বৃষ্টির সম্ভাবনা

মানবেন্দ্র সাহা



সে বীজ পুঁতবো পুঁতবো ক'রেও কোনোদিন পোঁতা হয়নি। সে বীজ ভিতরে ভিতরে ছিলো একটা কৌতুকহীন ভোর। সেখানে আলোর সম্ভাবনা ছিলো, ছিলো নিস্পন্দ গুহার একাগ্রতাও, তবু একমাত্র সত্য সেখানে এই, যে একটি নিস্পৃহ পরমাণুও ধীরেধীরে আজ খোলসের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে খোলা আকাশের নিচে। বহুদিন পর অন্ধকার নেমেছে পৃথিবীর বুকে। আকাশের অধিকার বুঝে নেওয়ার অন্ধকার। অথচ এই অন্তহীন অন্ধকারই তো আমার কবিতা। এই যে গুমোট ভাঙা বৃষ্টির সম্ভাবনা, এই তো আমার গল্প। গুমোট ঘরের ভিতর থেকে ধীরেধীরে উঠে আসি পৃথিবীর ছাদে। একটা জমাট অন্ধকার সেখানে। হাতড়ে হাতড়ে পা ফেলছি। খুঁজে চলেছি বৃত্তের উৎসবিন্দু। একটা ফাঁকা গেলাস ছিটকে পড়লো পায়ে লেগে। গেলাসই হবে বোধহয়। দীর্ঘ অপেক্ষায় বসে থাকা একটা ফাঁকা গেলাস। অথচ আজকে যখন পৃথিবীর উষ্ণতম রাত্রি, বৃষ্টির একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, ঠিক তখনই ছিটকে পড়লো একটা ফাঁকা গেলাস। না এখনও কোনো মেঘের সঞ্চার হয়নি আকাশে। এখনও ঝলকে ওঠেনি ক্ষীণতম কোনো বিদ্যুতের রেখাও। তবুও বৃষ্টি হবে। আমার মনের ভিতর একটা পুরুষ ব্যাঙ অবিরাম ডেকে চলেছে। আমার ঘিলুর ভিতর থেকে খুঁটে খুঁটে খাদ্য সঞ্চয় করছে একদল উন্মাদ পিঁপড়ে। যখনই এসব ঘটে তখনই বৃষ্টি নামে আমার ছাদে। এসকল আসলে বৃষ্টিরই পূর্বাভাস। যে বীজ আনবো আনবো করেও আনা হয়নি কোনোদিন, যে বীজের ভিতর আমার যাবতীয় কবিতারা লিপ্সাময়ী ফুলের মত তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। আজ বহুদিন পর আমি তার খোঁজেই বেরিয়েছি। এই অখণ্ড অন্ধকার ভেঙে আমি অনন্ত পথ পাড়ি দেবো খালি পায়ে। আমার পায়ের নিচে ঝলসে উঠবে সভ্যতার নৃশংসতম কাঁটাগাছ। আমি গুঁড়িয়ে ফেলবো রাষ্ট্রের প্রাচীর, এক নিশ্বাসে শুষে নেবো পৃথিবীর সমস্ত জলাশয়। যেসব স্থাপত্য আমি তৈরি করেছি যূগেযূগে আজ সবকিছু ভেঙে একটা রাস্তা তৈরি করবো। একটা সোজা রাস্তা। একটা সংক্ষিপ্ততম রাস্তা। সে রাস্তার দুপাশে সারিসারি বীজ পুঁতবো বৃষ্টির দিনে। আর সে বীজও একদিন বুঝে নেবে আকাশের অধিকার। শাখায় শাখায় ঝুলে থাকবে কবিতাদের লাস্য। চুরমার হয়ে যাবে সব অন্ধকার। উত্তরহীন আকাশে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে সপ্তর্ষিমণ্ডল।


অলংকরণঃ অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়

ফেসবুক মন্তব্য