চৈত্রপবনে, মম চিত্তবনে

অতনু দে



জানলাটা নিয়ে লড়ে যাচ্ছিল রোহিত। একেবারে টাইট হয়ে বসেছে – অনেকদিন খোলা হয় নি তো। প্রথমে নাট-বোল্টগুলো খুলে তারপর কব্জায় ড্রপারে করে তেল দিয়েছে তিনবার। তাও সে খোলবার নাম করছে না।
অবশ্য দোষ নেই। বারো বছর ধরে না খোলা হলে এমনটা তো হবেই।
আরেকবার হাতল মুচড়ে সর্বশক্তি দিয়ে চাপ দিল রোহিত। সঙ্গে কাঁধ ঠেকিয়ে বাড়তি প্রেশার। দাঁতে দাঁত লাগিয়ে। প্রথমে ক্যাঁচ – তারপর হাত আর কাঁধের ধাক্কায় হুস করে খুলে গেল জানলাটা। হুহু করে ঘরে ঢুকে এলো দমকা হাওয়া।
সেই একরাশ “আআ-হ”এর তৃপ্তিমাখা হাওয়ার সঙ্গে এলো কটা শুকনো পাতা। চৈত্রশেষের হলদে পাতা। হাতে ধরলেই খড়মড় করে ভেঙে যাচ্ছে, গুঁড়ো পড়ছে রোহিতের ঝকঝকে বেডরুমে। রোহিত ইচ্ছে করে আরও কটা পাতা হাতে নিয়ে খড়মড় করলো। তারপর মুঠো করে গুঁড়োগুলো ছুঁড়ে দিল ওপর দিকে – আর অমনি বনবন হাওয়া এসে সেগুলোকে উড়িয়ে দিল, ঘুরিয়ে দিল, ছড়িয়ে দিল চারিদিকে।
আজ কেমন অস্থির লাগছে রোহিতের। অশান্ত লাগছে খুব। ছটফটে একটা ভাব মনে।
ছটফট করতে করতে রিমোটটা তুলে নিল রোহিত। তারপর দেওয়ালজোড়া লাইভস্ক্রিনটা চালু করে দ্রুত ডায়াল করলো রিমাকে। স্ক্রিনে ফুটে উঠলো রিমার বেডরুমের ছবি – তবে তার সামনে একটা পর্দা। আসল পর্দা নয়, ডিজিটাল একটা পর্দার এফেক্ট দেওয়া। মানে রিমা এখন ব্যস্ত।
রিমা – মানে রোহিতের স্ত্রী। পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে। তবে দেখাসাক্ষাৎ লাইভস্ক্রিনেই বেশি হয়।
একটু বাদেই স্ক্রিনটা জ্বলে উঠলো। রিমা। বেডরুমে খাটের ওপর বসে আছে – শর্টস আর টিশার্ট পরে। শরীরী আবেদন ঠিকরে বেরোচ্ছে তার থেকে। সে তো হবেই, মনে মনে ভাবল রোহিত। রিমা অত্যন্ত শরীরসচেতন – নিয়মিত জ্যিম করে। তাছাড়া সে সত্যিই সুন্দরী – বিনা মেকআপেও তার থেকে চোখ ফেরানো যায় না।
“সাত সকালে কানেক্ট করার চেষ্টা করছিলে দেখলাম?” রিমা জিগ্যেস করলো।
“না, ওই আর কি। তোমাকে কী দারুণ দেখাচ্ছে!” আমতা আমতা করে বলল রোহিত।
“এইটা বলবে বলে কানেক্ট করলে? জিগ্যেস করলো রিমা। গলায় বিস্ময় আর বিদ্রূপের একটা ধারালো মিশ্রণ।
“না না, তা নয়।“ ঢোক গিললো রোহিত। “বলছিলাম কি – আজ একবার দেখা করলে হয় না?”
“ইউ মিন – ইন পার্সন? হঠাৎ? গত মাসেই তো…” রিমার ভুরু কুঁচকে উঠলো। “কী ভাবছো বলো তো – সেক্স? আবার?”
রোহিত কিছু বলবার আগেই রিমা ঝাঁঝিয়ে উঠলো “গত বছরই তো তোমার জন্যে ব্যাংকক থেকে সেক্সরোবট আনিয়ে দিলাম। কাস্টমাইজড মডেল, তোমার শখ অনুযায়ী আমার চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করানো হল। তোমার আবার একটু মোটা মেয়ে পছন্দ বলে এক সাইজ করে বাড়িয়ে নেওয়া হল লাস্ট মোমেন্টে। তারপর তো ভিয়েতনাম-হল্যান্ড-বেল িয়াম – নানান দেশের পর্নোগ্রাফি আর সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসিও তাতে প্রোগ্রাম করা হলো। একগাদা টাকা খরচা করে।“ রিমার মুখটা ঘৃণায় কুঁকড়ে গেল বলতে বলতে। “তা সেই ব্যাংককের ‘জিনিয়া’ও তোমার দেহজ খিদে মেটাতে পারছে না আজকাল?”
“আহা – আমি সে কথা বলতে চাই নি…” রোহিত আমতা আমতা করে বলে উঠতে না উঠতেই রিমা আর্তনাদ করে উঠলো “তুমি কি জানলা খুলেছো নাকি?”
“হ্যাঁ – অনেক কষ্টে। কী সুন্দর লাগছে…”
“রোহিত, তোমার কি মাথাটা একেবারেই গেছে? জানলা খুলেছ? কেউ জানলা খোলে আজকাল? এয়ারবোর্ন ডিজিজ হবার সম্ভবনা আছে তো…”
“রিমা – সেই কথাই তো বলছিলাম। শোন না…”
“কি?”
“একবার বেরোবে বাইরে? হাঁটবে একটু? বাইরে কী অপূর্ব রোদ উঠেছে, দেখেছো? আর গাছের হলদে পাতাগুলো সব হাওয়ায় উড়ছে…”


হলুদ আর সবুজ পাতামোড়া নিঃসঙ্গ রাস্তায় তিনহাত দূরত্ব রেখে হেঁটে যাচ্ছে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকা একটি ছেলে আর একটি মেয়ে। ওদের মাথায় ঝুরঝুর করে পাতা ঝরে পড়ছে ইতস্তত। ওরা মুখ তুলে দেখছে আকাশটাকে – যেটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লাইভস্ক্রিনের চেয়েও ঝকঝকে।
পাখি ডাকছে। ওদের মুখে চৈত্রশেষের আলো এসে পড়ছে।


অলংকরণঃ কল্লোল রায়

ফেসবুক মন্তব্য