গ্রুপের নাম আকাশবাড়ি

অনিরুদ্ধ সেন

এখন বিকেল। জাফরি গলে রোদের বরফিগুলি এখনই এসে ঘরের মেঝেতে লুটোবে। এই সেদিনও এটা ছিল নিরঞ্জনবাবুর সংক্ষিপ্ত দিবানিদ্রার পর চা খাওয়ার সময়। এখন একা একা সেটা আর বিশেষ হয়ে ওঠে না। তার বদলে তিনি সাধারণত এখন একটু হাঁটতে বেরোন। তেমন ইচ্ছে হলে ফেরার পথে কোনও দিন মোড়ের মৌসুমী কেবিন থেকে চা খেয়ে নেন।

আজ অবশ্য তিনি বেরোলেন না। কেন যেন ইচ্ছে করল না। আর অবসর নেবার পর থেকে তিনি ইচ্ছেকে দমন করার চেষ্টা বড় একটা করেন না। যৌবনে মানুষ ভবিষ্যতের তাগিদে অনেক ইচ্ছে সংযত রেখে বিভিন্ন সুঅভ্যাসের দাস হয়। বার্ধক্যের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। আছে শুধু বর্তমান, যে তার যোগ্য মর্যাদা দাবি করে।

তাছাড়া, তিনি এখন প্রায় দায়মুক্ত। ছেলে, মেয়ে দুজনেই জীবনে প্রতিষ্ঠিত, বিবাহিত আর দূর দেশে স্থিত। স্ত্রী বছর দুই হল গত হয়েছেন। ঝাড়াঝাপটা তিনি শুধু নিজের প্রতিই দায়বদ্ধ।

সে দায় নিতে অবশ্য তিনি পিছপা নন। নিজের দৈনন্দিন যৎসামান্য চাহিদার জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় কাজকর্ম তিনি নিজেই সারতে পারেন। শুধু আজকাল নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ মনে হয়। একলা যেন কেমন দম আটকে আসে।

না, মাঝরাতে হঠাৎ নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলে কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার নেই ভেবে তিনি ব্যাকুল নন। মৃত্যুভয় তাঁর নেই, এমনটা নয়। কিন্তু সেটা কখনও সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠেনি। তিনি মনে করেন, তাঁর পূর্ণ জীবন তিনি যাপন করেছেন। এবার যেটুকু জোটে, তা অধিকন্তু। এই সচেতন চিন্তার সাহায্যে তিনি মৃত্যুর আতঙ্ক অনেকটাই প্রশমিত করতে পেরেছেন।

তবে মানুষ তো মননশীল জীব। তাই সে মানসিক সঙ্গ খোঁজে। আর এখানেই হয়েছে মুস্কিল, তাঁর মন উপযুক্ত সাহচর্য পায় না। এই বয়সে নবীন প্রজন্মকে বিশেষ পাশে পাবেন, এ দুরাশা তাঁর নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, চারপাশে প্রবীণ যাঁদের দেখেন তাঁদের মানসিকতাকে তিনি একটুও মেনে নিতে পারেন না। সবার মধ্যেই খালি নিরাশা, অতীত রোমন্থন আর নতুন প্রজন্মের বিরুদ্ধে ক্ষোভের উদগার। এ যেন বার্ধক্যের কাছে আগে থাকতে অসহায় আত্মসমর্পন, দু বেলা মরার আগে বারবার মরা।

“আজকালকার ছেলেমেয়েরা… আর আমাদের সময়? এসব ভাবাও যেত না। আমাদের একটা শিক্ষাদীক্ষা ছিল।” শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। একবার বলেই ফেলেছিলেন, “বুড়োরা চিরকালই অমনটা বলে এসেছে, আমাদের আগের প্রজন্মও আমাদের সম্বন্ধে একই ধরণের কথা বলত। তাই বরং সেই গতানুগতিকতায় বাঁধা না পড়ে অল্পবয়সিদের তাদের চোখ দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করুন। আর এখনকার ছেলেমেয়েরা যদি খারাপ হয়েই থাকে তবে তা তো আমরা তাদের ঠিকমতো তৈরি করতে পারিনি বলেই? তাই এই হামবড়াই ছেড়ে বরং নিজেদের মতো করে বাকি জীবনটা কীভাবে একটু ভালো করে বাঁচা যায়, তার সন্ধান করুন।” এইসব কথা অবশ্য তাঁর বয়স্ক সঙ্গীরা ভালোভাবে নেননি। আলোচনার ফলে মনের ফারাক দূর না হয়ে বেড়েছে।

অনেকে আবার এই সময় বেশি করে ধর্মের দিকে ঝোঁকেন। কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যায় সেটা অন্তর পরিশুদ্ধির উপকরণ নয়, মৃত্যুর কালো ছায়াকে সাদা চোখে দেখতে না চাওয়ার এক রোদ চশমা।

এই বৃদ্ধদের গ্রুপে দু-একবার সামিল হওয়ার চেষ্টার পর তাই নিরঞ্জন ছিটকে বেরিয়ে এসেছেন। কালের নিয়মে সমবয়সী আত্মীয়বন্ধুর সংখ্যা ক্রমে কমছে। যারা আছে, তাদের অনেকেই দূরে দূরে থাকে। তবু তাদের সাথে অবরে সবরে যোগাযোগ রেখে তাঁর কোনওমতে দিন কাটে। বাকি সময়টা ভরান বই, টিভি আর ক্রসওয়ার্ড দিয়ে।

ছেলে সৌম্য পরামর্শ দিয়েছিল ফেসবুক করতে। বলেছিল, ওখানে তুমি অনেক সম মনোভাবাপন্ন মানুষকে পাবে আর তাদের সাথে চিন্তা বিনিময় করে সময় ভালো কাটবে। তার আগেই অবশ্য ছেলেমেয়েদের সাথে যোগাযোগ রাখার সুবিধার্থে তাঁরা কর্তাগিন্নি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন। সৌম্যর পরামর্শে তিনি ফেসবুক ব্যবহারের পরিসর বাড়িয়ে নতুন নতুন বন্ধু খোঁজার চেষ্টা শুরু করলেন।

এখানেও অবশ্য তিনি প্রচুর বুড়োটে, ফুরিয়ে যাওয়া মানুষকে পেলেন। এমনকি অকালবৃদ্ধ অনেককেও। তবু তার মধ্যে কয়েকজন মন্দের ভালো। তাদের সাথে যৎসামান্য আলাপ চালিয়ে আর কিছু পোস্টিং পড়ে, ছবি দেখে তাঁর রোজ কিছুটা সময় কাটে। এমন সময় একদিন এক ফেসবুক বার্তার পর তাঁর জীবন বলতে গেলে অনেকটাই পাল্টে গেল।

বার্তাটি পাঠিয়েছেন অনিকেত দত্ত বলে এক বয়স্ক ভদ্রলোক। কোনও এক ‘কমন ফ্রেন্ড’এর পোস্টিংয়ে মাঝে মাঝে কমেন্ট দেওয়ার সূত্রে তাঁদের কিছু ‘আলাপ’, পরস্পরের চিন্তার সঙ্গে কিছুটা পরিচিত হওয়া। তারপর একদিন অনিকেত নিরঞ্জনকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালেন। সেই রিকোয়েস্ট ‘অ্যাকসেপ্ট’ করতে নিরঞ্জনের দ্বিধা হল না। কারণ মতবিনিময়ের সূত্রে তিনি টের পেয়েছেন, চিন্তার দিক থেকে এই বয়স্ক লোকটি তাঁর অনেকটাই কাছাকাছি।

কিছুদিন অনিকেতের সাথে বার্তাবিনিময়ের মারফত তাঁরা মনের দিক থেকে আরও কাছে পৌঁছে গেলেন। অনিকেত ঐ যাকে বলে ‘বিন্দাস’ ধরণের লোক। তিনি দুঃখবিলাস পছন্দ করেন না। তা বলে তিনি দায়িত্বজ্ঞানহীন বা কাণ্ডজ্ঞানহীন নন, উপযুক্ত মননশীলতার মানুষ। আর তাঁর একটা আলগা নির্লিপ্তির ভাব নিরঞ্জনের ভালো লাগে। এই বয়সে তাঁরা মূলত দর্শক। জোর করে খেলোয়াড় হতে গিয়েই অনেকে নিজেরাও কষ্ট পায়, অন্যেদেরও ঝামেলায় ফেলে।
এরপর অনিকেত একদিন তাঁকে একটা গ্রুপের মেসেজ ফরোয়ার্ড করতে আরম্ভ করলেন। গ্রুপটির নামটা অদ্ভুত – আকাশবাড়ি। নিরঞ্জন জিগ্যেস করেছিলেন, “এমন অদ্ভুত নাম কেন?”

অনিকেত উত্তর দিয়েছিলেন, “দেখুন, আমরা সবাই ‘সাইবার’ জগতের বাসিন্দা আর ‘সাইবার’ কথার আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে ‘ভার্চুয়াল রিয়ালিটি’ বা কাল্পনিক বাস্তবতা। এই কল্পনার আকাশে বিচরণ করি দেখেই আমরা নাম নিয়েছি ‘আকাশবাড়ি’।”

নিরঞ্জন মেনে নিয়েছিলেন। গ্রুপটা ‘ক্লোজড গ্রুপ’ আর এই গ্রুপের তিনি এখনও মেম্বার নন। অনিকেত বলেছেন, “আমাদের কতগুলি নিয়মকানুন আছে। তাই এই মুহূর্তে আমি আপনাকে মেম্বার করতে পারছি না। কিন্তু আমার মনে হয় যেহেতু আপনার ও আমাদের চিন্তা মোটামুটি এক ফ্রিকোয়েন্সিতে, তাই আপনার হয়তো আমাদের পোস্টিংগুলো ভালো লাগবে। আপনি লাইক করতে পারলেও এক্ষুণি কোনও কমেন্ট করতে পারবেন না, কিন্তু কিছু বলার থাকলে আমাকে জানাবেন, আমি গ্রুপকে ফরোয়ার্ড করে দেব।”

“কিন্তু আমি কি জানতে পারি, কী সেই মেম্বার হওয়ার নিয়মকানুন? তাহলে অন্তত সেইভাবে চেষ্টা করতে পারতাম।”

“আপনাকে বিশেষ চেষ্টা করতে হবে না। আমাদের গ্রুপের মেম্বার হওয়ার যা যা লিখিত-অলিখিত শর্ত, তার অনেকটাই আপনি পূরণ করছেন। শুধু একটা ব্যাপারে আটকে যাচ্ছেন। চিন্তা করবেন না, সময় হলে নিজে থেকেই তা জানতে পারবেন।”

কৌতুহলী হলেও নিরঞ্জন আর কিছু জিগ্যেস করেননি। সাধারণভাবে, গ্রুপটির সাহচর্য তাঁর ভালো লাগছিল। তাই এখন দিনে অন্তত ঘণ্টা দুয়েক তিনি ফেসবুকে কাটান। কোনও পরনিন্দা, পরচর্চা নেই, কোনও না পাওয়াজনিত আক্ষেপ-হাহুতাশ নেই। শুধু মনের নান্দনিক দিকগুলিকে জাগিয়ে তুলে গ্রুপের এক একান্ত নিজস্ব ভাবাবেগে সদস্যরা সামিল। সূর্যাস্তের পূর্বের সোনালী দিনগুলি ভরিয়ে তোলার এমন সুযোগ যে কখনও আসবে, নিরঞ্জন ভাবতে পারেননি।

আজ সন্ধ্যায় নিরঞ্জন মনে এক হালকা বিষণ্ণতার ছোঁয়া নিয়ে ঘরে বসেছিলেন। আজ একটি বিশেষ দিন। কিন্তু যে মানুষটি এই দিনটি দু-একটি অনাড়ম্বর ছোট্ট খুশির আয়োজনে এক স্নিগ্ধতার ছায়ায় মোহময় করে তুলত সে আজ নেই। দূর থেকে ছেলেমেয়েদের ফোন অবশ্য রুটিনমাফিক আসে। তবে বিভিন্ন কারণে এবার তারা দু’জন ব্যস্ত থাকবে। তাই আজ যোগাযোগ নাও করতে পারে ভেবে আগাম বার্তা পাঠিয়ে রেখেছে। সুতরাং এই বিশেষ দিনটিও তাঁর নিঃসঙ্গই কাটবে।

সন্ধ্যা ঘনাচ্ছে। নিরঞ্জন উঠে আলো জ্বালালেন, তারপর তাঁর ল্যাপটপ চালু করলেন। নানা দায়ে পড়ে স্মার্টফোন কিনতে হলেও তিনি সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য এই যন্ত্রটিতেই স্বচ্ছন্দ। ফেসবুকে লগ-ইন করে বসে এটাসেটা দেখছেন, কিন্তু মন পড়ে আছে ‘আকাশবাড়ি’র বার্তার জন্য। অবশেষে শোনা গেল সেই প্রত্যাশিত ‘টুং’।

“শুভ জন্মদিন।” মেসেজ এসেছে আকাশবাড়ির এক সদস্য সুমিত বসাকের কাছ থেকে। তিনি উত্তরে ‘ধন্যবাদ’ লিখতে না লিখতেই আবার সুমিত লিখেছেন, “আমরা নভোজগতের বাসিন্দারা কাল্পনিক লিঙ্ক মারফত পরস্পরকে উপহার হিসেবে কোনও দ্রব্য পাঠাতে অক্ষম। তবু যা সম্ভব আপনাকে পাঠাচ্ছি, আশা করি ভালো লাগবে।” সাথে সাথেই ওদিক থেকে চলে এল একটা গানের লিঙ্ক, অখিলবন্ধু ঘোষের ‘ওই যে আকাশের গায় দূরের বলাকা ভেসে যায়।’

এই গান এবং গায়ক সত্যিই নিরঞ্জনের খুব প্রিয়। এক সময় অখিলবন্ধুর গানের একটা ক্যাসেটও তিনি কিনেছিলেন। কালের প্রকোপে টেপ রেকর্ডার এখন অকেজো হয়ে পড়ে, গরজ করে গান শোনার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়ে ওঠেনি। এখন নাকি ইউ টিউবে পছন্দের গান যখন খুশি শোনা যায়। কিন্তু তিনি কখনও চেষ্টা করে দেখেননি। অনেকদিন পর শুনে মন এক আশ্চর্য তৃপ্তিতে ভরে গেল। এক মুহূর্তের জন্য যেন তিনি আকাশের মেঘের ভেলায় ভাসতে লাগলেন।

আমেজটা থিতিয়ে যেতে না যেতেই আবার ‘টুং’। এবার দীপান্বিতা চৌধুরি, আবার শুভেচ্ছা। ওঁরা কী করে জানলেন সে প্রশ্ন অবান্তর, ফেসবুকই জানিয়ে দেয়। কিন্তু এবারেও তারপর উপহার একটা গানের লিঙ্ক – শচীন কর্তার ‘কে যাস রে, ভাটি গাং বাইয়া’। এটাও নিরঞ্জনের খুব প্রিয়। আকাশের পর হারিয়ে যাওয়া পুব বাংলার বহতা নদী – নিরঞ্জনের মন ভরে উঠল এক উদাস খুশিতে।

একটা প্রশ্ন তাঁর মনে উঁকি মারতে শুরু করেছে। সেটা জানাবার চেষ্টা করার আগেই অনিকেতের কাছ থেকে মেসেজ এল, “জানি, ভাবছেন আমরা আপনার প্রিয় গান ও গায়ক কারা তা কী করে জানলাম?”
“সত্যিই তাই। আপনি কি থট রিডিং জানেন নাকি?” অবাক নিরঞ্জন উত্তর দিলেন।
“আমাদের গ্রুপে এমন একজন আছেন যিনি আপনাকে চেনেন আর আপনার রুচিপছন্দের সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত। তিনিই আমাদের অবগত করেছেন যে আপনি এককালে গান ও আবৃত্তি খুব ভালোবাসতেন। আপনার পছন্দ সম্বন্ধেও আভাস দিয়েছেন। বাকিটা আমাদের সদস্যদের অনুমান।”
“কে তিনি?” অনেক ভেবেও নিরঞ্জন কুলকিনারা পেলেন না।
“সেটাও সময় হলেই জানতে পারবেন।”
আরও একটি রহস্য। কিন্তু এ নিয়ে বিশেষ ভাবার আগেই কিছু সময়ের ব্যবধানে একের পর এক আসতে লাগল ‘আকাশবাড়ি’ সদস্যের থেকে শুভেচ্ছা ও গানের উপহার। হেমন্ত-সলিল, দেবব্রত বিশ্বাস, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, গীতা ঘটক, সুচিত্রা মিত্র, মান্না দে – সবই তাঁর প্রিয়। আবার কিছু দুর্লভ আবৃত্তি – কাজী সব্যসাচী, এমনকি রবীন্দ্রনাথের স্বকণ্ঠে ‘আমি পরাণের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা’।

তারপর এক সময় যখন তাঁর মন সংপৃক্ত হতে চলেছে তখন ‘অনেক হয়েছে, আজ থাক’ মনে হওয়ার ঠিক আগে পেশাদারি সংযমে সেই স্রোত স্তব্ধ হল।
“আশা করি আজকে আপনার শুভ জন্মদিনের সন্ধ্যায় আপনার নিঃসঙ্গতাকে আমরা কিছুটা হলেও কাটিয়ে তুলতে পেরেছি।” বললেন অনিকেত, “তবে যদি আপনার পছন্দের আর কোনও শিল্পী থেকে থাকেন তো জানাতে পারেন। আমরা চেষ্টা করে দেখতে পারি।”
“আপনারা তো মনে হয় আমার পছন্দের বর্ণালীর প্রায় সবটাই পরিক্রমা করেছেন।” বললেন নিরঞ্জন, “তবে সুবিনয় রায় আর শ্রাবণী সেনের রবীন্দ্রসঙ্গীত আর প্রদীপ ঘোষ, গৌরী ঘোষের আবৃত্তি শুনতে খুব ইচ্ছে করছে। অবশ্য যদি –”
কিছুক্ষণ বিরতির পর উত্তর এল, “সুবিনয় রায়ের একটা গানের লিঙ্ক পাঠাচ্ছি, আপনার সম্ভবত অপছন্দ হবে না। কিন্তু দুঃখিত, অন্যদের গান আমাদের অ্যাকসেসের বাইরে। তবে ইউ টিউব সার্চ করলে আপনার পছন্দের গানগুলি পেলেও পেতে পারেন।”
“ধন্যবাদ, তাতে কোনও অসুবিধা হবে না।” নিরঞ্জন সুবিনয় রায়ের গানটা শুনলেন। আর তারপর সবিস্ময়ে লক্ষ করলেন, ‘আকাশবাড়ি’র দেওয়া লিঙ্কগুলি ইউ টিউবের নয়। সম্ভবত সব কটিই কোনও ব্যক্তিগত লিঙ্ক থেকে শেয়ার করা। আশ্চর্য, ওদের কি তাহলে ইউ টিউব অ্যাকসেস নেই?

“এবার আমার তরফ থেকে ছোট্ট করে ধন্যবাদ দিই এই বহুমূল্য উপহারগুলির জন্য, যা আদতে বস্তুগত উপহারের চেয়ে অনেক, অনেক দামি।” নিরঞ্জন লিখলেন, “আমি চিরকালই মনে করতাম, রুচির ব্যাপারে আমি নিঃসঙ্গ। কিন্তু আপনাদের সাথে যোগাযোগের পর মনে হচ্ছে, আমি একা নই। অল্পসংখ্যক হলেও অন্তত কিছু মানুষ আছেন যাঁরা চিন্তার দিক থেকে আমার দলে।”
“আপনার অনুভূতিকে আমি সম্মান জানাই। তবে হয়তো জেনে খুশি হবেন, আমরা এখন আর মুষ্ঠিমেয় নই। বাড়তে বাড়তে এমন একটা জায়গায় এসে গেছি যে খুব শিগগিরই আমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাব।”
ঠিক বিশ্বাস করতে না পারলেও অনিকেতের আশাবাদকে মনে মনে তারিফ জানিয়ে নিরঞ্জন ঘুমোতে গেলেন।

সেই রাতটা নিরঞ্জন ঘুমে-জাগরণে এক অদ্ভুত আচ্ছন্ন ভাব নিয়ে কাটালেন। সকালের রোদ চোখে পড়তে উঠে দেখলেন, একটু বেলা হয়েছে। দরজায় পড়ে থাকা প্রভাতী সংবাদপত্রটা তুলে নিয়ে অলস চোখ বোলাতে বোলাতে তিনি গতকালের প্রায় অলৌকিক অভিজ্ঞতার কথা ভাবছিলেন। এমন সময় ফেসবুকের এক নোটিফিকেশন চোখে পড়তে সচকিত হলেন। ভুরু কুঁচকে সমস্ত ব্যাপারটা আবার নতুন করে ভাবতে বসলেন।

হ্যাঁ, ছেলেমেয়েরা কিছুদিন আগেও বলত, “তোমাদের জন্য আর আলাদাভাবে উইশ বা সেলিব্রেট করার দরকার কী? একেবারে পিঠোপিঠি বার্থ ডে। তোমাদের তো শুনেছি অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। তা, গ্র্যান্ড পা, গ্র্যান্ড মা’রা কি কুষ্ঠির বদলে বার্থডে মিলিয়ে তোমাদের সম্বন্ধ করেছিল?”
গত ক’বছর এই কথাটা তারা আর তোলে না। হয়তো বাবাকে স্মৃতির খোঁচায় কষ্ট দিতে চায় না দেখে। তিনিও তাই নিজের জন্মদিনটিকে আর বিশেষভাবে স্মরণ করতে চান না। কিন্তু না চাইলেও মন তো মানে না, অতীতের স্মৃতি বেদনা জাগায়।

তবে কাল যা হল, কল্পনাতীত। ক’বছর পর তিনি যেন সেই পুরনো দিনগুলিকে ফিরে পেয়েছিলেন। স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে কাগজে চোখ বোলাতে লাগলেন। এমন সময় একটা টুকরো খবরে তাঁর চোখ আটকে গেল।

“ফেসবুকে মৃত ব্যক্তিদের অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। যেহেতু উত্তরাধিকারীরা সাধারণত পাসওয়ার্ড জানে না, তাই কারও মৃত্যুর পর তার অ্যাকাউন্ট আর ডিলিট হয় না। বাড়তে বাড়তে ফেসবুকে মৃতদের সংখ্যা খুব শিগগিরই জীবিতদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে।”

জানালা দিয়ে একফালি রোদ তাঁর চোখে পড়েছে। নিরঞ্জনের অন্তরও যেন এক নতুন উপলব্ধিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। “সময় হলেই জানতে পারবেন”, অনিকেতের বারবার উচ্চারিত এই কথাটির অর্থ তিনি যেন আজ ভোরে বুঝতে পারলেন। চিনতে পারলেন ‘আকাশবাড়ি’র সদস্যদের আর তাদের মধ্যে তাঁর পরম পরিচিত বান্ধবটিকেও।

শুধু বুঝতে পারলেন না, এই নতুন উপলব্ধির পর এখন যদি তিনি কম্পিউটার খোলেন তবে দেখবেন কিনা যে আকাশবাড়ি গ্রুপ রাতারাতি আকাশেই মিলিয়ে গেছে। তবে জানার তাড়াই বা কী? তিনি ধীর চিত্তে অপেক্ষা করবেন কখন তাদের গ্রুপে সামিল হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন।

“উইশ জয়ন্তী চ্যাটার্জি ফর হার বার্থডে।” নোটিফিকেশনটা আবার দেখলেন নিরঞ্জন। তারপর ধীরে ধীরে টাইপ করলেন, “ভালো থেকো।”

ফেসবুক মন্তব্য