নোঙ্গর

বৈশালী চ্যাটার্জী



রিক্সা থেকে নামতে গিয়ে ব্যাপারটা চোখে পড়ল বহ্নির। কী কান্ড! রজতের ঘরে পরার চপ্পলখানা পায়ে দিয়েই চলে এসেছে। এখন কী করা যায়? দামী কাঞ্জিভরমের সাথে দু'সাইজ বড় নীল জেন্স চপ্পল! আহা! কী খোলতাই না দেখাবে! বিয়ে বাড়িতে কনে ছেড়ে তাকে দেখতেই লোকে হুমড়ি খেয়ে পড়বে নির্ঘাত।

এখন আর বাড়ি ফেরার সময় নেই। নৈহাটীটা তো গেলই, কল্যাণী সীমান্তটাও বেরিয়ে যাবে তাহলে। বিনয়ের মুদির দোকানের পাশে একটা ঘুপচি মতন জুতোর দোকান আছে না স্টেশন রোডে? কোনোদিন ঢোকেনি দোকানটায়...
আবার রিক্সায় উঠে ওখানেই যেতে বলে আলিকে।

"কেন? কী হল বৌদি?"
"আর কী হল... তাড়াতাড়ি চল তুমি..."

সকালে উঠে কাজের ফাঁকে ভেবে রেখেছিল হাতের কাছে থাকা বটলগ্রীন বিষ্ণুপুরি সিল্কটা জরিপাড় কালো ব্লাউজ দিয়ে ম্যানেজ করে পরে চলে আসবে।
এমন সময় নীতার ফোন, "কী পরবি তুই?"
"ওই একটা সিল্কটিল্ক... "
"মানে? খবরদার! ভাল কিছু যদি না পরিস, তোকে নিয়েই যাব না দেখিস।"
"এর থেকে ভাল কিছু কী পরব?"
"তোর মেরুন কাঞ্জিভরমটা পর না... "
"ওটা পরে ক্লাস করব কী রে!"
"দূর ছাই! পরে ক্লাস করবি কেন? ব্যাগে নিয়ে চলে আয়... আর ম্যাচিং ব্লাউজ না নিয়ে এলে গলা টিপে মেরে ফেলব তোকে আজ..."

বুলাকে গত মাসে সামান্য কারণে ছাড়িয়ে দিলেন বিনতা। ও তাও দুটো বছর টিকল। নইলে কেউ তিন মাস তো কেউ পাঁচ মাসেই তিতিবিরক্ত হয়ে বলে, "না বৌদি, মাসিমা বড্ড টিকটিক করে। এরম করলে কাজ করা যায় না। তুমি অন্য লোক দ্যাখো... "
এ সময় বহ্নির পরীক্ষার খাতা দেখার চাপ। নতুন রাঁধুনি ঠিক করতে গেলেই হাজারো খুঁত খুঁজে বার করতে হাত ধুয়ে লেগে পড়েন। অথচ দিব্যি বসে আছেন সুস্থ মানুষ, তাড়াহুড়োর সময়ও একটা লঙ্কার বোঁটা ছাড়িয়ে উপকারে নেই। চাতালের, বাথরুমের কল খুলে রেখে বেমালুম চলে আসেন। জল পড়ে যেতেই থাকে। মনে করালে ঝাঁঝিয়ে ওঠেন, "থামো তো! একটু জল, তার আবার এত! তোমাদের সবেতেই বেশী বেশী।"

আজ ঝর্ণাদিও ডুব মেরেছে। সকাল থেকে সংসারের যাবতীয় সেরে আর নিজের সাজের পারিপাট্য নিয়ে ভাবার ইচ্ছেই থাকে না। আজ আবার রজত আসবে। সুতরাং চার- পাঁচ পদের কম রান্না সম্ভবই নয়।
নীতা শুনলেই বলে, "সব সম্ভব। তুই চাইলেই।"

ট্রেনে বসার জায়গাটা পেতেই বসে মাথাটা পিছনে হেলিয়ে দেয় বহ্নি। শরীর যেন ছেড়ে দেয়, চোখ বুজে আসে। কাল রাত আড়াইটে পর্যন্ত জেগে খাতা দেখেছে। ঘন্টা তিনেক ঘুমিয়েই আবার ওঠা। শরীরের আর দোষ কী? ফোনটা বাজতেই থাকে ব্যাগে। ধরতে ইচ্ছে করে না। কেটে যাবার পরেও আবার বেজে ওঠে। নাছোড়বান্দা এটা কে? অচেনা নম্বরটা ধরবে কিনা ভেবেও ধরতেই ওপাশে একটা মিনমিনে পুরুষ কণ্ঠ বলে ওঠে, "বৌদি আমি বুলার বর।"
"বলুন... " নিস্পৃহভাবে জবাব দেয় বহ্নি।
"আপনাকে একটু সতর্ক করার ছিল।"
"কেন?"
"আজ্ঞে বুলা মেয়ে মোটেই সুবিধের নয়। আপনাদের ঘরের কথা সব পাঁচকান করে বেড়ায়। তাছাড়া চরিত্রও.... আপনি হয়তো জানেন না। চাকরি করেন, বাইরে অনেকটা সময় থাকেন... "
বহ্নি সোজা হয়ে বসে। বুলার যে কাজ চলে গেছে লোকটা তার মানে জানে না। কিন্তু চরিত্র খারাপ বলে সতর্ক করছে কেন? রজত কী কিছু গড়বড় করেছে? শিলিগুড়ি ট্রান্সফার হবার পরে দু'সপ্তাহ অন্তর দিন দুয়েকের জন্যে বাড়ি আসে, মাঝে মাঝে সপ্তাহের মধ্যেও। গত সেপ্টেম্বরে মিলু দিল্লীতে চলে যাবার পর থেকে বুলা বেলায় আসছিল। বহ্নি শ্বশুর- শাশুড়ির জন্যে সকালের জলখাবারের রুটি -তরকারি করে তাই-ই একটু খেয়ে স্কুলে চলে আসত। আর ভাবতে ভাল লাগেনা বহ্নির। লোকটা ওদিকে ফোনে একই কথা বিভিন্নভাবে বকেই চলেছে।
"আচ্ছা, বুঝেছি." বলে ফোন কেটে দেয় ও। মাথায় একটা শেকলের ঝনঝনানি টের পায় বহ্নি, একটা কিছু ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার, বদলে ফেলার তাগিদ।

হঠাৎ উত্তরবঙ্গে ট্রান্সফার হওয়ার আগে মাসখানেক ধরেই ফোন এলে কথা বলতে বাথরুমে চলে যাওয়া, হঠাৎ ফোন করতে করতে বহ্নি এসে পড়লে ফোন কেটে দেওয়া ইত্যাদি ভালই নজরে পড়ছিল। একদিন সৌমেন্দুদাকে ফোন করেছিল বহ্নি, "ওকেই শুধু কেন ট্রান্সফার করল সৌমেন্দুদা? আমি জানি রজত খুব চালাক। আপনিও কী কিছু লুকোচ্ছেন ? "
"না না.... তা কেন?... এমনিই... হঠাৎই.... অনেকসময় করে এরকম... "
"কই আর কারোর তো এরকম শুনিনি? "
"আমি ঠিক জানিনা বহ্নি। তুমি আর কিছু জিজ্ঞেস কোরো না আমায় প্লিজ... "
খুব আতান্তরে পড়ে গেছেন ভালমানুষ সৌমেন্দুদা। তিনি যে সবই জানেন গলার স্বর শুনেই বুঝেছিল বহ্নি।
কিন্তু বুলার বর ওকে কী জানাতে চাইল? সবাই সব জানে, নাকি লোকটা বুলাকে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে? হঠাৎ বহ্নির বড় অনুকম্পা জাগে লোকটার প্রতি।

কেন জানি রজতের ব্যাপারে বড্ড নির্লিপ্ত লাগে আজকাল। আগে একটা সুন্দর লেসের কাজ করা ঢাকনার নিচে রংচটা সম্পর্কটাকে ঢেকে রাখত দিনের পর দিন। এখন আর ইচ্ছে করে না। কয়েকদিন আগেই পর পর দুদিন একই স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙল শেষ রাতে। একটা নোঙ্গর ফেলা জাহাজ। বন্দরের কাছেই। নিশুতি রাতে অল্প দুলুনিতে দুলতে থাকা জাহাজটা যেন জীবন্ত। ধীরে ধীরে দুলুনি বাড়ছিল, জাহাজটা রেগে উঠছিল যেন। একটানা একটা শেকলের ঝনঝনানি ক্রমশ বাড়তে বাড়তে তীব্র হয়ে উঠেছিল। শেষে একসময় মনে হল জাহাজটা নোঙ্গর ছিঁড়ে ফেলবে। কী একটা অজানা ভয়ে, চরম উৎকণ্ঠায় বহ্নি চেঁচিয়ে বলতে চেয়েছিল, "না না, থামো, থামো এবার.." গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হয়নি। শুধু ঘুমটা ভেঙে গিয়ে দেখেছিল নাইটিটা ঘামে সপসপে ভিজে।


প্রিয়ার বার তিনেক ফোন করা হয়ে গেছে, "কখন আসছিস তোরা?"
"আমরা সাজছি... "
"বন্ধুর ভাইয়ের বৌভাতে এত কী সাজচ্ছিস রে বুড়িগুলো? "
"খবরদার! বুড়ি বলবি না। আমরা কচি সংসদের সদস্যরা এই পৌঁছলাম বলে।"

স্কুল থেকে টোটো বা অটোতে অনুষ্ঠানবাড়ি মিনিট দশের মামলা। স্টাফরুমে বেশ হাসিঠাট্টা চলছে। সবাই মোটামুটি রেডি। বহ্নি শাড়িটা পাল্টে একটা হাতখোঁপা করছিল। মেখলা জোর করে চুল বেঁধে দিতে এল।
"কী অবস্থা গো চুলের! একটু যত্ন করো!"
বহ্নির মনে পড়েছিল বাগানের গাছগুলোর কতদিন যত্ন করা হয় না। গোলাপের ডালগুলো ছেঁটে একটু সার দেওয়া দরকার। পাখিদের জন্যে জল রাখবে ভেবেও একদম ভুলে গেছে। ভুলোর জন্যে রাখা বাসি রুটি দুটো তাড়াহুড়োয় দেওয়া হয়নি। বিনতা কি দিলেন না ড্রেনে ফেলে দিলেন কে জানে!

নীতা একটা মেরুন লিপস্টিক সামনে রেখে বলে, "লাগিয়ে নে।"
"আমার জন্যে এনেছিস?"
"আজ্ঞে, জানি তো আপনি ভুলে যাবেন।"
যত্ন করে কফি কালারের লিপস্টিক লাগানো নীতার ঝকঝকে হাসি থেকে যেন আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়ছিল। বহ্নির সব থেকেও এই আত্মবিশ্বাসটাই যেন নেই।
"আটটার মধ্যে বেরিয়ে আসব কেমন?" ওর কাঁধ পর্যন্ত ছেড়ে রাখা চকচকে সিল্কের মতন চুলের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বহ্নি বলে।
"কেন? এত তাড়া কীসের তোর? নটার মধ্যে বাড়ি ঢুকতেই হবে? দশটা বা সাড়ে দশটা হলে ঢুকতে দেবে না?"
"না রে, এমনি কিছু না। রজত এসেছে আজ। রাতের রান্না সবই করা। খানকতক রুটি করব গিয়ে।"
"তুই সকালে রান্না করেছিস, সারাদিন স্কুল করলি আবার রাতের রুটিকটাও তোকেই করতে হবে? কেন শাশুড়িকে বলে আসতে পারলি না করে রাখতে? রজতও তো পারে করে নিতে!"
"ও বাবা! শাশুড়ির ছটা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত টানা সিরিয়াল।"
"আর তোর সারাদিন টানা ডিউটি?" নীতার গলা চড়তে থাকে, "শোন্ বহ্নি তোদের এসব ন্যাকামি দেখলে না পিত্তি জ্বলে যায়। তোদের এই সব কিছুতে জড়িয়ে থাকতে চেয়ে ছড়িয়ে লাট করা জাস্ট অসহ্য।"
"তোমার ওপর নাই ভুবনের ভার... বুঝলে বহ্নিদি! এবারে একটু আলগা দাও। এত বছর তো করলে।" অদিতি পাশ থেকে ফুট কাটে।
"আরে বহ্নিদি করতে দেয় না তাই। করতে বললেই করে। এইতো শুভ্র প্রায়ই রাতে ডিমের ঝোল বা চিকেনটা রাঁধে। সাথে আমি একটু ভাত করে নি। অনেক সময় ও-ই বসিয়ে দেয়।" মেখলা পিছন থেকে বলে।
বহ্নি চুপ করে হাতের ছোট্ট আয়নায় চোখের কোলের গাঢ় কালিটা দ্যাখে। সত্যিই ও কোনোদিন করতে বলেনা কেন? বলার জোর পায় না? নাকি সংসারে প্রতিনিয়ত ভাল হবার চেষ্টা এটা?
এত করে কী পায়? নাকি এভাবে চলাটা একটা অভ্যেস? একটা শিকলের ঝনঝনানি চলে মাথার ভেতর, টানা চলতেই থাকে...



রজত সাড়ে আটটা নাগাদ ফোন করল, "বেরিয়েছ? "
তখন ওরা খেতে বসেছে। বহ্নি সংক্ষেপে, "হ্যাঁ এইতো।" বলতেই কানে এসেছিল বিনতার গলা, "তাড়াতাড়ি আসতে বল! এসে রুটি করলে তবে তো তোর বাবাকে খেতে দেব। মানুষটার বয়স হচ্ছে..."
রজত আর কিছু বলার আগেই বহ্নি ফোনটা কেটে দিয়েছিল।
নীতা জিজ্ঞাসু মুখে তাকিয়েছিল।
"ওই রুটি... "
পোলাওটা নাড়াচাড়া করছিল শুধু, খেতে ইচ্ছে করছিল না বহ্নির।
"কিনে নিতে বল..."
"ওরা কেনা রুটি খেতে চায় না।"
"বানাতেও চায় না সেটাও বল!"
ফিকে হাসিটা ভাল ফুটছিল না বহ্নির মুখে।
"এভাবেই মর তুই!" নীতা চাটনীতে মন দিয়েছিল।

অটোস্ট্যান্ডে এসে কথাটা কানে গেল ট্রেনের গন্ডগোল।
"রাত নটা বাজে এখনই। ইশ!"
"আমার ওখানে চল। কাল স্কুল করে একবারে চলে যাবি।"

নীতার বাড়ি স্টেশনের কাছেই। বাকিরাও দু তিনটে স্টেশন দূরত্বে, বাস বা অটো করেই চলে যেতে পারে। মেখলা ওর বরের বাইকে চলে যাচ্ছে। শুধু বহ্নিরই সাতটা স্টেশন পেরিয়ে। ট্রেন ঠিকঠাক চললে এ আর এমন কী? কিন্তু....
স্টেশনে থিকথিক করছে মানুষ। দুটো ট্রেন ছেড়ে দিতে হল, এত ভীড়। নীতাও স্টেশনে এসেছে। মিলু রোজকার মত ফোন করে সব শুনছিল, নীতা পাশ থেকে বলল, "তোর মা ভীষণ অবাধ্য রে মিলু। তখন থেকে বলছি আমার বাড়ি যেতে। এত রাতে কখন ট্রেনে উঠতে পারবে..."
মিলুও ওপাশ থেকে সায় দেয়, "কী করছো মা? নীতা মাসির বাড়ি চলে যাও। আর দাঁড়িয়ে থেকো না।"
"আচ্ছা" বললেও বহ্নি সেই দাঁড়িয়েই থাকে। নীতাকে বলে, "তুই যা না! স্টেশনভর্তি লোক। তোর দাঁড়াবার কী? "
"সেই, ওরা তো সব্বাই তোর মামা- মাসি... আচ্ছা কাল ভোরেও তো আমার ওখান থেকে বাড়ি চলে যেতে পারিস। গিয়ে পঞ্চব্যঞ্জন রেঁধে আবার হাঁপাতে হাঁপাতে স্কুলে আসবি। তাই চল না হয়।"
নীতার কথার ভঙ্গীতে হেসে ফ্যালে বহ্নি। তখনই আবার ফোন বাজে। আবার রজত।
"তোমার আর কত দেরী? রাত দশটা বাজতে চলল!"
"ট্রেনের ভীষণ গন্ডগোল। ভীড়ের জন্যে উঠতেই পারছি না।"
"আশ্চর্য! এখনো স্টেশনে? বাড়ি ফিরতে তো রাত ভোর হয়ে যাবে! এতক্ষণ কী করছিলে?
ফুর্তি দেখছি ফুরোচ্ছেই না! বাবা না খেয়ে বসে আছে... "
ফুর্তি! কথাটার শ্লেষে মাথাটা যেন ঝনঝনিয়ে উঠল। কয়েক মুহূর্ত সামলাতে নিল বহ্নি। তারপর ফোনটা মুখের কাছে নিয়ে খুব দৃঢ় স্বরে বলল, "আমি নীতার বাড়ি যাচ্ছি। কাল একবারে স্কুল করে ফিরব। আমার ফোনে চার্জ নেই। কল করলে পাবে না। রাখছি।"
ফোনটা ব্যাগে পুরে নীতার পিঠে হাত রাখে বহ্নি। খুব শান্ত গলায় বলে, "চল, তোর বাড়িতেই থাকব আজ।"
"সত্যি? "
"একদম... বন্দরের কাল হল শেষ।"
ভীড় ঠেলে এগোতে এগোতে বহ্নি গভীর একটা শ্বাস নেয়, নোঙ্গর তুলে ফেলা জাহাজটা এবার নিশ্চয়ই তার ইচ্ছেপাড়ি জমাবে।



অলংকরণঃ কল্লোল রায়

ফেসবুক মন্তব্য