ক্রিসমাস ইভ

ভাস্বর জ্যোতি ঘোষ



দিনটা ছিল চব্বিশে ডিসেম্বর। ফ্রান্সিসের সাথে শুভমের হঠাৎ দেখা হয়ে গেল মিডলটন রো তে, ইনকাম ট্যাক্স অফিসটার সামনে। ইনকাম ট্যাক্স বিল্ডিংটার উল্টোদিকের কর্পোরেশন ব্যাঙ্কটা থেকে বেরোচ্ছিল ফ্রান্সিস। ঘড়িতে তখন ঠিক চারটে বাজে। কত বছর পরে দেখ হল ফ্রান্সিসের সাথে? তা, হিসাব করলে বছর পনের তো বটেই। এই পনের বছরে শুভমের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। চেহারা ভারিক্কি হয়েছে। চেহারায় সাফল্যের চাকচিক্য বেশ স্পষ্ট। বেহিসাবি ছাত্রজীবন ছেড়ে এখন ঘোর সংসারি। মাথার চুল পাতলা হতে শুরু করেছে। শুধুমাত্র বাঁ হাতের ক্রাচটা আর দাড়িতে কয়েকটা রুপোলি রেখা ছাড়া, ফ্রান্সিসের চেহারায় বিশেষ কোনো পরিবর্তনই হয়নি। ফ্রান্সিসকে দেখে, শুভমের পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পা দুটো যেন কেউ পেরেক দিয়ে রাস্তার সাথে পুঁতে দিয়েছে। শুভমকে দেখতে পেয়েছে ফ্রান্সিস। ও রাস্তা ক্রস করে শুভমের দিকেই আসছে। রাস্তাটা ক্রস করে শুভমের সামনে এসে দাঁড়ায় ফ্রান্সিস। ভেতরে ভেতরে কেমন যেন গুটিয়ে যেতে থাকে শুভম। দীর্ঘকায় ফ্রান্সিস, ডানহাতটা শুভমের কাঁধে রেখে বলে,
- অনেক দিন পরে দেখা হল শুভ। পনেরো বছর, তাই না? বেশ পালটে গেছ। চলো আমাদের বাড়ী। আর ইউ ইন আ হারি?
– না, তাড়া নেই। চলো। এখানকার কাজ হয়ে গেছে। আজ আর অফিস যাব না।
বাঁ কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে ফ্রান্সিসের সাথে হাঁটতে থাকে শুভম। হাঁটতে হাঁটতে ওর পিঠে হাত রেখে ফ্রান্সিস বলে।
- একদম আসা বন্ধ করে দিলে কেন শুভম? ফোন নাম্বারও পালটে ফেলেছিলে। সি.এ পাশ করেছো। বোম্বেতে চলে গেছো। এসব তো ডোরার মুখেই শুনেছিলাম। কিন্তু তুমি যে কোলকাতায় ফিরে এসেছো সেটা গীতশ্রীর মুখে শুনেছিলাম। একদিন গীতশ্রীর সাথে দেখা হয়েছিল। এখন কোলকাতায় ম্যাকেঞ্জি ইন্টারন্যাশনালে চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার। শুনে ভালো লেগেছিল।
ফ্রান্সিস কথা বলে যায় অনেকটা স্বগতোক্তির ঢঙে। বোঝাই যায় কোন উত্তর ও আশা করেনা।
- গিটার বাজানো ছেড়ে দিয়েছি। এখন কনফেকশনারির একটা দোকান চালাই। বাইক অ্যাক্সিডেন্টে হয়েছিল। সেই থেকে বাঁ পাটা আর ঠিক হয়নি। ক্র্যাচ ছাড়া চলতে পারিনা। বাইকটা বেচে দিয়েছি।
চুপ করে হাঁটতে থাকে শুভম। ডোরার কথাটা শনেই, বুকের ভেতরটা হীম হয়ে যেতে থাকে ওর। নিঃশব্দে,অনন্ত পথযাত্রায় চলেছে ফ্রান্সিসের সাথে, এরকম মনে হতে থাকে ওর। কি চায় ফ্রান্সিস? পনেরো বছর আগের দৃশ্য তার চোখের সামনে রিওয়াইন্ড হতে থাকে।

ফ্রান্সিস অগাস্টিন গোমস। সিলভার ফক্সের গিটারিস্ট। ওর সাথে শুভমের আলাপ সি.এ. পড়ার সময়। টিউশনের পরে সিলভার ফক্সে গীতশ্রীকে খাওয়াতে নিয়ে গেছিল শুভম। ওয়ালেট নিয়ে যেতে ভুলে গেছিল। ফ্রান্সিস না বাঁচালে একটা কেলেংকারি হয়ে যেত সেদিন। দুশো পঁয়ত্রিশ টাকা বিল হয়েছিল। তখনকার বাজারে অনেক। ফ্রান্সিস মাঝখানে এসে ঝামেলা মিটিয়ে দিয়েছিল। বিলটা পে করে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ফ্রান্সিস,
- আমি ফ্রান্সিস, ফ্রান্সিস অগাস্টিন জোনস। এখানে গিটার বাজাই, আপনি?
- আমি শুভম। সি.এ পড়ছি। আর্টিকলশিপ করি রুইয়া অ্যান্ড রুইয়াতে।
পরিচয় হবার পর, শুভম প্রচন্ড অবাক হয়ে বলেছিল,
– অদ্ভুত মানুষ তো আপনি ফ্রান্সিস। চেনেন না, শোনেন না। পে করে দিলেন? আমি যদি টাকাটা ফেরত না দি?
ফ্রান্সিস, শুভমের পিঠে আলতো করে চাপড় মেরে হা হা করে হেসে উঠে বলেছিল,
- ঠিক আছে টাকাটা আমি ফেরত নিয়ে নিচ্ছি। আপনি বরং আমাদের মাসলম্যান পিটারের সাথে বুঝে নিন।
তারপরে বলেছিল,
- টেক ইট ইজি শুভম। যেকোন দিন ক্যাশে, আমার নাম করে ফেরত দিয়ে দেবেন।
শুভমের ইচ্ছে ছিল একটু বসে ফ্রান্সিসের গিটার বাজানো শুনে যাবে। কিন্তু বাড়ী ফেরার তাড়া ছিল। গীতশ্রী হাত ধরে টান দিল। শুভ, লেট’স মুভ। উই আর অলরেডি গেটিং লেট। যেতে যেতে গীতশ্রী বলে,
- কি সুন্দর দেখতে দেখেছিস ফ্রান্সিসকে। যেরকম লম্বা,সেরকম গায়ের রং। ব্লু আইসের সাথে ব্ল্যাকিশ ব্রাউন বিয়ার্ড। কি মাচো চেহারা দেখেছিস? আজ ফ্রান্সিস না থাকলে তোর কপালে মার ছিল।
একটু আনমনা ছিল শুভম, গীতশ্রীকে জিজ্ঞাসা করে,
- প্রেমে পড়লি নাকি ফ্রান্সিসের?
– বারের গিটারিস্টের সাথে প্রেমে পড়তে আমার বয়ে গেছে। দেখতে সুন্দর। তাই বলছিলাম। নে বাস আসছে। চল,ওঠ।
পরের দিনই অফিস ফেরতা ফ্রান্সিসের টাকাটা ক্যাশে ফেরত দিয়ে এসেছিল শুভম। কিন্তু ফ্রান্সিসের সাথে দেখা হয়নি। দেখা হয়েছিল পরের শনিবার। অফিস থেকে দুটো নাগাদ বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছে, দেখে ফ্রান্সিস উল্টো দিক দিয়ে আসছে। ওকে দেখেই ফ্রান্সিস থেমে যায়,
- আর ইউ ইন আ হারি শুভ?
শুভ কবজি উলটে ঘড়িটা দেখে নেয়,
- না, তেমন কিছু না।
- তাহলে, চলুন আমার বাড়ী চলুন। বেশী দূরে না, সামনেই, পার্ক লেনে।
শুভ বন্ধুদের বলে,
- তোরা এগো। আমি ফ্রান্সিসের বাড়ী হয়ে একটু পরে যাবো।
পার্ক লেনে বেশ পুরোন বাড়ী। বাড়ীর সামনে একটা বাইক দাঁড় করানো। বাইকের সিটে আলতো একটা চাপড় মেরে কলিং বেলের সুইচটা টেপে ফ্রান্সিস। দরজা খুলে দেয় যে তরুণী, তাকে এক ঝলকে ইউরোপিয়ান বলে ভুল হতে পারে। চুলের কালো রংটা বাদ দিলে বাকি সবটাই খাঁটি ইউরোপিয়ানের মতো।
- আসুন, ভেতরে আসুন। মিট মাই সিস্টার ডোরা।
- হ্যালো ।
ডোরা হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দেয়। ঈষৎ দ্বিধাগ্রস্ত ভাবে ডোরার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরে শুভম। কেমন একটা ঘোর লেগে যায় শুভমের।
- প্লিজ বসুন। ডোরা একটু কফি খাওয়াবি? আর কিছু স্ন্যাকস।
- হ্যাঁ আনছি। একটু বোস।
ডোরা ভেতরে চলে যায়। শুভম সোফায় বসে। পুরোন সোফা। সোফাটা তেমন আরামদায়ক নয়।স্প্রিংগুলো পেছনে ফুটছে। সোফার উল্টোদিকে দুটো চেয়ার, মাঝখানে সেণ্টার টেবিল। ঘরে আসবাবপত্র বলতে এই। একদিকের দেওয়ালে গিটার ঝুলছে। বুককশেলফে যত্ন করে সাজানো বই। সবই ইংরিজি বই। বাঁধানো বাইবেল রয়েছে। তার প্রিয় ‘ দ্য ফোর্থ এস্টেট’ বইটাকেও লক্ষ্য করে শুভম। বুকশেলফের উপরেই, বার্নিশ করা কাঠে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর ছবি মাউন্ট করা। পাশের দেওয়ালে ভিঞ্চির দ্য লাস্ট সাপার বাঁধানো। বাহুল্য বর্জিত ছিমছাম ঘর। বেশ পুরোন বাড়ী। বিবর্ণ দেওয়াল। মেইন্টেন্যান্সের অভাব বোঝা যায়। শুধুমাত্র দেওয়াল ঘেঁসে রাখা সিঙ্গল খাটটাকেই ঘরের মধ্যে বেমানান মনে হচ্ছে।
- কি দেখছো শুভম? অনেক পুরোন বাড়ী এটা। তুমি বললাম। কিছু মনে করলে না তো?
– আরে না,না। ঠিক আছে।
ফ্রান্সিস বলতে থাকে,
- আমার গ্রেট গ্যান্ডফাদার রিচার্ড জোনস ইন্ডিয়ান আর্মিতে ডক্টর ছিলেন। ফার্স্ট ওয়ারের পরে কর্নেল ওকশটের মেয়েকে বিয়ে করে এই বাড়ীটা পেয়েছিলেন। এটা কর্নেল ওকশটের বাড়ী। ভালো প্র্যাকটিস ছিল। ভালো ইনকাম ছিল। আমার গ্রান্ডফাদার রবার্ট জোনস, রেলে গার্ড ছিল। প্রচুর ড্রিঙ্ক করে রিটায়ারের কিছুদিন পরেই মারা যায়। বাবা তখন খুব ছোট। লেট ম্যারেজ ছিল গ্র্যান্ডফাদারের। আমার গ্র্যানি, ভিক্টোরিয়া জোনসকে দেখতে ছিল ঠিক গ্রেটা গার্বোর মত। অল্প বয়সের ছবিতে দেখেছি। রিটায়ার করে গ্র্যান্ডফাদার পার্ক স্ট্রীটে একটা গিফট শপ খুলেছিল। গ্র্যানি সেটা বেশ ভালোই চালাচ্ছিল। কিন্তু বাবা শাসনের বাইরে চলে গেল। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির প্রোফেসর সাগ্নিক সেনের মেয়েকে ইলোপ করে বিয়ে করে বাড়ী থেকে পালায়। সোজা বোম্বে। ভালো গিটার বাজাতো। ওখানে গিয়ে নাম ভাঁড়িয়ে বারে গিটারিস্টের চাকরী নেয়। বিয়ের পরে মা এক দিনের জন্যও শান্তি পায়নি। ডোরা হওয়ার কিছুদেনের মধ্যেই বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যায়। আমার তখন তিন বছর বয়স। মার হাত তখন একদম খালি। একরকম বাধ্য হয়েই মা কোলকাতায় চলে আসে। বাট গ্র্যানি ওয়েলকামড আস। তারপরে মাও বেশীদিন বাঁচেনি। গ্র্যানি খুব ভালোবাসতো আমাদের। আমি গিটার শিখতাম। বি.কম পাশ করে সিলভার ফক্সে ঢুকি। ডোরা মন্টেসারি স্কুলে টিচার। গ্র্যানি দু বছর আগে মারা গেছে। এই হল ফ্র্যান্সিস অগাস্টিন জোনসের ইতিহাস।
একটানা কথাগুলো বলে একটু দম নেয় ফ্রান্সিস। ততক্ষণে ডোরা ট্রেতে করে প্যাটিস আর কফি নিয়ে এসেছে। ট্রেটা সেন্টার টেবিলে রাখতেই এক চুমুকে আধগ্লাস জল খেয়ে হাতের উল্টোপিঠে মুখটা মুছে নেয় ফ্রান্সিস।
- ডোরা, স্কার্টটা টান করে ফ্রান্সিসের সামনে বসে বলে,
- শুনলেন, ইতিহাস?
ফ্রান্সিস হাসে,
- ধুর ইতিহাস আবার কি? কথা তো বলাই হয় না। মনে হোল শুভম শুনতে পারে। তাই বকলাম। বোর হলে নাকি শুভম?
প্যাটিসে একটা কামড় বসিয়ে শুভম বলে ,
- না। বোর কেন হবো। ভালোই লাগছিল শুনতে। তবে, তোমাদের শরীরে ইন্ডিয়ান ব্লাডের মিক্সিং কিন্তু অনেক পরে হয়েছে। ফ্র্যান্সিস বলে,
- তা ঠিক। দেখোনা, ডোরা ঠিক আমার গ্র্যানির মত দেখতে। একদম ইউরোপিয়ান বিউটি।
হো হো করে হেসে ওঠে ফ্রান্সিস।
- ধুস্‌।
ব্লাশ করে ডোরা।
চা, প্যাটিস শেষ করে, রুমালে হাত মুছে শুভম বলে,
- ডোরা, চা আর প্যাটিস। দুটোর জন্যই ধন্যবাদ আপনাকে। সত্যিই খিদে পেয়েছিল আমার।
- ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম।
গিটারে টুং টাং করছিল ফ্র্যান্সিস। চোখ তুলে বলে,
- ডোরাকে আপনি আজ্ঞে করছো কেন?
ডোরা হেসে ফেলে, বলে,
– আমাকে আপনি স্বচ্ছন্দে তুমি বলতে পারেন।
ভুরু কুঁচকে ফ্রান্সিস বলে,
- আরে, তুইই বা আপনি বলছিস কেন?
শুভম আর ডোরা দুজনে হেসে ফেলে।
ডোরার শরীর থেকে ল্যাভেন্ডারের মিষ্টি গন্ধ আসছে। শুভমের উঠতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু উঠতে হবে এবারে। বাঁ হাতের কবজি উল্টে ঘড়িটা দেখে নিয়ে শুভম বলে,
- উঠি ফ্রান্সিস। খুব সুন্দর সময়টা কাটলো।
- উঠবে?
ফ্রান্সিস বলে,
- তোমাকে এনরিক গ্রানাডোর একটা কম্পোজিশন শোনাতাম। যাক, পরে শুনো। যখন ইচ্ছে চলে এসো। ডোরাও কিন্তু চমৎকার গিটার বাজায়। আরে, তোমার সেল নম্বরটা দাওনি তো।
ফোন নম্বর বিনিময়ের পরে শুভম উঠে দাঁড়ায়। ডোরা বলে,
- দাঁড়াও। আমিও যাব।
- তুই আবার কোথায় যাবি রে ডোরা?
ফ্রান্সিস জিজ্ঞাসা করে।
- একটু বেকবাগানে যাবো। ক্যাথি আন্টিকে একটু দেখে আসি।
- আচ্ছা। বেশী দেরী করিস না যেন।
- না,না। দেখা করেই চলে আসবো। একা থাকে তো।
রাস্তায় বেরিয়ে শুভম জিজ্ঞাসা করে
- ক্যাথি আন্টি কে?
– মার বান্ধবী। আঙ্কল মারা গেছেন। দুই ছেলেই অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। বড্ড একা। তাই মাঝে মাঝে দেখে আসি। আমাদের খুব ভালোবাসে।
- তোমরা দুজনেই কিন্তু চমৎকার বাংলা বলো। একদম অ্যাকসেন্ট ফ্রি বাংলা। এইরকম খাঁটি ইউরোপিয়ান চেহারার মানুষের মুখে এরকম বাংলা শুনতে অদ্ভুত লাগছিল।
- আমার মা আর গ্র্যানি দুজনেই চমৎকার বাংলা বলতেন। আর বাঙালী বন্ধু বান্ধবীও তো আছে আমার।
রাস্তার মুখে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে ডোরা।
- কি হল, দাঁড়িয়ে পড়লে যে?
শুভম অবাক হয়।
- পিটারকে সঙ্গে নিয়ে যাবো। ওকে বলা আছে। ও আসবে। তুমি এগোও।
- হু’জ পিটার?
মনের মধ্যে কোথাও যেন সুক্ষ্ম জ্বলুনি বোধ হয় শুভমের। প্রেমে পড়লো নাকি ও ডোরার?
- পিটার আমার ছোট বেলার বন্ধু।
এই প্রথম। এর পরেও বহুবার পার্ক লেনে গেছে শুভম। কখনো ফ্রান্সিসকে পেয়েছে। গিটার শুনেছে। ফ্রান্সিস এবং ডোরা দুজনেই বাজিয়েছে। চমৎকার গানের গলা দুই ভাইবোনেরই। তিনজনে মিলে আড্ডা মেরেছে। এলোমেলো আড্ডা। কিন্তু ফ্রান্সিস নয়। শুভমের কাছে ডোরাই ছিল পার্ক লেনে যাওয়ার আসল কারণ। ডোরা ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হয়েছে শুভমের প্রতি। পার্কলেনের একান্তে, রেস্তরাঁয় ডোরার হাতের আঙুল নিয়ে খেলা করেছে শুভম। পড়াশোনা আর আর্টিকলশিপের চাপের মাঝেও ডোরাকে নিয়ে বাবুঘাটে বসে থেকেছে শুভম।

সেই দিনটা ছিল চব্বিশে ডিসেম্বর। ডোরার জন্মদিন। ওকে বাবুঘাটে স্কুপে ট্রিট দিতে নিয়ে গিয়েছিল শুভম। ডোরার জন্য নিয়ে গিয়েছিল চমৎকার একটা ঘড়ি। স্কুপ থেকে বেরিয়ে গঙ্গার পাড়ে বসে ডোরার হাতটা টেনে নিয়ে সেই ঘড়িটা পরিদিতে দিতে শুভম বলেছিল,
- মেনি,মেনি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্য ডে।
ভীষণ খুশি হয়েছিল ডোরা। বাঁ হাত দিয়ে শুভমকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,
- আই লাভ ইউ শুভম। কেন ভালোবাসি তা জানিনা। কিন্তু বাসি। ভীষণ ভালোবাসি।
সূর্যাস্তের অস্তরাগে পশ্চিম দিগন্ত তখন লাল। একটা শুশুক গঙ্গায় লাফ দিয়ে উঠে আবার ডুব দিল। মাঝগঙ্গায় একটা নিঃসঙ্গ নৌকা। শুভমের রক্তে আগুন জ্বলে উঠেছিল।ডোরার কোমলতা তার শরীরে মিশে রয়েছে। দুহাতে ডোরার মুখটা তুলে নিয়ে শুভম গাঢ় চুম্বন করেছিল ডোরার ঠোঁটে। ডোরার লালায় তার লালা মিশে গিয়েছিল। লজ্জায় রাঙা হয়ে গিয়েছিল ডোরা। মাথাটা নিচু করেই শুভমকে জিজ্ঞাসা করেছিল,
- আচ্ছা শুভম, তুমি তো সিএ পাশ করে গেছো। চাকরিও পেয়ে গেছো। বললে ফার্স্ট জানুয়ারিতে মুম্বাই চলে যাবে? আমার কথা কিছু ভেবেছো?
শুভমের তখন যেন আর তর সইছে না। ভয়ঙ্কর এক উন্মাদনা।
- সিলি কোয়েশ্চেন কোরনা ডোরা। তোমার ভাবনা আমার। ব্যস। জাস্ট রিলাই অন মি। আই’ল টেক কেয়ার অফ দ্য রেস্ট। আই কেয়ার ফর ইউ ডার্লিং। চলো তোমাদের বাড়ী যাই। আজ তো ফ্রান্সিস অনেক রাতে আসবে, তাই না?
সেদিন রাত সাড়ে ন’টা পর্যন্ত ডোরার সাথে ছিল শুভম . . .
– এসো।
ফ্রান্সিসের কথায় বাস্তবে আছড়ে পরে শুভম। দরজা ভেজানোই ছিল। আস্তে করে ঠেলতেই দরজা খুলে যায়।
- ভেতরে এসো।
ফ্রান্সিস বলে।
সেই পার্ক লেন। পনেরো বছর পরে আবার! ঘরের কিচ্ছু পরিবর্তন হয়নি। শুধু দেওয়াল গুলো আরো বিবর্ণ হয়েছে আর দেয়ালে ঝোলানো গিটারটা ধুলো জমে গেছে। বোঝাই যায় বহু বছর ওতে কারো হাত পড়েনি। ডোরা কেমন আছে, কোথায় আছে খুব জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করে শুভমের। কিন্তু চুপ করে থাকে। ফ্রান্সিসের উদ্দেশ্যটা বুঝতে পারের না শুভম। ভেতরে ভেতরে ঘেমে জল হয়ে যায়। পাশের ঘরে আলো জ্বলছে। ডোরা কি এখনও এখানেই থাকে। মনে মনে ভাবে শুভম। ওই ঘরটার দিকে তাকিয়ে তার পনের বছর আগের সেই দিনটা মনে পড়ে যেতে থাকে। সে আর ডোরা . . . ডোরা আর সে . . . আর কিচ্ছু না . . . আর কেউ না . . .
– ডোরা, প্লিজ কাম।
ওঃ ডোরা এখানেই আছে। হাত পা ঠান্ডা হয়ে যেতে থাকে তার। ডোরা পাশের ঘরের পর্দা ঠেলে ড্রয়িং রুমে আসে। তাকে দেখে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় ডোরা বলে,
- ও শুভম তুমি। বসো।
- মেনি,মেনি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্য ডে।
কোন রকমে কথাগুলো উচ্চারণ করে শুভম। ডরার বয়স যেন সেই পনের বছর আগের বয়সেই স্থির হয়ে আছে। একটুও পরিবর্তন হয়নি ডোরার।
-থ্যাঙ্কস শুভ। ডিনার করতে বলবো না। কিন্তু কেক না খেয়ে খেয়ে যাবে না। আমি নিজে বানিয়েছি।
প্যান্ট্রিতে চলে যায় ডোরা। পাশের গরের পর্দা ঠেলে ফুটফুটে এক কিশোরী বেরিয়ে আসে।
- মামা,চলো। আজ আমার পার্কস্ট্রীটে ঘোরাবে বলেছিলে।
ততক্ষণে ডোরা পেস্ট্রি আর কফি নিয়ে এসেছে।
- জাস্ট আ মিনিট লিজা।
- ইয়েস মম।
- মিট শুভম আঙ্কল। হি ইজ আওয়ার ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। উই মেট আফটার ফিফটিন ইয়ার্স।
- হাই আঙ্কল।
হাত বাড়িয়ে দেয় লিজা।
- ইউ মাস্ট হ্যাভ মেট বিফোর আই ওয়াজ বর্ন। আয়্যাম জাস্ট ফোর্টিন। সি ইউ আঙ্কল। মেরি ক্রিসমাস।
- সেম টু ইউ লিজা।
শুভম উত্তর দেয়।
- থ্যাঙ্ক ইউ আঙ্কল। সি ইউ।
ফ্রান্সিসের হাত ধরে বেরিয়ে যায় লিজা।
- এই দিনটার জন্যই আমি এতদিন অপেক্ষা করে ছিলাম শুভম। আমি জানতাম যিশাস কখনঅই অতো আনকাইন্ড হবেন না। মেয়ে তার বাবাকে চোখের দেখাটাও দেখতে পাবে না? এটা হতে পারে না। নাউ আই অ্যাম হ্যাপি। লিজা ইজ আওয়ার ডটার।
পাথর হয়ে যায় শুভম। খুব শ্বাস কষ্ট হতে থাকে শুভমের। মাথা ঘুরতে থাকে। মারা যাচ্ছে কি সে?
- মেয়েকে দেখলে তো? না,না। আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না কোন। দ্যাট ডে আই ওয়াজ অলসো ইকুয়ালি রেস্পন্সিবল। তুমে কেন ফিরে আসোনি বা কেনই বা আমার খোঁজ নাওনি, সে সম্বন্ধে আমি তোমাকে কোন প্রশ্ন করবো না। লিজা ইজ আ গড’স গিফট টু মি থ্রু ইউ। নাউ লিজা ইস মাই ডটার। অনলি মাইন। ঈশ্বর তোমাকে নিশ্চয় ক্ষমা করবেন শুভম। নাও কফিটা খেয়ে নাও। ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
মাথা নিচু করে কফির কাপটা তুলতে গিয়ে শুভম দেখে থরথর করে হাত কাঁপছে তার। বাইরে লাউডস্পিকার বাজছে, শুভম শুনতে পায়
জিংগল বেল জিংগল বেল জিংগল অল দ্য ওয়ে . . . . . .

অলংকরণঃ অর্ঘ্য দত্ত

ফেসবুক মন্তব্য