পায়েস

অর্পিতা বোস




সকালে চা করে রোজকার মতোই একটা কাপ স্ত্রী পৌলমীর ছবির সামনে রেখে নিজের কাপটা টেবিলের ওপর রেখে জানালাটা খোলেন সব্যসাচী রায়। ভোরের আলোয় গেটের সামনের লাল কৃষ্ণচূড়া গাছে বসে কোকিলের ডাকটা আরও একাকিত্বের জানান দিয়ে যাচ্ছে যেন। সামনের ব্যস্ত রাস্তাটা লকডাউনের জন‍্য প্রায় জনশূন্য। আজকাল আর হাঁটতেও বেরোন না। বিকেলে একটু ছাদে পায়চারী করেন। পৌলমীবিহীন নিঃসঙ্গ জীবনে আরো একাকী হয়েছেন এই করোনার জন্য লকডাউনে। যদিও পৌলমী চলে যাওয়ার পরেও সোনাই আর বৌমা-রিমি বারবার বলেছিল ওদের সাথে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এই বাড়ি জুড়ে তাঁর অনেক স্মৃতি, সেসব ফেলে কেন যাবেন! এখানেই তাঁর হাতে হাত রেখে পৌলমীর আসা, তারপর সোনাই এল। সোনাইয়ের বড় হওয়ার স্মৃতি এবাড়ির আনাচ কানাচে ঘোরে। তবু বিয়ের পর সোনাইয়ের নতুন ফ্ল‍্যাটে চলে যাওয়াটা তিনি মনে মনে মেনে নিয়েছিলেন। অনাথ আশ্রমে মানুষ হওয়া রিমির সাথে তার ছেলের প্রেমের সম্পর্ককে মান্যতা দিতে তিনি মোটে রাজিই ছিলেন না। পৌলমীর জেদের কাছে হার মেনে বিয়েতে রাজি হলেও মনে মনে আজও রিমির সাথে একটা ঠাণ্ডা সম্পর্ক আছে। তাই বিয়ের পর ফ্ল‍্যাটে নতুন সংসার পাতাকে তিনি মেনেই নিয়েছেন। পৌলমী চলে যাওয়ার পর রিমিই তার বেশি খোঁজখবর নেয় কিন্তু সব‍্যসাচী আজও খুব কম কথায় উত্তর দেন। যদিও পৌলমীর ইচ্ছে ছিল সম্পর্কটা স্বাভাবিক হোক কিন্তু...

হঠাৎ মোবাইলের আওয়াজ জানান দিয়ে যায় আজ সোনাইয়ের জন্মদিন। এসব দিন তারিখের হিসেব তাঁর মনে থাকতো না। সবসময়ই পৌলমী মনে করে রাখতো। মোবাইলের স্ক্রিন জুড়ে তাদের দুজনের ছবি। সোনাইয়ের বিয়েতে তোলা। আসলে এই ফোনটাতো পৌলমীরই। সোনাই গতবার জন্মদিনে দিয়েছিল। খুব খুশি হয়েছিল ফোনটা পেয়ে। বৌমা রিমির সাহায্যে এই মোবাইলের সঙ্গে বড়ো সখ‍্যতা গড়ে উঠেছিল পৌলমীর অবসর সময়ে। রাগ হতো সব্যসাচীর। মনে করতেন যেন তার সাথে কাটানো সময়ের থেকে বেশ কিছু সময়ে ভাগ বসাতো এই মোবাইল।

আর আজ! মোবাইলটা আছে শুধু পৌলমী নেই। একটা শূন্যতা ঘিরে থাকে সারাটাক্ষণ। আর এখন তো আরও বেশি...

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওঠেন। লকডাউনটা আরও বাড়তে পারে, কিছু দরকারি জিনিস আর ওষুধ স্টকে রাখা দরকার। টেবিলের ড্রয়ার থেকে প্রেসক্রিপশনটা বের করেন। টেবিলের ওপর রাখা পৌলমীর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলেন,
--এত কিসের তাড়া ছিল তোমার! আজ সোনাইয়ের জন্মদিন, পায়েস রাধবে কে?
ছবিতে পৌলমীর হাসি যেন কিছু বলে যায়...

**

সোনাইয়ের জন্মদিনের পায়েস কাউকে চাখতেও দিত না পৌলমী। তাই সব‍্যসাচী বুঝতে পারলেন না কেমন হল বানানো পায়েসটা। প্রেসক্রিপশনটা পকেটে নিয়ে পায়েস ভর্তি টিফিন বক্স ভালো করে প্যাক করে নিয়ে গাড়িটা বের করলেন বহুদিন পর। খুব বেশি দূরত্ব না হলেও গাড়ি নিয়ে যাওয়াই সুবিধার মনে হল।

ড্রাইভ করতে করতে বারবার পাশের খালি সিটটা মনে করাচ্ছিল অনেক স্মৃতিদের। পাশে পৌলমী ছাড়া আজ এই প্রথম গাড়ি চালাচ্ছেন।

স্মৃতি রোমন্থনের মাঝেই এসে দাঁড়ালেন ছেলের ফ্ল‍্যাটের নীচে। টিফিন বক্সটা নিয়ে ছেলের ফ্ল‍্যাটের সামনে এসে দেখেন তালা। মোবাইলটাও আনতে ভুলে গেছেন। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। আশেপাশের সব ফ্ল‍্যাটও বন্ধ। কাউকে ডেকে জিজ্ঞেস করাটা বোধহয় ঠিক হবে না, তাই...

ফেরার পথে নিজের থেকেও বেশি রাগ উঠছিল রিমির ওপর। ছেলে হয়তো ডিউটিতে ব‍্যস্ত কিন্তু রিমি! ব্যাঙ্কের কাজ শেষে রিমি বাড়িতে থাকবে এটা ভেবেই তো এসময় সব্যসাচীর আসা। অবশ্য যার বাবা-মা নেই সে আর কি বুঝবে জন্মদিনের পায়েসের মূল‍্য!

মন খারাপের মাঝে বাড়ির পথ ধরেন...

***

বাড়ির সামনে একটা চেনা অবয়ব দেখে হঠাৎ অবাক হন সব্যসাচী। গাড়িটা থামতেই মুখে মাস্ক হাতে গ্লাভস পরা রিমি এসে সামনে দাঁড়ায়। হাতে ব্যাগ। রিমি চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করে,
-- কোথায় গেছিলে বাবা?

অবাক চোখে তাকানো সব্যসাচীকে কোনো উত্তর দিতে না দিয়েই রিমি বলতে থাকে,
-- আজ তোমার ছেলের জন্মদিন। কাল রাতে ডিউটি যাওয়ার আগে বলছিল বারবার মায়ের হাতের পায়েসের কথা, এই বাড়ির কথা। আমি তাই অফিস থেকে এখানেই এলাম। স্নান করে এখানেই আজ পায়েস বানাবো। রাতের ডিনার এখানে করে আজ এখানে থাকব আমরা। কাল তো দুজনেরই ছুটি তাই। তোমার ছেলেকেও এখানেই আসতে বললাম। আর এসে দেখি তুমি নেই! মোবাইল বাজছে কেউ তুলছে না। আমার কি চিন্তা হচ্ছিল তুমি জানো?

মাস্কের ওপরে রিমির জলভরা দুচোখে চিন্তা আর শাসনের সাথে আরও কী আছে সব্যসাচী জানেন না। কিন্তু তিনি বোধহয় হেরে যাচ্ছেন এই অনাথ মেয়েটার কাছে এটা বুঝতে পারছিলেন। কোথায় যেন একটা নরম জায়গা নিয়ে নিচ্ছে রিমির ভালোবাসার মাখা শাসনের ছোঁয়া। আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন তিনি ঠিক এমন সময় গেটের কাছাকাছি আরও একটা গাড়ি থামে। ডবল ডিউটি সেরে বিধ্বস্ত শরীরে গাড়ি থেকে নেমে সোনাই বাড়ির সামনে তাদের দুজনকে অবাক হয়ে দেখে।

নাহ্ আর বাড়ির বাইরে থাকা ঠিক না। পায়েসের টিফিন বক্সের প‍্যাকেটটা নিয়ে তিনজন বাড়িতে ঢোকে নিরাপদ দূরত্বের মাঝে।

****

আজ রায় বাড়িতে পৌলমীর ছবির সামনে পায়েসের বাটি হাতে সোনাই আর রিমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন সব্যসাচী। রিমির মাথায় হাত রেখে ছবির পৌলমীকে বলেন,
আজ সোনাই আর রিমির জন্মদিন। আমি পায়েস বানিয়েছি...

দূরে দূরে থাকার দিনেও কিছু সম্পর্করা অনেক কাছের হয়ে যায়...


অলংকরণঃ অর্ঘ্য দত্ত

ফেসবুক মন্তব্য