শক্তি ও পাথর-প্রতিমা

অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়



১৯৭৭। প্রকাশিত হয় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘আমি ছিঁড়ে ফেলি ছন্দ, তন্তুজাল’। বইটির প্রথম কবিতাটিই চমকে দেয়। ‘তুমি একটু থামো, তোমার দু-পায় আমি নূপুর পরাই’। পনেরো লাইনের ওই গাঢ় প্রেমের কবিতার স্তবক বিভাজনও অভিনব – ১ম স্তবকে ৯ এবং ২য় স্তবকে ৬টি ছত্র। সান্দ্র এক প্রেমার্তি যেন আশ্চর্য ভাস্কর্যে সমাহিত ওই ক’টি ছত্রে। তবে এই কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিশেষত্ব, গোটা বই জুড়ে ‘পাথর’ শব্দটির পরিচিত ধুনের মত বারবার ফিরে আসা। হিসেব করে দেখা যায়, ৫২টি কবিতার মধ্যে ১৮ বার ‘পাথর’ শব্দটি ব্যবহৃত এবং কোনো কোনো কবিতায় একাধিকবার। পাথর শব্দ নিয়ে কবির বিচিত্র খেলা এই রচনাটির বিষয় ।
পাথর বলতে স্বভাবত মনে আসে ওজন বা ভারের ব্যঞ্জনা। পাথর প্রাণহীনতা এবং বোধহীনতারও দ্যোতক। কিন্তু শক্তির লেখনিতে পাথরের চিত্রকল্প ধরা পড়ে বিচিত্র অনুষঙ্গ, অর্থ ও চিত্রকল্পে। অবাক হতে হয় ‘পাথর’ শব্দটিকে এবইয়ের অলিন্দে তিনি কতবার কত ভাবে সাজান :
‘ছুটন্ত এক নবীন ঘোড়া হঠাৎ যেমন থমকে দাঁড়ায়
তেমন ভাবে চোখের উপর, চিত্রকরের মাথার উপর
আকাশ জুড়ে থমকে দাঁড়াও স্থির যেন এক পাথর তুমি।’(রাখো তোমার উদ্যত পা)
শক্তির গভীর জটিল কবিতার আধারে ফুটে ওঠে পুরুষের চঞ্চল নারীকে বন্ধনে বাঁধার অভীপ্সা। তুমি একটু থামো, দাঁড়াও, যেভাবে কাল দাঁড়িয়ে পড়ে – শক্তির ‘হিম পাথর’ এখানে থমকানো কালের প্রতীক যেখানে কবিতা শব্দের বন্ধন ছেড়ে অরূপলোকে যাত্রা করে। পরের কবিতা ‘ঘরে ফেরা’–তে প্রতীকের লক্ষ্য যায় পাল্টে :
পা তুলে যে শূন্যে রাখো, তা কোন পাথর ধরবে হাতে?
পাথরের হাত আছে? হাতের আদরযত্ন আছে?
পাথরের কী আছে যা তোমায় সস্নেহে কোলে নেবে?
আঠারো ছত্রের কবিতায় চারবার ‘পাথর’ শব্দের ব্যবহার। ভাব ও ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অপরূপভাবে উদ্যত পা ‘হিম পাথর’ এক নারীর চিত্রকল্প ভেঙে যায় যখন সেই রমণীর উদ্যত পা ধরা পড়ে পাথরের হাতে। এই পাথর অনুভূতিহীন, বোধহীন, জড়। আবার অন্যত্র ‘ঝাউয়ের শিকড় আছে---নারিকেল গুচ্ছমূল আছে, পাথর জড়িয়ে আছে, বাহু মেলে তারকাঁটা সহ’ (সমুদ্রতীরের স্বার্থ)। এখানে পাথর অনড়, জড়বস্তু, অন্যদিকে স্থিতিস্থাপকতারও প্রতীক। পরক্ষণে ‘এক রকম আলো’-তে ‘মহিষের চোখ জ্বলে পাথরের পাশে’-তে যদিও পাথর নিষ্প্রাণ ভার কিন্তু তা ‘নদীর পাথর’--নদীর সঙ্গে জুড়ে দেওয়ায় পাথরে অনিবার্যভাবে যোগ হয় একটা স্নিগ্ধতা, গতিময়তা ও শুদ্ধতা যা পাথরের স্থবিরতাকে ক্ষয় করে বিভাসিত হয় ‘এক রকম আলো যার আলাদা প্রকৃতি’।
পাথর তীব্র উন্মাদনার সংহত রূপ হতে পারে? শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের হাতে পারে। তাই ‘ঋত্বিক তোমার জন্য’-তে লেখেন ‘পোড়া পাথরের মত পড়ে আছ বাংলা দেশে, পাশে’। কখনো বা অবক্ষয়, অবহেলা ও মূল্যহীন আবর্জনার প্রতীক হয়ে ওঠে পাথর :
‘অযত্ন পাথর কিংবা তেনি
হয়ে আছে বারান্দায় যেন আমি ঘুমে ও আঁধারে
অপেক্ষায় ধুলো হয়ে পড়ে আছি’ । (কেউ কেউ একা থাকে বেশ একা, ভয়ঙ্কর একা)
‘সারা রাত গান গায় আঁধার বৈষ্ণবী’-তে এক জীবনপ্রেমী যেন সম্ভোগের মধ্যে ছড়ায় নিদারুণ বৈরাগ্য¡:
সমস্ত সাধ বাঁধ ভেঙে ভৈরবের মতো
হবে উচাটন, যাতে পাথর গুঁড়িয়ে হবে ধুলো।
এ পাথর কি বস্তুভার, বন্ধন, জড়তা? একই ভাবে ‘জলের নিকটে ছিলে, পাথরের কাছে বসে ছিলে’ (সুখে থেকো) যেখানে স্থবিরতা বোঝাতে আবার পাথরের উপমা। ‘বিষণ্ণতা ছিল’-তে বিষণ্ণতার চাপে ‘পাথর পড়েছে জলে নুয়ে’ । কবির কাঙাল মনকে কুঁড়ে কুঁড়ে ক্ষয় করে দেওয়া অতলান্ত বিষাদ ওই নুয়ে পড়া পাথরের মধ্য দিয়ে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। ‘দেখা---কতদিন বাদে’ কবিতাটির আবেদন ভোলার নয়¡ :
‘মনে হয় তার কাছে আজ সব সমস্ত পাথর
আজ, এই সন্ধ্যাবেলা, কতদিন বাদে।’
কিন্তু কবির মনে সংশয়ও থেকে যায়-
‘কি জানি রয়েছে কিনা
বজ্র তার মেঘের আড়ালে
সহজ হাসিটি হেসে আবার পোড়াবে পোড়ামুখ
পাথরের মত।’
পোড়া পাথরের এই ছবি তাঁর ‘ঋত্বিক তোমার জন্য’-তে ব্যবহৃত পাথরের চিত্রকল্পকেই আবার মনে পড়ায় না কি?
বইটির নামকবিতায় অমোঘভাবে আসে পাথরের উপমা।
‘প্রেমে গদগদ ভবিষ্যৎ
কান ফুটো করে যদি সেই ভয়ে পাথরের কাছে
কথা আছে সাড়া দাও.....এই বলে
পাথর হয়েছি
অত্যন্ত আপন।’
পাথর হয়ে পাথরের ধ্যানভঙ্গের প্রাণপণ প্রয়াস ফুটে ওঠে চিত্রমূর্চ্ছনায়। শক্তির দুর্বোধ্য কবিতাগুলির মধ্যে সম্ভবত এটি অন্যতম। ‘নদীতীরে’ কবিতায় আবার সেই ‘পাথর’-
‘আমার ভলোবাসার ইচ্ছে পাথর দিয়ে রাখলে চেপে’ । এ কবিতার চপল ছন্দে বিবাগী বাউন্ডুলে শক্তি চট্টোপাধ্যায় নয়, জীবনপ্রেমী এক শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ঝলকপ্রকাশ ঘটে যায়।
‘স্বপ্নের সমুদ্র থেকে পাথর উঠেছে ভোরবেলা’ – এ কোন পাথর? এই পাথরকে ডুবিয়ে দেবার তাগিদেই কি কবি বলেন - ‘বৃষ্টি হলে একবার এখানে আবার আসা যাবে’ ?
এরপর আসে ‘ভয়ের পাথর’ যা গুঁড়িয়ে গিয়ে করছে মাটি --- পাথর গুঁড়িয়ে ধুলো হওয়ার চিত্রকল্পও ওঁর কবিতায় নতুন নয়। ‘ঋষির মত নিস্পৃহতা, পাথরের মত’--- কত অবলীলায় দুটি আপাতবিরোধী শব্দকে একসূত্রে গেঁথে দেন কবি। প্রিয়তম সহোদরের স্মৃতিতে কবির হৃদয়মন্থন করা বিষণ্ণতা উৎসারিত ‘এই মেঘ থেকে বৃষ্টি’-তে:
‘ও আমার প্রিয়তম সহোদর, মিশে গেল ভিড়ে
এবং মিশল না – একা পড়ে থাকল পাথরের মতো
নীরব, করিৎকর্ম, সমুদ্রের মৌন ও গভীর।’
পাথর এখানে জড়তা নয়, অস্তিত্বের সুনিশ্চিত প্রকাশ। সে মৌন কিন্তু সত্য, অনড় কিন্তু গভীর। ‘এখানে বেড়াতে এসো’-র ‘রকমারি পাথর’ তুচ্ছ বৈচিত্রের ব্যঞ্জনা জাগায়। ‘রকমারি পাথর’ শব্দদুটিকে আশ্চর্য ব্যঙ্গে কবি ছুঁড়ে দেন কবিতার অঙ্গে -- ‘কুড়োবে ছড়াবে’-র মধ্যে আছে কৌতূহল আর অবজ্ঞার শ্লেষ। ‘ছিন্নবিচ্ছিন্ন ২’-তে দেখি একটি চতুষ্পদীর প্রত্যেকটি চরণের আদ্যশব্দ ‘পাথর’:
‘পাথর নিয়ে ছিলো গভীর রাতে
পাথর নিয়ে ছিলো সকালবেলা
পাথর রাখে বুকের ওপরটাতে—
পাথর নিয়ে কোন পাহারের খেলা।’
কবিকে যেন পাথর শব্দটি তাড়া করে ফেরে! শহরে-গঞ্জে, সমুদ্রতীরে, পর্বতে, মানুষের আচরণে, নারীচরিত্রে – সর্বত্র এই অভিনব উপমাকার প্রত্যক্ষ করেন পাথর – নানা রূপে, নানা অনুষঙ্গে। ভাবতে অবাক লাগে, যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় শৃঙ্খলবিহীন গতি ও বোহেমিয়ানিজ্মের মূর্ত প্রতীক, যার একমাত্র উপমা হতে পারে ‘ঝড়’, সেই শক্তির রচনায় কেন বারবার ব্যবহৃত হয় স্থবীর পাথরের উপমা? তাঁর মৃত্যুর প্রায় একুশ বছর বাদে ‘আমি ছিঁড়ে ফেলি ছন্দ, তন্তুজাল’ বইটিকে আরেকবার সকৌতূহলে পড়তে গিয়ে প্রশ্ন জাগে, কোন সে জগদ্দল পাথরের ভার তাঁকে এমন বিষণ্ণ, তির্যক, পাথরপ্রিয় করে তোলে?

অলংকরণঃ অর্ঘ্য দত্ত

ফেসবুক মন্তব্য