কবিতার পাঠ প্রক্রিয়া

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়



দৈনন্দিন আলাপচারিতায় প্রায়ই শুনতে হয় আধুনিক কবিতা বোঝা দায়। সাধারণ পাঠক আধুনিক কবিতা বলতে সম্ভবত রবীন্দ্রোত্তর যুগের কবিতার কথাই বলেন কারণ অনেকের মুখেই শুনেছি রবীন্দ্রনাথ তো বেশ বুঝতে পারি, অথচ... । তথাকথিত আধুনিক কবিতা আপাতদৃষ্টিতে কেন দুর্বোধ্য লাগে সেই বিষয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম পরবাস ওয়েব পত্রিকায়। উৎসাহী পাঠক পরবাসের আর্কাইভে খুঁজে দেখতে পারেন। কথাটা হল, রবীন্দ্রনাথকেও আমরা বোধহয় সঠিক বুঝি না। তবে ছোটোবেলা থেকে 'ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোট সে তরী...' আবৃত্তি করে আর আকাশবাণী ক'য়ে রবীন্দ্র সংগীত শুনে মনে হয় বুঝি। সেই অভ্যস্ত বোঝা আদতে বাঙালি ঘাড় থেকে নামাতে হিমশিম খাচ্ছে দীর্ঘদিন। সমস্যা হল অধিকাংশ বাঙালি কবিতা পড়ে না, শোনে। যখন সেই কবিতা আবৃত্তি করে বা গেয়ে শোনানো হয়। একটি কবিতাকে স্পর্শ করতে হলে, তার গহনে ডুব দিতে হলে, তার দহনে পুড়ে যেতে হলে তাকে নিভৃতে পাঠ করা জরুরি। অন্তত আমার তাই মনে হয়।

বিষয় হল একটা কবিতা কীভাবে পড়া উচিত? অধিকাংশ পাঠকই বলবেন, এটা একটা কথা হল? কে না জানে কবিতা অনুভবের বস্তু। সেখানে শব্দের থেকে শব্দের ব্যঞ্জনাকে, কবিতার অন্তর্লীন শব্দাতীত আত্মাকে স্পর্শ করা বেশি জরুরি। অবশ্য সে আর এমন কী হাতি ঘোড়া ব্যাপার? একটু মন দিয়ে পড়লেই... এখন কথা হল কোনো কিছু অনুভব করতে গেলেও প্রথমে তাকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হতে হয়। পাঁচটি সেন্সরি অরগ্যান ছাড়া ব্রেনে সিগনাল পাঠানোর অন্য কোনো উপায় তো ঈশ্বর রাখেননি। তার মানে কবিতার শারীরিক সৌকর্য তার আত্মার শুচিতার মতোই আবশ্যিক সামগ্রী। যে কবিতাটি পড়ছি তার সঙ্গে একাত্ম হতে হলে অক্ষরের সিঁড়ি ডিঙিয়েই গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। না হলে ছাপার অক্ষরগুলি কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং হয়েই থেকে যাবে। রবীন্দ্র পরবর্তী কবিরা সজ্ঞানে কবিতার শারীরিক গঠন নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। কখনও রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করার জন্য কখনো বা সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে। সেটুকু বুঝে নিলে আর অসুবিধে থাকে না।

আর একটা সম্পর্কিত প্রশ্ন মনে আসে, কবিতা বুঝতে গেলে কি কবির জুতোয় পা গলানো (পড়ুন কবির ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি দেওয়া) নিতান্ত জরুরি? কবির চোখ দিয়ে না দেখলে কি একটা কবিতা নিজেকে সম্পূর্ণ উন্মোচিত করে না? নাকি নিজস্ব মেধা ও হৃদয়াবেগের সদ্ব্যবহার করেই একটা কবিতাকে সম্যক উপলব্ধি করা যায়? সব কবিতাই যে আদতে ব্যক্তিগত সে বিষয়ে দ্বিমত নেই। প্রতিটি সার্থক কবিতাই কবির আঙুলের ডগা থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্তপাত। কবির একান্ত নিজস্ব সুখ-দুঃখ, দ্বিধা-দ্বন্দ্বর অনুলিখন। পাঠক যখন সেই কবিতার সঙ্গে একাত্ম হন, তখন সেই কবিতা পাঠকের হয়ে ওঠে, সর্বজনীন হয়ে ওঠে।

আমার মনে হয় তার জন্য কবির জীবনের কেচ্ছা না জানলেও চলে। একজন কবিকে তার কবিতার প্রেক্ষিতেই বিচার করা উচিত। মনে রাখা দরকার কবিও একজন সাধারণ মানুষ। শুধু যখন তিনি কবিতা লিখতে বসেন তখন তাঁর আঙুলে দেবতা বা অপদেবতার ভর হয়। সেসব অলৌকিক ঝঞ্ঝাট নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে, পাঠক যদি নিজের বোধবুদ্ধির ওপর ভরসা রাখেন, তাহলে যে কোনও কবিতাই বোঝা সহজ হয়ে ওঠে।

এই আলোচনায় আমি রবীন্দ্রোত্তর যুগের অন্যতম 'দুর্বোধ্য' কবি বিনয় মজুমদারের দু'-একটি কবিতা পড়ার প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলব। এইখানে একটা বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ দিয়ে রাখা ভালো। আমি মূর্খ নই, বিনয়ের কবিতার 'মানেবই' লেখার সদিচ্ছা আমার নেই। সে জন্য কোনো মায়া প্রকাশনী আমার সঙ্গে এ তাবৎ যোগাযোগ করেনি। বিনয়ের কবিতাকে গিলে ফেলেছি এমন দাবী করার ধৃষ্টতাও যেন আমার কোনোদিন না হয়। এমনকি এই আলোচনায় আমি তাঁর কবিতা নিয়ে কোনো বিদগ্ধ মতামতের উল্লেখ করব না, যদিও সে সব দুর্লভ নয়। শুধু বিনয়ের কবিতার সাধারণ পাঠে যতটুকু বোধগম্য হয় বা হওয়া উচিত সেটুকুই দেখার চেষ্টা করব।

যখনই পড়ি, বিনয় মজুমদারের কবিতার আপাত অসংলগ্নতার মধ্যেও আমি একটি যৌক্তিক বিন্যাস খুঁজে পাই। নিঃসন্দেহে অসংলগ্নতা কবির টালমাটাল অস্তিত্ব ও চেতনার আক্ষরিক প্রতিফলন। ব্যবহারিক পৃথিবী ও অন্তর্জগতের টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত স্বত্বার অস্থির-লিপি। তবু পাঠক জানেন, তার নিবিড় পাঠ এক অসামান্য প্রতিভার ইঙ্গিত দেয়। বিনয় মজুমদারের 'ফিরে এসো চাকা', যাকে বাংলা কবিতার যুগ বদলের দলিল মনে করা হয়, সেই কাব্যগ্রন্থের ১৪ই অক্টোবর লেখা কবিতাটি একবার দেখি। পাঠকের সুবিধার্থে পুরো কবিতাটাই এখানে উদ্ধৃত করলাম।

"কাগজকলম নিয়ে চুপচাপ ব'সে থাকা প্রয়োজন আজ;
প্রতিটি ব্যর্থতা, ক্লান্তি কী অস্পষ্ট আত্মচিন্তা সঙ্গে নিয়ে আসে।
সতত বিশ্বাস হয়, প্রায় সব আয়োজনই হয়ে গেছে, তবু
কেবল নির্ভুলভাবে সম্পর্কস্থাপন করা যায় না এখনো।
সকল ফুলের কাছে মোহময় মনে যাবার পরেও
মানুষেরা কিন্তু মাংসরন্ধনকালীন ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।
বর্ণাবলেপনগুলি কাছে গেলে অর্থহীন, অতি স্থূল ব'লে মনে হয়।
অথচ আলেখ্যশ্রেণী কিছুটা দূরত্ব হেতু মনোলোভা হয়ে ফুটে ওঠে।
হে আলেখ্য, অপচয় চিরকাল পৃথিবীতে আছে;
এই যে অমেয় জল- মেঘে মেঘে তনুভূত জল-
এর কতটুকু আর ফসলের দেহে আসে বলো?
ফসলের ঋতুতেও অধিকাংশ শুষে নেয় মাটি।
তবু কী আশ্চর্য, দেখো, উপবিষ্ট মশা উড়ে গেলে
তার এই উড়ে যাওয়া ঈষৎ সংগীতময় হয়।"

উপরের কবিতাটির প্রথম দুলাইন পড়ে মনে হয় কবি আজকাল লিখতে-টিখতে পারছেন না, রাইটার্স ব্লকে ভুগছেন। সব লেখক কবির জীবনেই একটা সময় আসে যখন তাঁরা কাগজে কলম ছোঁয়াতে পারেন না। কোরা কাগজ কোরাই থেকে যায়। তার পরের দু'-লাইন কি অক্ষরের সঙ্গে কবি নিজের সম্পর্কের কথা বলছেন? কবি অক্ষরের মধ্যে প্রাণসঞ্চার করতে পারছেন না। কষ্ট পাচ্ছেন। আত্মচিন্তা শব্দটি তারই ইঙ্গিত দেয়। তার পরেই আসছে দুটি দৈব প্রেরিত সাংঘাতিক লাইন। আহা কী শব্দচয়ন। এই রকম দুটি লাইন লেখার পর যথার্থই মরে যেতে সাধ হয়। শুধু কবিতার জন্য অমরত্ব তাচ্ছিল্য করা যায়।

"সকল ফুলের কাছে মোহময় মনে যাবার পরেও
মানুষেরা কিন্তু মাংসরন্ধনকালীন ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।"

কী অসাধারণ সাধারণীকরণ! আমরা বুঝতে পারি কবি আসলে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের কথা বলছেন। মানুষ ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় কিন্তু মাংস রান্নার গন্ধের অমোঘ আকর্ষণ এড়াতে পারে না। সেই টান খিদের মতো, যৌনতার মতো প্রবৃত্তিগত, ইনস্টিঙ্কটিভ। এই দুই লাইন পড়ে আবার দ্বিতীয় লাইনে ফিরে যাই।

"প্রতিটি ব্যর্থতা, ক্লান্তি কী অস্পষ্ট আত্মচিন্তা সঙ্গে নিয়ে আসে।"

এই লাইনটির এখন অন্য অর্থ করতে ইচ্ছা হয়। মনে হয় কবি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতার কথা বলছেন। প্রেমে ব্যর্থতা, ব্যবহারিক জীবনে ব্যর্থতা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা... অনেক লেখালেখি হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই, সে সব নিয়ে। অধিক না বললেও চলে।

সপ্তম এবং অষ্টম লাইনে কবি আবার বর্ণ ও আলেখ্যর কাছে ফিরে গেলেন। বললেন, তারা কাছ থেকে দেখলে স্থূল, কিন্তু দূর থেকে মনোলোভা। সন্দেহ দৃঢ় হয় কবি আভাসে ইঙ্গিতে নারী ও পুরুষের সম্পর্কের কথাই বলছেন। বর্ণ ও আলেখ্য উপমা মাত্র। বাকি লাইনগুলিতে কবি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের সম্পর্কের আলো আঁধারির বর্ণনা করছেন। প্রকৃতির মধ্যে তার প্রতিফলন দেখছেন। শেষ লাইনটা তাৎপর্যপূর্ণ, কিছুটা সিনিক্যাল - কাছাকাছি থাকা যেন হাতের ওপর বসে থাকা মশার মতো বিরক্তিকর, উড়ে যাওয়া ঈষৎ সংগীত।

আমি শুধু বললাম, কীভাবে আমি বিনয় মজুমদারের কবিতা পড়ি। একটা কবিতা এক এক জন পাঠকের কাছে এক এক রকম অর্থ নিয়ে আসে। পাঠক যে অর্থটি করলেন সেটিই তাঁর কাছে ঠিক। কবি কী ভেবে লিখেছেন সেটা জানা তেমন জরুরি নয়। তিনি কী মানসিক অবস্থান থেকে কবিতাটি পাতার ওপর খোদাই করেছেন সে অনুষঙ্গ গৌণ। কবিতাটি আমার কাছে শুশ্রূষা হয়ে এল কিনা সেটাই বিবেচ্য। আমি একটা কবিতা বার বার পড়ি, নিভৃতে। দু চার লাইন পড়ে ফিরে যাই প্রথমে। মাঝখান থেকে পড়তে শুরু করি কখনো। প্রত্যেকটি কবিতা নিজের মতো করে আবিষ্কার করি। এই খনন যে কী দারুণ রোমাঞ্চকর!

বিনয়ের অন্য আর একটি কবিতা ছুঁয়ে এই লেখা শেষ করব। একটু আগেই যা বলছিলাম, তাঁর লেখা পড়তে পড়তে সন্দেহ জাগে, আপাত প্রলাপের মধ্যে তিনি একটা তির্যক যৌক্তিকতার সন্ধান করেন। বা বলা যায় তাঁর অধিকাংশ কবিতায় একটা অচেনা পথনির্দেশিকা থাকে। যেন আপনি গন্তব্য না জেনেই একটা ট্রেনে চেপে বসেছেন, জানেন না কোথায় যাচ্ছেন, তবে এটুকু নিশ্চিত জানেন যে ট্রেন লাইন ছেড়ে ধানখেতে নেমে পড়বে না। তাঁর কবিতায় বিশৃঙ্খল শব্দাবলীর মধ্যেও একটা অন্তর্লীন সুবন্দোবস্ত থাকে। গাণিতিক নিয়মের প্রতি গোপন সমর্থন অথচ পরিশীলিত অশ্রদ্ধাই তাঁর কবিতাকে অনন্য করেছে।

“...পতনের দৃশ্যের বদলে/ মৃত্তিকার থেকে উঠে ওই ফুল বৃন্তে লেগে গেলো -/ এই দৃশ্য হলে বড়ো ভালো হতো, বড় ভালো হতো!” (একটি ফুলের বিষয়ে, বিনয় মজুমদার, ঈশ্বরীর) পড়ে মনে হয়, স্মৃতি যখন তীব্র বেদনাদায়ক হয় তখন কবি নিষ্কৃতি চান – “কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?” তাই হয়তো কবি চাইছেন সময় ভাঁজ হয়ে পিছু হাঁটুক। কিন্তু যৌক্তিকতা তাঁকে রূঢ় বাস্তবে ফিরিয়ে আনে, “বারম্বার ভেবে ভেবে কেবলি বিফল হতে থাকি।/ যন্ত্রণাদায়কভাবে কেবলি বিভ্রম হতে থাকে।” দ্রব মন আর শাণিত মননের এই টানাপোড়েন কবির বিজ্ঞান ও কারিগরী শিক্ষালব্ধ চেতনার ফসল। বিনয়ের কবিতায় বৈজ্ঞানিক সত্য কবিতার সত্য হয়ে দেখা দেয়, যেমন জল "আপাতদৃষ্টিতে নীল, প্রকৃতপ্রস্তাবে স্বচ্ছ", কিংবা "ফুল বৃন্তে লেগে গেল"তে স্পেস এর মত টাইমেরও আগে পিছনে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা মনে হয়। এ'সব বিনয়ের বিজ্ঞান পারংগম মনের কবিতায় প্রক্ষেপ। শেষে অবশ্য হাল ছেড়ে অসহায় কবি অলৌকিকের যাচঞা করছেন, “স্মৃতি পরিবর্তনের মতো প্রিয়তর কীর্তি করায় সক্ষম কোন পাখি?”

বিনয় মজুমদারের যে কবিতা দুটির কথা বললাম সে দুটিই কবির নিতান্ত আত্মগত চিন্তার ফসল বলে মনে হয়। সর্বজনীনতা নিতান্তই ফলশ্রুতি। অবশ্য একটা সার্থক কবিতা ভূতাত্ত্বিক খননের মতো। প্রতি স্তরে যুগান্তরের প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন খুঁজে পাবার সম্ভাবনাময়। আমি উপরের স্তরের মৃত্তিকা সরিয়েছি মাত্র। উৎসাহী পাঠক আরো গভীরে যেতে উদ্যোগী হবেন, আমি নিশ্চিত। এই নাতিদীর্ঘ আলোচনায় আমি প্রমান করতে চেয়েছি যে কবিতা বুঝতে হলে কবির জীবন সম্বন্ধে জানার থেকে বেশি জরুরি পাঠক কবিতার সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতে পারলেন কিনা, সেই সুসংবাদ। না পারলে তিনি সেই দায় থেকে রেহাই পেলেন। কবিতার বিষয় ও গঠনপ্রণালীতে কবির জীবনযাপনের প্রভাব বা বৃহত্তর সাহিত্য আন্দোলনের নিরিখে কবির অবদান ইত্যাদি গুরুগম্ভীর বিষয় অনুসন্ধান করার দায়িত্ব সাহিত্যর নিবিষ্ট গবেষকের জন্যই তোলা থাক। সাধারণ পাঠক কবিতাকে নিজের বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার চশমা লাগিয়ে কবিতা পড়বেন। এবং তার রসাস্বাদন করবেন, সেটাই যথেষ্ট। এই আমার মত।

অলংকরণঃ অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়

ফেসবুক মন্তব্য