আগমনী

অতনু দত্ত



রাতে ভাল ঘুম না হওয়ায় অনেক বেলায় ওঠে হরেন আজ। ছেঁড়া প্লাস্টিকের চাটাইটা গুটিয়ে রেখে চোখে মুখে জলের ঝাপ্টা দিয়ে মুড়ির কৌটোটা খুলে দেখে একবার। জানে একমুঠোর বেশি মুড়ি নেই, তবুও মনে আশা, কোন মন্ত্রবলে খুলে এক কৌটো মুড়ি দেখবে। একটা পলিথিনের ব্যাগে মুড়িটা ঢেলে নিয়ে, সাথে খ্যাপলা জাল আর খলুই নিয়ে বেরিয়ে পরে হরেন। মুড়িটা খাবে যখন খিদে একেবারে অসহ্য হয়ে যাবে। যত দেরী করে খাওয়া যায় তত পরে আবার খিদে পাবে।
হরেন এগোয় নদীর দিকে। করলা নদীর। তার ওই ভাঙ্গাচোরা বাড়িটার থেকে খানিকটা দূরেই নদী। কিছুটা হেঁটে নিজেকে খুব দুর্বল মনে হয়। মাথাটা যেন পাক দিয়ে ওঠে। একবার ভাবে মুড়িটা খেলে বোধহয় একটু ভাল লাগবে। কিন্তু খাওয়ার কথা ভাবতেই কেমন গাটা গুলিয়ে ওঠে। বোঝে খেলে বমি হয়ে যাবে। কাল সারা রাত কাশি হয়েছে। ভোর রাতের দিকে একবার রক্তও বেরিয়েছে। সেজন্যই ঘুমোতে পারেনি একদম।
হরেনের টিবি আছে। অনেক দিনের রোগ। আসলে এতদিন বাঁচারই কথা নয় হরেনের। কিন্তু ওই গেলবার খুব বাড়াবাড়ির সময় গিয়ে সরকারি টিবি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। এক খুব ভাল ছোকরা ডাক্তারের চিকিৎসায় সেরে উঠেছিল সেবার। কিন্তু গরীবের রাজ রোগ। পথ্য করতে হবে। পয়সা কই। আবার ফিরে এসেছে ওই রোগ। গতবারই যদি ভাল করে চিকিৎসাটা পুরো করত… আসলে অধৈর্য হয়ে পড়েছিল। কত দিন আর পড়ে থাকা যায়? জবরদস্তি পালিয়ে এসেছিল হাসপাতাল থেকে। এখন বুঝছে কি ভুল করেছে।
যদিও ও নিয়ে বেশি ভাবে না হরেন। কপালে যা আছে তা কে খন্ডাবে। আর বেঁচে করবেই বা কি সে। তিনকূলে তো কেউ নেই… কেউ শব্দটা মনে আসতেই পারুলের কথা মনে পড়ে যায়। ওর বৌ। মারা গেছে প্রায় বছর সাতেক হয়ে গেল। মনটা হঠাৎ করেই একদম খারাপ হয়ে যায়।
ইতিমধ্যে হরেন পৌছয় করলা নদীর ধারে। নদীর পাড় দিয়ে যাওয়া রাস্তায় হেঁটে, ধীরে ধীরে নদীর বাঁকটার দিকে এগোয়। বাঁকে পৌছনর একটু আগেই যে বড় নিমগাছটা রয়েছে তার তলায় বসে পড়ে একটু জিরোবার জন্য। একটা ঠান্ডা হালকা হাওয়ায় আস্তে আস্তে শরীরটা অনেক ভালো মনে হয়। সামনের শীর্ণকায়া নদীর দিকে তাকিয়ে আবার মন খারাপ হয় হরেনের। এই করলাও শুকিয়ে যাচ্ছে দিন কে দিন। ঠিক পারুলের মতই।
আগে যখন শরীরে বল ছিল, তখন দিনে রিক্সা চালাত হরেন, আর সকাল থেকে মাছ ধরে বিক্রি করত। ভালো ছিল সেই সব দিনগুলো। তখন এই করলাও ছিল অন্য রকম। জল বইত প্রচুর। এখনকার মত হাঁটু জল ছিল না। না ছিল এত নোংরা নদীর জলে। এখন এই শহরের যত নোংরা, যত পাপ বয়ে বয়ে ক্লান্ত, মৃতপ্রায় করলা। কত মাছ ছিল সে সময়। বাটা, সরপুঁটি, ফলুই, মৃগেল, বোয়াল, বাম মাছ, আরো কত কি। কত রকমের কুচো মাছ পাওয়া যেত সে সময়। আর ছিল বোরোলি মাছ। তিস্তা আর করলার সব চাইতে স্বাদু মাছ। তেমন ছিল তার চাহিদা। চাহিদা তো এখনো আছে। কিন্তু মাছ কই। তিস্তায় যাও বা পাওয়া যায়, করলায় প্রায় নেই বললেই চলে। দামও তেমন, এখন তো হাজারের ওপরে কেজি।
বোরোলির কথায় আবার পারুলের মুখটা মনে পড়ে হরেনের। ওর শেষ ইচ্ছেটাও রাখে নি হরেন। তখন প্রায় মৃত্যুশয্যায় পারুল। ডাক্তারের ওষুধের খরচ চালাতে হিমসিম খাচ্ছিল সে। সে সময়ই একদিন বোরোলি পড়েছিল জালে। অনেক ধরেছিল সেদিন। ঘরে এসে বলাতে পারুল বলেছিল ওর খুব ইচ্ছে করছে বোরোলি মাছ খেতে। বলেছিল বিক্রি করতে হবে না, বরং একদিন ওরা নিজেরাই ভাল করে খাবে। শোনে নি হরেন। বিক্রি করে ওষুধ কিনে এনেছিল। ভীষণ অভিমান হয়েছিল পারুলের। কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল হরেনের সাথে। তার কদিন পরেই…
খুব দুঃখ ছিল পারুলের মনে ওদের কোন সন্তান না হওয়ায়। ও নিজেকেই দোষী মানত। কতবার বলেছিল তুমি আরেকটা বিয়ে কর। হরেন জানত, দোষ পারুলের নয়। ওর নিজের। সদর হাসপাতালে গিয়েছিল অনেক দিন আগেই। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেছিল সেকথা। কিন্তু কোন দিন কাউকে বলে উঠতে পারে নি হরেন। এমন কি পারুলকেও না। নিজের পৌরুষে আটকিয়েছিল তখন। এখন হাসি পায় সে কথা ভাবলে। ঘেন্না হয় নিজের ওপর। কি বোকাই না ছিল সে। এমনকি মদের ঠেকে মাতাল হওয়ার পরে যখন বন্ধুরা ওর বউকে বাঁজা বলত, তখনো কোনদিন প্রতিবাদ করতে পারে নি হরেন। এখন কষ্ট হয় হরেনের। বড় কষ্ট।
পারুল গেল। মদ বাড়ল। নিজের রিক্সা বিক্রি হল। চালাত ভাড়ার রিক্সা। তাতেও মালিককে ভাড়া দিয়ে খাওয়া আর মদের খরচা উঠে আসত কোন রকমে। তারপর একসাথে এল টোটো আর টিবি। শেষ হয়ে গেল হরেন। একেবারে নিঃস্ব। কপর্দকহীন। এখন শুধু দিন গোনা।
বাতাসে হঠাৎ দূর থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসে। মনে পড়ে যায় আজ থেকে দুর্গাপুজা শুরু। অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে। যখন শরীরে শক্তি ছিল, কি ভালোই না কাটত কটা দিন। সারাদিন, সারা সন্ধে ভাড়া খাটত তখন। অনেক বাঁধা খদ্দের ছিল হরেনের। তাদের বাড়ির মহিলা, বৃদ্ধাদের ঠাকুর দেখাতো সে। কতবার সারা শহর চষে ফেলত। গোশালা মোড়ের রাস্তা ধরে কখনো চলে যেত দেবী চৌধুরানী ভবানী পাঠকের মন্দির। সে মন্দিরও তো পুড়ে ছাই হয়ে গেল কিছুদিন আগে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে হরেন। কেমন সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। খুব কামাই হত সে সময়। পূজো শেষ হলেই পারুলকে মিথ্যে কথা বলে চলে যেত কিং সাহেবের ঘাটের কাছের বস্তিতে। কয়েকটা বন্ধু থাকত ওখানে। খুব ফুর্তি হত তখন। কাঁচা পয়সার ফুর্তি।
সবই ধীরে ধীরে শেষ হয়ে গেল। এখন দুর্গা পূজা আসে যায়। ফিরেও তাকায় না হরেন। গরীবের আবার উৎসব। তবে কখনো কোথাও দরিদ্র ভোজন করাচ্ছে শুনলে খেয়ে আসে পেট পুরে। ওটুকুই যা ভাল।
শরীরটা এখন অনেকটাই সুস্থ মনে হয়। একটু একটু খিদেও পায়। মুড়িগুলো বার করে আস্তে আস্তে কয়েকটা করে চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে থাকে হরেন। মুখের লালা দিয়ে ভিজিয়ে ভিজিয়ে গিলে নেয়। শেষ হলে উঠে পড়ে। এগিয়ে যায় নদীর দিকে। সামনেই নদীটা বাঁক নিয়েছে। তাই এদিকে জল একটু বেশী। বাকি জায়গায় তো নদী যেন প্রতিদিনই ছোট হয়ে আসছে। দুপাড়ের আগাছাগুলো প্রতিদিন দখল করে নিচ্ছে নদীর বুকের মাটি। এভাবে চললে আর কতদিন থাকবে এই নদী কে জানে। এই তো সেদিন খুব ঘটা করে মা করলার পূজো হল। গিয়েছিল হরেন। কত বড় বড় লোক এল। প্রসাদ খেল। কাজের কাজ কিছু হল কি?
আর হবেই বা কি করে। যে নদীকে তার জলদাত্রীই ছেড়ে চলে গেছে তাকে আর কে বাঁচাবে। টিবি হাসপাতালের ডাক্তারবাবু হরেনকে বলেছিল, বৈকুন্ঠপুরের গভীর জঙ্গলে, যেখানে করলা নদীর উৎস পাহাড়ী ঝোরার থেকে, সেখানে এখন সব শুকনো। কোন জলই নেই। ওই জল নাকি আসতো একটু দূরে বয়ে যাওয়া তিস্তা থেকে মাটির তলা দিয়ে, যেমনটা মায়ের বুকে দুধ আসে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। এখন সেই তিস্তা নাকি সরে গেছে দেড় কিলোমিটার। শুকিয়ে গেছে পাহাড়ী ঝোরা। শুকিয়ে গেছে করলার উৎস। ডাক্তারের মুখে এই সব কথা শুনে খুব সাধ হত হরেনের ওইখানে যাওয়ার। ভাবত গিয়ে প্রণাম করে আসবে করলা মাকে। দু হাত জোড় করে বলে আসবে, মাগো জল দে মা। বাঁচুক নদীটা। বাঁচুক মাছ। বাঁচুক তাদের মত মানুষগুলো। বাকি সব ইচ্ছের মত এই ইচ্ছেটাও ইচ্ছেই রয়ে গেছে হরেনের। এক টিবি রোগির সাধ্য কি, বুনো হাতি ভরা গভীর অরণ্যে গিয়ে ইচ্ছে পূরণ করবে।
বাঁকের কাছে নদীর এপারে বেশ খানিকটা চরা পড়েছে। শুরুর দিকটা ফার্ণের আগাছায় ভর্তি। ওদিকটায় নদীর পারের কাছে কেউ থাকে না। অনেকটা জায়গা জুড়ে গাছপালা ভরে থাকায় প্রায় জঙ্গলের মত লাগে। লোকজনও কম এদিকে।
বাঁকের জন্য নদীর জল ওপারে অনেক বেশি। মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা এখানে সব চাইতে বেশি। হরেন সেজন্যই আজ এখানে এসেছে। কিছু না পেলে তো না খেয়েই মরতে হবে মনে হচ্ছে। জলে নামার ঠিক আগেই আবার মাথাটা ঘুরিয়ে ওঠে। শরীরটা দুর্বল লাগে।
নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে জলে নামে হরেন। কোমর জলে এসে জালটা দু হাত দিয়ে কায়দা করে পাকিয়ে মাথার ওপরে এক চক্কর ঘুরিয়ে ছুঁড়ে মারে জলের গভীরে। একটা ছাতার মত ঝুপুস করে জালটা গিয়ে পড়ে জলে আর পড়েই নিচে বাঁধা শিসের ভারে নেমে যায় জলের ভেতরে। হাতে বাঁধা জালের দড়িটা ধরে অভ্যেস মত টান দিতে থাকে হরেন। জালটা গুটিয়ে উঠে আসতে থাকে ওপর দিকে আর তারপরই চোখে পড়ে জালের নীচের দিকে চকচকে রুপোলী ছটা। মাছ, এবং হরেনের অভিজ্ঞ দৃষ্টি চিনে ফেলে মাছগুলোকে। হ্যাঁ, বোরোলি মাছ। আনন্দে বুকটা ধক করে ওঠে। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস হয় না। পাগলের মত জাল থেকে ছাড়িয়ে মাছগুলোকে খলুইয়ে ঢোকায় হরেন। আবার জাল ছোঁড়ে আবার সেই একই ভাবে উঠে আসে রুপোলি মাছের ঝাঁক সাথে কিছু অন্য মাছও। কয়েক বারেই প্রায় ভরে আসে খলুই। আনন্দে উত্তেজনায় কি করবে ভেবে পায় না হরেন। আরো একটু গভীরে এগোয়। ঠিক তখনই আওয়াজটা ভেসে আসে কানে। একটা খুব হালকা কুঁই কুঁই আওয়াজ। ভালো করে শোনে হরেন। মনে হয় খানিকটা যেন কেউ কাঁদছে। আশেপাশে তাকিয়ে মানুষ খোঁজে হরেন। কেউ কোথাও নেই। একটু যেন ভয় পায়। একেই এত মাছ। তার পরে আবার এই আওয়াজ। সবটাই যেন অস্বাভাবিক লাগে।
ভালো করে দেখে আওয়াজটা নদীর ওই পারের জলের লাগোয়া আগাছার থেকে আসছে। মাছভরা খলুই আর জালটা পারে রেখে আবার জলে নামে হরেন। সাঁতরে ওপারে যায়। আওয়াজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিছুই নজরে আসে না। একটু এদিক ওদিক হাতড়ে দেখার চেষ্টা করে। তারপরে ভাবে এদিকে সাপের উপদ্রব খুব। এই কাদাভরা ঝোপের কাছে না থাকাই ভাল। ফিরে যাবে বলে পেছনে ফেরে হরেন। ঠিক সে সময় পেছন থেকে পরিস্কার মানুষের বাচ্চার কান্নার আওয়াজ কানে আসে। এবারে আর অসুবিধে হয় না ঝোপের ভেতরে আটকে থাকা ঝুড়িটা খুঁজে পেতে।
অবাক হয়ে দেখে ফুলের মত মিষ্টি একটা সদ্যজাত মেয়ে হাত পা ছুঁড়ছে আর আস্তে আস্তে কেঁদে উঠছে মাঝে মাঝে। সাঁতরে ঝুড়িটা নিয়ে এপারে আসে হরেন। শক্ত দৃঢ় পায়ে উঠে আসে জল ছেড়ে। মেয়েটাকে তুলে নিয়ে পরম যত্নে জড়িয়ে ধরে বুকের ভেতরে। খলুই আর জাল নিয়ে রওনা দেয় নিজের ঘরের দিকে। বুকের কাছে মেয়েটা ওম পেয়ে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে।
পাড়ায় সবাই বুড়ো হরেনকে ওভাবে তেড়েফুঁড়ে আসতে দেখে অবাক হয়ে তাকায়। একগাল হাসি হেসে হরেন বলে ওঠে, দেখছিস কি রে। পরে বলব সব। এখন অনেক কাজ। আজ দুর্গাপুজা না? মা এসেছে আমার ঘরে। আমার মেয়ে এসেছে…


অলংকরণঃ কল্লোল রায়

ফেসবুক মন্তব্য