চিরসখা

উত্তম বিশ্বাস



----‘অ্যায়! অ্যায় ভাই বডিটা দূরে রাখ! দেখছ না আমরা কাল সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি! এমনিতেই ছোঁয়াচে রোগি! এভাবে ফ্যানেজলে এক করে ফেল না!'

‘---কুথে লিব মাঈজি!’ এবার কেলে আয়ামাসি বাঘিনী হয়ে উঠলেন ---‘কুথে লিব মানে? কাল থেকে তোমাকে বলছি এমএলএর চিঠি লাগবে; নড়লে না! বড়ো বেয়াদব! পাঁচখানা নীলপাত্তি ফেলে পাচঘণ্টা ওয়েট করো তারপর অ্যামবুলেন্স; আছে --?’

করিডোর দিয়ে এখন হাঁটাও মুশকিল! পেশেন্টপাটীর ক্যাওয়াচ আর কাতরানি যেন চাকায় পিষ্ট পথচারী কুত্তার মত কানে এসে লাগে! ডাক্তারবাবুরা কানে পাইপ গুঁজে দিয়ে দ্রুত এ ওয়ার্ড থেকে ও ওয়ার্ডে ছোটেন আর সিস্টার দিদিমণিদের জামা টেনে ধরলে খেইখেই করে ওঠেন! মাত্র দিনদশেকের শহরযাপনে রমেশের তলা পর্যন্ত একেবারে শুকিয়ে চেলাকাঠ হয়ে গেছে! ওর নালীতে এখন আর এমন কোন ভিজে কথা নেই যেটা সে খুঁচিয়ে টেনে বার করে ডাক্তারবাবুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। গঙ্গা যখন কাল একদম কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল; আর ডাক্তারবাবু তার বাঁহাতখানা একবারমাত্র টিপেই বেডের ওপর ঠেলে ফেলে দিয়েছিল ---সেই দৃশ্য দেখে মেয়ে সুরুপি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল খুব! কিন্তু এখন ও আর কাঁদছে না। একটা ন্যাতানো বিস্কুটের প্যাকেট চাবাতে চাবাতে বাবার গায়ে ঠেস দিয়ে অপেক্ষা করছে কখন তার মা বাড়িতে গিয়ে পৌঁছবে! সুরুপির ঘুম পাচ্ছে খুব! কিন্তু এত হাজার ব্যস্তসমস্ত অসতর্ক অসহিষ্ণু পায়ের পাতার ওপর তার দেহটা ছড়াবে কোথায়! শত হলেও সে মেয়ে সন্তান তো! দারিদ্রের দেশে আরকিছু না আসুক, লজ্জা আর জড়তা আসে খুব দ্রুত --- একেবারে জটপাকানো শ্যাওলার মতো!
গঙ্গাকে কোলের মধ্যে আগলে নিয়ে রমেশও খানিক ঝিমিয়ে নিল। এখানে কে শোনে কার কথা! উশকোখুসকো চুল আর নিরাশ্রয় চোখের ধূসর চাহনি দেখলেই অ্যাম্বুলেন্স তো দূর অস্ত; ভ্যানরিক্সাচালকেরাও দ্রুত সাইড নিয়ে কেটে পড়ে! অযথা মুঠোমধ্যে সময় পচে ওঠে রমেশের! কতদিন হল গঙ্গার বুকে ঘন ঘন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতে পারেনি সে! নাহ! এখানে কোথাও একটু আড়াল নেই! হাঁড়িতে ভাত থাক আর না থাক; পরের পুকুরে মাছ থাক আর না থাক হাউস করে একবার গঙ্গার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারলেই সমস্ত খিদে মিটে যেত রমেশের! গঙ্গার বুকখানা আজ শুকিয়ে একদম চটি হয়ে গেছে! পাচুরপুকুরে শামুক ভাঙার কাজ সেরে রমেশ সকাল সকাল বাড়ি ফিরত, আর দুপুরবেলা ঘরে খিল এঁটে গঙ্গাকে আদর করতে করতে বলত---‘ শুইনছ্যি শামুকের মাংসে সরীরে রক্ত হয়, তুঁ খাবি গঙ্গা?’
--‘ সর কেনে! মুটে কুথা শুনিস লা! বুঝিসতো ছোঁয়াচে রোগ বটে!’ রমেশ কিন্তু ছাড়বার পাত্রটি নয় সে! কেননা ওদের মহল্লায় যখনই গাছের কাঠবেড়ালি ফুরিয়ে আসে; অথবা গর্ত গেঁড়ে থেকে সমস্ত ইঁদুর গোসাপের বংশ ধ্বংস হয়ে আসে --- তখন ওরা একহাঁটু ক্ষুধা আর আদিম শিকারের নেশায় ধারালো খোন্তা দিয়ে নিজেদের একফালি ঘরবারান্দা খুঁড়ে এফোঁড় ওফোঁড় কতে থাকে! এমন আবেগঘন বীরসা মুহূর্তে গঙ্গা কেন, পৃথিবীর কোন রমণীই আর তখন না বলতে পারে না!

উদভ্রান্ত অথচ নিরুপায় মুহূর্তে মানুষের তন্দ্রার বেগ আসে নেশার মত। ঘুমের ঝিমটির মধ্যে রমেশ দেখতে পেল তাদের পাড়ার টুরুপিসি এসেছে। গা ভর্তি মুক্তোর গয়না ইক্কেবারে তারাভরা আকাশের মতো তার গতর থ্যেক্যা শাইন দিচ্ছে!
--‘আরে! টুরুপিসি লা?’
--‘হি বেটা!’
--‘তুঁ ইখানে?’
--‘হ্যাঁ বেটা! দিখাতে এলোম। হক হয় কেনে দেখ!’
--‘কে বা দিল তুকে এত্তো দানা? আর তুহার গত্তরের ঘা পাঁচড়া?’
--‘ কেনে! ওই পাচুর ড্যামে ডুবাইন দিলোম! বিশ্বাস হয় কিনা হয়? যা উঠ উঠ! গঙ্গাকে লিয়ে যা! যা! যা! উঠ! মু তো দেখ কিমোন ব্যামোর থেকে বাঁচি গিলাম!’

কিন্তু রমেশের মাথায় ঘুরছে অন্য চিন্তা,-- ‘আইজ হপ্তাদেড় হয়ি গেল ওই হাঙ্গরগুলার গালে দানাটি পড়ে লাই; আর পিসি কিনা সিখানে--!’ রমেশ দিব্যি মনে করতে পারছে এই তো মাসখানেক আগেও টূরুপিসি পাচুর পুকুরপাড়ে এসে তার পাশে বসে কেই কেই করত ---‘অ বাপ ইকদলা মাংস দে ক্যানে! মুটা চাইলের ছাড়া ছাড়া দানা গলাতে মুটে লামে না!’
--‘তুঁ সর ইখান থেক্যা! তুর গায়ে পোচা গোন্দ!’
--‘মর মুখপোড়া! গোন্দ তোর ইহাতে! সারাটোবেলা পোচা শামাক ঠ্যাঙ্গাবি আর গোন্দ খুঁজবি মাগি লুকের গতরে!’
--‘ভালোই তো বুঝিস পোচা শামাক! তা তুর পেট লিবে কেন?’
-- ‘কী আর গতি বাপ! দেশভুঁই কি আর সিকালটোর মত আছে! বাওবাতাস জলাধলা সব পচে একাকার কিনা! দিবি বাপ?’

রমেশও বোঝে, তার সংসারেও একখাবলা শামুকের মাংস নিয়ে আসতে পারলে মেয়েটি খুশি হয়; কেননা সেও জানে সাদা ভাতের ওপর একদলা শামুককুচি ছড়িয়ে দিলেও বিরিয়ানি হয়! কিন্তু গঙ্গা এসব খায় না। ওর সবসময় বমির ঝোঁক ওঠে। বেশি বমি হলে তখন ভাতের চেয়ে রক্ত ওঠে বেশি! রমেশ তাই চাপাচাপি করেনা গঙ্গাকে! ডাক্তার বলেন জটিল জণ্ডিস; তারসাথে ক্ষয়রোগ – ভালো ভালো ফুডের দরকার। মুহূর্তে রমেশের ভালোবাসার দোচালাঘর কাঁপন অনুভব করে! একে অভাবি সংসার তারও ওপর অবহেলা --- বাঁধের গায়ে ছোট্ট ইদুরের গর্তকে অবহেলা করলে বন্যার সময় যেমন তার ষোল আনা মাশুল গুনতে হয়, গঙ্গাও ঠিক তেমনি আজ ভাঙ্গনের অপেক্ষায়! রমেশ সারা পৃথিবী মাঠঘাট মাথায় নিয়ে চিন্তা করে। কিন্তু এই মুহূর্তে ওর সম্বল কেবল শামুকপেটানো একখণ্ড আধলা ইট আর বাওড়ের মরাপচা শামুকের খোল! এই পুঁজি দিয়ে কিভাবে বাঁচিয়ে তুলবে তার গঙ্গাকে! সারাদিন পাচুরপুকুরের হাইব্রিড মাগুরগুলোকে সে খাওয়ায় আর গঙ্গার জন্য চিন্তা করে। মাগুরগুলোরমত ওরও একসময় রাক্ষুসে খিদে ছিল; সেটা বোঝে গঙ্গা। আর তাই সুযোগ পেলেই গঙ্গাকে সে গল্প শোনাত ---‘জানিস গঙ্গা, মাগুরগুলা সব এক একটো হাঙ্গর! এক্কেবারে আমার মতো – কাকপক্ষী তো দূর অস্ত! মুনিষ পর্যন্ত উয়ার কাছে ঘেষে লা! হয় আস্ত লিবে না হলে বিষাক্ত কাঁটার ঘায়ে ইক্কেবারে জরোজরো করে ছাইড়ব্যে!’ চিন্তায় রমেশ কোন কূলকিনারা পায় না, রাত্রে তাই একমাত্র শরীর দিয়েই শরীরের ক্ষয়রোধের সংকল্প নেয় সে!

পচা শামুকের জন্যে আলাদা কোন উপমার দরকার হয়না! দুর্গন্ধ আর খচখচানিই হল এই উপগ্রহের আদি অলংকার! রমেশের পৃথিবীটাও যেন তাই। বাড়তি বালাই বলতে তার সমাজ আর ডাঈনরূপী রোগ! আজন্মপরিচিত তাদের ফাঁকা ফাঁকা মাঠ জলাজঙ্গল—সবই যেন আজ নাটারকাটায় বন্দী অস্পৃশ্য কাঁটাতার! কোথায় যাবে রমেশ! মুমূর্ষু গঙ্গার বুকেই তাই বাধ্য হয়ে উটপাখির মত মুখ গুঁজে দেয় সে!

রমেশের বস্তামাপা মজুরি। সারাদিন পাচ বস্তা শামুক ছেঁচতে পারলে পঞাশ টাকা! পাশের গ্রামের বাঁওড় থেকে মোটরভ্যানে শামুক আনে পাচু। টুরুপিসি এসে সময়ে অসময়ে রমেশের হাতের মধ্যে হাতগুজে দেয়; ওর কাজের ব্যাঘাত ঘটায় – ‘উঁহু! উঁহু! এই লালহলুদের চক্র আঁকা জ্যেন্ত ঝিনুকটোতে ছ্যচা দিসলা বাপ; এটা জলে ছুঁড়ে ফ্যালাই দি দে! উহাতে মুক্তোর ডিম দিবেক দেখিস!’ এমন কপালফোলান মুক্তোর গল্প টুরুপিসি বছরভর শোনায় রমেশকে, আর অমনি গেঁড়ি গুগলি শামুকের ঢিপিতে একটা জ্যান্ত ঝিনুক চোখে পড়েছে কি না – একেবারে বাঁ হাতে টিপে কানেরকাছে নিয়ে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলতে থাকে —‘হি! হি! হি! ইটাও জ্যেন্ত বটে! মুদের মা খুড়িরা বুলে ইহাদের পেটে নাকি মুক্তো গড়ে এক্কেবারে কচ্ছমের ডিমের মতো!’ রমেশ ব্যঙ্গ মিশিয়ে বলে, --'হ! তারপর একদিন তুঁ ইখানে ডুবাইন দিবি! মাগুরকাটা বাদে পালাপুকুরে সিদিন যা পাবি সবই তুহার! মু তো দেখ যিটাতে ছ্যাচান মারি সিটাই পোচা ওঠে---তাই মাঝে মাঝে ভাবি এই ইটখানা কোপালে লিয়ে পিটাই যদি মুক্তো মিলে!’

--‘ দেখিস উহার ঢাকনাটো খুল্যা আমি তুকেই ইকদিন দিখাব! কুপালগুনে পাই আগে! তখন গঙ্গার নামে একটো টিকলি গড়াই লিস!’

রমেশ হাসে! পুকুরের পচা কালো জলের তলে গঙ্গার ছায়াখানি দুলে ওঠে! তাতে অদ্ভুত একটা হাসি – ঠিক যেন দগ্ধ উলুবন ফুঁড়ে উঠে আসা তৃষ্ণার্ত একফালি চাঁদ! সহসা এমন সুন্দরের আবির্ভাবে ঘেয়োপচা টুরুপিসিকে আর সহ্য হয়না তার। একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে, --‘হ হ! যা সর! সেই সাত রাজার ধন বেইচ্যা তুঁ আগে একটো মোটা ডাক্তার তো দিখা!’

--‘ডাক্তার আর দিখাবনা বাপ! শহুরের মোটাডাক্তার বোলান দিছে, মোর গতোরের সব রক্ত লাকি পচি গেইছ্যে! আইজ হাঁটুর ফোঁড়া টিপি তো কাইল কুঁচকির ফোঁড়া চাগান মারে! খড়মাঠের চানসি ডাক্তার গজবেণ্ডেজ গুঁতাই গুঁতাই মোর শরীরটো ইক্কেবারে নালাখালা করি ছাইড়ল! সুংসারের হাঁস মুরগি ছাগল গরু একে একে সব ইখানে ঢুকি গেল; কিন্তু বেদনা তো মুটে গেল না বাপ! মাঝে মাঝে ভাবি, ওই হাঙ্গরগুলোর গালে ঝাঁপ দিই — এই পচা গতর ওরাই যদি একটু ছিঁড়ে কুটে নামাতে পারে বাঁচি যেতোম!’

পাতলা পাতলা হাসি আর পচাপুকুরের শিংমাগুরের ক্যাতক্যাতানি আওয়াজ —এ সব মনে পড়তেই রমেশের পৃথিবীটা একবার লাট্টুরমত চক্কর দিয়ে উঠল। ঝিমুনির ঘোর পাতলা হয়ে আসে। তখনও যেন রমেশ প্রত্যাখ্যাত অ্যামবুলেন্সের হুইসেলের মত শুনতে পায় —‘ যা যা উঠ! গঙ্গাকে পাচুর পুকুরে লিয়ে ফ্যাল! উ বাঁচি যাবে! যা! যা! গঙ্গা ঘর পাবে, উঠোন পাবে সব পাবে! যা যা!’

রমেশ ভেতরে ভেতরে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল! ‘টুরুপিসির ভরসায় গঙ্গা বুঝি নইড়ল! ইখনো বুঝি সে মোটাডাক্তারবাবুর ভয়ে কাশির ঝোঁক চাপা দিবার চেষ্টা কইরছ্যে এখানে আর একদণ্ডও তিষ্ঠাতে আছে গো ’ মুটোতে সময় ভ্যাপসা হয়ে ওঠে তার! টুরুপিসির কথাটা তাই ফেলতে পারল না রমেশ। গঙ্গাকে কাঁধের ওপর তুলেই দিল ছুট!
--‘মুটে তো বারো ক্রোশ! তুঁ পারবিলা সুরুপি? এই চ্যাটা রাস্তাটো পার হলেই টিলা; তারপরে মুদের কাঠপাতার জঙ্গল --- ওইটো ঝাঁপ দিলেই তো পাচুরপুকুর ---!’

সুরুপির চোখেও এখন ছলকে উঠছে হাজারটা সোমেশ্বরী! আজ তাতে ফেনিয়ে উঠেছে দারুণ সম্মতির ছায়া!--- তার মা ঘর পাবে উঠোন পাবে, সমাজ পাবে -----! সেও দৌড়াচ্ছে, খুব দৌড়াচ্ছ--- --------!

অলংকরণঃ অর্ঘ্য দত্ত

ফেসবুক মন্তব্য