মেশিন

যুগান্তর মিত্র

পা টিপে টিপে মল্লিনাথ বাড়ির দিকে আসে। কিছুটা এগিয়েই বুঝতে পারে সেলাই মেশিনের শব্দ আসছে তার বাড়ি থেকেই। ভীষণ অবাক হয়ে চুপিচুপি বাড়িতে পা রাখে সে।
সেলাই মেশিনটা কিছুদিন ধরে বড্ড ঘটঘট করে শব্দ করছিল। মাঝে মাঝেই সেলাই করার সময় ববিনের সুতো জড়িয়ে যেত। সূঁচ ভেঙে যেত। কিছুতেই একটানা সেলাই করতে পারত না। খুব বিরক্ত লাগত তখন। কাজ জমে যাচ্ছিল। সময়ে ডেলিভারি দিতে না-পারলে লোকজন কথা শোনায়। অনেকে দোকান ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। কেউ কেউ ছেড়েও দিয়েছে। বিরক্ত মুখে জড়ানো সুতো ছাড়িয়ে আবার সেলাই করত মল্লিনাথ।
নিজের নামের মানে সে জানে না। বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিল ছোটবেলায়। বাবা বলতে পারেনি। মাও জানে না তার নামের মানে। একবার ভেবেছিল বিদিশা ম্যাডামকে জিজ্ঞাসা করবে। কিন্তু করা হয়ে ওঠেনি। নামটা তো বাংলায়। বিদিশা ম্যাডাম সংস্কৃত পড়ান। তিনি কি জানবেন? নাকি প্রদীপ্ত স্যারকে জিজ্ঞাসা করবে? উনি বাংলা পড়ান। নিশ্চয়ই বলতে পারবেন। কিন্তু করব করব করেও জিজ্ঞাসা করা হয়ে ওঠেনি। তার আগেই পড়া ছেড়ে দিতে হল। আর এই ছেড়ে দেবার জন্য বাবা দায়ী। বাবারা সাধারণত এরকম হয় না। সমীর, পুলক, রতন, ইকবাল, পরিতোষ…এদের সবার বাবা দিব্যি বেঁচে আছে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, বেড়ানো, জামাকাপড় জোগান দেওয়া, সংসার চালানোর মতো টাকা দেওয়া, সবই করে যাচ্ছে। শুধু মল্লিনাথের বাবাই আলাদা হয়ে গেল। সবার বাবা বেঁচে আছে। শুধু ওর বাবা আচমকা মারা গেল। এক রাতে ঘুমের মধ্যেই হার্টফেল। তাই স্কুল ছেড়ে দিতে হল। না-দিয়ে উপায় ছিল না।
মল্লিনাথ বড় ছেলে। ভাই মুক্তিনাথ তার থেকে বছর পাঁচেকের ছোট। আর বোন সুবর্ণা ভাইয়ের পিঠোপিঠি। এতগুলো লোকের সংসার চালানোর মতো টাকাপয়সা তো আর জমানো ছিল না বাবার। তাই ক্লাশ নাইনেই পড়াশোনায় ইতি টেনে কাজে নেমে পড়ল মল্লিনাথ। কাজ বলতে বাবার দরজির পেশায় চলে এল সে।
বাবার ছিল সেলাই মেশিন। সেই মেশিনই তাদের পরিবারের রুজি রোজগারের একমাত্র পথ ও পাথেয় ছিল। বাবা মাঝে মাঝে মল্লিকে দোকানে নিয়ে গিয়ে প্যান্ট-জামার কাটিং শেখাত। দোকানের নাম 'সরলাবালা টেলারিং শপ'। ঠাকুমার নামে দোকানের নাম দিয়েছিল বাবা।
মল্লিকে তার বাবা বলত, এই দ্যাখ মল্লি, এইভাবে কাঁইচি ধরবি। বুড়া আঙুলের চাপে একটু একটু করে ঘুরা। ব্যস, কেমন দাগে দাগে কাটা হই গেল দেখলি? এইটা হল দাগ দেয়ার চক। এই দিয়া মাপে মাপে দাগ দিতে হয়। বাবা কাঁচিকে কাঁইচি বলত। শুধু কাটিং নয়, তাকে সেলাইও শেখাত বাবা। বলত, শার্টের কাপড় কাটার সময় খেয়াল রাখিস বেসিক শার্ট না পাইলট শার্ট। বেসিক শার্টের দুইটা পকেট হয়। কাপড় বাচায়া রাখতে হয় দুই নম্বর পকেটের জন্য। বুঝলি?
জামার যে এতরকম অংশ আর তার নাম হয়, জানত না মল্লি। বাবা তাকে বোঝাত। ইয়োক পার্ট কাটার সময় এইভাবে আস্তে আস্তে কাঁইচি ঘুরাবি। তাইলে গোল করে কাটা যাবে। এই দ্যাখ ইয়োকের সাথে ক্যামনে ব্যাক সাইড জোড়া দিতে হয়। সেলাই করে দেখিয়ে দিত তাকে। হাতেকলমে শিক্ষা।
মল্লিনাথ বাবার কাছে পোলো শার্ট বানানোও শিখেছে। এই তল্লাটে তার বাবার নাম এমনি এমনি হয়নি। বোঝে সে। কাজের চাপ থাকলে সন্ধ্যায় বাবা তাকে দোকানে বসিয়ে দিত। তখন একটা মেশিন ভাড়া নিত বাবা। প্যান্টের কয়েন পকেট বানাতে শিখে খুব মজা পেয়েছিল মল্লিনাথ। প্যান্টে জিপার পয়েন্ট, সিঙ্গেল প্লাই, ডাবল প্লাই, ওভার লক, আইহোল ইত্যাদি নানা কিছু বাবার থেকে শেখা। একটা প্যান্টেও এতকিছু থাকে বাবা? অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল মল্লি।
হা হা হা… থাকে তো। এইসব মনেও রাখতে হয়। নাইলে কাজ করবি ক্যামনে?
মল্লি এখন ভাবে, ভাগ্যিস বাবা জোর করে তাকে টেলারিংয়ের কাজ শিখিয়েছিল। না-হলে সে কী করত? কীভাবে এতগুলো লোকের পেট চালাত? ভাইবোনের পড়াশোনা চালাতে পারত? মানানসই ঘরে বিয়ে দিতে পারত বোনের? একেবারে ভেসে যেত না !

বাবা শুধু মল্লিকেই নয়, তার মাকেও কাজে যুক্ত করে দিয়েছিল। না-হলে পেরে উঠত না যে। বাবা বলত, বুঝলি মল্লি, সবাই মিলে কাম করলে ঘরের টাকা ঘরেই থাকে। তোর ভাইটা এট্টু বড় হোক। ওরেও কাজ শিখাব। শিক্ষা কোনওদিন বিফলে যায় না। মল্লিনাথ হাড়ে হাড়ে টের পায় বাবার কথা। তার মা টেলারিংয়ের কাজে বাবাকে সাহায্য করত। ঘরে বসে হেম সেলাই করে দিত মা। জামার বোতাম লাগিয়ে দিত। বাবা বলত, পুন্যিমার হাতের ফোঁড় খুব ভালো, বুঝলি। কী সুন্দর হেম সেলাই করে !
বাবার হাতের কাজও নিখুঁত ছিল। এইজন্যই এলাকায় 'সতীদার টেলারিং'-এর নাম ছিল। সতীনাথ তার বাবার নাম। নিজের নামের নাথ যোগ করে তাদের দুই ভাইয়ের নাম রেখেছিল বাবা। মল্লিনাথ আর মুক্তিনাথ। ভাই এখন মিলিটারিতে চাকরি করে। বউ নিয়ে দূরে থাকে। যোগাযোগ আছে সামান্য। বোনের সঙ্গেও যোগাযোগ কমই। ভাই-বোনের পড়াশোনা, বোনের বিয়ে, মায়ের শেষকাজ সবই একার হাতে করেছে মল্লিনাথ। মা তাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছিল। একটু বেশি বয়সেই তার বিয়ে। তবে তার বিয়ের পরে মা আর বেশিদিন বাঁচল না।
বাবা ওপার বাংলার লোক। ঐ দেশকে বাবা বলত 'দ্যাশের বাড়ি'। মল্লি খেয়াল করেছে ওদেশে যাদের একসময় ঘরবাড়ি ছিল, তারা ঐ দেশটাকে দেশের বাড়িই বলে। সেই দেশের বাড়িতে বাবার এক কাকা ছিল। বড় ভালোমানুষ। বাবার কাছেই তার গল্প শুনেছে মল্লি। বাবা তার মল্লিকাকার নামেই ছেলের নাম রাখল। কাকার মতোই ছেলেও ভালো হবে। অনেক পড়ালেখা করে বড় মানুষ হবে। বাবার স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার ছিল না। কেননা মল্লি পড়াশুনা করতে চাইত না। স্কুলে যাবার নাম করে অন্য কোথাও গিয়ে বসে থাকত। কেউ কেউ বাবাকে এসে নালিশ করত। বাবা তখন বলত, মল্লি রে, পড়ালিখা শিখ। নাইলে বড় হবি ক্যামনে বাপ? আর কিছু বলত না বাবা। কোনওদিন তার ওপর রাগ করেনি। কারও ওপরেই বাবাকে রাগতে দেখেনি তারা। মুখ গম্ভীর থাকলেই তারা বুঝে নিত বাবা রেগে গেছে। তখন মল্লিনাথ চুপ করে যেত। দুষ্টুমি করত না। ভাই, বোন, মা, ঠাকুমা বাবার গম্ভীর মুখ দেখলে বুঝত মানুষটা কোনও কারণে রেগে আছে। তাই চুপ করে থাকত সবাই।
বাবার মৃত্যুর পরে সেলাই মেশিন নিয়ে পুরোপুরি লেগে পড়ল মল্লি। ভাগ্য সহায় ছিল, তাই পুরনো লোকজনের জামাকাপড় সেলাই করার কাজ কিছু কিছু পেল। প্রথমদিকে কেউ কেউ অভিযোগ করত, তোর বাবার মতো হাত নয় তোর। আর-একটু ধরে ধরে কাজ কর মল্লি। আবার কেউ বলত, কেন যে সতীদার থেকে ভালো করে কাজটা শিখলি না কে জানে! মল্লিনাথও বাবার মতোই চুপচাপ। কথা কম বলে। তবে মনে মনে অনেক কথা বলে। সেসব কেউ শুনতে পায় না। কেউ কিছু বললে চুপ করে শোনে। আর মিটিমিটি হাসে। একদিন সুবলদাকে বলেছিল, কী করে শিখব বলো দাদা। বাবা যে টুপ করে মরে গেল। আমরা কি বুঝেছি বাবা চলে যাবে? তবে কাজটা বাবার থেকেই শিখেছি। দেখে নিও ঠিক বাবার মতো পেরে যাব।
কথাটা শুধু কথার কথা থাকেনি। মল্লিনাথ ধরে ধরে সেলাই করেছে। কাজের সময় বাবার কথাগুলো মনে রাখত সে। আবার অনেক সময় কেনা প্যান্টজামা উল্টেপাল্টে দেখেছে সেলাইয়ের নানা কৌশল। আজকাল জামাপ্যান্ট তেমন একটা কেউ বানায় না। সবাই কেনা জামাপ্যান্ট পরে। তবে অনেকেই প্যান্ট অল্টার করতে নিয়ে আসে তার কাছে। হয়তো কোমর ঢিলা হয়ে গেছে। পুরনো প্যান্ট। তখন কোমরের সেলাই খুলে বাড়িয়ে দিতে হয়। কিংবা হয়তো কেনা প্যান্ট লম্বায় বড়। নীচ থেকে কেটে সেলাই করে দিতে হয়। সেইসময় প্যান্টের সেলাইয়ের কায়দা দেখে নেয় মন দিয়ে।
জামাপ্যান্ট বানানোর চল কমে গেছে বলে মল্লি কিছু রেডিমেড কাজ ধরে। তাছাড়া ভোটের সময় পতাকা সেলাই করে অনেক। এভাবেই চলে যাচ্ছে ভালোই। বছর শুরুর দিকে অবশ্য কাজের চাপ থাকে। স্কুলের বাচ্চাদের জামাপ্যান্ট বানাতে হয়। দেবুদা স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই কাজটা পাইয়ে দিয়েছে তাকে। পুজোর সময়ও কাজের চাপ থাকে। তবে দিনে দিনে সেই চাপ কমে যাচ্ছে। সেলাইয়ের কাজ ছেলেকে শেখাবে না মল্লি। এই কাজের ভবিষ্যৎ নেই। এখন বোঝে সে। ভরসা একটাই তার, ছেলে পড়াশোনায় খুবই ভালো।

(২)

হ্যাঁ রে, তুইও কি আমার বাবার মতোই একদিন টুপ করে…
মেশিনের কাজ থামিয়ে মনে মনে বলত মল্লিনাথ। কদিন ধরে মেশিন যেন ঠিকঠাক কাজ করছে না। মেশিন কি তার কথা বুঝতে পারে? তার কি বোঝার ক্ষমতা আছে? কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই নিজের ভেতরটায় ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসত তখন। যদি সত্যিই বাবার মতো এই মেশিনটাও চলে যায় একেবারে? ভাবলেই তার ভেতরের চড়াইপাখিটা এক্কাদোক্কা থামিয়ে দিত। চুপ করে মেশিনের দিকে অনেকটা সময় তাকিয়ে থাকত মল্লিনাথ। রাতে মেশিন বন্ধ করে দোকানের ঝাঁপ ফেলার আগে মেশিনটাকে মুছে রাখত। পরম মমতায় মেশিনের ওপর হাত বোলাত সে। আবার পরদিন কাজ শুরুর আগেও একবার মুছে নিত মেশিনটা। কতদিন ভেবেছে মোছার কাপড়টা বাড়িতে নিয়ে যাবে। একটু কাচাকাচি করা দরকার। তেল-ময়লায় কালচে হয়ে গেছে। হাতে নিলেই আঠা আঠা লাগে। কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় ঠিক ভুলে যেত।
মেশিনের ঘটঘট শব্দে ভয় পেত মল্লিনাথ। প্রায় সবসময় ভাবত, আচ্ছা সকালে কাজে বসেই যদি টের পায় মেশিনটা আর কাজ করছে না? তাহলে কী হবে? ওর বাবারও মাঝে মাঝেই শরীর খারাপ হত। মাথা টলে যেত। মা ডাক্তার দেখানোর কথা বললে বলত, ও কিছু না। মনে হয় গ্যাসট্যাস হইছে। ঠিক হয়া যাবে।
সেইসময় কেমন যেন থম মেরে থাকত বাবা। তবে কিছুক্ষণ মাত্র। আবার উঠে কাজে লেগে পড়ত। মেশিনের কাজ। বাড়ির অন্যান্য কাজ।
এসব কি আজকের কথা? সেই আঠারো-উনিশ বছর আগের কথা। বাবা মারা যাবার পর বছর তিনেক মেশিনটা খুব ভালো কাজ দিল। তারপরই একসময় ঘটঘট শব্দ শুরু হল। তাড়াতাড়ি বিনোদ মিস্ত্রিকে ডেকে এনেছিল মল্লিনাথ।তারই এক কাস্টমার বিনোদের খোঁজ দিয়েছিল।
সেই মিস্ত্রিকে এখন আর এই একালায় ঢুকতে দেয় না বিল্লু মিস্তিরি। এই নামেই সবাই তাকে চেনে। বিল্লু বাজার কমিটিতে আছে। কাউন্সিলের কাছের লোক। এদিকে ঠান্ডা গোবেচারা স্বভাবের বিনোদ মিস্ত্রি মেশিন সারাইয়ের কাজটা মন্দ করত না। তাই তার ডাক পড়ত নানা দোকানে ও বাড়িতে। বিল্লু ওর জন্য কাজ পেত না এলাকায়। সেই কারণেই বিনোদকে ভয় দেখিয়ে এদিকে আসা বন্ধ করে দিল বিল্লু।
বিনোদের সারানোর মাসখানেক পরে আবার শব্দ শুরু হয়ে গেল মেশিনের। বিনোদ সারানোর পরেই বলেছিল, এখন মোটামুটি চলবে দাদা। কিন্তু বেশিদিন টানতে পারবেন না। দু-চারটে পার্টস পাল্টে দিলে একেবারে ঠিক হয়ে যাবে। মল্লির ইচ্ছে ছিল পাল্টেই নেয় একেবারে। কিন্তু বিনোদ তখনই পারবে না বলল। হাতে তার অনেক কাজ। দিন দুয়েক পরে করে দেবে বলেছিল। তার মধ্যেই বিল্লু হুমকি দিয়ে তার আসা বন্ধ করে দিয়েছে।
এবার খারাপ হওয়ার পরে বিল্লুকেই ডেকেছিল মল্লি। না-ডেকে উপায়ও ছিল না। এই তল্লাটে বিল্লু অন্য মিস্ত্রিকে ঢুকতেই দেয় না। বিল্লু মেশিন পুরোপুরি না-খুলেই বলে দিল, এর পেছনে হাজার দেড়েক খরচ করতে হবে মল্লিদা। দাঁত, ববিন কেস, টেনশন ডায়াল, সাটেলের লুপ টেকার, আর্ম… সব একেবারে ঝরঝরে হয়ে গেছে। সারিয়ে কোনও লাভ নেই। তার চেয়ে নতুন মেশিন কিনে নেওয়া ভালো।
নতুন মেশিনের তো অনেক দাম ! এত টাকা পাবো কোথায়?
সে ব্যবস্থা আমি করে দেবো। ব্যাঙ্কের ম্যানেজার আমার চেনা লোক। তুমি হাজার খানেক জোগাড় করো। বাকি টাকা মাসে মাসে শোধ করে দিও।
মল্লি শুনেছে এই কেনার থেকেও বিল্লু কমিশন আদায় করেছে। শীতল এন্টারপ্রাইজের থেকে মেশিন কিনতে হল। সেই দোকানদার নাকি বিল্লুকে কমিশন দিয়েছে।
এই মেশিনটা কি পরে সারাই করে নেবো?
মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বিল্লু বলেছিল, ওসবের দরকার নেই। লজঝরে মেশিনটা পরে আমিই কিনে নেবো। ওটা তো কেজি দরে বিক্রি করা ছাড়া কাজে লাগবে না। আমি অন্য কাজে লাগিয়ে দেবো। রেখে দাও এখন। পরে দেখছি।
সেই পরে আর আসেনি। নতুন মেশিন কেনার পরে বিল্লু আর এদিকে পা রাখেনি। অন্য কাউকে বিক্রি করার কথাও ভাবেনি মল্লিনাথ।
একবার ভেবেছিল পার্বতী তো সেলাই জানে। পা-মেশিন চালাতে পারে। বিয়ের আগে ওর মা বলেছিল। মেশিনটা সারিয়ে নিলে ছেলের জামাটামা সেলাই করতে পারবে। নিজের সেমিজ ছিঁড়ে গেলে রিপেয়ার করতে পারবে। তাছাড়া বাবার কথাটাও মনে পড়ল তার। ঘরের টাকা ঘরে রাখার কথাটাও ভেবেছে বার কয়েক। কিন্তু ভাবাই সার। মেশিন আর ঠিক করা হয়ে ওঠেনি। বাতিল হয়ে পড়ে আছে দোকানে।
কিন্তু একসময় মেশিনটা বাড়িতে নিয়ে আসতে হল। শ্যামল এক বিকেলে তার দোকানে এসে বলল, মল্লিদা, তোমার মেশিনটা তো পড়েই আছে। বেচে দাও না। সারিয়েসুরিয়ে নিই। ঘটকদার বাড়িতে পাইকারি রেটে ব্লাউজ সেলাই হয়। আমার বউও সেলাই জানে তো। বাড়িতে বসে যদি দু-চারদিনে এক ডজনও সেলাই করতে পারে, খারাপ কি? যা দু-পয়সা আসে আর কি ! বোঝো তো বাজারের অবস্থা।
মেশিনটা অনেকদিন হল পড়ে আছে, কোনও কাজেই লাগছে না এটা ঠিকই। তবু বিক্রির কথা শুনে ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠেছিল মল্লিনাথ। দোকানের এক কোণে পড়ে থাকে। তবু মনে হয় বাবা যেন ওর কাছাকাছি আছে। বাবার স্মৃতি। শুধু তো স্মৃতি নয়, একসময় এই মেশিন তাদের সংসার টেনেছে। তাই দোকানেই রেখে দিয়েছে মেশিনটা। শ্যামলকে বলেছিল, ওটা বাবার স্মৃতি হিসাবে থাক শ্যামল।
স্মৃতি কি যন্ত্রে মল্লিদা? বাবা তোমার মনে সবসময় আছে। দাও না দাদা কমসম করে !
এরপরও শ্যামল কয়েকবার বলেছে। তখন একদিন পার্বতীর কথা বলল মল্লিনাথ।
দেখ শ্যামল, আমি বিক্রির কথাটা পার্বতীকে বলেছিলাম, বুঝলি? কিন্তু পার্বতী রাজি হচ্ছে না রে।
কেন? বৌদি রাজি নয় কেন?
বুঝলি না, বাবার স্মৃতি বলে কথা। তাছাড়া ও নিজেও তো মেশিন চালাতে পারে। তাই বলল সারাই করে বাড়িতেই রাখো। আমাদের টুকিটাকি জিনিস ঘরে বসে সেলাই করতে পারব।
পুরোটাই বানিয়ে বলেছে মল্লিনাথ। পার্বতীর কথা বলে কাটাতে চাইল আসলে। শ্যামল বুঝল কিনা কে জানে। তবে মুখ অন্ধকার করে চলে গিয়েছিল। তারপর থেকে শ্যামল আর মল্লির দোকানে আসে না। কথাও বলে না পারতপক্ষে। হয়তো রাগ করেছে। তা করুক। মেশিনটা প্রাণে ধরে বেচতে পারবে না সে। তাই একদিন দুপুরে কানাইয়ের ভ্যানে চড়িয়ে নিয়ে মেশিন নিয়ে এসেছে ঘরে।
রান্নাঘরের পাশে ছোট্ট একটা ঘর আছে তাদের। বহু পুরনো। একসময় ওখানে ঘুঁটে আর গুল রাখা। সেটা বাবার আমল। তারপর বাবা নিজেই একদিন গ্যাসের লাইন নিল। তখন গুল পাওয়া যেত না বেশি। ঘুঁটে কেনার জন্য হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করতে হত। এখন সেই ঘরটায় বাতিল জিনিস রাখে ওরা। সেই ঘরেই মেশিন রেখেছে মল্লিনাথ। মাঝে মাঝে না-হয় মেশিনটা মুছেটুছে রাখবে। বাবার স্মৃতি থেকে যাবে, যেভাবে তালপাতার পাখাটা তুলে রেখেছে তাকের ওপরে। কাপড়ের লাল পাড় দিয়ে পাখার কিনারা সাজিয়ে দিয়েছিল মা।
পা টিপে টিপে ঘরে ঢোকে মল্লিনাথ। আড়াল থেকে দেখে ছেলে পার্বতীর পুরনো সেমিজ সেলাই করে দিচ্ছে। আচমকাই ঢুকে পড়েছে সে। ছেলে তার এই অসময়ে এবং আকস্মিক আগমনে চমকায় না একটুও। বাবাকে দেখে হাসিমুখেই সেলাই চালিয়ে যায়। কিন্তু পার্বতী অবাক হয়। দেয়ালের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে, কী গো? আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরলে যে ! শরীরটরির ঠিক আছে তো?
হুম। পল্লবদা বিকেলে মরে গেল। সবাই দোকান বন্ধ করে সেখানে গেছে। আমিও চলে এলাম।
কোন পল্লবদা গো?
পরে বলব। এটুকুই কথা বলে থেমে যায় মল্লিনাথ।
হাতমুখ ধুয়ে এসো। চা করে আনি।
পার্বতীর কথার কোনও জবাব দেয় না মল্লিনাথ। পার্বতীও জবাবের অপেক্ষা না-করে রান্নাঘরে চলে যায়।
অবাক হয়ে মল্লি ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। দু-একসময় দোকানে গিয়ে ছেলে বায়না ধরত সেলাই শেখানোর জন্য। হাসিমুখে মল্লিনাথ ছেলেকে কিছু কিছু শিখিয়েছে।
তোর এসব শেখার দরকার নেই রে পাগলা। তুই বড় চাকরি করবি। এসব কাজ করবি কেনো?
তবু ছেলের ইচ্ছেতেই সেলাইয়ের কিছু রকম শিখিয়ে দিয়েছে সে। তবে কাটিং শেখায়নি। ছেলে অবশ্য শিখতেও চায়নি। বাবা সেলাই করে। তাই তার আব্দার সেও সেলাই শিখবে।
পার্বতী চা আনে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মনটা ভরে ওঠে মল্লিনাথের। সেইসময় পার্বতী তাকে মেশিনের বৃত্তান্ত শোনায়। পার্বতীর ভাই এসেছিল বিকেলে। সঙ্গে এক বন্ধু। সেই বন্ধু মেশিনটেশিন সারাতে পারে। সে সেলাই মেশিনটা খুলে বলল, তেমন কিছুই হয়নি। দুটো জিনিস বদলে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।
জানো তো, ছেলে তখনই ছুটল কিনে আনতে। বলল বাবাকে এখন বলব না। এসে দেখবে মেশিন ঠিক হয়ে গেছে। সেই যে মেশিনে বসেছে, আর ওঠার নাম নেই। উত্তেজনা ও আনন্দ ঝরে পড়ে তার কণ্ঠ থেকে।
হাসি হাসি মুখে পার্বতী নানা কথা বলে যায়। কিন্তু লোকটা তার কথা একবর্ণও শুনছে না বুঝতে পেরে থেমে যায় একসময়। কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে আছে তার স্বমী। অভিমানে সেখান থেকে সরে যায় পার্বতী।
চা খেতে খেতে মল্লিনাথের মনে পড়ে যায় লুঙ্গিটার কথা। ঘরে ঢুকে তার ব্যাগ থেকে একটা নতুন লুঙ্গি বের করে আনে। সে ভেবেছিল দোকানে হাতের কাজ শেষ করে সেলাই করে নেবে। এখনকারটা এখানে-ওখানে ছিঁড়ে গেছে। আর সেলাই করে পরা যাবে না। কিন্তু পল্লবদা মারা গেছে বলে নতুন কেনা লুঙ্গিটা সেলাই করা আর হয়ে ওঠেনি। দোকান বন্ধ করে চলে আসতে হয়েছে।
দেখি কেমন সেলাই শিখলি। লুঙ্গিটা ছেলের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলে মল্লিনাথ। হাসি ঝুলে পড়ে তার মুখ থেকে। ছেলেও হাসিমুখে লুঙ্গিটা হাতে নেয়। যেন সেলাই করাটা এমন কিছু কঠিন কাজ নয় তার কাছে। মেশিনে নীল সুতো লাগানো আছে। মায়ের নীল রঙের সেমিজ সেলাই করছিল এই সুতো দিয়েই। বাবার লুঙ্গিও নীল চেককাটা। তাই আর সুতো বদলের প্রয়োজন পড়েনি তার। লুঙ্গির দু-পাশ মিলিয়ে ধরে সেলাই শুরু করে সে।
মল্লিনাথ অন্ধকার বারান্দায় মোড়া পেতে বসে। ঘরের টিউবের আলোয় সেলাই করতে থাকা ছেলের আলোকিত চেহারা তার চোখে আনন্দের প্রলেপ লাগিয়ে দেয়। সে পুলকিত হয়।
হঠাৎই মেশিনের ঘূর্ণায়মান চাকায় চোখ পড়ে মল্লিনাথের। অবিরাম ঘুরে চলা চাকা থেকে কি কোনও কথা ভেসে আসছে? কান পেতে শোনার চেষ্টা করে সে। বাবার গলা না? আমি আছি! পাশে আছি! মেশিনটা তার বাবার স্মৃতি, নাকি সত্যি সত্যিই বাবা হয়ে উঠল ! আমি আছি! পাশে আছি! বাবা যেন আরও অনেক কথা বলে চলেছে। সবই ভরসার কথা। আর সেই কথাগুলো ভাসতে ভাসতে তাকে যেন জড়িয়ে ধরছে। ক্রমশ পাকে পাকে বেঁধে ফেলছে।
সহসা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মল্লিনাথ। মোড়া থেকে পড়ে যায় মাটিতে।

ফেসবুক মন্তব্য