শব্দেরা আশ্রয় পেতে চায়

গোপাল লাহিড়ী

সঞ্জীব শেঠই এই সময়ের এক উল্লেখযোগ্য ভারতীয় কবি যিনি ইংরেজিতে কবিতা লিখছেন। তিনটি কাব্যগ্রন্থ ও পৃথিবীর পঁচিশটি দেশে তাঁর এক-হাজারের বেশি কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।
তাঁর কবিতা এই প্রথম মূল ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন বিতান চক্রবর্তী। এক এক কবির ভাবনা চিন্তা, নিজস্বতা , শব্দচয়ন এক একরকম। সঞ্জীব শেঠর কবিতায় প্রধান অস্ত্র শব্দচয়ন ও তাতে কবিতা হয়ে ওঠে অমোঘ। যারা তাঁর ইংরেজি কবিতা পড়েছেন, বুঝেছেন শব্দের আশ্রয় পেয়ে জীবনের পরিক্রমার পথটুকু।
বিতান চক্রবর্তীর ‘বৃষ্টিসহায়’ পুস্তিকায় আছে সঞ্জীবের ১৮ টি কবিতার বাংলা অনুবাদ। এক নিখুঁত পরিমিতি বোধ, এক নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি ও কবিতার রুপময়তা সঞ্জীবের কবিতার প্রেক্ষাপট জুড়ে ছায়া ফেলেছে।
এভাবে বেঁচে থাকা
তোমাকেই প্রয়োজনীয় করে তোলে।
আর আমি,
ভুলগুলো খুঁজে পাই পুরনো দেরাজে। (বোধের ভেতরে)
আবার কখনো কবি নির্মাণ করেছেন এক নিটোল ভঙ্গিমায় আশপাশের পরিবেশ ও তারপরে বৃষ্টির আশ্রয়।
আবেগের এই রেখা মুছে ফেলো।
দেখবে সহজে নিঃশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে,
যেমন, হঠাৎ বৃষ্টিতে মাটি
গন্ধ চিনে নেয়। (বর্ষা)
কবি নিজ ভাবনায় রচনা করেছেন কবিতার বাস্তব যেখানে আবেগের রেখা বারে বারে মুছে যায়। এক বিক্ষত সময়ের সামনে দাঁড়ায় মানুষ, অস্তিত্ব গড়ে দেয়। জাগ্রত চেতনার পাশে জীবনের অন্তরার সুর বেজে ওঠে।
তোমার কান্না আর অভিমানের ভেতরে
আমার দু-আঙুল যে তাঁর বেঁধে ছিল
তা থেকে সুর নয়, কেবলই
চিৎকার উঠে আসে। (তুমি যা বাজাও)

কবি বাড়তি শব্দের দিকে কখনো যাননি। ছোটও ছোটও কবিতা। এক অন্তরঙ্গ চেহারা ছবি। এক জিজ্ঞাসা, এক মনস্কতা, কবিতার নির্মাণে কবির আত্মস্বর শহরের জীবন আড়াল খুঁজে নিতে চায় অথচ বাস্তব এড়িয়ে যায় না। বেলা শেষের একাকিত্য ছুঁয়ে যায়।
যতদূর চোখ যায়
কেবল উঁচু ঘরবাড়ি
নিন্দুকেরা বলে,
‘কোথায় আকাশ?’
কীভাবে বোঝাবে তাদের?
সারাক্ষণ ওপরে তাকাতে ব্যাথা করে। (আমার শহর)
নতুন কিছু গ্রহণের মানসিকতা এক সোপান তৈরি করেছে যেন। উত্তরণ কি হতে পারবে এই অবস্থানে? কবির অকপট স্বীকারোক্তি।
কবিতায় প্রবেশ করতে চাইলে
নর্তকীর সামনে নবাবের মতো
অবশ হয়ে যাবে। (চলাচল)
সব কবিতার মধ্যে কোথাও যেন একটা সুত্র আছে। এই সুত্র আসলে এক অনুসন্ধান। এক চলাচল। এই পুস্তিকা অস্থির জীবনে যেন এক আনন্দ সঞ্চরণ।
বিতানের অনুবাদ স্বছ ও সাবলীল। সঞ্জীবের কবিতার শব্দের দুরূহতা অতিক্রম করেছেন নিজস্ব অনুভবের দরজা খুলে দিয়ে। কবির অন্যতর ভাবনা ও ভেতরের দেখাটুকু আমাদের অন্তরে পৌঁছে দিয়েছেন এক অনায়াস ভঙ্গিতে। ‘বৃষ্টিসহায়’ পাঠকের ভালবাসা পাবে নিজগুণে। সঞ্জীব শেঠইর বুধ্বিদীপ্ত কবিতা প্রাণিত করবে পাঠককে এই আশা রইল। অপেক্ষা থাকবে তাঁর পরবর্তী কবিতা সঙ্কলনের জন্য। পাশাপাশি বিতানের পরবর্তী অনুবাদ কবিতা গ্রন্থের জন্য আগ্রহ থাকলো। সর্বজিত সরকারের অলংকরণ মনোগ্রাহী।

বৃষ্টি সহায় / সঞ্জীব শেঠই
অনুবাদ/ বিতান চক্রবর্তী
প্রকাশকঃ শাম্ভবী, কলকাতা -৭০০১১০






ফেসবুক মন্তব্য