অ্যাট ইয়োর সার্ভিস

ভাস্বর জ্যোতি ঘোষ

জয়ন্ত ভেবেছিল ডিভোর্সটা হয়ে গেলেই বোধহয় ঝামেলা চুকে যাবে। কিন্তু, ঝামেলা কি আর এত সহজে শেষ হয়। সুপ্রিয়ার সাথে কাটানো দুটো বছরের বিষাক্ত স্মৃতি জয়ন্তকে ছাড়ছে না। অস্থির লাগে জয়ন্তর, মনে হয় কখনও কখনও মনে হয়,পাগল হয়ে যাবে। রাতে ঠিকমত ঘুম হয়না, চোখের তলায় কালি। সবমিলিয়ে একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি।

অফিসে লাঞ্চের সময় সুপ্রকাশ ওকে ধরল, ‘কি ব্যাপার বলতো, তোর জয়ন্ত? ঝোড়ো কাকের মত দেখাচ্ছে। দাড়ি ফাড়ি কাটা ছেড়ে দিয়েছিস। একদম একটা হ্যাগার্ডের মত লাগছে তোকে। আরে, ডিভোর্স হয়ে গেছে। ঝামেলা শেষ। নাউ চিয়ার আপ।’ লাঞ্চ শেষ হয়ে গেছিল। কফির কাপে দীর্ঘ একটা চুমুক দিয়ে জয়ন্ত বলে, ‘সুপ্রিয়ার স্মৃতি আমায় মেরে ফেলবে রে সুপ্রকাশ। একা থাকতেই ভয় লাগে আজকাল। ভালো বা খারাপ সুপ্রিয়ার যেকোন স্মৃতিই আমার কাছে অসহ্য।’ সুপ্রকাশ বলে, ‘তাহলে ডিভোর্স নিয়ে কি লাভ হল তোর? বরং বিয়ে করে ফ্যাল একটা।’ কোন জবাব না দিয়ে একটা সিগারেট ধরায় জয়ন্ত। জয়ন্তর প্যাকেট থেকেই একটা সিগারেট টেনে নিয়ে ধরায় সুপ্রকাশ। দুই বন্ধু নিঃশব্দে খানিকক্ষণ ধুমপান করে। ‘তুই বরং একটা কাজ কর বুঝলি’ – নীরবতা ভেঙে সুপ্রকাশই প্রথম কথা বলে ওঠে। জয়ন্ত সুপ্রকাশের দিকে তাকায়। অ্যাট ইয়োর সার্ভিসে একবার যোগাযোগ করে দেখ। “অ্যাট ইয়োর সার্ভিস?” ভুরু কুঁচকে যায় জয়ন্তর। ‘সেটা আবার কী?’ সুপ্রকাশ জবাব দেয়, ‘আরে বেরিওয়াল চেম্বার্সের গ্রাউন্ড ফ্লোরে এদের অফিস। এরা নানান ধরণের কাজ করে। সবতো জানিনা, তবে এদের একটা মেমরি ব্যাঙ্ক সার্ভিস আছে বলে শুনেছি।’
‘মেমরি ব্যাঙ্ক সার্ভিস বলতে?’ জয়ন্তর ভুরু আরেকটু কুঁচকে গেছে। কবজি উলটে ঘড়িটা দেখে নেয় সুপ্রকাশ। এখনো দশ মিনিট আছে। নতুন করে একটা সিগারেট ধরিয়ে সুপ্রকাশ বলতে থাকে, ‘এদের এখানে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। তোর অপ্রয়োজনীয় স্মৃতি এরা বের করে তোর অ্যাকাউন্টে জমা করে রাখে। ইচ্ছে হলে এটা তুই আবার উইথড্র করে নিতে পারিস। মানে ফিরিয়ে নিতে পারিস। আবার আরো স্মৃতি সেখানে জমাও দিতে পারিস। এটা মনে হয় তোর কাজে লাগতে পারে, আমি কল্লোলের থেকে শুনেছি। তুই ডাইরেক্ট গিয়ে একবার কথা বলে নিতে পারিস’। লাঞ্চ শেষ। ভুরু কুঁচকানো অবস্থাতেই অফিসে ঢোকে জয়ন্ত।

অ্যাট ইয়োর সার্ভিসে অ্যাকাউন্ট খুলতে তেমন ঝামেলা হয়না জয়ন্তর। ওদের মেমোরি ব্যাঙ্কটা একতলায়। বাকি আকজকর্ম সব সাততলায় আর আটতলায় হয়। এখানে মাত্র তিনজন কাজ করে। তিনজনেই মহিলা। একজন অ্যাকাউন্ট রিলেটেড পেপার ওয়ার্ক গুলো সামলান। আরেকজন ডেটা এন্ট্রি করেই যাচ্ছে। আর তৃতীয় জন কাউন্টারে। ব্যাস। জয়ন্তর কোম্পানির নাম শুনে, মহিলাটি বললেন, ‘সার, আপনার কোম্পানি আই. ডি নাম্বারটা বলুন প্লিজ।’ আজকাল বড় বড় কোম্পানির এমপ্লয়িদের সব তথ্য পাবলিক ডোমেনে রাখা থাকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কোম্পানির সেন্ট্রাল ডেটাবেসে জয়ন্তকে লোকেট করে, ওর পার্সোনাল ডিটেলের একটা প্রিন্ট আউট ওর সামনে রেখে বলে, ‘প্লিজ সাইন করে দিন।’ জয়ন্ত সই করে দেয়। ছ’মাসের জন্য আনলিমিটেড ডিপোজিট আর উইথড্রয়ালের জন্য অ্যাকাউন্ট মেইন্টেন্যান্স বাবদ যে অ্যামাউন্টটা ওরা চার্জ করছে সেটা অবিশ্বাস্য রকমের বেশী। কিন্তু জয়ন্ত মাথা ঘামায় না। ‘আপনি কি এখনই কিছু ডিপোজিট করবেন? আপনার কার্ডটা নিয়ে কাউন্টারে চলে যান। নন্দিতা আপনাকে হেল্প করবে।’

‘আসুন সার।’ নন্দিতা ওকে কাউন্টারের পেছনে একটা ছোট চেম্বারে নিয়ে যায়। কার্ডটা একটা মেশিনে সোয়াইপ করে। কোড টাইপ করে, কার্ডটা অ্যাক্টিভেট করে। জয়ন্তর থেকে তার ডিপোজিটের ডিটেল জেনে নিয়ে জয়ন্তকে একটা চেয়ার দেখিয়ে বলে, ‘বসুন।’ ঘরের আলো সব নিভিয়ে দিয়ে একটাই হালকা আলো জ্বালিয়ে রাখে। জয়ন্তর মাথায় একটা হেলমেট পরিয়ে দেয়। হেলমেট থেকে কয়েকটা ইলেকট্রোড সার্ভারে যুক্ত করে নন্দিতা। মাথায় একটা অদ্ভুত অনুভূতি হতে থাকে জয়ন্তর। ‘রিল্যাক্স।’ নন্দিতার গলা শুনতে পায় জয়ন্ত। ঠিক চল্লিশ মিনিট বাদে নন্দিতা ঘরের সব আলো জ্বেলে দেয়। হাসিমুখে বলে, ‘ইট’স ওভার সার।’ হেলমেটটা খুলে নেয় নন্দিতা। অবাঞ্ছিত স্মৃতির ভারমুক্ত জয়ন্ত উঠে দাঁড়ায়। কার্ডটা ওকে ফেরত দিতে দিতে নন্দিতা বলে কোন ট্র্যানজাকশান করতে হলে কার্ডটা অবশ্যই নিয়ে আসবেন। হ্যাভ আ নাইস ডে।’

‘সার... মি. সেন... আপনার কার্ডটা ফেলে যাচ্ছেন’ নন্দিতা ওর কাউন্টার ছেড়ে, দরজার দিকে প্রায় ছুটে আসে। কিন্তু ভদ্রলোক ততক্ষণে রাস্তার ব্যস্ত জনারণ্যে হারিয়ে গেছেন। নিচের ঠোঁটটা একবার উল্টিয়ে নন্দিতা আবার ওর কাউন্টারে এসে বসে।

কাঁচের দরজাটা ঠেলে জয়ন্ত ভেতরে আসে। নন্দিতা ওর মুখে একধরণের পেশাদারী হাসি ফুটিয়ে তোলে, ‘আরে সার, আসুন আসুন। বলুন দাদা, হাউ মে আই হেল্প ইউ?’ জয়ন্তর মুখেও এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। ‘আসলে আমি একটা উইথড্রয়াল করতে চাই।' 'অবশ্যই সার, আসুন।’

‘আর হ্যাঁ’, জয়ন্ত বলতে থাকে, ‘তারপরে আমি আমার অ্যাকাউন্টটা ক্লোজ করে দিতে চাই।’

‘আপনি কি আমাদের কাজে স্যাটিসফায়েড নন?' নন্দিতা জিজ্ঞাসা করে। ‘না, না ওসব কিছু নয়। আপনি কাইন্ডলি আমার কমপ্লিট উইথড্রয়ালের ব্যবস্থা করে দিন।'

‘নো প্রবলেম সার। প্লিজ আসুন।’ কাউন্টারের পেছনের ছোট চেম্বারটায় গিয়ে নন্দিতা আবার জিজ্ঞাসা করে, ‘পুরোটাই উইথড্র করে নিতে চান তাহলে?’

‘হ্যাঁ নন্দিতা। প্লিজ্‌ ডু ইট। আসলে স্মৃতিগুলো ইরেজড হওয়ার আগে বুঝতে পারিনি এগুলো সত্যিই আমার কাছে কত ইম্পর্ট্যান্ট। একথা ঠিক যে ওর মধ্য অনেক খারাপ স্মৃতিও রয়ে গেছে। কিন্তু ওগুলো সম্পূর্ণ চলে গিয়ে এমন একটা ভ্যাকুয়াম তৈরি হয়েছে, যেটা আমি নিতে পারছি না। ওগুলো নিয়েই আমায় বাঁচতে হবে। সুতরাং ওগুলো আমার ফেরত চাই।’

‘ওকে সার, অ্যাজ ইউ প্লিজ্‌। কিন্তু ঘন্টা খানেক সময় লাগবে এতে।’

‘সময় নিয়েই এসেছি আমি। আপনি শুরু করুন।’ জয়ন্তর কার্ডটা মেশিনে সোয়াইপ করে, নন্দিতা ওর কাজ শুরু করে। জ্যন্তর হেলমেটের সাথে সার্ভারটাকে কানেক্ট করে নন্দিতা বেরিয়ে যায়। জয়ন্ত ওর বেরিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে চোখ বন্ধ করে। ঘন্টাখানেক বাদে নন্দিতা বলে, ‘হয়ে গেছে, আপনি উঠে আসতে পারেন।’ নন্দিতা হেলমেট আর ইলেকট্রোড গুলো খুলে নেয়। ‘হয়ে গেছে? থ্যাঙ্কস।’ জয়ন্ত দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগোয়।

‘আপনার কার্ডটা?’

‘রেখে দিন। ওতে আমার আর কোন প্রয়োজন নেই।’ জয়ন্ত কাঁচের দরজাটা টেনে বাইরে বেরিয়ে আসে। গাড়ির কাঁচটা না তুলেই চলে গেছিল। নিজের অসাবধানতায় নিজেই বিস্মিত হয় জয়ন্ত। যাকগে, দামী কিছুতো আর ও সিটে ফেলে যায়নি। গাড়িটা একটা গলিতে পার্ক করে, একটু এগিয়ে গিয়ে একটা কফিশপে ঢোকে জয়ন্ত। আজকের দিনটা সেলিব্রেট করা যাক। নিজের মনেই বলে। চিকেন স্যান্ডউইচ আর কফির অর্ডার দেয়। স্যান্ডউইচ শেষ করে কফিতে চুমুক দিয়েছে। একন সময় ওর মোবাইলটা বেজে ওঠে। কল সেন্টারের নম্বর দেখে ফোন না ধরেই কেটে দেয় জয়ন্ত। ওর চোখে মুখে বিরক্তির চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কল সেন্টার! বিরক্তিকর। জয়ন্ত ফোনটা কেটে দেয়। খানিকক্ষণ বাদে আবার ফোন আসে। জয়ন্ত ওর ফোনটাকে সাইলেন্ট মোডে রেখে পকেটে ঢুকিয়ে রাখে। পাশের টেবিলের ভদ্রলোক জয়ন্তকে লক্ষ করে বলে, ‘নিশচয় কোন মেয়ের ফোন? সত্যি আমার তো দাদা, জীবন অতিষ্ট হয়ে গেছে এই ফোনের জ্বালায়।’ জয়ন্তর কফি খাওয়া হয়ে গেছে। ‘হুম’ গোছের একটা আওয়াজ করে ওয়েটারকে বিল মিটিয়ে জয়ন্ত উঠে পড়ে। গাড়িতে উঠতে যেতেই একটা স্মৃতি ওর মাথায় ঝলক দিতে থাকে। যান্ত্রিক ভাবে ও গাড়ির গ্লোভ কম্পার্টমেন্টটা খোলে। একটা ছুরি ঝকঝক করছে! ও স্পষ্ট বুঝতে পারে এবার ওকে কি করতে হবে। একটা ক্রুর শয়তানি হাসি ওর ঠোঁটে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। ও ছুরিটা ভাঁজ করে পকেটে ফেলে ও দ্রুত আবার সেই কফিশপটার দিকে ফিরে আসতে থাকে। ওর পাশের টেবিলের সেই ভদ্রলোক তখন কফিশপ থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ‘হ্যালো! কি ব্যাপার ফিরে এলেন যে? কিছু ফেলে গেছেন নাকি?’ জয়ন্ত বলে, ‘না, ফেলে যাইনি কিছু। আপনাকেই খুঁজছিলাম।’

‘আমাকে? কেন বলুন তো? আমি তো আপনাকে চিনিও না।’ ওনার বাঁদিকের ভুরুটা উপরে উঠে যায়।

‘কাইন্ডলি আমার সাথে একটু আসুন।’ ওনাকে প্রায় টেনে জয়ন্ত গলির মধ্যে নিয়ে যায়। ওর গাড়ির গায়ে ভদ্রলোককে ঠেসে ধরে জয়ন্ত পকেট থেকে ছুরিটা বের করে। ‘আমাকে মারবেন কেন? কি করেছি আমি?’ ওর গলায় ছুরি ঠেকিয়ে, বুকপকেট থেকে ওনার মোবাইল ফোনটা বের করে সিমকার্ডটা বের, ভেঙে করে ম্যানহোলের ঝাঁঝরি দেয়ে ফেলে দেয় জয়ন্ত। ফোনটা তুলে, প্রচন্ড আছাড় মারে জয়ন্ত। ফোণটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। প্রচন্ড ভয়ে আর বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেছেন ভদ্রলোক। ওনার মুখটা চেপে ধরে ওর পাঁজর লক্ষ্য করে ছুরিটা চালিয়ে দেয় জয়ন্ত।

ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অফিসারে বিকাশ মিত্রর সামনে বসে আছে নন্দিতা। এই মুহূর্তে অফিসে আর কেউ নেই। টেবিলের উপরে রাখা পিতলের মিনে করা, ভারি ফুলদানীটা ডানদিকে একটু সরিয়ে রেখে বিকাশবাবু বলতে থাকেন, ‘তাহলে আপনি বলছেন, দুটো কার্ডের অদলবদল হয়ে যাওয়াতেই জয়ন্তবাবুর হাতে এই মার্ডারটা হয়ে গেছে?’ ‘হ্যাঁ সার, ঠিক তাই।’ নন্দিতা বলতে থাকে, ‘ আমি তো আগেও বলেছি। জয়ন্তবাবু আসার কিছুক্ষন আগেই এসেছিলেন মি.সেন। উনি ওনার অ্যাকাউন্টে কিছু ডিপোজিট করেন। আর যাওয়ার সময় ভুল করে ওনার কার্ডটা ফেলে চলে যান। আমি ছুটে গেছিলাম ফেরত দিতে,কিন্তু ওনাকে খুঁজে পাইনি।’

‘আর তারপরে জয়ন্তবাবুকে ওনার স্মৃতি ফেরত দেবার সময় ভুল করে মেশিনে মি. সেনের ফেলে যাওয়া কার্ডটা সোয়াইপ হয়ে যায় তাইতো?’ অফিসার জিজ্ঞাসা করেন।

‘এক্স্যাকটলি। আর আপনারা নিশ্চয় জানের মি.সেন খুনের অভিযোগে আগে জেলও খেটেছেন। ফলে খুনের কিছু স্মৃতিও ওনার অ্যাকাউন্টে রয়ে গেছিল।’

‘উনি কাউকে খুন করেননি নন্দিতা।’

‘কিন্তু উনি যে জেল খেটেছিলেন একথা উনি নিজেই আমাকে জানিয়েছিলেন।’

নো স্মোকিং বোর্ডটার দিকে উদাস ভাবে তাকিয়ে একটা সিগারেট ধরান, নন্দিতার সামনে বসা ডিটেকটিভ বিকাশ মিত্র।

‘মার্ডার নয়, তহবিল তছরুপের জন্য জেল হয়েছিল মি.সেনের।’ সিলিঙের দেকে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে উত্তর দেন বিকাশ মিত্র। ‘মার্ডার চার্জ ছিলনা ওনার! ওঃ! তাহলে আমার ভুলে জয়ন্তবাবুর মধ্যে মার্ডারের স্মৃতি চলে যায়নি! বাঁচালেন অফিসার।’ নন্দিতা উঠে দাঁড়ায়। ‘আরে, বসুন, বসুন। আমার কথা শেষ হয়নি এখনো।’ একটা অস্বস্তি নিয়ে বসে পড়ে নন্দিতা। বিকাশ মিত্র উঠে দাঁড়ান। ওয়াটার কুলার থেকে একগ্লাস জল খেয়ে এসে, মুখটা মুছে নিয়ে আবার নন্দিতার সামনে বসেন উনি। ‘আপনি বোধহয় জানেন না, পুলিসের ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টে এখন টপ লেভেলের সফটওয়্যার প্রফেশনালসরা কাজ করেন।’ নন্দিতা চুপ করে থাকে। আমাদের ধারণা আপনাদের সিস্টেমটা হ্যাক করা হয়েছিল। আর পরিকল্পনা মাফিকই জয়ন্তবাবুর মাথায় খুন করার স্মৃতি ভরে দেওয়া হয়েছিল। এটা কিন্তু মি. সেনের স্মৃতি নয়। তৈরি করা, আই মিন, ফ্যাব্রিকেটেট মেমোরি।’

‘বড়ই অদ্ভুত একটা কথা শোনালেন অফিসার। আপনার কথা যদি সত্য বলে ধরেও নি। তাহলেও তো প্রশ্ন থেকে যায়। এইরকম উদ্ভট কাজ কেউ করবে কেন? আর কেই বা করবে? কি লাভ হবে এসব করে?’

‘এই প্রশ্নটা তো আমাদেরও। এই লোকটি শহরে একেবারেই নতুন। মাত্র কয়েক সপ্তাহ হ’ল ও এখানে ট্রান্সফার হয়ে এসেছে। ওর এক সহকর্মীর কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, একটি মেয়ে ওর জীবন অতিষ্ট করে তুলেছিল। কোন একটি অনুষ্ঠানে ওদের একবার দেখা হয়। সামান্য পরিচয়ও হয়। ফোন নম্বর বিনিময়ও হয় তাদের মধ্যে। কিন্তু দু একদিন কথাবার্তা হওয়ার পরে, লোকটি মেয়েটির সাথে কোন যোগাযোগ করেনি। না ফোনে, না কোন সোশ্যাল মিডিয়ায়। লোকটি সম্ভবত মেয়েটিকে পছন্দ করেনি। ওর সহকর্মীই একথা আমাদের জনায়। সিম বের করে নিয়ে, ওনার ফোনটা জয়ন্তবাবু ভেঙে ফেলেছিলেন। এই সিমটা ওনার অফিসিয়াল সিম নয়। সদ্য নেওয়া সিম, খুব সম্ভবত। ফলে অফিসের কেউ এই নম্বরটা জানে না।’

‘তাহলে অফিসার, সেই মেয়েটিই কোনরকমে আমাদের সিস্টেমে ঢুকে এই খুন করার স্মৃতিটা তৈরি করে বলে আপনার ধারনা? যাতে এটা আমাদের কোন কাস্টমারের মাথায় ইম্পপ্ল্যান্ট করে, তাকে দিয়ে ভিকটিমকে মার্ডার করানো যায়? ব্যাপারটা একটু কষ্টকল্পনা হয়ে যায় না কি?’

বিকাশ মিত্র কোন জবাব দিলেন না। গলাটা একবার খাকারি দিয়ে পরিস্কার করে নিয়ে, নন্দিতা বলে, ‘তাহলে একমাত্র সেই রহস্যময়ীই জানে যে সে কে, তাইতো?’

‘হুঁ, ঠিক তাই’ বিকাশ মিত্র জবাব দেন। নন্দিতা জিভ আর টাগরা দিয়ে চুক্‌ চুক্‌ শব্দ করে বলে, ‘খুবই দুঃখের বিষয়, লোকটি মারা গেছে। রহস্যটা রহস্যই রয়ে যাবে।’

‘আমি কি বলেছি, লোকটা মারা গেছে?’ বিকাশ মিত্র ঘাড় ঘুরিয়ে দরজাটার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে আবার বলতে থাকেন, ‘মৃত্যুর মিথ্যে খবরটা ইচ্ছাকৃত ভাবেই প্রেসকে দেওয়া হয়েছিল।’ নন্দিতা একটা ঢোঁক গেলে। একটু অস্থির লাগতে থাকে ওকে।

কাঁচের দরজাটা খুলে যায়, একজন সুদর্শন মানুষ ভেতরে আসে, যার পেছনে একজন ডি.ডি অফিসার।

‘হ্যালো নন্দিতা, চিনতে পারছো?’ লোকটির এই কথার একট মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হয় নন্দিতার মধ্যে। জ্যা মুক্ত তিরের ফলার মত সোফা থেকে ছিটকে ওঠে। কেউ কিছু বোঝার আগেই পিতলের ভারি ফুলদানিটা টেবিল থেকে তুলে সামনের মানুষটির দিকে সজোরে ছুঁড়ে মারে নন্দিতা। অত্যন্ত দ্রুত হাত চালান বিকাশ মিত্র। ফুলদানিটি লক্ষভ্রষ্ট হয়ে পাশের দেওয়ালে ঝনঝন করে আছড়ে পড়ে। সামনের বিস্ময়ে বিমুঢ় মানুষটিকে ততক্ষনে অন্য অফিসারটি দ্রুত টেনে সরিয়ে নিয়েছেন। বাঁ হাত দিয়ে ডান হাতটা চেপে ধরে সোফায় বসে পড়ে নন্দিতা। যন্ত্রণায় ওর মুখ বেঁকে গেছে। সেই যন্ত্রণাকাতর মুখেও একটা তীব্র ঘৃণার সুস্পষ্ট ছাপ। সোফায় বসে, নন্দিতার দিকে মুখটা এগিয়ে নিয়ে বিকাশ মিত্র বলতে থাকেন, ‘ ব্যাপারটা যে এতদূর পৌঁছোবে, সেটা বোধহয় আপনি ভাবেন নি। না হলে আপনার তো জানা থাকার কথা এই রাস্তাটা সি.সি টিভি সার্ভিল্যান্সে রয়েছে। জয়ন্ত বাবুর গাড়ির গ্লোভ কম্পার্টমেন্টে আপনি যে ছুরিটা রাখছেন, এটা সি.সি টিভি ফুটেজেই দেখা যাচ্ছে।’ এবারে সোজা হয়ে বসেন বিকাশ মিত্র। স্বাভাবিক গলায় বলতে থাকেন, ‘জয়ন্ত বাবুকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আর আপনাকেও অ্যারেস্ট করা হচ্ছে না।’ নন্দিতার মুখটা খানিকটা স্বাভাবিক দেখাচ্ছে এখন। বিকাশবাবু তার দ্বিতীয় সিগারেটটি ধরান, ‘ক্রিমিনালদের শুধরানোর জন্য একটা নতুন প্রোগ্রাম তৈরি হয়েছে। এতে, অপরাধীর সমস্ত ক্রিমিনাল মেমোরিকে ইরেজ করে দেওয়া হয়। তবে সমস্য হচ্ছে, এই প্রোগ্রামটা একেবারেই প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। ফলে, এতে অনেকসময় টোটাল মেমোরি ইরেজও হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে আপনাকে কিন্তু আবার সেই ন্যাপি স্টেজ থেকে শুরু করতে হবে।’ ততক্ষণে একজন মহিলা অফিসার আর দুজন মহিলা কনস্টেবল নিঃশব্দে এই ঘরে এসে ঢুকেছে। নন্দিতা চিৎকার করে ওঠে, ‘আমার সাথে এরকম করতে পারেন না আপনি অফিসার, প্লিজ আমার কথাটা একটু শুনুন।’

‘টেক কেয়ার নন্দিতা। অল দ্য বেস্ট।’ কাঁচের দরজা ঠেলে বিকাশবাবু বেরিয়ে যান।

নন্দিতা এখন একটা খাটে শুয়ে রয়েছে। বিছানা ভিজিয়ে ফেলেছে। ওর মুখে একটা অর্থহীন হাসি।

ফেসবুক মন্তব্য