ঘুম

কল্লোল রায়



মানুষের জীবনে ঘুম একটি অতি পবিত্র ও মূল্যবান অধ্যায়। তাই এঁকে নিয়ে হেলাফেলা করা অত্যন্ত অন্যায়। এই উক্তিটি বহু শতাব্দী আগে গ্রীক দেশের কোনো এক মহাপুরুষ বলে গিয়েছেন। দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁর নাম সবাই ভুলে গেলেও তাঁর বাণী আজও আমাদের কাছে অমর হয়ে রয়েছে। 

মানুষের জীবনে কম বেশি এক তৃতীয়াংশ জুড়ে আছে ঘুম। একবার যে ঘুম হেলাফেলা করেছে সে মরেছে। পৃথিবীর সবথেকে অখুশি হলো সেই মানুষ, ঘুম যার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে। ছোটদের দেখুন কত হাসিখুশি, সবসময় ছটফটে আর ঘুমের ব্যাপারেও কোনো বাছ বিচার নেই। যেখানে সেখানে, অন্যের বাড়িতে, বাসস্ট্যান্ডে, ভীড় বাজারের মাঝে, কাঠ ফাটা রৌদ্রে, গাছের তলায়, ইস্কুলে অথবা শ্রাদ্ধবাড়িতে যেখানেই সুবিধা পাবে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়বে। যত মুশকিল আমাদের মতো বড়োদের  নিয়ে। কারোর নিজের বিছানায় সাড়ে বাইশ ডিগ্রী এঙ্গেলে পা মেলে না শুলে ঘুম হয় না, কারুর শুনেছি ঘুমোতে যাবার সময় বেডরুমে বাংলা সিরিয়াল চালিয়ে দিতে হয় আবার অনেকেরই তো কড়া কড়া ওষুধ লাগে।

পৃথিবী জুড়ে ঘুম নিয়ে অসংখ গল্প ও রূপকথা ছড়িয়ে আছে। কে নাকি একবার পাহাড়ের উপর গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ফিরে এসে দেখে মা বাবা মরে ভূত হয়ে গিয়েছে, ভাই বোনেরা শুধু বড়ো হয়নি বুড়ো হয়ে সাদা সাদা গোঁফ দাড়ি বেরিয়ে গিয়েছে। আর যে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে কিন্তু কচি খোকাটি রয়ে গিয়েছে। আমি জানি, সংঘাতময় দাম্পত্য জীবন থেকে উদ্ধার পেতে মাঝেমধ্যে আপনাদের অনেকেরই ইচ্ছা করে যে, চলো যাই পাহাড়ের উপরে আর দি লাগিয়ে এইরকমই একটা জম্পেস ঘুম। বহু বছর পরে ঘুম ভেঙে যখন আপনি বাড়িতে ফিরে আসবেন, তখন দেখবেন যে গিন্নী গত হয়েছেন বহু কাল আগে, ছেলেমেয়েরা সব বড়ো হয়ে যে যার পায়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে, জীবনে আর কোনো চাপ নেই। সুতরাং আপনি আবার জীবনটাকে শুরু করতে পারেন নতুন ভাবে।

কোনোদিন যদি ঘুমের অলিম্পিক হয় তাহলে বাঙালিরা অবশ্যই গোল্ড মেডেল পাবে। বাঙালিরা ঘুম ব্যাপারটাকে একটা শিল্পের পর্যায় নিয়ে গিয়েছে। সবাই বলে বাঙালি বলতে বোঝে ইলিশ মাছ, মিষ্টি দই, রসগোল্লা, সন্দেশ আর রবীন্দ্রসঙ্গীত। আমার বিশ্বাস রবিবারে মাংসভাত খেয়ে যে বাঙালি ভাতঘুম নেন না তিনি প্রকৃত বাঙালিই নন, কোথাও একটা ক্রস ব্রিডিং হয়ে গিয়েছে।

ঘুমের কথা এলেই আমার খুব নস্টালজিক ফিলিং হয়। ছোটোবেলা থেকে বড়োবেলা অবধি কত কথা যে মনে পড়ে যায়। 

আমাদের বাংলা মিডিয়াম ইস্কুলে এক ইংরাজীর মাস্টারমশাই ছিলেন। তিনি খুব ইংরেজিতে লেকচার দিতে ভালোবাসতেন কিন্তু স্থান কাল নির্বিশেষে ঘুমিয়ে পড়তেন। একবার এনুয়াল ফাংশানে হেডমাষ্টারমশাই ওনাকে স্টেজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। প্রথমে ইংরেজিতে একটু স্কুলের ব্যাপারে ইন্ট্রো দিয়ে তারপরে স্টেজে বসা বাকি গণ্য-মান্য ব্যক্তিদের সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে, এই ছিল ওঁর কাজ। তা মাস্টারমশাই স্টেজে উঠে বক্তৃতা শুরু করলেন আর এক মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লেন। লেকচার কিন্তু চলতেই থাকলো। আমাদের মতন অভিজ্ঞ ছাত্ররা ছাড়া বাকিরা কেউই  প্রথমটায় ব্যাপারটা ঠিক ধরতে পারেনি। ইস্কুলের কথা বলতে গিয়ে যখন উনি রবার্ট ক্লাইভ আর সিরাজুদৌল্লার মারপিট আর তারই সাথে প্রিপোজিশন আর এন্টোনিম বোঝাতে শুরু করলেন, তখন হেডমাষ্টারমশাই-এর টনক নড়ল। 

একবার এক বাঙালি ম্যাজিশিয়ান মেক্সিকোতে ম্যাজিক দেখাতে গিয়েছিলেন। এমনিতেই জেট ল্যাগ, তার উপর দিন নেই রাত নেই খালি ম্যাজিক শো। চোখ ফুলে লাল লাল, খুলে রাখাই দুষ্কর। এদিকে ওনার বজ্রাসনে বসে বাতাসের উপর ভাসতে ভাসতে আকাশে উঠে যাওয়ার ম্যাজিক খুব জনপ্রিয় হয়ে পড়েছে।  হাজার হাজার লোক আসছে স্পেশালি এই ম্যাজিকটা দেখতে। একদিন নাকি এইরকমই একটা ম্যাজিক শোতে আকাশের উপর উঠতে উঠতে উনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এদিকে নিচে খোঁজ খোঁজ, কোথায় গেলেন। থানা, পুলিশ, এম্বুলেন্স, প্রেস। পুরো দুইদিন কোনো খোঁজ নেই। পরে ইন্টারপোলের মাধ্যমে জানা গেল যে উনি এখন ঘানায়। তা ঘানায় কিভাবে গেলেন সেটাও খুব আশ্চর্যের ঘটনা। পরে সাংবাদিকরা ইন্টারভিউ নিয়ে জানতে পারলো যে, ঘুম ভাঙার পরে উনি দেখেন যে উড়তে উড়তে অনেক উপরে চলে এসেছেন, কিন্তু কোথায় এসেছেন তা বুঝতে পারেননি। হঠাৎ দেখেন সামনের থেকে একটা প্লেন আসছে। তারপরে পাইলটকে অনেক অনুনয় বিনয় করাতে ওনাকে প্লেনে উঠতে দিয়েছিলো। সেই প্লেনে ওনাকে নাকি ঘানায় নামিয়ে দিয়ে  অন্য কোথায় চলে গিয়েছিল, তা উনি জানেন না।  
   
একবার শুনেছিলাম আমাদের পাশের পাড়ার এক মেসোমশাই ছিপ হাতে রবিবারের সকালে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। গাছের তলায় বসে বহুক্ষণ ছিপি হাতে অপেক্ষা করেও মাছেদের কোনো হদিশ না পেয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখতে লাগলেন যে বাড়িতে বসে গরম ভাতে ঘি দিয়ে কাঁচা লঙ্কা মেখে রুই মাছ ভাজা খাচ্ছেন। তখনও বাজারে মোবাইল আসেনি যে বাড়ি থেকে বৌ দশবার ফোন করে প্রাণ অতিষ্ট করে তুলবে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেলো। হটাৎ একটা বড়োসড়ো মাছ টোপ গিলে সুতোয় দিলো এক মোক্ষম টান। আর যাবে কোথায়, মেসোমশাই সোজা এঁদো পুকুরের জলে। নয়-দশ ঢোক কচুরিপানা মেশানো জল খেয়ে, চোখ খুলে, উনি প্রথমেই মাছটাকে জাপ্টে ধরলেন। ব্যাটা পালাবি কোথায়। মিনিট বিশেক মাছে-মানুষে জলযুদ্ধ হবার পরে অবশেষে মাছবাবাজী মানুষের কাছে হার মানল। সেদিন মেসোমশাই কাদা জল মেখে, আড়াই কিলো ওজনের রুই মাছ কোলাপাঁজা করে সন্ধেবেলায়  বীরের মতো বাড়ি ফেরার পরে মাসিমার মুখটা ঠিক কিরকম হয়েছিল সেটা জানা যায়নি। খালি এটা জানা গিয়েছিলো যে পরে মেসোমশাই বন্ধুদের দুঃখ করে বলেছিলেন, বুঝলি রবিবারের দুপুরের অমন সুন্দর ঘুমটা একদম চটকে গেল। 

কল্যাণ বাগচী, কানপুরে এক বড় ফ্যাক্টরীর ম্যানেজার। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি। রাতে ফ্যাক্টরী লাগোয়া কলোনীতে এসে মরার মতো ঘুম। আবার সকালে দৌড়। এই হলো নিত্যদিনের রুটিন। ছেলে নাগপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। সহধর্মিনী বিশাখা বাগচী ঘর সামলানোর পরে কিটিপার্টি, আর ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। শনিবার হাফডে, দুপুরে বাড়িতে এসে ভাত খেয়ে একটা জম্পেস ঘুম লাগানো কল্যাণবাবুর বহুদিনের নেশা। গতবছর গৃষ্মে  এরকমই এক শনিবার সকাল এগারোটার সময় বিশাখাদেবী ছোট বোনের কাছ থেকে ফোন পেলেন যে আগামী কাল মানে রবিবার, ওনার ছোট বোন দিল্লি থেকে সপরিবারে দুদিনের জন্য কানপুর আসছেন। হটাৎই কর্তার একটা কাজ পড়ে গিয়েছে কানপুরে তো সেই সুযোগে দুদিন দিদির বাড়ি ঘুরে যাবে। বিশাখাদেবী হাঁ হাঁ ঠিক আছে বলে ফোন ছেড়ে টেনশনে পড়ে গেলেন। আরে, বাড়িতে তো কিচ্ছু নেই। কল্যাণ বাবু রবিবার ছাড়া অন্যদিন বাজারে যান না। শনিবারতো কোনোমতেই না।   ওদিকে সবাই কাল সকালেই এসে পড়বে। ছোটটার যদি কোনো কান্ডজ্ঞান থাকতো, কথাটা এক দুদিন আগে বলতে পারলি না। যাহোক আর কি করা যাবে। বিশাখাদেবী ঠিক করলেন যে উনি বাড়ি ফিরলে দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পাট মিটিয়ে একাই বেরোবেন শপিং করতে। গাড়িটাতো আছে। 

দুপুর দেড়টায় খাওয়াদাওয়া করে কল্যাণবাবু শুতে চলে গেলে  বিশাখাদেবী শান্ত মনে ফর্দ বানাতে বসলেন। দুপুর আড়াইটে তিনটের মধ্যে সব কাজ সেরে, তৈরী হয়ে কোম্পানির দেওয়া গাড়িটা নিয়ে উনি বাজার করতে বেরিয়ে গেলেন। ড্রাইভার আছে তো চিন্তা নেই দু তিনটে হাইপারসিটি আর ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ঘুরলে সব জিনিসের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

সন্ধে সাতটার মধ্যে সব বাজার টাজার করে গাড়ির ডিকি ভরে জিনিস নিয়ে বিশাখাদেবী কলোনিতে ফিরে এলেন। দোতলা বাড়ি।  সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মনে পড়লো, এই যা: বেরোনোর সময় ডুপ্লিকেট চাবিটা আনতে ভুলে গিয়েছেন। ঠিক আছে। কর্তাতো আছে বাড়িতে, নিশ্চই এতক্ষণে নিজে চা বানিয়ে নিয়ে ঘরে বসে টিভি দেখছেন। টুং টাং, বেল বাজালেন। কোনো সাড়াশব্দ নেই। দশ সেকেন্ড অপেক্ষা, আবার বেল।  তিন চার বার এক সাথে। নো সাউন্ড। কি হলো বাইরে বেরিয়েছে নাকি। না, বাথরুমে। কান পাতলেন দরজায়। ভিতরে সব চুপ চাপ। টিভির শব্দ নেই। খালি ভিতর থেকে একটা মিহি গলার আওয়াজ ভেসে আসছে ফ্রু , ফ্রু। এই আওয়াজ খুব চেনা। মানে কল্যাণ বাবু এখনো নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন। নিমেষের মধ্যে বিশাখা দেবীর মাথায় জ্বলে উঠলো প্রতিহিংসার আগুন। উনি এতো খেতে খুটে ঘাম ঝরিয়ে বাজার করে আনলেন আর বাবু এখনো ঘুমোচ্ছেন। আর কোনো দয়ামায়া নেই। প্রথমে দরজার হুড়কোতে  খট খট, তারপরে হাতের চড় চাপড়, সবশেষে লাথি পড়তে লাগলো দমাদম। চারদিকে এবার অতি উৎসাহী কলোনীর লোকজন জড়ো হতে লাগলো একে একে। সবাই মিলে দরজা ধাক্কাতে লাগলো। নাম ধরে চিৎকার করে ডাকা ডাকি চলতে লাগলো। কয়েকশো মিসকল গেলো ওনার ফোনে। কিন্তু কি হবে। ফোন তো উনি সাইলেন্ট মোডেই রাখেন বরাবর। কেউ একটা পরামর্শ দিলো, দিদি বেডরুমে ঢিল ছুড়ে দেখবো? বিশাখাদেবী তখন মাথায় হাত চেপে ফ্ল্যাটের সামনে সিমেন্টে বাঁধানো বেঞ্চিতে বসে পড়েছেন। আর ততক্ষনে পাড়া প্রতিবেশীরা এই সমস্যার পুরো দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে নিয়েছে। সুতরাং ঢিল ছোড়ে শুরু হলো।  আর পটপট জানলার কাঁচ ভাঙলে শুরু হলো। গোটা পাঁচ ছয়েক জানলার কাঁচ ভাঙার পরেও ভিতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে প্রতিবেশীরা ক্ষান্ত দিলো। কেউ একটা পরামর্শ দিলো যে চলো দরজা ভেঙে ফেলি। এবার বিশাখাদেবী হা হা করে উঠলেন। আরে, আপনারা করছেন কি কাল সকাল বেলায় বাড়ি ভর্তি অতিথি এসে যাবে, তখন আমি ভাঙা সদর দরজা নিয়ে কি করব? কেউ একটা দমকলে খবর দিল হোস পাইপ দিয়ে গায়ে জলের ছিটে মারবে বলে। কেউ মেইন সুইচ অফ করে দিল যাতে ফ্যান বন্ধ হোল গরমের চোটে ঘুম ভেঙে যায়। এবার বিশাখাদেবী হুঙ্কার ছাড়লেন ড্রাইভারকে, বাহাদুর তুম রেইন ওয়াটার পাইপ পাকাড়কে উপর যাও আর অন্দরসে দরওয়াজা খোল দো।
  
রাত তখন নটা। বাহাদুর পাইপ বেয়ে তড়তড়িয়ে ব্যালকনিতে উঠে পড়লো।  ব্যালকনির দরজা খোলাই ছিল। ভিতরে গিয়ে বেডরুমে ঢুকে দেখে সত্যি বাবু নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। তাড়াতাড়ি সাহেবকে ধাক্কা দিয়ে বললো, সাব উঠো মাইজি আপকে লিয়ে কবসে বাহার মে ইন্তেজার কর রাহা হ্যায়। 

লোক মুখে শোনা যায় যে কল্যাণ বাগচী ঘুম থেকে ধড়ফড় করে উঠে প্রথমেই বাহাদুরকে এই মারেন তো সেই মারেন, তুমহারা কোই আকাল নেহি হ্যায়, তুম ফ্যাক্ট্রিকা গন্ধা জুতা প্যাহানকে হামারা বেডরুমপে খাড়া হো। মালুম হ্যায় ম্যাডামকো ইস বাতোকো পাতা চল গিয়া তো তোমারহা নৌকরী খা লেগা।  


অলংকরণঃ কল্লোল রায়     

ফেসবুক মন্তব্য