অসুবিধে হল না। বললো আয়, আয় এখন থেকে এটাই তোর বাড়ি। আমি কাকিমাকে গাড়িতে রেখে ভেতরে গেলাম। দেখি আমার বৃদ্ধা মা সংসারের ফর্দ লিখছে। আমার দিকে তাকালো না পর্যন্ত। আমি ঘুরে ঘুরে ওই ছোট কাঠের বাড়ি, বাইরের বাগান, বাগানের ক্যামেলিয়া দেখে বললাম। দাঁড়াও কাকিমাকে ডেকে আনি। গাড়িতে বসে আছে। বাড়িটা চিনে যাক। এখন থেকে এই বাড়িতেই থাকব যখন। কাকিমা বাবাকে বললো তোমার মেয়ে যা গান আমাকে শুনিয়েছে। কোন গান? ওই যে শুকতারা গো নিয়ো না বিদায়। হ্যাঁ আমার থেকেই তো শুনে শুনে সব মনে রেখেছে। বাবার মুখে উত্তমকুমারের মত হাসি। অথচ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মত নাক। ঠাণ্ডায় নাকের ডগা লালচে। আচ্ছা দাঁড়াও কাকিমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি। গাড়িতে কাকিমা আমাকে বললেন বেশ হল, এবার মাঝে মাঝে আড্ডা বসানো যাবে। তুই যখন বিদেশ যাবি এবার আমার জন্য একজোড়া লাল লেসের লঁজেরি আনিস। আমি বললাম, আজকাল এখানেও পাওয়া যায়। তোমাকে অ্যাম্বিয়েন্স মলের মার্ক্স এণ্ড স্পেন্সার থেকে এনে দেব। গাড়ি এগিয়ে চলছিল। একটা ট্যারা লাল রশ্মি আমার চোখের ওপর পড়ছিল। বিরক্তিতে চোখ খুললাম। পর্দার ফাঁক দিয়ে আলো লাগছে চোখে। কিছুটা সময় লাগলো ধাতস্থ হতে। তবু মন ভালো হয়ে গেল। বাড়ির কেউ তখনও জাগেনি। আমি গাছে জল দিয়ে ওদের নতুন পাতা খুঁজলাম। দু-একটা সবুজ পাতা তাদের পিটপিটে সবুজ চোখ আমাকে দেখে হাসলো।


রান্নাঘরের জানলা দিয়ে তাকিয়ে আমি সেই শব্দগুলো নিয়েই ভাবছিলাম। এখন এই জানলাটাই আমার নিজের। অন্য দুটো অন্যদের দ্বারা অধিকৃত এখন। যদিও তার মধ্যে একটাতে আমি মাঝে মাঝে যাই। সেখানে আমার ছোট চারটে অকাজের গাছ আছে। তাদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি আমি। মাটি তো অশুদ্ধ, সারবিহীন। চল্লিশ ডিগ্রি পেরোনো তাপমাত্রায় তারা শোঁ শোঁ করে জল টেনে নিচ্ছে দুবেলা, আর কৃতজ্ঞ চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে। নাকি, কি জানি আমার মনের ভুল কিনা। কতই যে ভুল আমার। সেই কবিতার ছাদে আজকাল সাদা, কালো, রঙিন কোনো কাপড় শুকোতে দেওয়া হচ্ছে না। অথচ এখন সারাদিন অন্তত পাঁচবার রং বদলাতে পারে ওই ছাদ, শুকোতে পারে থান থান কাপড়। এত খটখটে শুকনো হাওয়া। আমিও সেই রং মিলান্তির খেলা খেলতে পারছি না নিজের সঙ্গে। কারণ ওই ছোট্ট রং কারখানাও বন্ধ এখন। তার মানে ওই সব শ্রমিকরা দূর থেকেই আসতো। এই চত্বরে প্রচুর আগ্রা থেকে আসা অস্থায়ী কর্মীর বসবাস।

সেল্ফ আইসোলেশন আমার স্বভাবজাত। আমার একটুও অসুবিধে হচ্ছে না। কাজের মধ্যে কাজ আরও বেড়ে গেছে বলে বেঁচে গেছি আমি। কাজ বন্ধুর মত আমার সঙ্গে হেসে হেসে গল্প করে যে। আর হ্যাঁ, আমি ১০ ই মার্চ থেকে বাইরে বেরোইনি। বাইরে থেকে ফিরে স্বাভাবিক জ্বর ও গলাব্যথা ছিল তাই বিশেষ সতর্কতা ছিল পনেরদিনের মত। সেসব পেরিয়ে গেছে। অল্পের গল্প লিখতে চাই। আসলে যা যা লেখার দায়িত্ব আছে সেগুলো বাদ দিয়ে কতকিছুই যে লিখে চলেছি। সেল্ফ কন্ট্রোল এখনও শিখলাম না। ভাবনার ব্রেক আমার হাতে নেই। আয়ত্বে আসেনি এখনও। শুধু জানলা দিয়ে দেখছি একটা মৃত্যুপুরী। প্রতিটা গাড়ীর ওপর এমন ধুলো জমেছে। কোনটার কী রং বোঝাই যাচ্ছে না। উইপিং দেওদার এত পাতা ঝরিয়েও কি ভাবে সবুজ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভাবছি। বেঁচে থাকার সহজাত ক্ষমতা প্রকৃতি খুব ভালো জানে। আকাশে এখন অন্য শরৎকাল। শরৎকালে আমার বিরহ হয়। খালি খালি লাগে। বিচিত্র বোধ। এক একটা লাইনের যে কত মানে হয়। যার যেমন মন, তার কাছে তেমন মানে। আমি লিখলাম I am blue without you. কবিতা হল বুঝি। কবিতার যে কত মানে হয়। কয়েকজন ঝাঁপিয়ে পড়লো pollution নিয়ে এমন লাইন... আহা। আমি ফিকফিক করে হাসতে হাসতে ফোনের দিকে এগোচ্ছিলাম। মাকে ফোন করতে দেরি হয়ে গেল আজ। এই লকডাউনে একা আছে। ভোরের ফোনকে ভয় পাওয়ার তো কারণ আছেই। বয়স হয়েছে তাঁর। উদ্বেগ স্বাভাবিক আমার। ফোন তুলতেই মায়ের গলা। বলতে যাচ্ছিলাম আজ দেরি হয়ে গেল। স্বপ্নের কথাটাও বলা যাবে না এই মুহূর্তে। সতর্ক আমি। একটা বড় শ্বাস ফেলে ওধার থেকে কথা ভেসে এল। আজ আবার একজন চলে গেল। আর একটা বাড়ি খালি হল। বুকটা ধকধক করে উঠলো। মা এইসব খবর যখন আমাকে দেয়, কেমন লাগে তার ভাবতে চেষ্টা করি। কে? কে? এই তো আমি এলাম ওদের বাড়ি থেকে। পাশের বাড়ির কাকু। হার্ট অ্যাটাক। দুম করে চলে গেল। রোজ ভোরবেলা উঠে গাছপালা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন। যেন নতুন কিছু দেখতে পাবেন। যেন রোজ কুঁড়ি আসবে গাছে, হয় ফুল ধরবে নয়তো ফল। নিদেন একটা পাতা। কোনোদিন গাছে জল দিতে দেখিনি যদিও। তবু গাছ নেড়েচেড়ে দেখা শখ তাঁর। শখ ছিল হয়ে গেল আজ থেকে। "সঙ্গে কেউ যেতে পারলো না। গাড়ি এসে নিয়ে গেল। মেয়েরা দূরে।" আর ওই যে একটা শব্দ। লকডাউন। হট স্পট। রেড যোন অরেঞ্জ যোন। যাক তুমি এসে জামাকাপড় ছেড়ে, হাত পা ধুয়েছ তো? হ্যাঁ স্নান করেই তোকে ফোন করছি। সকাল দশটা বাজে। খেয়েছ কিছু? খাওয়ার কথা বলতে কাকিমার মুখ মনে পড়ল। ওই বড় বাড়িতে এইবার কাকিমা একা। এই বাড়িতে আমার মা। ভয় ভয় শীতল অনুভূতি। মা বললো শেষরাতে নার্সিংহোমএ। আমি আবার কথা ঘোরানোর জন্য বললাম তোমার হাঁটুর ব্যথা কেমন। ওষুধ খেয়েছ? আজ কী রান্না করবে? এখন চা খেয়েছ? খাবার খাও কিছু। মৃত্যুর কথা ঘোরানোর কী অপরিসীম চেষ্টা আমার। কথা ঘোরে না। দিনের চাকা ঘোরে এই লকডাউনের বাজারেও।

সব ফোন আসে না। সেইসব চুরি করা গোপন টেলিফোন। সময় টিকটিক করে চলে। অন্য ফোন সব দ্রুত শেষ হয়। আবার টিক টিক টিক টিক। "ঘরে যারা যাবার তারা কখন গেছে ঘরপানে, পারে যারা যাবার গেছে পারে... ঘরেও নহে পারেও নহে যে জন আছে মাঝখানে" কারভাঁর সুইচ বন্ধ করি। গান শুনতে ইচ্ছে করে না। এখন শুধু অপেক্ষার দিন.....


অলংকরণঃ কল্লোল রায়

ফেসবুক মন্তব্য