উদাসীন কুয়াশা ভেবে

স্নেহাংশু বিকাশ দাস



এক

মানুষটি বিড়বিড় করতে করতে আপনমনে হেঁটে চলেছেন। কখনও বা আকাশের দিকে মুখ তুলে শূন্যতা মাপছেন। হয়তো তিনি কোনোদিন মরূভূমি দেখেননি। বালির ওপরে জ্যোৎস্নার আলোকে লুটিয়ে পড়তে দেখেননি। তাঁর দৃষ্টি আটকে আছে রঙিন ঘুড়িতে। ঋতম ছোটবেলায় ঘুড়ি ওড়াতে ভালোবাসত। ঘুড়ি তাকে নিয়ে যেত এক স্বাধীন সত্তার দিকে। আমি ওকে আকাশ কিনে দেব বলেছিলাম। দিই নি। বরং একটা ঘড়ি কিনে দিয়েছিলাম। সেই ঘড়ি এখন ভুবনেশ্বরে। সময়, দিন মাপছে। আমি সময় পেলেই ওখানে চলে যাই। ঋতমের হস্টেলের পাশের ফুডকোর্টে বসে দুজনে কফি খাই বিকেলবেলায়। ঠিক সাড়ে ছটা বাজলেই ওকে হস্টেলে রেখে আমি হোটেলে ফিরে আসি। ঘড়িটি সারারাত ভুবনেশ্বরের আকাশে উড়তে থাকে।

দুই

বাগবাজারে মায়ের ঘাটে এসে বসে আছি। বুকের মধ্যে দেশ, মাটি – ধুলো পায়ে প্রাচীন বটের ছায়া। জলের মধ্যে বিকেল কেঁপে উঠছে। শরীরে সোনার রেণুরা – আসন্ন সন্ধ্যা ধরে রাখছে নাড়ীর টান। এই পৃথিবী জলের আকাশে কুয়াশার হিম, শান্ত হয়ে আছে, বাঁচিয়ে রেখেছে আমাকে, আমাদের। ওই যে বিপন্ন বক ভাসমান আলোর পাশে আরোগ্যপথ খুঁজছে। দিকচিহ্ন হিসেবে দু’একটি কলস অদৃশ্য তারাদের গুছিয়ে রাখছে। ইতিহাস মিশে যাচ্ছে মাটির বলয়ে। এখানে ভেসে যাওয়ার কেউ নেই অথচ ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রয়েছে বিস্তীর্ন নদীবক্ষ। জলের দিকে তাকাই, অদৃশ্য তারাদের দেখি। কেঁপে উঠছে জলের ভেতর। নিজের দিকে তাকাই – কান্না পায়। ভেতরের ছায়া, স্মৃতি – সব একাকার হয়ে গড়িয়ে পড়ছে এ-ওর বুকের মধ্যে। নিজেকে নদীর পাশে রেখেছি এতদিন। দাঁড়িয়েছি অনন্তগভীর জলের বুকে।

তিন

চয়ন আমাকে সামনের রবিবার যাদবপুর স্টেশনে যেতে বলেছে, কবিতা শোনাবে। আমাকে তো রবিবার সকালে কামারপাড়ার দিকে যেতে হবে, ফড়িং দেখব। আমি সুব্রত’র দোকানে চায়ে ডুবিয়ে ক্যানিং লোকাল খেতে চেয়েছিলাম। হয়ে ওঠেনি। কতকিছুই পেরে উঠছি না আর। কবিতাও কীভাবে যেন ব্যাঙ্ক পাশবুকে গিয়ে বসেছে। শতবার আপডেট করেও তাকে নিজের করে নিতে পারছি না। যে কালো মাস্কটা গত কয়েকদিন ধরে ব্যবহার করে চলেছি তা বিবর্ণ হয়ে গেছে। রবিবার দিনই আমাকে চারু মেডিক্যালে যেতে হবে নতুন মাস্ক-এর জন্য। কবিতাওয়ালা সুন্দর একটা মাস্ক চাই আমার। কবিতা উৎসবের মঞ্চের নীচে ওই মাস্ক পরেই নিজেকে লুকিয়ে রাখব। চয়নের কবিতা শুনব। স্টেশনে বসে আর কোনও রবিবার আমার কবিতা শোনা হবে না। রবিবার আমি কাশফুল দেখতে যাব।

চার

এইসব দিনে ঝুঁকে থাকি দরজার দিকে। তুমি দেখো বারান্দাবাগান – রঙিন পাতাবাহার। দুপুরের রোদ চলে গেলে বিরক্ত হও। টের পাও নিপুণ সেই মাদারির খেল। জুড়ে রেখেছে শীতের মাস, অবাধ্য চোরকাঁটা এবং কবেকার অ্যান্টাসিড। ফিরে আসছে জল, জমি ও থরথর হাওয়া। সেই হাওয়ায় অচেনা পথিক কেঁদে ওঠে। দুঃখের আলো মুখে এসে পড়ে। জেনেছি গাছের কাছে, জলাভূমির কাছে। তোমাকে আমার ফুরিয়ে যাওয়া দিলাম। তার মেঘে উড়ে যাওয়ার আবেগ। সেই আবেগের হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে ইব্রাহিমপুর রোড। পেছনে পাতাকুড়ুনির দল। কুড়োচ্ছে টুকরো টুকরো স্মৃতি। জলডিঙিটির গোপন কোলাহল।


অলংকরণঃ অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়

ফেসবুক মন্তব্য