চিৎসাঁতার

উত্তম বিশ্বাস



সন্ধ্যা হলেই উঠোনের আলোটা নিভিয়ে দেন বাহাদুর সামন্ত। এসময় অন্ধকারে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে দিঘির পাড় থেকে ডুরি আসে। ডুরি নিমাইএর বৌ। ভরকেন্দ্রে উপস্থিত সকলের নামে নামে ফুল পয়সা দিয়ে আঁচল পেতে অপেক্ষা করে ডুরি। এইসময় বাহাদুর গিন্নির ভর হয়। মা শীতলার ভর। আজ অনেকগুলো উঠতি বয়েসের নতুন মুখ লঙ্কা দগ্ধকারী হনুমানের মতো গুটিসুটি মেরে বসেছিল উঠোনের এক কোণায়। অনেকক্ষণ হল বাহাদুর গিন্নি ভরে পড়েছেন। কিন্তু কিছুই বলছে না দেখে ডুরি উশখুশ করে ওঠে, “মা, কিছু তো বলো। ছেলেগুলো কী খাবে, কোথায় থাকবে, ওদের কী উপায় ওবিধে হবে, বলে দাও মা। আদৌ কি ওরা গ্রামে ঢুকতে পারবে?”
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি হয়। ডুরি ধৈর্যহারা হয়ে ওঠে, “আমি তবে উঠি মা। দোরে সন্ধ্যেবাতি পর্যন্ত জ্বেলে আসিনি।”
এবার বাহাদুর গিন্নি ঝলসানো সাপের মতো মোচড় মেরে ওঠেন, “ধর। ধর। ধর। ডুবে গেল। ডুবে গেল। আমার সোনার জাহাজখানি ডুবে গেল রে!”
ডুরি ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করে, “কোথায় বজরা মা?”
-“মা যেখানে গা ধুতে আসেন। আগে ছেঁচে তোল। তা না হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে!”
অন্ধকারে ডুরি ছেলেদের মুখের দিকে তাকায়। তারপর আবার কাকুতিমিনতি করে, “মায়ের আদেশ অমান্য করে সাধ্য কার! কিন্তু এদের কী হিল্যে হবে, সেটা যদি মা দয়া করেন!”
অনেক রাত অবধি পুজো আচ্চা চলে। ভীড় বাড়ে। ডুরি মাথা কোটে। কিন্তু কোনও সমাধানসূত্র বার হয়না।




গাঁয়ে বাহাদুর বাবুর পুকুর সংস্কারের কাজ চলছে। সংস্কার তো নয়, যেন মা শীতলার আদেশে স্বর্ণ সন্ধানী মানুষের অভিযান চলছে!
বাহাদুর বাবুও ধৈর্যহারা ওঠেন, “ওরে, পারলে আরও সবাইকে ডাক। তাঁকে বিশ্বাস করে, দুকোপ সরিয়েই দেখ না!”
বাহাদুর বাবুর কথা কেউ বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, ডুরি করে। কেননা এই কয়েকবছর আগেও ওর বাপের বাড়ির গ্রাম পদ্মপুকুরে আস্ত একখান মাস্তুল উঠতে দেখেছিল। এই উত্তেজনায় ডুরিও তার রাঁধাবাড়া আদ্দেক করে সমানে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। আজ পুকুরের উত্তর পোতায় এসে পা ঝুলিয়ে বসেছে তারিণীর ছেলে মণিকান্ত। ওর হাতে জামরুলের ডাল। থোকধরে ভেঙে এনেছে গাছ থেকে। ছেলেটির সুন্দর চেহারা। গাছের আড়াল থেকে ঢুলুনি গলায় হাঁক দেয় ডুরি, “ও ঠাকুরপো, কোথায় ছিলে এদ্দিন?”
-“উটি।”
-“উটি থেকে এদ্দুর পায়ে হেঁটেই মেরে দিলে? বাব্বা! দম আছে বলতে হয়!”
মণিকান্ত কথা ঘুরিয়ে দেয়, “শুনলাম এখানে নাকি সোনা পাওয়া গেছে?... তাই?”
-“বেশি চেঁচিও না। পারলে আরও কিছু মাটি মজুর দেখে দাও না!”
কিছুক্ষণের মধ্যেই পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে আরও তিনজন। ডুরি উঠোনে ঘুরঘুর করে আর পুকুর পাড়ে নজর রাখে। তিনজনই প্রায় সমবয়সী। বিল্টু আর বক্রেশ্বর না? বাকি জনা কার ছেলে? মনে করতে পারেনা ডুরি। কিছুক্ষণের জন্যে অন্যত্র সরে যায় ডুরি।

সন্ধ্যার খানিকটা আগে হাঁস খ্যাদানোর ছল করে আবার এসে দাঁড়াল ছ্যাতলা ধরা সিঁড়িটার ওপর। দেখল ছেলেগুলো তখনো দিব্যি গাছের ছায়ায় জটলা পাকিয়ে বসে আছে। ওদের শুকনো মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে ডুরির কষ্ট হল খুব। এবার সে খানিকটা অনুশাসনের সুরে বলে উঠল, “বাপুরে বাপু! গোটা একটা দিন কাবার হয়ে গেল! তোমাদের বাড়ির লোকগুলোরও বলিহারি ঝাই! হাঁস পাখি খাওয়ানোর মতো করে দূর থেকে একদলা খাবার ছুড়ে দিয়ে গেলেও তো পারে!”
-“এই তো খাচ্ছি!” বলেই ওদের মধ্যে একজন একটা জামরুল ডুরির গায়ে ছুড়ে মারল।
-“নকশা কতো! জল চাবিয়ে আর কদ্দিন! পেটে ভাত না পড়লে সব রস শুকিয়ে ধুনো হয়ে যাবেক্ষণ!”
-“বেঙ্গলের যে ভাত! ভাল্লাগেনা।”
-“হ্যাদে ও মা ছুড়া বলে কী! বলে কিনা ভাত ভাল্লাগেনা। তবে কী ভাল্লাগে শুনি?”
-“সমসা হাহাহা!”
-“আঃ মলো জা! বলি সমস্যা খেয়ে কেউ বাঁচে নাকি?”
ছেলেগুলো ডুরির কথায় হেসে গড়িয়ে পড়ে। ডুরির বয়েস কম। সেও তার নিটোল বক্ষভার নিয়ে হেসে লুটিয়ে পড়তে চায়। সন্ধ্যা হয়ে আসে। সে টানপায়ে ঘরের পথে পা বাড়ায়। যেতে যেতে অন্ধকারের উদ্দেশ্যে আঁচল উড়িয়ে বলে যায়, “পারলে সন্ধেবেলা একখান ঝুড়ি কোদাল ম্যানেজ করে মন্দিরে এসো। বাহাদুর কাকিমাকে বলে দেখি, তিনি নিশ্চই একটা কিছু ব্যবস্থা করে দেবেন!”


সকাল হলেই রোদ ঝিকিয়ে পড়ে উঠোনে। রান্নাঘরের চালা থাকে আজকাল আকাশের অনেকদূর অবদি দেখা যায়। ডুরির চোখ দুটো কচি লেবুপাতার মতো ঝিকমিক করে ওঠে। সকালের কাজ সেরে পায়ে পায়ে পুকুরটার ধারে এসে দাঁড়ায়। দেখল প্রায় জনা পঁচিশ ছেলে অনেকটা মাটি কেটে ফেলেছে। ‘খুব ভোর থেকেই নেমেছে বোধয়।’ ডুরি ভাবে। মণিকে দেখে ডুরি আরও অবাক হয়। দেখল সেও আস্তিন গুঁটিয়ে ঝুড়ি কোদাল নিয়ে এক হাঁটু পাঁকের মধ্যে নেমে পড়েছে! ডুরির মতো আরও অনেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। কী অসম্ভব শক্তি ওর শরীরে। একেক কোপে এক হাত করে পাতাল ফাঁক হয়ে আসে। বনবেড়াল কিম্বা বেজী দীর্ঘদিন খাবার না পেয়ে যেমনভাবে শাঁকালু কিম্বা গাছের কন্দ খুঁজে মরিয়া হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনি ছেলেগুলোর মধ্যেও যেন কী এক অদৃশ্য উন্মাদনা! মাস খানেকের মাথায় আশ পাশের গ্রামের আরও কয়েক শো ছেলে মণিকান্তদের সাথে কাদায় নেমে পড়ে। ডুরি মনেমনে অহং অনুভব করে খুব, “এদ্দিন কোথায় ছিল এই পঙ্গপালের মতো রাজপুত্তুরগুলো?”


ডুরি চাল ভেজে গুড়ো করে আনে। ভিজিয়ে ছাতু করে ডাক দেয়, “ও ঠাকুরপো, হাত ধোও!”
পুকুরের খোল ফুড়ে এখন হরেক ভাষার বিচিত্র সব সায়েরি ভেসে আসে। শরীরমন গরম করা এসব শ্লীল অশ্লীল প্রলাপগুলো ডুরির খুব ভালো লাগে। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শোনে।

একদিন হঠাৎ বৃষ্টি! আকাশ ছ্যাদা করে এক্কেবারে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। কিছুদিনের মধ্যে বসুমাতার গর্ভ ফেটেও নীলজলের ধারা বেরিয়ে এল। ঢেউ দেখে বিস্ময়ে ফেটে পড়ল ডুরি,“ও কাকিমা, কোথায় তোমার সোনার ভারা? স্যাতলা ধরা ক’খান হরিণের শিং আর পাতাল ঠ্যালা পানসে জল ছাড়া আর কিছুই তো উঠল না। এইবার একটা কিছু করো।”
-“সে তোমার আর বলতে হবেনা বৌমা। মায়ের আদেশ, সামনের গো-ফাগুনে ওদের শৌচ হবে! তা হ্যাগা, তোমার কোচড়ে কী ওগুলো?”
-“ঘুসো ধানি পোনা কাকিমা। আমার নন্দাই এই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। হ্যাচারিতে কাজ করে। হাড়ি কাচিয়ে ওই আদাড়ে ফেলে দিতে চাইছিল। আমি বললাম ফেলনা, দাও। পুকুরে সাঁতার পাতার জল। ছেড়ে দিই। ছোটমোটা যাইহোক একসাজ না দিয়ে তো একলা খেতে পারবে না!”

ডুরি তার আঁচলের পোনামাছের চারাগুলো পুকুরের জলে গুলে অনেকটা ঘোলা দিয়ে, সাঁতরে, ডুব দিয়ে স্নান করে যখন ডাঙায় উঠল, দেখল সিঁড়িতে দাঁড়ান মণিকান্ত।
-“কাকিমা কী বললেন? এদিকে কিছু ছাড়ো।”
ডুরি বুকের ওপর থেকে ভিজে কাপড় ফেলে দিয়ে হেসে উঠল, “এই রে! এইমাত্র সব ছেড়ে দিলাম!”
-“না আমি পোনা চাইছি না! বলছি উঠোনের....!”
ডুরি এবার আঁচল নিংড়ানো ভুলে আতংকে শিউরে উঠল,“উঁহু! আবদার কতো!”
-“তাহলে আবদার কার কাছে করব?”
ডুরি তার কথায় এবার খানিকটা মাখন মাখিয়ে দেবার চেষ্টা করল,“কী যে বল না! নিজের গাঁয়ের নদী কেটেছ। তার জন্যে আমি উঠোন কেটে জায়গা দিতে যাব কোন দুঃখে শুনি?”
মণিকান্ত অবাক হয় খুব,“নদী মানে?”
-“গাঁয়ে জন্মেছ, অথচ গাঁয়ের আদ্যিনাড়ি কিছুই জাননা দেখছি!”
ডুরি একটা শ্লোক আওড়াল,-
“শুকিয়ে গেল সন্ধ্যাবতী। তলিয়ে গেল ডিঙা!
সাত বেনিয়া বাউল হল। বেশ্যা ভাঁজে ভুনা!”
-“সন্ধ্যাবতী! আমাদের সুটি? এ পুকুরটাও?”
-“হ্যাঁ গো হ্যাঁ! সন্ধ্যাবতী... সুখাবতী... সুটি! ডুরির মতো পোড়াকপালি সুটি!”
-“কিন্তু বাহাদুর বাবু যে বলেন......!”
-“ওরম মনে হয়! মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে ওই বুড়ো বাহাদুর আস্ত একখান নদী বগলদাবা করে রেখেছে! আমার উঠোনে যেতে চাইছ? ওখানে এককালে কী ছিল জান? লোকে বলে পয়সার অভাবে নিমাই নাকি বেশ্যাদের ভিটেয়... !”
মণিকান্ত ডুরিকে পথ ছেড়ে দেয়। ভিজে গায়ে ডুরি ঘরের পথে পা বাড়ায়। এমন সময় দূরে গাছের কোটরে এক নামহারা পাখি কুহুক কুহুক করে ডেকে ওঠে। যেন ডুরির হয়ে শতবার বলতে চায়, “আমার ভুল বুঝো না মণি!”




আজ গো-ফাগুন। পুকুরপাড়ে লোকে লোকারণ্য। আজ হিন্দুমতে গোয়ালের গরু বাছুরকে তেল হলুদ মাখিয়ে স্নান করানোর তিথি। কিন্তু এ কী! সকাল হতে না হতেই যেন সোনাঝুরির হাট বসেছে পুকুরের পাড় জুড়ে। গাদাগুচ্ছ হলুদ থেঁতো করে ছেলেদের গায়ে গা লাগিয়ে কীভাবে মদ্দানি মারছে ময়রাদের মেয়ে টুসকি! মণিকান্ত ঘড়িয়ালের মতো চিৎ হয়ে ভেসে আছে পুকুরের জলে। ওর গালে আজও কাঁচা হলুদের দাগ। ডুরি হতাশ হয় খুব! ছেলেগুলো ওর দিকে আর যেন সেভাবে মনোযোগ দিকে তাকাচ্ছেই না। এমন কি মণিকান্তও না! এমন ভাবখানা দেখায়, যেন কোনও গুরুত্বই নেই ওর! মণির প্রতি আক্রোশে মনেমনে বলে ওঠে, “জম্মের শোধ জলকেলি করে নাও! আমিও দেখছি তোমাদের কদ্দুর দৌড়!”
সেদিন পেটকাকালে এক শিশি ফলিডল নিয়ে পুকুরের পাঁড়ে এসে দাঁড়াল ডুরি। তার সারা শরীর এখন থরথরিয়ে কাঁপছে। জলে বিষ দেবে ডুরি। কিন্তু পুকুরঘাট ফাঁকা হবার কোনও লক্ষণই দেখতে পেলনা ডুরি। গরু মানুষে গিজগিজ করছে। সেই দুপুর থেকে মণিকান্ত মহিষের শিংএর ফাঁকে মাথা পুরে দিয়ে একই শীর্ষাসন দেখাচ্ছে। সনাতনের মা মণিকান্তর সাহস দেখে ভিজে কাপড় নিঙড়াতে নিঙড়াতে ডাক পাড়ছে, “ও খুকা, আমার এঁড়েডার এট্টু চুবনি দিয়ে দিস!”
ডুরি কিছুক্ষণের জন্যে পিছু হটে যায়। হঠাৎ ঝড়ের মতো এসে উঁচু পাঁড়ে দাঁড়িয়ে একটা হাঁস উড়িয়ে দিয়ে হাঁকল, “ও ঠাকুরপো, ধরো। যে ধরতে পারবে, হাঁসটা তার।” মুহূর্তের মধ্যে পুকুর জুড়ে বিরাট তরঙ্গ দোলায় চারপাশের পাড়া আন্দোলিত হয়ে উঠল। একটা ছাইরঙা হাঁস অদ্ভুতভাবে সাঁতরাচ্ছে। পুকুরের চৌপাড় জুড়ে সে কী হৈহল্লা চেঁচামেচি, “ওরে ও মণি, ধর ধর! গেল রে উড়ে!”
-“হা কপাল! এটুকুতেই হাঁপিয়ে গেলি? খানিকটা চিৎসাঁতার দে!”
-“ওরে ও বিলু, এই যে বলিস সকাল বিকাল তোরা নাকি সাঁতরে বোম্বের সমুদ্র পার হোস। একটা সামান্য শোলাপানা হাঁসের সাথে পারলে না! এই তো মুরোদ!”
ডুরি দুচোখ ভরে দেখছিল তার হাঁসটিকে ছোঁবার জন্যেকীভাবে ছেলে-বুড়ো একসাথে হামলে পড়েছে। ডুরি মাথার কাপড় দলা করে চোখ মুছে জনান্তিকে প্রার্থনা জানায়, “ঠাকুর, ওদের ধৈর্য দাও। যদ্দিন ওদের কোথাও কোনও হিল্লে না হয়, আরও একটু ধৈর্য দাও!”
সেদিন হাঁস তো দূরের কথা, ডুরির ছুড়ে দেওয়া হাঁসটির একটা পালকও ছুঁতে পারেনি মণিকান্ত ও তার বন্ধুবান্ধব।

ভরা পূর্ণিমা। ভিজে জলধোয়া উঠোনে গোলাপী জ্যোস্নায় গাছেদের ছায়াগুলো ছিল ছোখে পড়ার মতো। পাশের কামরায় নিমাই কাশিছিল খুব। ডুরি জেগে ছিল। হঠাৎ চোখে পড়ল উঠোনের মাঝখানে একটি অন্যরকম ছায়া। ছায়াটি ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল ডুরির হাঁসের বাক্সের দিকে। ডুরি উঠে বসল। ছায়াটির চলন দেখে ডুরি মনেমনে অংক কষে নিল, “এ বেচারা নিশ্চই মণিকান্ত। সেদিন হাঁস ধরতে না পারার উশুল আদায় করতে নেমেছে।” ডুরি নরম পায়ে নেমে ছায়াশরীরের পেছনে এসে দাঁড়াল।
-“মশলাপাতির পয়সা আছে তো ঠাকুরপো?”
হাতেনাতে ধরা খেয়ে মণিকান্ত পাথরের পুতুল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
-“কী হে, পিকনিক হবে বুঝি?”
মণিকান্ত আরও পাথর!
এবার ডুরি তার নাকের থেকে এককুচি সোনা খসিয়ে, মণিকান্তের মুঠোর মধ্যে দিয়ে বলল, “নাও। কাপুরুষ কোথাকার!”
অনিচ্ছা সত্বেও মণিকান্ত অস্ফুটে উচ্চারণ করে ফেলল,“এটা খুললে কেন?”
-“এটা বেঁচে মদ মাংস বিড়ি গুটখা যা খেতে ইচ্ছে করে খেও। কিন্তু ওই যে বললাম আমার হাঁসকে ধরা অতটা সহজ নয়। এতো অস্থির হলে কিছুই হবেনা মশাই। হাঁস কেন সামান্য একটা চড়ুইও ধরতে পারবে না!” মণিকান্ত দেখল ডুরির চোখদুটো আজ হীরের চেয়েও উজ্জ্বল, অথচ কী অপূর্ব সিক্ততায় ভরপুর! ডুরি ঘুমচোখ কচলে হাইতুলে চলে যাচ্ছিল। খপকরে ওর হাতখানি ধরে মণিকান্ত ভ্যাক করে কেঁদে ফেলল, “বিশ্বাস করো বৌদি, এই হাতদুখানা দিয়ে এখন রোজ মানুষ খুন করতে ইচ্ছে করছে!”
-“ব্যাটাছেলে হয়ে অমন কাঁদলে হয় নাকি!”
-“আমার কাজ চাই কাজ! আমি পাগল হয়ে যাব!”
-“কাজ করছ তো। দুবেলা হরেন ময়রার মেয়ে টুসকির পেছনে গাবের আঁটি ছুড়ে মারছ!... এটাও তো কাজ তাইনা?”
-“কী করব? সময় কাটে না! মরে যেতে ইচ্ছে করে!”
-“মাত্র ক’ মাস ঘরে বসে আছ, তাতেই এই! হেঁসেল ঠয়ালা মেয়েলোকগুলোর কথা ভাবো একবার। তার চেয়ে এক কাজ করো, পারলে সকাল বিকাল আমার বেগুন খেতখানার আগাছাগুলো একটু চরসো করে দিও!”





বিকাল হলে পুকুরের পাড়ে বাঁশের চাটনায় পা ঝুলিয়ে আয়না চিরুনি নিয়ে বসে ডুরি। নীলজলে নিজের ছায়া দেখে বিভোর হয়ে চেয়ে থাকে ডুরি। পাড় বেয়ে জল অবধি নেমে গেছে মাধবী আর লবঙ্গ লতিকা। মৃগেল আর গ্লাসকাপ মাছেরা এসে খপখপ করে ওই আগাগুলো খায়। ডুরি এসব দেখে আর অবাক হয়। ছেলেরা দল ধরে আসে। কেউ কেউ ছিপ ফেলে চুপচাপ বসে থাকে। মাছকে কিন্তু কেউই বাগে আনতে পারেনা। এর পরিবর্তে ওদের আরাধ্য বঁড়শিতে উঠে আসে অনেক নতুন নতুন সম্ভাবনা, “তোকে শুনলাম ফোন করেছিল? কাজের সাইটে যাচ্ছিস তা হলে?”
মণিকান্ত মাথা নিচু করে চেয়ে থাকে জলের অতলে। সেখানেও তার ছায়াটি আশা নিরাশায় এমনভাবে দোল খায়, বিট্টু বুঝতেই পারেনা। সন্ধ্যা হয়ে আসে। সিঁড়িতে নেমে চোখে মুখে জলের ঝাঁপটা দিচ্ছিল ডুরিকে ছুঁয়ে আরও একটি নন্দিত ছায়া দুলে ওঠে। ডুরির গা ছমছম করে ওঠে। দ্যাখে মণিকান্ত।
-“আবার কী হল?”
-“এটা কেন দিলে বললে না তো?” সেই নাকছাবিটা। মণিকান্তের করতলে জোনাকির মতো মিটমিট করে জ্বলছে!
-“বল কেন দিলে?”
-“সব কথার উত্তর হয়না। তোমার না লাগলে ফেরত দিতে পার!” ডুরি গরম নিঃশ্বাস উড়িয়ে নাক এগিয়ে দিল। হঠাৎ বাজখাই গলায় বাহাদুর গিন্নি হাঁক পাড়লেন, “কারা গো তোমরা? কে ও বৌমা না?”
ডুরি অন্ধকার খুঁজে অদৃশ্য হয়ে গেল।


কতদিন হল পুকুর ঘাটে যায়না ডুরি। ঘর থেকে আজ সন্ধ্যার পর আরও একটা শাঁখ উলুর শব্দ শুনেছে ডুরি।
-“আবার একজোড়া বিয়ে? এই আকালের বাজারে কাদের বিয়ের বাই উঠেছে হে ভগমান!”
ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে আসে ডুরি, “মণিকান্ত নয় নিশ্চই?”
রাতে শুয়ে বিছানার এপাশ ওপাশ করেও চোখের পাতা এক করতে পারেনা ডুরি। দুপদাপ করে পা ফেলে নেমে আসে উঠোনে। রাগে দুঃখে খেইখেই করে গাল পাড়ে, “মদনাগুলো! কাজ নেই কম্ম নেই গড়ে গাব দেবার নেশায় একেবারে উন্মাদ হয়ে উঠেছে! মাগিগুলোর পেট বাধুক, বুঝবি ঠেলা!”
মশারির মধ্য থেকে অসুস্থ্য নিমাই ঝাঁঝি দিয়ে ওঠে, “ওরা বিয়ে করুক, যাই করুক তোমার অত ঝাল খাওয়ার কী আছে?”
-“ঝাল খাবনা মানে? দুদিন যেতে দাও, চ্যাংড়ার পাল ওদের ঝেদি ফেলে থুয়ে না পালায় আমার নামে কুকুর পুষো!”

পুকুর পাড় আবার আগের মতো শুনশান অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। ডুরির ভেতরটা শুকনো পাতার মতো মচমচ করে ওঠে, “গেল কোথায়? সব কি ডিমে তা দেওয়ার কাজে ঘরে সেঁধিয়ে গেল? নাকি...?” কোনও উত্তর পায়না ডুরি।



আজকাল ঘুমের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ স্বপ্ন দেখে ডুরি। তার উঠোনে খাপ পঞ্চায়েত বসেছে। নিজে থেকেই উঠোনজুড়ে বেদেচাটাই বিছিয়ে দিয়েছে বাহাদুর গিন্নি। বিদেশ ফেরৎ ছেলেগুলো অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে গাছের আড়ালে। বাহাদুর বাবু আজ ভীষণউত্তেজিত, “বৌমা, ছেলেগুলোর মাথা এইভাবে চিবিয়ে খাচ্চ!.... এর মানে কী?”
-“আমি এর কিছুই বুঝলাম না কাকাবাবু!”
-“নিমাই, তোমাই বৌকে বুঝিয়ে দাও!”
নিমাই ঘাবড়ে যায় খুব, “আমি এর কী জানি!”
-“তুমি কী জান মানে! দুবেলা চড়ুইভাতির আসর বসছে তোমার উঠোনে। দিনে রেশন ডিলারকে ধরে হেনস্থা করছে। রাত হলে পাখপাখালি রেখে শুতে যাওয়া যাচ্ছে না! এমন কি গাঁয়ের সমত্থ মেয়েগুলো পর্যন্ত....! এসব কী অনাচার শুরু হল শুনি?”
এবার ডুরি আগুন উগরে দিল, “অনাচার আমি শুরু করিনি কাকা! শুরু করেছেন আপনারাই। গ্রামখানা আড়াআড়ি ভাগ হতে বসেছে। ছেলেগুলোর আজ কোত্থাও মুখ লুকোনোর জায়গা নেই। ওদের গায়ে নজর পড়লেই হেটোমেঠো আহাম্মকের দল হিটগুঁতো মেরে কথা বলছে! এমনকি দোকানঘরের চালায় এসে বসলেও জনমজুরখাটা লোকগুলো বলে কিনা, ওরা তো বাবু মারাতি বাইরে গিয়েছিল। এখন আমাদের বৌবাচ্চার কোলের ভাত কেড়ে খাবার জন্যি আবার ফিরে এয়েচে! ভাবুন দিকিনি একবার। ওরা কি গ্রামের কেউ না?”
বাহাদুর গিন্নিও আজ হাঁসুয়া নিয়ে বসেছেন, “অতো লাই দিওনা বৌমা। হেটোমেঠো মানুষের সামনে সকাল সন্ধ্যে ফুলফ্যাশান দিয়ে ঘুরে বেড়ালে কেউ সহ্য করবে না! তুমি কোদাল বাহিনী তৈরি করেছ ভালো! কোই কাদায় নেমে চার বিঘে চষে দিক দেখি!”
-“দেবতার দোহাই দিয়ে আপনারা এতবড় একখানা জলকর কাটিয়ে নিলেন! কোই একটা কানা কড়িও ওদের হাতে দিলেন না তো!”
-“এখন বেশ বুঝতে পারছি কেন তুমি কাদার মধ্যে ফেলে চালে আর কাঁকরে এক করে দিতে চেয়েছিলে!”
-“কাদা মাখিয়ে যদি রোগবালাইকে চাপা দেওয়া যেত, তাহলে তো কোনও কথাই ছিল না! ঘরে এসে অব্দি দেখি কাকাবাবুর রক্তকাশি। এতোই ঝ্যাকন জান, তাহলে তো তোমার ঘরের মানুষটিকে অনেক আগেই মাটি মাখানোর দরকার ছিল তাইনা!”
সামন্ত বাবু হুংকার দিয়ে উঠলেন, “এই নিমাই, বৌকে সামলা! ও কিন্তু রীতিমত বিদ্রোহ ঘোষণা করছে!”
বাহাদুর গিন্নি রণংদেহি মূর্তি ধারণ করলেন, “পুকুরের মাছগুলো কোথায় গেল বৌমা? রাত জেগে ইয়ং ছেদের সাথে এতো গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর কীসের শুনি? গাছে একটা ডাব থাকছে না। কাঁধি কাঁধি সুপুরি উধাও। কোই আগে তো এমন উৎপাত ছিল না!”
ডুরি জবাব দিতে পারেনা। ওর গলা শুকিয়ে আসে। ঘুম ভেঙে ধড়মড়িয়ে ঠেলে ওঠে। এতক্ষণ কীসব স্বপ্ন দেখছিল সে! কলসি থেকে একগ্লাস জল গড়িয়ে নিয়ে গলা ভেজায় আর মনেমনে সংকল্প করে, “কাল আসুক উঠোনে মদ্দানি মারতে!... এত বোঝা নিয়ে আর বাঁচা যায়না! ঝেঁটিয়ে দূর করে দেব একেকটাকে!”




সেদিন ঢেঁকিঘরে দাঁড়িয়ে তারিণীর বৌটা খুব কান্নাকাটি করছিল। মণিকান্ত চলে যাচ্ছে। বলছিল ভোরেই ট্রেন।
ঢেঁকিতে পাড় ওঠে ক্যাঁচ ক্যাঁচ। পাড় পড়ে দুমদুম! ডুরির ভাজা ধান খানিক খানিক থেঁতো হয়। খানিক খানিক ধুলো ধুলো হয়ে লাফিয়ে ওঠে। ধানের সাথে আজ নিজেকেও থেঁতো করে নিয়ে ঘরে ওঠে ডুরি। সন্ধ্যাবেলা হাঁসপাখি ওঠাতে গিয়েও আদ্দেক আদ্দেক ওঠায়, আদ্দেক আদ্দেক জলে খেদিয়ে দেয়। ডুরি বুঝতে পারে কী যেন এক অস্থিরতা গ্রাস করেছে ওকে। রাতে রান্না চাপিয়েও উনোনে জল ঢেলে দিতে ইচ্ছে হয় ডুরির। বার বার আগুন উসকে দেয়। ভাতের হাঁড়ির ফ্যান উপচে হুপহুপ করে উনুন নিভে যায়।
সারারাত দু চোখের পাতা এক করতে পারল না ডুরি।

ভোর। তখনও অনেকটাই অন্ধকার। ঢেঁকি ছাঁটা চিঁড়ের সাথে কয়েকটা তিলের নাড়ু বেঁধে নিয়ে জলের ধারে এসে দাঁড়াল ডুরি। মণিকান্ত এইপথ দিয়ে যাবে। ওর ব্যাগের মধ্যে গুঁজে দেবে সে।

হঠাৎ বমির শব্দ।
মনে মনে আঁতকে উঠল ডুরি, “কে রে বাপু!”
দেখল পশ্চিমপাড়ে একটা মেয়ে কচার ডাল ধরে খুব মোচড় পাড়ছে আর ককিয়ে ককিয়ে কাঁদছে। কৌতুহলি ডুরি পা টিপে এগিয়ে আসে। মেয়েটির চিবুক ধরে উঁচু করে,“ওমা! টুসকি তুই? এখানে? তাকা দেখি!... আরে! তুই এই নাকছাবিটা কোথায় পেলি?”
টুসকি জবাব দিল না বটে! কিন্তু তখনো ওর নাকের সাথে আটকানো ছোট্ট পাথর কুচিটা রহস্যময়ী তারার মতো মিটমিট করে হাসছিল! টুসকিকে ওই অবস্থায় দেখে ডুরির ঘেন্নায় অপমানে মরে যেতে ইচ্ছে হল। সে আঁচলের চিঁড়ে নাড়ু পুকুরের জলে ছুড়ে ফেলল। মণিকান্ত কখন ওর পাশ কাটিয়ে চলে গেল কিছুই জানেনা ডুরি! অকারণ আফসোসে ঝাপসা হয়ে আসে ডুরির চোখ। এক সীমাহীন জিজ্ঞাসা নিয়ে ডুরি চেয়ে থাকে জলের গভীরে। ওখান থেকে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে একটা লাল থালা। থালাটির চারপাশে ঝাঁকধরে এগিয়ে আসে রূপোলী আঁশের মাছ! ডুরি তার আঁচলে করে সেদিন যে মাছের পোনাগুলো ছেড়েছিল, আজ তারা অনেক মোটা হয়ে গেছে। ওর ঢেঁকিছাঁটা চিড়েগুলো সেইসব মাছেরা এখন খপখপ করে খাচ্ছে!



তথ্য ঋণস্বীকার-
বৃহত্তর দত্তপুকুরের সেকাল একাল (১ম খণ্ড)
- অরুণ কুমার ঘোষ



অলংকরণঃ কল্লোল রায়

ফেসবুক মন্তব্য