লুপ্তস্নানকথা

অশোক দেব

জলের যৌবন আছে। শৈশবও। আমি সেই জল স্মরণ করি। সকালে গোবর আর মাটি দিয়ে লেপা হয়েছে উঠোন। এখন রোদ লেগে গেয়ে গেয়ে উঠছে। একটা বাহারি পিঁড়ি। কবেকার কে জানে। কালো হয়ে গিয়েছে কালের আদরে। তার ওপর সোনারঙের একটি পাত্র। পেতলের। তাতে জল। জলে দূর্বা ভাসছে। জলের শৈশব। আর শিশুটিকে স্নানে পেয়েছে। ফুলে ফুলে উঠছে ঠোঁট তার — চান করিয়ে দাও। আমি সেই স্নান স্মরণ করি। অতিদূর পূর্বজন্মের স্নান।জলে মধ্যমা ছুঁইয়ে রেখে ঠাম্মা বিড়বিড় করতেন:
‘ওম গঙ্গে চ যমুনেশ্চৈব গোদাবরী সরস্বতী
নর্মদে সিন্ধু কাবেরি জলহস্মিন সন্নিধিং কুরু’
সেই থেকে আমি নদীর বশ। জলের বশ। স্নানের বশ।স্নানে পায়, নদীতে পায়।

এই যে ঘাটে লালচে হলুদ হয়ে শুয়ে আছে,শুইয়ে রাখা হয়েছে, তাকে আমরা বলি ‘অসুরের হাড্ডি’। অসুরের হাড়। বহু আগে কোনো প্রবীণ বৃক্ষ মাটির গভীরে গিয়ে সমাধি নিলে তার শরীর এমন হয়ে যায়। পুকুর কাটতে গেলে তার দেখা মেলে। ঘাটে, জলে আর ভেজাডাঙায় তাকে শুইয়ে রাখা। আমাদের মায়েরা মাটির তৈরি হতেন। ফলে, তাঁদের পা ফেটে যেত, গোড়ালি। সেই অসুরের হাড়ের মধ্যে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তারা পা ঘষতেন।ঝিলিক ঝিলিক করে উঠত সে দুটি পা। হাল্কা অভিমানের মতন গতকালের আলতা মিশে যেত জলে। হাঁসেরা ডুব দিয়ে দিয়ে দেখে আসে পুকুরের অন্তঃপুর। ঘাটে আড্ডা হয়। স্নানঘাট স্বভাবে নারী। তাই সেখানে বসে নারীদের যত কথা। হাসি।স্নানার্ত বালক এতক্ষণ জলে পা দোলাচ্ছিল।আর মায়েদের আলোকজ্জ্বল হয়ে ওঠা দেখছিল। কিন্তু, তাঁদের কথায় সাধারণত দরোজা লাগানো থাকে। কথা শুরু হতেই, সেই বালককে স্নান করিয়ে, গা মুছিয়ে বাড়ি চলে যেতে বলা হত। দরোজা বন্ধ করে দেওয়া হত। ভেজা ইজের হাতে, ছোটো গামছা পরা সেই বালকের ঘাট থেকে বাড়ি ফিরে আসার লিকলিকে পথটিকে স্মরণ করি।

প্রকৃত যৌবন আসার আগে শরীরে বটপাতা গজায়। তখন পুকুর ছেড়ে শান্ত নদীটির দিকে চলে যায় স্নানের আর্তি। সেখানে, জলে একটি মেয়ের সাধারণ হাত বাহুলতা হয়ে যায়। সাঁতারই আসলে মানুষকে মানুষ করে তুলেছে। যে সেই সাদা মেয়েটির সঙ্গে সাঁতার কাটেনি, সে কী করেছে? জলের শিহরণে হেসে ওঠা সেই মেয়ের ঢেউ স্মরণ করি।

আমাদের দেশে সূর্য আসে আমাদের পথ ধরে। আমরা পূর্ব, আমরা পূর্বোত্তর। দেশ হতে দূরে এই দেশে আছি। ওইদিকে সারা দেশ, এদিকে দাহ্য পতঙ্গের দেশ। একদা আগুন লাগল। জুন, ১৯৮০। দাঙ্গা। আমাদের ঠাম্মা কেবল দেশত্যাগের বেদনাকেই বেদনা মনে করেন। সেই বেদনার আঁশ আবার আগুন হয়ে জ্বলতে লাগল। দূরে কারা যেন মানুষের ঘাড় থেকে ফেলে দেয় মাথা। তারপর ছুঁড়ে ফেলে নদীতে। ‘লাশ আসে, লাশ আসে’, চিৎকার শুনে আমরা নদীর কাছে যাই। নদী আমাদের সনাক্ত করতে পারে না। মানুষ মানুষ হয়ে মানুষের লাশ সনাক্ত করতে পারে না। ভেসে যায়। ‘কেউ নদীর জল পান করবেন না, নদীতে স্নান করবেন না’। একটা গাড়ির মাথায় মাইক বেঁধে বলে যান সরকার। আমাদের নদীস্নান বন্ধ হল। সেই লাশের ডুবসাঁতার, ভেসে ওঠা স্মরণ করি।

সেই যে আগুন, নিভলেও তার ধিকিধিকি থেকে গিয়েছে। মানুষ গ্রাম থেকে শহরের দিকে চলে আসতে থাকে। বিশাল গ্রামের বাড়ি ছেড়ে এসে শহরে একটুকু বাসা গড়ে। তার দরকারে একে একে মরে যেতে লাগল পুকুর। টিলার লালমাটি গোঁ গোঁ করে নিয়ে আসে পুংলরি। পুকুরগুলোর গোঙানির শব্দ তাদের আক্রোশের নীচে হারিয়ে যেতে লাগল। একটি একটি পুকুর ভরে যায়, আমাদের মায়েদের একটু একটু আয়ু কমে যায়। আমাদের বালকেরা সাঁতার জানে না, তারা তাই তেমন মানুষ হয়ে ওঠে না। আমাদের কিশোরী জোছনাসন্ধ্যায় কাঁদার মতন মেদুর পুকুরঘাট পায় না বলে,রহস্যহীন হয়ে গেল। আর আমরা একটা করে স্নানঘর গড়ে নিতে লাগলাম। তার ভেতরে নদীর ক্রন্দন জমা হয়ে যায়।সেই অশ্রুধারার নীচে দাঁড়িয়ে ভাবি, স্নান করি। এ স্নান আসল স্নান নয়।
সেই বিলুপ্ত স্নান স্মরণ করি।

ফেসবুক মন্তব্য