খাতার ভিতর অচিন পাখি

পীযূষকান্তি বিশ্বাস



কবিতা পড়ছি। ছবি দেখছি। আজ বহু বছর হলো। কোন টুউশনি নিইনি। আজও সেই সেলফ স্টাডি। একা, একাগ্রতায় পড়তে পড়তে এক এক দিক থেকে ঝুঁকে যাচ্ছি। কিছু দিক আলোকিত হচ্ছে, কিছুবা হচ্ছে না। কিছুটা অন্ধকার, কিছুটা লঘু আর কোন জায়গায় গুরুঘনত্ব। ভাষার কারুকাজ, ধ্বনির ব্যঞ্জনা, সমাজের আয়না, জীবন দর্শন, বিষয় বিবেচনা, স্বতঃস্ফূর্ত গতি, অলংকার, ছন্দ, প্রেম, প্রকৃতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সব যেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কোনো রেখা দিয়ে এটা ধরা যাচ্ছে না। কোন সমতল দিয়েও না। মনে হচ্ছে ঘরে একটা অদ্ভুত ক্যামেরা রয়েছে। ছায়ার অ্যাঙ্গেল মাপছি। ক্যামেরা জায়গা পাল্টাচ্ছে প্রতিনিয়ত। অ্যাঙ্গেলটা কখনো উপরে চলে যাচ্ছে বা নিচে নেমে। যে পিক্সেলে যতটা আলো পড়া দরকার ছিলো, তা পড়ছে না।

আলো আঁধারময় ছবিতে যেটুকু বুঝলাম, কবিতা পড়া এক নির্জন পদ্ধতি। যে কোন কলা একটু চেতনা নির্ভর ও মননশীল হয়। মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে। চট করে বোঝা যায় না বা বুঝতে বহুবছর লেগে যায়, কিংবা অনন্তকাল তার ব্যাখ্যা চলতে থাকে। আমার এরকম একটা বক্তব্য মাথায় চলে আসে বা ভাবায় যে রুচির তারতম্য থাকে। একটা ব্যাক্তিগত পক্ষপাতিত্ব থাকে, যে যে রুচিতে বিশ্বাস করে। রুচির শ্রেনিবিভাগ হয়ে যায়। বিশ্বাস আপনা আপনা। হিউম্যান টেন্ডেন্সি। একটা সামাজিক ফ্যাক্টর থাকে, নিজের বুদ্ধিমত্তা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থান থেকে সে শিল্পকর্মটিকে দেখে। কোনো শিল্প শিল্প হয়ে ওঠে, কোনটা ওঠেনা। যেকোন প্রতিষ্ঠানকে আক্রমন, নৈস্বর্গিক বর্ণনায় উৎফুল্ল মনের অবস্থা, নিপীড়িতের ব্যাখ্যান, রাস্ট্রনেতার গালমন্দ, প্রতিবাদীর স্লোগান, নগন্য কে নায়ক করে তোলা, প্রত্যাখ্যাত প্রেমের আবেগ, অত্যাচারীর সমর্থনে যে কেউ 'দুই কথা' যেই বলবেন তাই চটকরে কবিতা হয়ে যাবে। এইখানে যে বিষয় বিবেচনার একটা মুন্সিয়ানা থাকে না তা নয়, কিন্তু একই বিষয় নিয়ে অধিকবার চর্চা কবিতাকে ইলাস্টিক বানিয়ে ছাড়ে। শব্দের জীয়নকাঠি কবিতার শরীরে প্রাণপ্রবাহ সঞ্চার করে, পাঠক ও এই কবিতা পড়ে একটা ধারণা করে ফেলেন, তার নিজের মধ্যে এক বোধের জন্ম নেয় এবং তিনি মনের মধ্যে এরকম একটা শিল্পের ছবি দাঁড় করিয়ে নেন, হৃদয় থেকে এক আওয়জ আসে, মুখ থেকে নির্গত হয় এক ধ্বনি - "এই হলো কবিতা"।

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? এখন সমস্যাটা এই জায়গায় যে টেক্সট বেসড পাঠক কমে যাচ্ছে। কবিতাকে শিল্পের মাধ্যম হিসাবে এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। অডিও-ভিজুয়াল দখল করে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের প্রাইমটাইম। সময়ের সাথে পাল্লা দিতে দিতে, টেক্সট আজ কোন ঠাসা, সময় কাটানোর জন্য এখন অডিও-ভিজুয়াল কয়েক কদম এগিয়ে গেছে। প্রশ্ন আসতেই পারে, সে তো অনেক দিন আগের কথা, "A picture is worth a thousand words" কথাটা বোধহয় ১৯১১ সালে প্রথম বলা হয়। তখন তো ভিজুয়ালের রমরমা ছিলো না। কিন্তু পরিবর্ত সময় কাটানো, বা অবসরে শিল্পের স্বাদ নিতে হাতে বই তুলে নেওয়া হতো। আমি নিজে দেখেছি ছোটবেলায় আশির দশকে, বিয়ে অন্নপ্রাশনে বই উপহার দেওয়া হতো। টেক্সট বা বই ছিলো সোসাল ট্যাবু। আজ দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষ পাঠকে পরিবর্তিত না হয়ে, দর্শক হতে বেশি আগ্রহী। দৌড় বেশি, সময় কম। পাঠক আর কবিদের খুঁজছে না, কবিরাই পাঠক কে খুঁজছে। বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। বই নিজের পয়সায় ছেপে বিলি করছে। আর কাব্য গ্রন্থ বিক্রি? ব্রেক ইভেন করছে এমন কবি সিঙ্গল ডিজিটে। মানে আপনি একজন প্রিয় কবির নাম বলেন তো! তার বইয়ের বিক্রি কতো? ৩০০? ৫০০? বা হাজার?
একটা ছোট্ট হিসাব। খাতা তুলে দেখা যাক। বাঙ্গালীদের বাস শুধু পশ্চিমবঙ্গেই ৯কোটি। ধরে নিন, তাদের মধ্যে আট কোটি বাঙ্গালী ভাষাভাষী। সেখানে সরকারী খাতা অনুযায়ী যদি ধরা যায় ৭৭% লোক স্বাক্ষর। মানে ৬ কোটি ১৬ লক্ষ বাঙ্গালী বাংলা পড়তে পারে বা তারা বাংলা সাহিত্যের আমাদের পাঠক! অনুপাতটা একবার মেলাবেন? সেইখানে আপনি এক হাজার বই বিক্রি করে কতটা বুক ফোলাবেন?

"খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়
তারে ধরতে পারলে মন বেড়ি
দিতাম পাখির পায়ে।"

খাতার মধ্যে আটকে আছে আছে অনেক পাঠক।
পাঠকের রকমফের আছে।তাদের পড়াশোনা ও শিক্ষার রকমফের আছে। জীবনের প্রায়োরিটি আছে। শ্রেণী সংগ্রাম আছে। ভৌগলিক অবস্থান আছে। বাজার অর্থনীতি আছে, রাজনৈতিক টানাপোড়েন আছে। বাংলায় একটা কথা প্রচলিত আছে। "খালে বাড়লে বিলেও বাড়ে।" বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিন মাধ্যম জায়গা করে নিচ্ছে, ইন্টারনেটের ব্যাপ্তি বাড়ছে। নেটওয়ার্ক বাড়ছে। ইমেল, অরকুট, টুইটার, ইউটিউব, ফেসবুক। মানুষ আরো বেশি সোসাল বিস্তার বাড়িয়ে নিচ্ছে। তো সম্ভবনাময় পাঠক তো বাড়ছেই। ইন্টারনেট এরকম এক জামানায় এরকম পাঠকের সংখ্যা অনেকগুন বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের নিজস্ব পছন্দবোধ ও পোলারাইজড হচ্ছে। চট করে বোঝা যায় এমন ধারণা থেকে কবিতার পরিচিতি বাড়ছে কি না। বাঙ্গালি 'আম-জনতা'-র কবিতার প্রতি ঝোঁক প্রমানিত সত্য। সুতরাং যে কোন বাংলা পড়তে জানা বাঙ্গালি ইন্টারনেট বা বইয়ের দোকানে আসতেই পারেন। তাই কোনভাবেই উড়িয়ে দিতে পারছি না যে আমাদের টেক্সটের কোন পাঠক নেই। কিন্তু এই ধরনের পাঠকের কি অভিরুচি? কোন স্বাদের শিল্প এই নতুন শ্রেনীকে পরিবেশন করতে চায় আজকের কবিগণ?

এইবার আপনি বলবেন, টার্গেট অডিয়েন্স দেখে কবি কবিতা লেখেন না। কবির সুকল্পিত সুস্থ মানসিকতার মেধামিশ্রিত ছন্দময় পঙতি দ্বারা পরাবাস্তব কাহিনীর অবতারণা কি এই নতুন শ্রেনীর টেক্-সেভি বাঙ্গালিদের সুপ্ত পাঠকসত্বাকে জাগিয়ে তুলবে? সেই রকম লেখকও যে বাজারে নেই তা নয়। যেহেতু পাঠকের রকমফের রয়েছে তাই চট করে বোঝা যায় এমন কবিতার উপস্থিতি থাকবেই যা সহজেই এই শ্রেণির পাঠকের কাছে বোধ্য কবিতা নিয়ে আসবে এবং তা সংখ্যা আনুযায়ী অনেক বেশি হবে। যে কবিতা শিল্পবোধকে বন্ধক রেখে বুঝতে হয়, জাহির হে তাদের পাঠক সংখ্যা নিদারুন ভাবে কম হবে। যুক্তি অবশ্যই আসবে, যে কবিতা পড়তে মাথা খাটাতে হয় সে কবিতা কেন পড়ব?

"আট কুঠুরী নয় দরজা আটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা
তার উপরে সদর কোঠা
আয়না মহল তায়ে।"

তাই কবি বন্ধুরা বলেন কবিতা দুর্বোধ্য হয়ে যাচ্ছে। কবিতার কোন মানে খুঁজে পাচ্ছেন না। আয়নার মুখোমুখি হচ্ছি আমরা, নিজেকেই আমরা বুঝতে পারছি না। বড় কঠিন আর বন্ধুর এই ভূমি। বড় বঞ্জর এই ভূমি, কতবার ধর্ষিত ও লুন্ঠিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। প্রতিপদে পরীক্ষা দিয়ে বাছাই পর্বের আগে নিজেকে স্থাপন করতে হয়েছে। লড়াই করে নিজের জায়গা করে নিতে হয়েছে। এক পা পিছিয়ে পড়লে যার পাত্তা কেটে যায়। তাই খেলায় থাকতে হলে একটু মেধার দরকার পড়ে। চিন্তনের সাথে মেধার সমন্বিত এই ম্যাজিক দেখার আমাদের বহুদিনের ইচ্ছে, যে কোন উত্তম পুরুষকে আমাদের নায়ক হিসাবে দেখার ইচ্ছে।

কিছু এরকম পাঠকের সাথে আমি নিয়মিত কথা বলি, এবং বুঝতে পারি আমরা সবাই ভারতচন্দ্রের কবিতার ভাব সম্প্রসারণ মুখস্থ করে মাধ্যমিক পাশ করা দুধে ভাতে থাকা বঙ্গসন্তান, তাই তো মাইকেল মধুসুদনের কবিতাও কঠিন লাগে। কঠিন লাগাতে কবির সৃষ্টির প্রতি কি আমরা একটু অসম্মান করি না? আমাদের বিদ্যেবুদ্ধি এতটাই যে কোনরকমে দুলাইন যদি পড়ে ফেলি সেটাই কি অনেক কিছু নয়? বাংলা তৎসম ও তৎভব শব্দের পার্থক্যটুকু বুঝতে পারাই অনেক আমাদের কাছে। শিল্পকর্মের জন্য আরো কিছু এক্সট্রা মাইল যদিও আমাদের হাঁটার কথা, কিন্তু আমাদের পা এতটুকুই। রাস্তার কথা কেন বার বার বলি? যদি সমস্ত বাংলাকবিতাই বোধগম্য হবেন তবে কেনই বা ভাবসম্প্রসারণ? আর টীকা লিখিয়েরাই বা কোথায় যাবেন? আসলে দীর্ঘদিন পড়তে পড়তে কেউ কেউ এর রহস্য ভেদ করতে শিখে যান, অনেকে কখনোই শেখেন না। আমাদের কাছে তাই কবিতার অর্থ অধরা থেকে যায় এবং তার প্রভাব আমাদের মনে এমন ভাবে ছাপ ফেলে যায় যাতে আমরা নতুন কিছু সূত্র সেখান থেকে পেতে পারি আর এ রকম কিছু মার্গের সন্ধানেই বাকি জীবনটা আমরা উড়িয়ে দিই সাহিত্যের উন্মুক্ত আকাশে।

"কপালের ফ্যার নইলে কি আর
পাখিটির এমন ব্যবহার।
খাঁচা ভেঙ্গে পাখি আমার
কোন বনে পালায়"

সেই তার আর পর নেই, সেখান থেকে আমি কবিতাটা বোঝার চেষ্টা করি। আমার মত করে করি। আমার শিক্ষা, জীবন সংগ্রাম থেকে উঠে আসে ধারনা, উপমা, অনুপ্রাস, বিষয়, শব্দ, ধ্বনি, চিত্রকল্প আমার হয়ে ওঠে। আমার মনের অবস্থা, পরিবেশ, জীবিকা, পরিবার, থাকা ও খাওয়া, পছন্দ ও অপছন্দও তাই পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশের থেকে আলাদা হবে, আমার বিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ ভাবনা অন্যদের থেকে আলাদা হবে। আমার সময়, সামাজিক জাগরন, বিশ্ব-অর্থনীতি ও খোলা বাজারের ফলে দেশে আভ্যন্তরীন পরিবর্তন, মানুষের অভ্যাসের পরিবর্তন, পৃথিবীর দৌড়কে আলাদা নজরে দেখতে বাধ্য করে। যে জেনারেশন আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে তাদের আলোচনার বিষয়, তাদের বেড়ে ওঠার প্রাসঙ্গিক অনুসঙ্গ আমার কবিতার উপাদান। আজ যদি আমি লিখি "ভাটি বনে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে", আমাদের জেনারেশনের কাছে তা অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে। অর্থনৈতিক ভাবে সবল হয়ে ওঠা তরুণ বালকের কাছে জিজ্ঞাসা করুন তাদের জীবনে কী বেশি ভাবায়? তাদের কবিতার আবহ কী হবে? কী হবে তাদের বিষয়? নাকি আমরা এখনো সেই শুধু "খেটে খাওয়া" মানুষদের নিয়ে সুবোধ্য কবিতাই লিখে যাবো? "খেটে খাওয়া"তো অলরেডি বোধগম্য, এর মধ্যে কোন ফাইননেস বা কোন আর্ট দেখি না। বরং "খেটে খাওয়ার উপপাদ্য" আমার কাছে অনেক কবিতা মনে হয়। অনেক প্রতিবাদ ও মিছিল, নজরকে সংকীর্ণ করে এমন যে কোন পার্টিকে সমর্থন বা আক্রমন, কোন যুক্তি বা বুদ্ধি না খাটিয়ে আবেগী হয়ে পড়া আমার কাছে কোন কলা বলে মনে হয় না। তাই বিনির্মান থাকবে, থট-প্রসেস থাকবে, জিজ্ঞাসা থাকবে, তাকিয়ে থাকা থাকবে, ভাবতে থাকা থাকবে। নিজেকে প্রশ্ন করার অধিকার চাইছে আজকের জেনারেশন। তাদের কথা শুনুন, যারা আজকের ২০১৬ তে এই লেখাগুলো কে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করবেন, আমি চাই আজকের প্রস্তবনাগুলোও কেউ কেউ নিজের নিজের চেতনার রঙে রাঙাক। মানে স্পেসেলাইজেশন।

জেনেরালাইজেশন বনাম স্পেশালাইজেশন একটা পুরাতন বিতর্ক হলেও ধীরে ধীরে এর ভরবেগ স্পেশালাইজেশনের দিকেই ঝুঁকছে বলে আমার মনে হয়। এই মনে হওয়াটা হটাৎ নয়, একটা চিন্তা রয়েছে। আমার কিছু নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও ধারণা। প্রমান করার মত কিছু নেই বরং কিছু রেফারেন্স টানা যায় যা আমাকে এই কিছু পদ্ধতির দিকে ঠেলছে। যেমনঃ

১। মানুষের শিল্পবোধ জন্মায়। আর্ট সেন্স।
২। শিল্পে ভালো লাগা অবাক হওয়া থাকে। ওয়াও ফ্যাক্টর।
৩। মানুষের ভাললাগার রকমফের রয়েছে। স্পেসিফিক টপিক।
৪। শিল্পে বিভিন্ন রকম রস রয়েছে। ফ্লেভার।

এই বার দেখিঃ

১। একজন ভ্রমনবিলাসী পাহাড় যখন চড়েন তার কাছে চরমতম ভালো লাগা কী?
২। একজন উচ্চ-বেতনের পাইলট সপ্তাহে প্রতিদিন যখন বিমান চালান তার ভালো লাগা টা কী?
৩। একজন সফল আইনবাজ আডভোকেটের ভালো লাগাটা কী?
৪। একজন জনপ্রিয় বইমেলা আয়োজকের ভালো লাগাটা কী?
৫। একজন সর্বহারা মানুষের জনদরদী রাস্ট্রনেতার ভালো লাগার জায়গা কোনটা?

ভালো লাগাটা কি নিজস্ব নয়? আলাদা নয়? প্রতিবাদীর কাছে হরতাল যেমন হৃদয়ে ব্যঞ্জনার অনুভব আনে, তেমন কবির কাছে পাঠক, ক্ষুধার্তের কাছে ভাত, প্রেমিকের কাছে ভালোবাসা। চার্টটি ম্যাপ করলাম।




চিত্র-১

এখানে যদি একজন মানুষকে এক রৈখিক ভাবে বসানো যায় দেখা যাবে দুটো উপপাদ্যের জন্ম নিচ্ছে।
এক, 'ক্ষুধার্ত' মানুষের কাছে 'ভালোবাসা' বা 'পাঠক' একটি গৌণ বিষয়।
দুই, ক্ষুধার্ত যখন খাদ্যের অভাবকে অতিক্রম করে যাচ্ছে, তার প্রাথমিকতা পালটে যাচ্ছে।

উপপাদ্য ১: 'ক্ষুধার্ত' মানুষের কাছে 'ভালোবাসা' বা 'পাঠক' একটি গৌণ বিষয়।

পছন্দগুলো দুলাইন উপরনীচ করা যাক। দেখি একই মানুষের কি ডাইমেনশন ধরা পড়ে।




চিত্র-২

সুতরাং, খাদ্যে স্বনির্ভর ব্যক্তি কি বস্ত্রের সন্ধান করবে না? বা কোন উপযুক্ত বাসস্থানের খোঁজ করবে না? সেই মুহুর্তে তার ভালো লাগা কি একটা ঘর কিংবা একটা নারী নয়? ঘর পেলে শুতে চায়। শুতে পেলে তার মনে হয় একটা সঙ্গী হলে মন্দ হয় না। তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে?

উপপাদ্য-২: ক্ষুধার্ত যখন খাদ্যের অভাবকে অতিক্রম করে যাচ্ছে, তার প্রাথমিকতাও পালটে যাচ্ছে।

ব্যক্তি তার 'থাকা/খাওয়ার' অভাবকে অতিক্রম করে গেলে তার প্রেম মানবীয় প্রেমের দিকে ঝুঁকবে বা ঝুঁকতেই পারে। সেই ক্ষুধার্ত ব্যক্তি যার ভাত ছিলো ভালোলাগার প্রতীক, আর সেই লোকটি যে এখন প্রেমিক, এই দুজনকে এই রেখায় রাখা যাচ্ছে না। দুজন দুই মেরুর। পাহাড়ে চড়া ভ্রমন বিলাসী ব্যাক্তির ভালো লাগা হয়ে যায় এভারেস্ট ছোঁয়া, সামিটে পৌঁছে এক খানা পতাকা গেড়ে আসতে পারলে তার জীবন কুলু কুলু করে যমুনার মত বয়ে যায়। হুম!

উপরোক্ত গদ্যকে কবিতার কারণে সিম্পলিফাই করে লিখলে এই রকম কিছু লেখা যায়, এই ধরুন পাঠকদের রকমভেদে কবিতায় তারা কী খুঁজছেন?

১। মৃদু ব্যথার কাহিনী খুঁজছেন।
২। জীবন দর্শন খুঁজছেন।
৩। কেউ উদাসী হয়ে যেতে চাইছেন।
৪। সত্যের উদ্ঘাটনে আনন্দ পান।
৫। কেউ কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চাইছেন।
৬। কেউ প্রতিষ্ঠানকে আক্রমন করে আনন্দ পাচ্ছেন।
৭। রাষ্ট্র সরকারের তুলোধোনা (গালি বলতে পারেন) করতে ভালো লাগছে কারো।
৭। সর্বহারার বিজয়গাঁথা খুঁজছেন।
৮। বঞ্চনার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা নারীবাদী ভাষায় কথা বলছেন।
৯। না পাওয়া প্রেমের আকুতি খোঁজেন।
আরো আছে, লিস্টটা এখানেই শেষ করছি...


এই নিয়ে যে কোন শব্দসজ্জা ও বাক্যবন্ধ কি কবিতা নয়? খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার এ সব নিশ্চয়ই কবিতা। বোধ্য কবিতা। এরও প্রয়োজন আছে। এও চমৎকার কবিতা। যা কিছু নবরসের অন্তর্গত তাহা শিল্প। যাহা কিছু অষ্টম সুরে বাঁধা তাহাই রাগ।

"আপনার রাগ হচ্ছে।
আপনার রাগের কারন আছে।
আপনি রাগের কারন সম্পর্কে জুতসই যুক্তি পাচ্ছেন।
আপনি কিছু করতে পারছেন না, কিন্তু প্রচন্ড রাগ হয়ে যাচ্ছে।
রাগে আপনার রাগ আরো কয়েকগুন বেড়ে যাচ্ছে।
ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে রাগ।

আপনি লিখে ফেলছেন
কবিতা হয়ে যাচ্ছে।"

কিন্তু এর বাইরেও জগৎ আছে। এর বাইরেও জেগে থাকে কোন সৃষ্টির বীজ, তারা খোঁজ করে চলে কোন পাঠকের আর্দ্র হৃদয়, যেখানে হাওয়ারা খেলছে রৌদ্র ছায়ায়। আর সেই তো হলো অংকুরোদ্গোমের আসল সময়, পাতা মেলে দেওয়ার বিলক্ষণ অভিক্ষণ, উল্লাসে ফেটে পড়ার উৎফুল্লময় দিন। প্রস্ফুট পল্লবে প্রত্যেকটা জন্ম যেন নতুন রূপে দেখা দেয়। যার কথা আমি কদাচিৎই ভাবি। মানে ভাবনায় এক সীমাবদ্ধতা টের পাই। একটা বৃত্ত যেন আটকে ধরে, পরিধির ভিতর ভিতর হাতড়ে বেড়াই আর বারবার বুঝতে পারি ভিতরের খাঁচাটার স্পর্শ। তাকে ধরাছোঁয়ার বাইরেই অনুভব করি। এমন একটা মনের কাছে, আমি শিল্পের প্রয়োজনেই আসি।

মেধার কথা ভার্সের মনের কথা। এখানে মনের কাছে মেধার আত্মসমর্পন হবে। প্যাশন। প্রশ্নটা রাখছি এইভাবে কবি কি পাঠকের মনের কথা ভেবে লিখবেন? নাকি পাঠক রিজেক্ট করে দেবেন বলে তাকে (ঘুষ দিয়ে) খুশি করে চলবেন। কেবলই মনে হয় তাহলে তো নিজের মেধার প্রতি অবিচার করা হয়। আমাদের দেশে বার বার বিখ্যাত বাংলা কবি জন্মেছেন, কিন্তু এই ভাবে তারা আজকের মত ইন্টারনেট বেসড পাঠক বিস্ফোরণের সম্মুখীন হননি। আজ ইন্টারনেটের প্রসার ও সোসাল মিডিয়ার সম্প্রসারণে 'ল্যাগ টাইম' কমে প্রায় জিরো আর প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় হিরো হয়ে যাবার হাতছানি। এখানে কবি পাঠকদের সাথে কানেক্ট করছেন। বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। নিজের পছন্দের পাঠক খুঁজে আনছেন। এখানে পাঠকদের ইনস্ট্যান্ট 'এক্সেপটেড' কবি সেলেব্রিটি হয়ে যাচ্ছেন। আর রিজেক্টেড কবিদের কাছে প্রশ্ন নিয়ে আসছে তাদের কি আদৌ কেউ পাঠক আছেন?

প্রশ্ন-১ পাঠক কারা?
উত্তরঃ পাঠক বল্লেই তর্ক চলে আসে, সবাই তর্কের খাতিরে 'আইডিয়াল' পাঠকের কথাই বলেন। মানে যারা সাহিত্য বা কলার উতকর্ষতার কথা বোঝেন।

প্রশ্ন-২ কবি কারা?
উত্তরঃ কবি বলতেই যারা পত্রিকায় কবিতা লিখছেন বা কাব্যগ্রন্থ বের করেছেন।

এখন একটা সমীক্ষা করলে আমি একশত ভাগ নিশ্চিত যে প্রত্যেক 'সিরিয়াস' বা 'আইডিয়াল' কবিতা পাঠক আজ কবিতে পরিণত হয়েছে। তাদের আর পত্রিকায় কবিতা ছাপানোর দরকারও নেই। কিংবা কাব্যগ্রন্থেরও আবশ্যকতা নেই। দিব্যি ব্লগ বা ফেসবুকে কবিতা লিখে ফাটিয়ে দেওয়া যাচ্ছে। তার মানে এখন যা দাঁড়াচ্ছে প্রশ্ন ২ এর উত্তর সংশোধন করে নিতে হবে। যে কেউ কবিতার আকারে লিপিবদ্ধ অন্ত্যমিলে বা গদ্যে প্রকাশিত টেক্সট প্রকাশ করলে তাকে কবি বলা যাবে। বাংলা বাজারে নিঃসন্দেহে এটি একটি সাড়া জাগানো দৃশ্য।

"দৃশ্যটি ভালো লাগছে।
আপনার প্রানে ফল্গুধারা বয়ে যাচ্ছে।
খুশির বন্যায় আপনি আপ্লুত হয়ে যাচ্ছেন
আপনি পাঁচ জনকে বলছেন, তারিফের তুফান উঠছে
সৌন্দর্যে ফেটে পড়ছে সমস্ত জাহান,
আপনি শান্ত ও নির্বিকার
প্রাণে শীতল প্রশান্তি

আপনি লিখে ফেলছেন
কবিতা হয়ে যাচ্ছে।"

কবি হতে গেলে এই সবগুন থাকলেই কবি হওয়া যাচ্ছে, এবং তাতে মনের কথাগুলোও বলা যাচ্ছে। এখানে কোন বিরোধ নেই, কিন্তু এর মধ্যে ঘটে যাচ্ছে আরো একটা অ্যান্টি-ঘটনা, যারা একটু হাটকে, মানে জারা দাবকে বা ডুবকে লিখছেন, যেমন

১। লুকিয়ে থাকা ছন্দ-ধ্বনি আবিষ্কার যোগ্য 'উইটি' কবিতা লিখছেন।
২। অপ্রচলিত বস্তু বা আবস্ট্রাক্ট বিষয়কে বাস্তবের পরিস্থিতিতে ফেলে মননশীল উপস্থাপন করছেন।
৩। অনেকগুলো বিষয় নিয়ে বিক্ষিপ্ত ভাবে রেখে ডিসটর্টেড আবহ তৈরী করছেন।
৪। আধুনিক কবিতাকে রিডিফাইন করে অন্য লেভেল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
৫। সীমিত শব্দ ও বিষয় নিয়ে অল্প পরিসরে কবিতার পরীক্ষা বা নিরীক্ষা করছেন।
৬। অপ্রচলিত রূপক বা রূপকালংকার নিয়ে এসে প্রাকৃতিক দ্যোতনাকে উপলব্ধি করাচ্ছেন।
এই লিস্টটাও আরো লম্বা করা যায় তবে আপাতত করছি না।

এখানে যদি ঐ সোসাল মিডিয়া ফ্যাক্টরটা নিয়ে আসা হয়, দেখা যাবে হিরো না হতে পারার কারণে অনেক মেধাবী কবি কেরাণী হতে চাইছেন কারণ বাজারে হৃদপিন্ডের দাম সস্তা আর মাথার দাম অনেক। আল্টিমেটলি, বাংলা কবিতার পরিমান হয়ত বৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু মান নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিতর্কের হাজার হাজার বীজ অংকুরোদ্গোম করছে।

"মন তুই রইলি খাঁচার আশে
খাঁচা যে তোর কাঁচা বাঁশে।
কোন দিন খাঁচা পড়বে খসে
ফকির লালন কেঁদে কয়।"

কবিতা আমার মনে হয় কোনদিনই আম জনতার শিল্প ছিলো না। যে কোনো শিল্প মাধ্যম কিছুটা মননশীল ও রুচিশীল লোকের পৃষ্টপোষকতায় বেড়ে ওঠে। আলাদা ভৌগলিক উপস্থিতি, বিক্ষিপ্ত ভাষা, ঐতিহাসিক অবস্থান, বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ, জাতি সংগ্রামের অন্তস্থল, টিকে থাকার লড়াই এই সমস্ত লেখালেখি কে প্রভাবিত করে। আমাদের লেখালেখির তেমন কোন টারগেট অডিয়েন্স নেই। রোজগারের প্রশ্ন, ইঁদুর দৌড়ের রাজনীতি, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি মানুষের জীবনে এক রকম নতুন ব্যস্ততা এনেছে। এই খানে বসে আছে আজ পোস্ট মডার্ন সাহিত্য । উত্তর আধুনিকতা আজ মৃত। আধুনিক কথাটা আর অচল মনে হয়। উত্তরআধুনিক কবিতা বা পুনরাধুনিক কবিতার সীমাবদ্ধতা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। দ্রুত পাল্টাচ্ছে চিত্র। ক্রমশ বদলে যাওয়া সমাজ ব্যবস্থায় কোন এক স্ট্যান্স নেওয়া সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ। আমাদের ভাববার অবকাশ রয়েছে, আমরা কি এর চেতনা নতুন রঙে রাঙাবো না?

কোই বাত নেহি, কোন রং না হলো, মধুর মিস্টতাই আসল। কোন চেহারা না হলো, একটা আকার তো হলো। অনুপস্থিতির থেকে ত্রিমাত্রিক অবস্থান অনেক আশাজনক। ভেঙেচুরে কবিতা, না হয় কবিতা না হলো কিন্তু একটা সিমেট্রি তো হলো। যে শেপটা নিলো সেটা না হয় কোন ত্রিকোনমিতি বা জ্যামিতি দিয়ে নাম দেওয়া গেলো না, কিন্তু ডেস্কটপে দেখো - পিক্সেলগুলো কত খুশি। একটা ছবি ওয়াল পেপারে ভেসে আসছে। একটা প্যাটার্ণ। আমার চেনা জানা গ্রাফদের মধ্যে পাইচার্ট টা খুব ভালো লাগে যা আমার একটা সীমাবদ্ধ ধারণা দিয়ে তৈরী। কিন্তু এই ছবিটা অনেকটা অন্যরকম, কিন্তু কোন লিজেন্ড নেই। ছবিটা ওই এক্স নাম্বার অ্যাংগল থেকে তোলা ক্যামেরার ছবি, ওয়াই অ্যাংগল থেকে ছায়া গ্রাস করে নিচ্ছে। সেটা কোন ছবি না হয়েও একটা মুহূর্তের এক অবস্থানের প্রতীক হয়ে রইলো। ওই একটা সময়, একটা স্নাপশট। এরপর দৃশ্য পালটে যায়, সেই ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল আমার আর মনে পড়ে না। ছবিটা দৃশ্য হয়, কিন্তু ছবি হয় না। মিথ্যা হয়ে যায়। ঐ যে দূরের নক্ষত্র, ওরাও যেমন চলমান, সময়ের যাত্রায় ওরাও তো ঝরে পড়ে কোন দিন, কোন বার ঝরে পড়ে ওদের সাথে ঘোরা সেই ক্যামেরাও, সেই অ্যাংগলও, সেই ছায়ায় মিলিয়ে যায় সেই সব ছবি। ব্যাস।

"তুমি কি কেবলই ছবি- শুধু পটে লিখা!
ওই-যে সুদূর নীহারিকা
যারা করে আছে ভিড় আকাশের নীড়,
ওই যারা দিনরাত্রি
আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী গ্রহ তারা রবি,
তুমি কি তাদের মতো সত্য নও।
হায় ছবি, তুমি শুধু ছবি।"



এ-ধার স্বীকারঃ কবি নিজে। উ-ধার স্বীকারঃ লালনফকির, রবি ঠাকুর।

অলংকরণঃ অর্ঘ্য দত্ত

ফেসবুক মন্তব্য