“মি শিক্সিকা আহে...”

ঝর্না বিশ্বাস



একটা সাদা গোল চশমা – আগেও যেমন সবার নজর কাড়ত, এখনও একই ভাবে। দেশব্যাপী কাজ চলছে তাই তাকে প্রতীকি মেনেই...
“স্বচ্ছতা অভিযান” থেকে শুরু করে ৬ থেকে ১৪ বছরের ছেলে মেয়েরা স্কুলে যায় কিনা তারই সার্ভে ছিল এক শনিবার...আর সেই অনুযায়ী এখানকার স্কুল শিক্ষিকাদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করা হলো ও দেওয়া হলো সেই এলাকার ম্যাপ সহ দুটি ফর্ম যার একটিতে শৌচালয় ব্যবস্থা নিয়ে জানকারি ও অন্যটিতে বাচ্চা স্কুলে না গেলে তাঁর সম্পূর্ন ডিটেলস নিতে হবে। সাথে দেওয়া হলো এক মার্কারও যা দিয়ে সেই না-পড়ুয়া বাচ্চাটির আঙুলে নিশান দিতে হবে আর নিশান দিতে হবে সার্ভে করা প্রতি বাড়ির দরজাতেও...
শুরুতে “না-না” থাকলেও আমাকে যেতে হলো...এই “না”-এর এক ও অন্যতম কারণ ভাষাটা ঠিক রপ্ত করতে পারিনি...আর যে এলাকায় পাঠানো হচ্ছিল সেখানে শুধু এ ভাষা ব্যতীত বোঝানো মুশকিল…যদিও আমার সকল চেষ্টা ব্যর্থ হলো, যখন দেখলাম নামের লিস্টে আমি অনেকটা ওপরে।
সেদিন মানে শুক্রবার স্কুল করে সোজা যেতে হবে মিউনিসিপ্যাল স্কুলের এক ভিড় ঠাসা ঘরেতে, সেখানেই বিস্তারিত মিটিং – অতএব লিস্টে যাদের নাম তাঁরা এক এক করে যে যার মতো পৌঁছে গেল, আর আমিও অগত্যা নিজেকে ঠেলেঠুলে উপস্থিত করালাম নির্ধারিত গন্তব্যে।
গিয়ে দেখি সত্যিই সে স্কুলের দেখভাল একেবারেই নেই...দেওয়ালে প্লাস্টার ঝরে পড়ছে...আর তাতেই কালো রঙ করে ব্ল্যাকবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়... বড় বড় বেঞ্চ পাতা, যার পাটাতন গুলোও বেশ পুরনো হয়ে গেছে। আর মাথার ওপরে প্রতি ঘরে একখানাই ফ্যান তাও আবার ঢিকঢিক করে ঘুরছে...
এপাশ ওপাশ জুড়ে তখন মস্ত ভিড়...সবারই কৌতুহল, কি কাজ? কোথায় যাব, আর কিভাবে?
ব্যস্ত ঘরের মধ্যে তখন কাগজ নিয়ে ঠেলাঠেলি। দেখলাম, আমারই মতো একজন - সে ও আমি জানালার কাছে দাঁড়িয়ে এসব কান্ডগুলো দেখছি। শাড়ি, গয়না বাছাইয়ের মতন সবার জায়গা বাছাই চলল কিছুক্ষণ...আর যিনি কাগজ বিলোচ্ছিলেন তাঁর অবস্থাও বেশ শোচনীয়...এত সব দেখে ঘাম ছুটছে অনবরত...যদিও শুরুতেই ওনাকে বললাম, আমায় প্লীজ একা দেবেন না। খুব অসুবিধা হবে।
কিন্তু শর্ত অনুযায়ী সব এলাকায় এক জনকেই, উনি আমায় অপেক্ষা করতে বললেন। এদিকে কিছুক্ষণ পরে দেখি, বাকিরা সব টেবিল থেকে কাগজ উঠিয়ে নিয়েছে...পরে চার পাঁচটা যা পরে আছে, হয় তা বিশাল বস্তি এলাকা অথবা এমন, যে জায়গা পরিচিত নয় একেবারেই...
দেখলাম আমার পাশের জনও একাই, যদিও সে এ ভাষায় পুরোপুরি রপ্ত...আমরা নিজেদের মধ্যে অদলাবদলি করলাম। ও আমায় কথা বলাতে সাহায্য করবে, আর আমি ওকে সেখানে নিয়ে যাব।
উল্টেপাল্টে আমি একটা পরিচিত এলাকা খুঁজে পেলাম...আর সেও খুঁজে পেল পুরনো রেলওয়ে কলোনীর কোয়ার্টার ও তারই সংলগ্ন দুপাশের বস্তি। ওতেই রাজি হলাম, ও দুজনে মিলে ঠিক করলাম জায়গা আলাদা হলেও এক সাথে বেরোব। আমাদের সময় সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ৭ টু ৭ মানে সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা, তাঁর মধ্যেই সারতে হবে সব কিছু।
ফোন নম্বর বিনিময় হলো ও ঠিক হলো পরদিন মানে শনিবার ঠিক সকাল সকাল দেখা হবে বাসস্ট্যান্ডে যা আমার ও তাঁর দুজনেরই চেনা।

আমিই আগে পৌঁছোলাম, যদিও সে জানালো অটোতে আছি, আসছি। ভাবছিলাম জিজ্ঞেস করি, কি রঙের পোশাকে - বা আমারটা বলি, যাতে ভিড়ে খুঁজতে হিমশিম না খেতে হয়...যদিও ব্যাপারটা অত কঠিন থাকল না, ওপাশে ঘুরতেই দেখি সে হাত নাড়াচ্ছে।
আমার ম্যাপে একটা ল্যান্ডমার্ক বেশ স্পষ্ট ছিল তা চার্চ। কিন্তু ওই এলাকায় দু-খানা চার্চ, তাই ওতে একটু কনফিউশন বাড়লেও জেরক্স্ এর একটি দোকানে জিজ্ঞেস করাতে খানিক স্বস্তি হলো। গতদিন আমাদের হাতে একখানা করে কপি দেওয়া হয়েছিল ফর্মের আর বাকিটা নিজেদের জেরক্স করতে হবে। প্রথমে তাই করলাম ও এ কাজের “শ্রী গণেশ” করতে এগোতে শুরু করলাম।
চার্চের কাছাকাছি ম্যাপে যে দুটি বসতির ছবি আছে সব মিলিয়ে তা ৫১ খানা ঘর, আর পাশের আরেক বসতিতে এপাশ ওপাশ নিয়ে আরো ২৮ টা... জায়গাটা কনফার্ম করলাম লাগোয়া এক মেডিক্যাল স্টোর্সে গিয়ে। উনি জানালেন, আপনারা একদম ঠিক জায়গায় এসেছেন। ম্যাপ অনুযায়ী এই সেই। তাই ফর্ম ও রাইটিং প্যাড হাতে তৈরি আমি আর আমার সহ বন্ধুটি মার্কার হাতে এগিয়ে চলল।
শুরুতে দরজায় আওয়াজ দিতে গিয়ে নিজের কথাই ভাবছিলাম, এমন অনেকবার হয়েছে কেউ নাম লেখানোর জন্য বা অন্য কোন কাজে এসেছেন অথচ তাদের পুরো কথা না শুনেই দরজা বন্ধ করেছি। আজ নির্ঘাৎ তা আমার সাথেও ঘটবে, তার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলাম।
প্রতি দরজাতে টোকা দিতেই এক এক জন বেরিয়ে এলো... তাদের প্রথম কৌতুহল, আমরা কারা আর কেনই বা এসেছি। যদিও আমার সহ বন্ধুটির ইন্ট্রোতে “মি শিক্সিকা আহে...” – তাদের সাথে কথা বলাটা অনেক সহজ হয়ে গেল।
তবে এত ঘোরাঘুরির পর এই এলাকায় যা খুঁজে পেলাম তাতে না-পড়ুয়া বাচ্চা খুব কম... মোটামুটি সবাই কাছাকাছি স্কুলে যায়। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী তাদের নাম ও মোবাইল নম্বর নিতে হলো...এবং সইও....
আমার কাজ সারতে সারতে ঘড়িতে প্রায় বারোটা, এবার সহ বন্ধুটির কাজ শুরু করতে হবে। ওর জায়গাটাও একেবারে অন্য...তাই অটো ধরতে এগোতেই দেখি আরেক গ্রুপ – এবং কথাকথিতে জানা গেল কাল অত হুটোপাটিতে ওরা জানতেই পারেনি যে ফর্মে এই সমস্ত পরিবারের পুরো ডিটেলস ভরা চাই।

এ শহরে যখন প্রথম আসি তখন “ভাইয়া” শব্দটায় লোকে ঘুরে ফিরে তাকাত। বুঝতে তাদেরও অসুবিধা হতো না, অন্য দেশের পরিযায়ী পাখিরা এ দেশে এসে ভিড় জমিয়েছে। যা হোক আপণ করে নেওয়ার ভাষায় অত ব্যাকরণ রাখতে নেই...তাই আমিও ভাষা বদলালাম না।
অটোওয়ালা আমাদের একদম রেলওয়ে কলোনীর দোরগোরায় উপস্থিত করালো ও আঙুল ঘুরিয়ে দেখিয়ে বলল, “ইয়ে হি হ্যেঁ আপকা ইলাকা”...মানে ম্যাপ অনুযায়ী বরাবর মিল খুঁজে পেয়ে আমরাও মহা খুশিতে।
শুরু হলো তাঁর কাজ আর আমি এতে সহযোগী হাত বাড়িয়ে শুরুতেই এক ঘরের ঘন্টা বাজালাম। দরজার ওপাশ থেকে কম বয়সী একটি মেয়ে বেরিয়ে এলো।
মা বাড়ি নেই। এও বলল, পাশের বস্তি এলাকার বাচ্চাদের উৎপাতে তাঁরা তটস্থ হয়ে আছে। যদিও বেশ কিছু ঘরে ঘন্টা বাজালেও তা খুলল না...বুঝতে পারলাম, দুপুরের ভাত ঘুমে ক্লান্ত...আর বাকি যা পেলাম তা এন্ট্রি করে বেরোতেই যাব, এক বয়স্কা ভদ্রমহিলার সাথে দেখা...তাঁর বহু কমপ্লেন, দুপাশের বস্তি নিয়ে...ঠিক তখনই একটি ১৭-১৮ বছরের ছেলেকে বালতি হাতে এগোতে দেখা গেল। উনি বললেন, আমাদের কোয়ার্টারের পেছনটা এরাই পুরো নোংরা করে ফেলছে। আপনারা প্লিজ এর জন্য ব্যবস্থা নিন।
ওনাকে আশ্বাস দেওয়া হলো, এর পুরো রিপোর্ট আমরা যথাযথ সাবমিট করব।
ওখান থেকে বেরিয়ে আমরা ঢুকলাম বস্তির ঘরগুলোতে... তাদের কথায়, গরীব মানুষদের দেখার কেউ নেই। বাচ্চাদের তাঁরা কাছাকাছি এক মিউনিসিপ্যাল স্কুলে পাঠায় ঠিকই, কিন্তু শৌচালয়ের অবস্থা শোচনীয়। ওনাদেরই একজন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন জায়গাটা, যেখানে নীল-কালো প্লাস্টিক ঘিরে কোনও মতে একটা ব্যবস্থা করা হয়েছে - যদিও তা দিনের বেশিরভাগ সময়ই ভীষণ নোংরা থাকে।
তবে কলোনীর পেছনটার অমন অবস্থা নিয়ে তাঁরাও নীরব থাকল। যদিও আবদার করল এক পাকাপাকি ব্যবস্থার।
আমাদের কাজ শেষ হলো প্রায় সাড়ে তিনটেয়। ফোনেই খবর পেলাম আমাদের অনেক বন্ধুরা তাদের কাজ সেরে বাড়িও ফিরে গেছে। অতএব দেরী না করে আমরাও গতদিনের সেই মিটিং স্থলে পৌঁছোলাম যেখানে অনেক আগে থেকেই গাইকওয়াড স্যার অপেক্ষায় ছিলেন।
উনি আমাদের স্কুলের লিস্টের নামে একে একে টিক মেরে কাগজ জমা করছিলেন। আমাদের নামেও টিক পড়ল।
দেখলাম অন্যরাও এসেছে। ওদের জন্য অপেক্ষা করে একসাথে বেরোলাম...তারপর যে যার রাস্তায়...আমার সহযোগী বন্ধুটি বলল, “আজ পুরা দিন আপকে সাথ বহত আচ্ছা গয়া”...
আমিও ঠিক এ কথাই বলতে চাইছিলাম, কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার কথা আসেনা, পুরনো অভ্যাস...আর সেই অভ্যাসেই শুধু “বাই” করলাম...
ঘরে ফিরে দেখি আমার অ্যাপার্টমেন্টের ফ্লোরেও কেউ নিশান লাগিয়ে গেছে।
যা হোক, কদিন পর খবরের কাগজ হাতে গর্ব হলো, যেখানে লেখা ছিল এই সার্ভের সফলতা। আমাদের টিম এমন বেশ কিছু বাচ্চাদের খুঁজে পেয়েছিল যারা এখনও পর্যন্ত স্কুলে পা রাখেনি এবং উল্ল্যেখযোগ্য এদের বেশির ভাগই অন্য প্রদেশ থেকে আসা, হিন্দি ভাষী, খেটে খাওয়া মানুষ জনের পরিবার...
এবার তাদের জন্য কিছু করে দেখাতে হবে, আর এমনটাই হতে চলেছে এই সার্ভের পর...


অলংকরণঃ সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

ফেসবুক মন্তব্য