ডাক্তারজেঠু

যশোধরা রায়চৌধুরী


দত্ত মেডিকালে যা তো মানি, এক ছুট্টে গিয়ে নিয়ে আয় ওষুধটা।
মা বলতে না বলতেই আমি ভোঁ।

কাউন্টারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দেখলাম, বাইরে মাছির মত ভনভনে গরম, লালচে রোদ গুড়ের মত জমাট বেঁধেছে। ভাত খাওয়ার ঘুম চোখে নিয়ে, বিকেল চারটের সময় ডাক্তার জেঠু ভুঁড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে এলেন। এসে বসলেন ওষুধের দোকানের লাগোয়া ছোট্ট, চিলতে ঘরটায়।

একটা টেবিল, যথাসম্ভব ছোট। একটা চেয়ার তাতে লাগানো। আর একটা ছোট মতন পেশেন্ট শোওয়ার বেড। এক ফুট বাই সাড়ে চার ফুট । ওই বেডে পা সোজা করে বড়রা শুতে পারত না। ওপরে ছোবড়ার গদিতে সবুজ রেক্সিন লাগানো। নড়বড়ে একটা টুল রাখা, যাতে খচমচিয়ে বেডে ওঠা যায়। তলায় বোধ হয় কিছু কাগজ পত্র রাখা হত , বা কমপ্লিমেন্টারি ওষুধ টোশুধ।

এই সব দেখলাম সবুজ পর্দাটা উড়ে গেল বলেই। নইলে পর্দার আড়ালেই পেশেন্টরা যায়, আর পাঁচটাকা ফিজ নিয়ে ডাক্তার জেঠু রুগি দেখেন। গরিব হলে সবসময় নেন না সে টাকাও। তবে সেদিন কেউ আসেনি। কে আসবে চারটের রোদ্দুর ঠেঙিয়ে , আর আসার মধ্যে তো সর্দি জ্বর আর পেট খারাপের পেশেন্ট। তখন সেভেন থেকে এইটে উঠছি, জানি কী এক আন্দাজে, বড়সড় অসুখ হলে ভটচাজ ডাক্তারকে কেউ দেখায় না। আর একটু একটু খারাপও লেগেছে এটা ভাবতে। আবার একটু একটু মজাও লেগেছে । প্রতিশোধের মজা। ততদিনে আমি এইটে উঠেছি কিনা।

আগে কিন্তু এসব ভাবতাম না, জানতাম না। মা বাবা আমাদের কোন অসুখ হলেই ভটচাজ ডাক্তার ছাড়া কিছু বোঝে না। বাবাকে সেই যে একবার রক্তআমাশায় পাঞ্জাবির দোকানের কশা মাংস খেতে বলেছিল। ওই গরম গরম মাংসের ঝোল খেলে নাকি পেটখারাপ পালায়। - কাঁচকলাও অবশ্য খাওয়া যায়...বাবা সেই থেকে ভটচাজদা বলতে অজ্ঞান ছিল...

ডাক্তার জেঠু, ডাকতাম আমরা। ডাক্তার জেঠুর হাতে ম্যাজিক ছিল। ছুঁলেই রোগগুলো সব উড়ে পালাত। কোথায় উড়ে পালাত? ছাতের ওপর দিয়ে, মিষ্টিদিদার রোদে দেওয়া আচার আর বড়ির ওপর দিয়ে, মায়ের মেলে দেওয়া ভাইয়ের হিসিতে ভেজা কাঁথা কম্বলের ওপর দিয়ে, নারকেল সুপুরির মাথার ওপর দিয়ে, মেঘেদের দেশে।

মেঘেদের দেশ থেকে অবশ্য আমাদের পাড়ায় রোগবালাই আসত যত না, বাচ্চাকাচ্চা আসত তার চেয়ে বেশি। আমাদের পাড়ার সব বাড়ির সব বাচ্চা ওই মেঘেদের দেশ থেকেই এসেছিল। টুপ টুপ করে এসে পড়েছিল। অন্তত আমরা তাই ভাবতাম। আমি, রেনু, ঘুচু, বাবলা সবাই ভাবতাম। কারণ প্রত্যেকের বাড়িতেই একের পর এক ভাইবোন কোথা থেকে যেন এসে যেত, আর আমাদেরও পোয়াবারো, কেউ ডাকখোঁজ করবার নেই, চান খাবার সময় ছাড়া। অবশ্য এসব কথা যখন ভাবতাম, তখন আমি এইটে উঠিনি। একদম বোকা ছিলাম, কাঁচা বাচ্চা।

তবু আমাদের ছোটবেলায় অসুখ হত খুব, সেসব ধুলোবালির মত স্বাভাবিক ছিল । আমরাও হাত না ধুয়ে খাবার খেয়ে, নোংরা ঘেঁটে মুখে হাত দিয়ে, জিভ দিয়ে চেটে ঘুড়ি সাঁটিয়ে খাম বা ডাকটিকিটের আঠা সাঁটিয়ে, এমন কি মাটি থেকে মুড়িলজেন্স তুলে খেয়ে অসুখের কমপিটিশনে নেমেছিলাম। একদম খুচরো নয়, আবার বড়সড় অসুখও না, ওই মাঝারি অসুখগুলো না হলে অবশ্যই ডাক্তার জেঠুর দর্শন হত না। মাথায় ভেজা কাপড়ের পটি কাজ না করলে, বা অয়েল ক্লথে ঘাড় ফেলে মাথা ধোওয়া ফেল করলে, তিনদিন ধরে জ্বর না কমলে, জ্বরের সঙ্গে অন্যান্য উপসর্গ, যথা গলাফোলা, খোসপাঁচড়া বা দাগড়া দাগড়া ঘা ইত্যাদি হতে থাকলে, ডাক্তার জেঠুর দর্শন ছিল অবশ্যম্ভাবী।

তবে আমাদের জীবনে ডাক্তার জেঠুর চাইতেও খারাপ খারাপ কিছু জিনিশ ছিল। করপোরেশনের একটা রোগামত সরুমত পায়ে গু-হলুদ রঙের প্লাস্টিকের চটিপরা বিয়ে না হওয়া মাসি বসন্তের টীকা দিতে আসত। এলেই পালাতাম। হাতে সূচ দিয়ে বিনবিনে ফুটি ফুটি দাগ ফুটিয়ে টীকা দিত মাসিটা। চার পাঁচদিন ধরে জ্বর থাকত, হাত ফোলা। কী বিশ্রি। তো, সেই ভয়ে আমরা লুকিয়ে পড়তাম, এর ওর বাড়িতে। কলঘরে, বাগানে, পেছনের গুদোমঘরে।
বাবলাদের পেছনের গুদোমঘরে একটা লোক থাকত, উশুখুশু দাড়ি আর ময়লা ময়লা চেহারা। তার জামাকাপড়ে খুব গন্ধ। টীকামাসিকে দেখে একবার পালাতে গিয়ে ওখানে লুকিয়েছিলাম। সেই লোকটা আচমকা এগিয়ে এসে, ঘোলাটে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, সেই থেকে আমার রাতে বিছানায় হিসি হয়ে যেত। ভয় পেয়ে জেগে উঠতাম, গলা শুকনো কাঠ।

গলার কথায় মনে পড়ল। আমার খুব টনসিল ফুলত তখন। আর গলাব্যথা হলে ডাক্তার জেঠুর কাছে যাওয়া। কী জঘন্য লাগত শুরুটায়। ডাক্তারজেঠু কথা বলত খুব, আচমকা চেঁচিয়ে ওম , ওম, করে কী সব মন্ত্রপাঠ শেখাত। স্টেথোস্কোপ গলায় ঝোলানো, সাদাটে একটা ফুলশার্ট আস্তিন গুটিয়ে রাখা, সেই চেহারাটা, বেশ বড় সড় আকারের এক ভালমানুষ দানবের মত, আমার কাছে ভয়াবহ ছিল। ভয়াবহ লাগার আর একটা কারণ জঘন্য ওই মিক্সচারটা, যেটা বানাত শুঁটকো কম্পাউন্ডারকাকু, কিন্তু ডাক্তারজেঠুই যে ওটার প্রেসক্রিপশন লিখে দিতে সেটা আর কে না জানে! এক খানা চ্যাপ্টা কাচের শিশিতে দাগ দেওয়া সাদা কাগজ কেটে আঠা দিয়ে সাঁটা, সেই দাগ মেপে ওষুধ খেতে হবে। উফফ, সেই ওষুধের স্বাদের মত খারাপ খেতে জিনিশ পৃথিবীতে আর নেই, আর রংটা, ওই মিক্সচার গোলাপি রং দেখলে দোলের দিনের বিশ্রি জামাকাপড় থেকে একমাস ধরেও না ওঠা গোলাপিকেও ফিকে লাগে। স্বচ্ছ অথচ ঘন, চ্যাটচেটে অথচ বেজায় দুর্গন্ধ, তরল পদার্থটার স্বাদটা না মিষ্টি, না তেতো। যদি শুধু তেতো হত তো এক কথা ছিল। কেন যে মিষ্টি সিরাপ ওর মধ্যে মেলানো হত কে জানে রে বাবা। তার ওপর ওই স্পিরিট স্পিরিট গন্ধটা, যাতে সবচেয়ে বেশি গা গুলিয়ে ওঠে। ভাবা যায় না কী খারাপ।

এর পর অবশ্য, যত বড় হতে থাকি, সেই সিরাপের বদলে, মিক্সচারের বদলে ডাক্তারজেঠু ট্যাবলেট দিতে শুরু করে। আমি ট্যাবলেট গিলতে পারতাম না, সে আর এক গোলমাল। মা চামচে জল নিয়ে তার মধ্যে ট্যাবলেট ভেঙে দিয়ে গুঁড়িয়ে গুলে দিতে চাইত, পারত না ঠিকঠাক, মা কোনদিনই কোন এরকম কাজ ভাল করে পারত না অবশ্য। মাথায় জলপট্টি দিতে গিয়ে জল গড়িয়ে কানে ঢুকে যেত, হাতপাখা দিয়ে মাথায় হাওয়া করতে গিয়ে ঠুকেও দিত মাথাটাকে অনেকসময়! উফফফ মা টা যে কী না!

আরো পরে এসেছিল অ্যান্টিবায়োটিকের বোতল, সেগুলো ভাইয়ের কপালে জুটেছে। গুঁড়ো ওষুধ, তাতে ফোটানো ঠান্ডা করা জল মিশিয়ে ঝাঁকিয়ে তরল বানাতে হবে। খেতে কম খারাপ না মিক্সচারগুলোর থেকে। তবে তেতো তো তেতোই, মিষ্টির ঝুঠো প্রলেপ দেওয়ার কোন চেষ্টাই নেই তাতে...এ এক দিক দিয়ে ভাল তো বটেই। আমার ধারণা আমার ভাই যে জীবনে এত সফল হয়েছে তাতে এই ব্যাপারটার হাত আছে। সোজাসাপটা ও, ঘেঁটে যাওয়া না। আর ওই না মিষ্টি না তেতো, কিংকর্তব্যবিমূঢ় সিরাপ খেয়ে খেয়ে আমার যে আজও সবেতে পিছুটান, সবেতেই কনফিউশন, বিভ্রান্তি, মায়া...

গদাইদার প্রেমে পড়েছিলাম আমি একবার। ওই আর কি, প্রায়ই ওষুধ কিনতে যেতে যেতে যেতে, একবার দেখি ভীষণ ভাল্লাগছে গদাইদাকে। তখন এইটে উঠেছি। সিক্স কি সেভেনে চোখ মেলে দেখিনি যে জিনিষগুলো , সেগুলো সব দেখতে শুরু করেছি । তেরো বছর বয়স। মানে আমি প্রকৃত টিনেজার।

প্রেমে পড়েছিলাম কেন? আসলে আমাকে বোধ হয় গদাইদার খুব ভাল্লাগে। আমার দিকে একটু অন্যভাবে তাকায়। একটু বেশি গুরুত্ব দেয় কাউন্টারে আমি গিয়ে দাঁড়ালেই, কিন্তু সেটা বুঝতে পেরে যে বেশ একটু ভাওটাও নেব, পাত্তা দেব না কিন্তু নিজের ওজনটা ছড়িয়ে দেব চারধারে, এত ক্যালি হয়নি তখনো আমার। ক্যালি কথাটা মাসতুতো দাদা প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হওয়ার সূত্রে তখন জেনেছি যদিও, বাজারে ভাও কথাটা আসেইনি তখনো। আসেনি ভ্যালেন্টাইন্স ডে, আসেনি অ্যাপোলো মেডিকাল হলের টাই পরা যুবকেরাও, যারা ইংরিজিতে কথা বলে আর কুটুর কুটুর করে কমপিউটারে বিল কাটে। এমনকি রঙিন টিভিও আসেনি, সাদাকালো কাঁপা কাঁপা ছায়ার আসরে সন্ধেগুলো সবে দূরদর্শনে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে সবে। ত , সে সময়ে আমার মত ডাগর হয়ে ওঠার মুখে দাঁড়ানো মেয়ে, নিজেকে এলোমেলো পুরুষদের লোভী চতুর ছোঁওয়ার হাত থেকে রক্ষাই করতে শেখেনি, দর নেওয়া বা অ্যাডভান্টেজ নেওয়া বুঝে উঠতে পারবে কি করে।

গদাইদার প্রেমে পড়ে আমার শুধু দত্ত মেডিকালে যাওয়া একটু বেশি ঘন ঘন হয়ে উঠল আর কি। গদাইদা মিষ্টি করে হাসত, ওটুকুই ফাউ, নইলে একটা ক্রোসিন, দুটো ভিটামিন ট্যাবলেটের জন্য অনেকটা সময় কাউন্টারে দাঁড়ানোটা এমনিতে খুব একটা পাওনা নয় কিছু। কিন্তু বেশিদিন দীর্ঘস্থায়ী হল না সে প্রেম। কেননা ডাক্তারজেঠু বাদ সাধলেন।

বড়সড় চেহারার মানুষটি আবার দানব হয়ে উঠলেন আমার জীবনে । না, গোলাপি মিক্সচারের জন্য না, ততদিনে পেশেন্ট কমেছে কিন্তু বাবা মা বা মিষ্টিদিদা-প্রবীণকাক দের বাড়ি, অন্যান্য পুরনোবাসিন্দাদের কাছে কিন্তু ডাক্তারজেঠুর সামাজিক প্রতিপত্তি আর ব্যক্তিত্ব একই আছে ।

আসলে আমরা বড় হচ্ছি আর একটু একটু করে করুণা করছি ডাক্তারজেঠুকে। কারণ নতুন ক্লিনিক খুলেছে মোড়ের মাথায় । অ্যাপোলো মেডিকাল হল । ল্যামিনেট করা চেয়ার টেবিল দেওয়ালে ওয়াশেবল পেন্ট...।

সুতরাং গরিবগুর্বো আর বাবাদের মত বুডঢারা ছাড়া কেউ দেখায় না ভটচাজ ডাক্তারকে । সেজন্যেই কি, ডাক্তারজেঠুর কাজ হয়ে গেছে শুধু অন্যদের ব্যাপারে কাঠি করা? কাজ একমাত্র সারা পাড়ার সবার ব্যাপারে নজর রাখা আর তা নিয়ে আড়ালে বা খোলাখুলি বলা। বাবা মাকে সেজন্যেই বোধ হয় আমার নামে লাগিয়ে দিল, আর অমনি আমার ওপরে খবরদারি শুরু হয়ে গেল ওদের। একদিন বিচারসভাও বসল। তুই কি জন্য লকস কেটেছিস? আমাদের মত বাড়িতে ভুরু প্লাক করে না জানিস না কেউ? মেয়েগুলোর ডানা গজালো কি করে। অধঃপাতে গেছিস একেবারে। জিওগ্রাফি বইয়ের নিচে শরদিন্দু, আশুতোষ , প্রতিভা বসু বা আশাপূর্ণা রেখে পড়িস পড়িস, তাই বলে আনন্দলোকের ছবিতে লাভ সাইন দিয়ে এঁকে ম্যাপবইয়ের মলাট করবি?
ছি ছি কি ঘেন্না!

আমিও কি ঘেন্না করেছিলাম সেদিন এই খুঁতখুঁতে লোকটাকে। গদাইদার ব্যাপারটা বাবার প্রেশার দেখার ছলে বলে দেওয়ায়। ছোটবেলায় যাকে ভগবানের মত বিশাল দরাজ মনে হত, যার হাতে ম্যাজিক ছিল, যার ছোঁওয়ায় আদ্ধেক জ্বরবালাই পালাত, তাকে বেজায় এক খিটকেল বুড়ো ছাড়া কিচ্ছু মনে হয়নি সেদিন।

গদাইদাকেও বোধ হয় বলে দিয়েছিল ডাক্তার জেঠু। কারণ তারপর একদিন বাবা মায়ের কড়া পাহারা সত্ত্বেও এন্টারোকুইনল নিতে গেছি। ওটা একটা বাহানা। আসলে তখন প্রায়ই যেতাম। ছুতো। দেখা দেব গদাই দাকে। দেখবও একটু । কাউন্টারের ওপার থেকে এপারে... ওটুকুই আদানপ্রদান।

তখন আমাদের জীবনে বড্ড এন্টারোকুইনল ছিল। লোকে পেট খারাপের গল্প পুঙ্খানুপুংখ বিবরণ সহ করতে ভালবাসত। পাতলা পায়খানা না আমাশা? পাতলা। গদাইদা এরকম পষ্ট জিগ্যেস করত। লোকে উত্তরও দিত পষ্ট।

দত্ত মেডিকালের সামনের দিকটায় সারাদিন ভিড় থাকত মাছির মত ভনভন করে। ছুটকো ছাটকা রোগের সব চিকিৎসাই হত কাউন্টারের ওপারে গদাইদার মুখে মুখে।

তখন, সেদিন, গদাইদা এলই না বাইরে। সামনেই এল না। অন্য একটা বিচ্ছিরি গোঁফওয়ালা ক্যাটকেটে মত লোক এসে ওষুধ জিগ্যেস করছিল। পরে চোখ এদিকে ওদিকে ঘুরিয়ে দেখলাম ভেতরের দিকে স্টোর রুমে কাজ করছে গদাইদা। কাকে যেন কী উত্তর দিল, কোনো একটা ওষুধ চাইতে। পর্দা দিয়ে এক ঝলক ওর মুখটা দেখতে পেলাম। ওর মুখে সব রক্ত এসে জমা হল এক মুহূর্তে, আমাকে কাউন্টারের এপাশে দেখে। সুরুৎ করে সরে গেল আবার পর্দার আড়ালে।

ব্যাস, সেই শেষ। এর পর বহুদিন আর দত্ত মেডিকেলে যাইনি। তারপর দত্ত মেডিকেল বন্ধ হয়ে গেছে কবে। ডাক্তার জেঠুও অসুস্থ হয়ে পড়লেন, বাইরে আর বেরোতেন টেরোতেন না বিশেষ।

পরে, অনেকবছর পরে, বাবা মার কাছে শুনেছি, ডাক্তার জেঠুর স্ত্রী মারা গেছিলেন বহুবছর আগে। সারাজীবন একা থেকেছেন। কিন্তু লোকে বলে উনি ওনার শ্যালিকাকে ভালবাসতেন। শ্যালিকাও বিধবা। চাইলে বিয়ে তো করতেই পারতেন। অথচ লোকভয়ে পারেন নি। কোনদিন মুখ ফুটে বলতেই পারেননি । মাঝে মাঝে শ্বশুরবাড়িতে যেতেন। শ্যালকদের সংসারের এককোণে পড়ে থাকা শ্যালিকা, রোগা, ক্ষয়া, সাদা শাড়ি পরা, তার একতলার কোণের ঘরের সামনে , দাওয়ায়, মোড়া পেতে বসে চা খেয়ে চলে আসতেন। শ্যালকদের আপত্তিতে একসময় সেই যাওয়াও বন্ধ হয়েছিল। সেবার ফিরে এসে দুঃখ করে বাবাকে বোধ হয় কিছু একটা বলেছিলেন। হয়ত প্রেশার মাপতে গিয়ে স্টেথো কানে নিয়েও কিছু শুনতে পাচ্ছিলেন না। পুরো অন্যমনস্ক হয়ে ছিলেন। বাবা জিগ্যেস করেছিলেন, ডাক্তারদা আপনার শরীর খারাপ? তখন বিরাট করে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়েছিলেন।

সেই থেকে কেউ আর কিছু জিগ্যেস করত না। ছাই চাপা আগুনের মত বাবা মা, বড়দের মুখে মুখে চোখে চোখে কথাটা ঘুরত।

আর ডাক্তার জেঠু সেসব কথার তোয়াক্কা না করে একলা থাকতেন, ডোরাকাটা শার্ট পরতেন, স্বপাকে খেতেন আর প্রতিটি জ্বর সর্দিকাশি আর পেটখারাপের পেশেন্টকে একইরকম ওষুধ দিয়ে যেতেন বছরের পর বছর। দিনের পর দিন। পাঁচ টাকা নিয়ে বা না নিয়ে।

তখন অনেক বড় হয়ে গেছি। কলেজে পড়ি । এই গল্পটা শোনার পর ডাক্তারজেঠুকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। গদাইদাকে যে আমার ভাল লাগে, মনে হয়, মজা করেই ডাক্তারজেঠু বাবাকে বলেছিল। কুটুনি কাটতে নয়। আসলে সব নষ্টের গোড়া বাবা-মায়েরাই। সুখী সংসারীরা যে অন্যদের ভালবাসার ব্যাপারটা দুচক্ষে দেখতে পারে না।

অলংকরণঃ অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়

ফেসবুক মন্তব্য