অন্তর্বর্তী

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়


আমাদের সংসারে তিনটি প্রাণী – আমি, বিবেকদাদা আর আমাদের কুকুর ইদি। এখানে বলে রাখা ভাল, কুকুরের নাম কোন রাষ্ট্রনেতার নামে রাখার মত রুচি আমাদের নেই। চাকরিসূত্রে প্রবাসে বাসা বাঁধার শুরুর দিকে বিবেকদাদা অনাহারে মৃতপ্রায় ক্ষত-বিক্ষত ইদিকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনেন। তখন ইদি এতটুকু ছিল। তুলো ভিজিয়ে দুধ খাওয়াতে হত। বিবেকদাদা তার ঘায়ে মলম-পট্টী করে অসীম শুশ্রূষায় তাকে সারিয়ে তোলেন। প্রথম থেকেই তাঁর ধারণা ইদি হিন্দীভাষী। সে কুঁই কুঁই, ভৌ ভৌ যাই করে সেটা হিন্দীতেই। হিন্দী থেকে তার নাম হয়ে গেল ইদি… বিবেকদাদার মুখে কথা আটকে যায়। বিবেকদাদা এবং ইদি পুরোপুরি আমার উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল। বিবেকদাদা সৎ, সাত্ত্বিক, নিরামিষাশী মানুষ। সারাদিন বাড়ীতেই থাকেন, পুজো-আচ্চা নিয়ে। ইদি ভয়ানক দুরন্ত। পারলে গিয়ে পুজোর নৈবেদ্যতে মুখ দেয়। বিবেকদাদা ইদিকে শাসন করেন, সামলান, আগলে রাখেন।

আমরা ভাড়াবাড়িতে থাকি বলে আমাদের নিজস্ব অনেক কিছুই কেনা হয়ে ওঠে না। যেমন আমাদের নিজেদের কোন আয়না নেই। বাড়ীওলার দাক্ষিণ্যে একটি পারদ-চটা আয়না বাথরুমের দেওয়ালে ঝোলান থাকে। টিম টিমে বাল্বের আলো জ্বালিয়ে সেই আয়নায় আমি রোজ সকালে দাড়ি কামাই। বিবেকদাদার সন্ন্যাসীর মত লম্বা দাড়ি, তিনি দাড়ি কামান না। আয়নাটি বার্ধক্যের প্রায় শেষ সীমায়, থাকা না থাকা সমান। সামনে দাঁড়ালে ভাল করে চেহারা চেনা যায় না। নিজেকে পাশের বাড়ীর লুম্পেন কর্নেলের মত লাগে। কর্নেল রিটায়ার্ড, দামিনীকে নিয়ে থাকেন, বলেন ভাগ্নী। লোকে নানা কথা বলে।

কে এল বাইরে এলো চুলে/ পুড়ে যাবে হাত তাকে ছুঁলে…


দামিনীর চেহারার মধ্যে একটা খাই-খাই ভাব আছে। ভর-সন্ধেবেলা চুল ছেড়ে বিল্ডিঙের লনে ঘুরে বেড়ায়, গুনগুন করে গান গায়। অফিস থেকে ফেরার সময় তাকে দেখি। সেও আমাকে দেখে, হাত নাড়ায়। বিবেকদাদা দামিনীকে একদম পছন্দ করেন না। প্রায়ই বলেন – ও মাগী অনক্কি! দামিনীর অলক্ষ্মীপনা আমার অবশ্য তেমন মন্দ লাগে না। বিল্ডিঙের লনে একটা কাঠচাঁপার গাছ আছে। দামিনী যখন নিচু হয়ে ফুল কুড়োয় তখন তার দিকে তাকালে চোখ জ্বলে যায়। আমি জোর করে চোখ সরিয়ে নিই। কখনও সন্দেহ হয়, দামিনীও বুঝি আমাকে পছন্দ করে। কর্নেল যদি জানতে পারেন আমি দামিনীকে বা দামিনী আমাকে বা দু-জনে দু-জনকে পছন্দ করি তাহলে তাঁরও রেগে যাবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হাজার হোক তিনি দামিনীর রক্ষক।
আমি ঠিক জানি না, আর্মির রিটায়ার্ড অফিসারদের কাছে কি ফায়ার আর্মস থাকে? তাহলে সেটা একটা ভয়ের বিষয় বটে। ভয় নিয়ে আমার মনে একটা সাংঘাতিক কনফিউসান আছে। এতখানি দামড়া হয়ে গেলাম, তবু ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, ভয় আমার শত্রু না মিত্র। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় পর্যন্ত ভয় আর আমার মধ্যে সম্পর্কটা অনেক সহজ ছিল। কলেজে ভয় যদিও এক বছরের সিনিয়র ছিল, র্যা গিং-এর সময় ওর সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। ওই বুদ্ধি দিয়েছিল বাড়াবাড়ি কিছু হলে হোস্টেলের ছাদে জলের ট্যাঙ্কের ওপর লুকিয়ে থাকার জন্যে। পরে কেমন নেশা লেগে গিয়েছিল। বিকেলের জলখাবারের পর থেকেই ছাদে যাবার জন্য মনটা উসখুস করত। ছাদে পৌঁছে দেখতাম মেঘের থেকে তখনও রঙ মুছে যায়নি। অথচ শালিমার রেল ইয়ার্ডএর দিক থেকে ধুলো-ধোঁয়া-সর্বস্ব সন্ধে উঠে আসছে। জং-ধরা লোহার সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতাম ট্যাঙ্কের ওপর। ভয় আমার হাত ধরে টান দিয়ে বলত – চল না, আমি তো আছি... ভয় কী? পা ফস্কালে ঠিক ধরে ফেলব। আমি বলতাম – ধ্যুর, কে বলল আমি ভয় পাচ্ছি? অথচ পেতাম। দামিনীকে দেখলে যেমন পাই। কিনারায় বসতে কার না ভয় লাগে?

বন্ধু যখন ভয়/ তার কাছে আশ্রয়...


পাশাপাশি বসে, পা দোলাতে দোলাতে আমরা টুকটাক গল্প করতাম। আমি আর ভয়। নিচে তাকালে পেটের মধ্যে খালি খালি লাগত, মাথা ঘুরত। তবু ভাল লাগত। রুজু রুজু হাওয়া দিত। অনেক নিচে পাথর-মাটি। পুকুরধারে বুনো ফুলের ঝোপ। উল্টো দিকে স্টাফ কোয়ার্টার, এক্ষুণি গা ধুয়ে নীলু এসে দাঁড়াবে বারান্দায়। আমি আর ভয় পরস্পরের দিকে চেয়ে মিচকে হাসব। আর ঠিক তখনই ক্যাম্পাসের পাঁচিল টপকে চাঁদ উঠবে।

কলেজ থেকে বেরিয়ে মাঝে কিছুদিন ভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তখন আমি হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছি। ভয় কেন, কোনো দিকে তাকানোরই কোনো সময় নেই। বাবা মারা যাবার পর হাঁড়ির হাল, মায়ের উইডো পেনশানের টাকায় কোনোমতে খোঁড়াতে খোঁড়াতে সংসার চলছিল। যে চাকরি পেলাম তার জন্যে আমায় বাড়ি ছাড়তে হল। মা রইল, বিবেকদাদার তত্ত্বাবধানে। আমি প্রবাসে বাসা ভাড়া করে চাকরি শুরু করলাম। বাড়ি ভাড়া আর নিজের খাই খরচের জন্যে কিছু রেখে মাসে মাসে টাকা পাঠাতাম বাড়িতে। মা আবার আস্তে আস্তে গুছিয়ে নিচ্ছিল। ছুটিতে বাড়ি গিয়ে দেখতাম জানলার পর্দা বদল হয়েছে। ডাইনিং টেবিলের কভারটা নতুন। মা বলছিল – ফ্রীজটা পুরোন হয়ে গেছে, ঠাণ্ডা হচ্ছে না, বদলানো দরকার। বলতে বলতে মায়ের চোখ উলটে গেল। হাসপাতালে নিয়ে যাবারও সময় দিল না। কাজকর্ম মিটে যাবার পর বিবেকদাদাকে বললাম – তুমি আর একা এখানে থেকে কী করবে? আমার সঙ্গে চল। বাড়িটা এক বন্ধুর জিম্মায় করে বিবেকদাদাকে নিয়ে চাকরির জায়গায় ফিরে এলাম।

সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফিরে দেখি বিবেকদাদার মুখ ভার। খাবার টেবিলে ঢাকা দেওয়া এক বাটি মাংস। দামিনী রান্না করে দিয়ে গেছে। বিবেকদাদা বল্লেন – অন্য বাড়ি দেখো। এই বাড়িতে আর থাকা পোষাচ্ছে না। এত পরিষ্কার করে কি আর বললেন? তবে আকারে ইঙ্গিতে তাই বোঝালেন। দামিনীর সঙ্গে তাঁর কীসের শত্রুতা কে জানে? তিনি সন্ধ্যাপূজা দিতে গেলেন। তাঁর ঠাকুরের সিংহাসনটি শোবার ঘরের দেওয়ালে টাঙানো থাকে। তাতে কালী ঠাকুরের ছবি বসানো আছে। পায়ের কাছে রামকৃষ্ণ পরমহংস ও সারদা মা। আমি চোখে মুখে জল দিয়ে আসতে না আসতেই আর এক কাণ্ড। ইদি লাফ দিয়ে মাংসের বাটি মেঝেতে ফেলে, মুখ দিয়েছে। দামিনীর রান্না করা হাড়-মাংস মেজের ওপর ছত্রাখান হয়ে পড়ে আছে। ঝোল গড়িয়ে যাচ্ছে ডিভানের নিচে। বিবেকদাদা ইদির কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে সরিয়ে মেঝে সাফ করতে লাগলেন। ইদি লোলুপ দৃষ্টি ফেলে বসে রইল। বিবেকদাদার সামনে মেঝেতে পড়া মাংসয় মুখ দেবার সাহস বা অধিকার তার নেই।


ভদ্রলোক আশ্চর্য রকমের গায়ে পড়া। প্রথমে বুঝিনি। ঠাণ্ডা কনকনে হাত দিয়ে আমার হাত চেপে ধরেছিলেন। ভেবেছিলাম মিতুলের কোন নিকট আত্মীয় হবে বুঝি। হাতে সান্ত্বনার চাপ দিয়েছিলাম। মিতুল আজ অফিসে আসেনি। ফোন করতে বলল ওর মাকে হঠাৎ হাসপাতালে অ্যাডমিট করতে হয়েছে। একটা ছোটখাটো স্ট্রোক মতন হয়েছে। আইসিইউতে আছেন। মিতুলের বাবার বয়স হয়েছে। দাদা ইউএসএতে সেটল্ড। দরকার হলে আসবে। আপাতত লোকবল চাই। রাত্রে মিতুল থাকবে হাসপাতালে। জিজ্ঞেস করল দিনের বেলাটা আমি ম্যানেজ করতে পারব কিনা। পৌঁছে দেখলাম আইসিইউ-এর সামনে মিতুল নেই। একজন অচেনা ভদ্রলোক আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন - তুমি কি সাম্য, মিতুলের বন্ধু? মিতুল বাড়ি গেছে। যতক্ষণ না আসে, তোমায় বসতে বলেছে। পাশে বসলাম। রোগাভোগা বয়স্ক মানুষ। উদ্বিগ্ন মুখ। বিশেষ কথা বললেন না। আমার হাত ধরে চুপচাপ বসে রইলেন।

মিতুল এল বিকেলবেলা। বলল – বাড়িতে বসে থাকতে অস্থির লাগছে। ঘুমও আসছে না ছাই! এখানেই থাকি। সাম্য, কালকের দিনটাও ছুটি নিও কিন্তু। আমি সকালে বাড়ি যাব। ভদ্রলোককে বলল – আঙ্কল, তুমিও এখন যাও। আবার কাল এস। হাসপাতাল থেকে বেরোবার পরও ভদ্রলোক সঙ্গ ছাড়লেন না। নিজে থেকেই বললেন – চল, কোথাও গিয়ে চা খাই। আমি জানি না ভদ্রলোকের সঙ্গে মিতুলদের কীরকম সম্পর্ক। একজন বয়স্ক মানুষকে চট করে না বলাও মুশকিল। টায়ার্ড লাগছিল যদিও, আমি রাজি হয়ে গেলাম।
রেস্তোরাঁটা বাইরে থেকে দেখেছি। কানাঘুষোয় শুনেছিলাম আগে এই রেস্তোরাঁটা একটা ড্যান্স বার ছিল। মেয়েরা ড্রিঙ্কস সার্ভ করত। রাত বাড়লে পয়সা ও শরীরের লেনদেনও নাকি চলত আড়ালে আবডালে। ভদ্রলোক আমাকে টেনে নিয়ে গটমট করে ভেতরে ঢুকলেন। যেন উনিই রেস্তোরাঁর মালিক। এখনও রেগুলার খরিদ্দাররা এসে পারেনি। আমরা নির্দিষ্ট সময়ের আগে এসে পড়েছি। এখন বোধ হয় আর মেয়েরা এই রেস্তোরাঁয় কাজ করে না। একজন বুড়ো ওয়েটার কাঠের টেবিলে একটা হলুদের ওপর নীল চেককাটা টেবিল-ক্লথ পাতছিল। ভদ্রলোক বললেন - আমরা চা খাব... চা পাওয়া যাবে? বুড়ো ওয়েটার সামান্য অবাক হল। সম্ভবত এই রেস্তোরাঁয় কেউ চা খেতে আসে না। ভদ্রলোক আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বললেন, “এই টেবিলেই... বুঝলে... এই টেবিলেই আমরা তিন বন্ধু বসতাম।”

আমি শুনতে চাইনি। হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে কে আর আজগুবি গল্প শুনতে চায়? কিন্তু ভদ্রলোক ছাড়বেন না, শোনাবেনই। হাসপাতালে চুপ করে ছিলেন। এখন রেস্তোরাঁয় ঢোকার পর কথার খই ফুটছে। মাঝে মাঝে খলখল করে হেসে উঠছেন। কথার সঙ্গে হাসির কোন সাযুজ্য নেই। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে শুনতে লাগলাম। তিনি বললেন - এখন যেমন দেখছ জায়গাটা এমন ছিল না। আমি ঘাড় নাড়লাম। বদলই পৃথিবীর নিয়ম। এ আর নতুন কথা কী? তিনি খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, নীল চোখের বেদুইন মেয়েরা এখানে নাচত। অবশ্য ঠিক নাচ নয়, বলা ভাল ঘাঘরা চোলিতে কোমর দোলাত। আঙুল তুলে দেখালেন, ওইখানে স্টেজের ওপর, মিউজিকের তালে তালে।

ভদ্রলোকের কথা সামান্য জড়িয়ে যাচ্ছিল। যতটুকু উদ্ধার করতে পারলাম তার থেকে বুঝলাম, তাঁরা তিন বন্ধু এই টেবিলে বসে মদ খেতেন আর নীল চোখের মরুচারিণী মেয়েদের তারিফ করতেন। তাদের সোনালি আঙুরের মত গালের রঙ, কটা চুলের ঘটা, চাহনিতে লাস্য। সেই মেয়েদের মধ্যে একটিকে তিন বন্ধুরই খুব পছন্দ ছিল। তবে মেয়েটির কথা ডিটেলে বলার আগে ভদ্রলোক তিন বন্ধুর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেওয়া সঙ্গত মনে করলেন। আমি মনে মনে নোট করে নিলাম, প্রথম বন্ধু বিজনেসম্যান... বিল্ডার, মজবুত চেহারা, কালো কোট, টাইয়ের নট সামান্য আলগা। দ্বিতীয় বন্ধু লোকাল কর্পোরেটর, দোহারা গড়ন, চোস্ত-শেরওয়ানি, কপালে লাল তিলক। তৃতীয় জন নেহাতই ভীতু, গালে না-কামানো দাড়ি, অবিন্যস্ত চুল, ছবি আঁকে। নিজেই বললেন, তৃতীয় জনের নাম ধরা যাক ইমরান। এই পর্যন্ত শুনে আমার মনে হল আমি এখনও ভদ্রলোকের নাম-ধাম জিজ্ঞাসা করিনি এবং তিনিও প্রথম দুজন বন্ধুর নাম বলেননি। কিন্তু মাঝপথে থামালে গল্প ফুরোতে দেরি হবে, তাই মুখ বন্ধ করে শুনে যাওয়াই মনস্থ করলাম। বাড়ি ফিরতে দেরি হলে ওদিকে বিবেকদাদা চিন্তা করবে।

ভদ্রলোক অব্‌ভিয়াস কথাটাই বললেন - তিন বন্ধু মদ খেতে খেতে, তারিফ করতে করতে... এক সঙ্গে সেই নীল চোখের মেয়েটির প্রেমে পড়ে গেল। পড়াই স্বাভাবিক, আশ্চর্যের কিছু নয়, সেটাই এক্সপেক্টেড ছিল। গল্পের মধ্যে রহস্য না থাকলে সেই গল্প শুনতে আগ্রহ লাগে না। আমি ভদ্রলোকের বিরক্তিকর মোনোটোন শুনতে শুনতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম। ক্যাশ কাউন্টারের ওপর একটা বেড়াল ঝিমোচ্ছে। কিচেনে স্টিলের বাসন পড়ার ঝন ঝন শব্দ উঠল। কাস্টমারের অ্যাইসি কি ত্যায়সি, কেউ কাউকে মা-বোন তুলে গালি দিল চেঁচিয়ে। আমি একবার রিস্ট-ওয়াচে দেখে নিলাম, কটা বাজে। দেরি হয়ে যাচ্ছে। যাবার সময় বিবেকদাদার প্রেসারের ওষুধ কিনে নিয়ে যেতে হবে। বুড়ো ওয়েটারটি চা-জল দিয়ে গেল।

ভদ্রলোক চায়ে চুমুক দিয়ে আবার গল্পের সুতো ধরলেন - যথেষ্ট ঘনিষ্টতা হবার পর ইমরান একদিন গভীর রাতে নীল চোখের ঘরে গেল। দেখল মেয়েটির হাতে রক্তজমা কালশিটে। ইমরান ভ্রূ তোলাতে মেয়েটি জানাল, তার বিল্ডার দোস্তটি, এক্কেবারে দস্যু। যা চায়, জোর করে নিয়ে নেয়। অনুমতির তোয়াক্কা পর্যন্ত করে না। ইমরান অসীম মমতায় নীল চোখের হাতে আঙ্গুল বুলিয়ে দিল, ঠাণ্ডা গরম সেঁক দিয়ে ব্যথার মলম লাগিয়ে দিল। আঘাতে চুমু খেয়ে জিগ্যেস করল - আর আমার কর্পোরেটর বন্ধুটি? মেয়েটি লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে বলেছিল - ও তো চোর, মেরা দিল চুরায়া। ইমরান নিজের কথা কিছু জিজ্ঞেস করল না। নিজের কথা সে সবই জানত, জিজ্ঞেস করার কোনো মানে হয় না। তাছাড়া ভয় ছিল, জিজ্ঞেস করলে যদি নীল চোখ বলে, তোমায় একদম ভালবাসি না, যাও। যাইহোক, এই ভাবেই কিছুদিন কাটল। তিন বন্ধু আপোষে ভাগাভাগি করে মেয়েটিকে ভালবাসতে লাগল। মেয়েটিও তিন বন্ধুকে।

প্রেমের কাছে ঝুঁকে/ কাটছিল দিন সুখে...

ঝামেলা বাঁধল গল্পে চতুর্থ বন্ধু প্রবেশ করার পর। বড় লোকের বখে যাওয়া ছেলে। এতদিন গুণ্ডাগার্দি করে জেলে ছিল। জামিনে ছাড়া পেয়ে বাইরে এসেছে। সিনেমার ভিলেনের মত চোখা চেহারা। ধরা যাক তার নাম অজিতেশ, দুর্বুদ্ধিতে তিন জনের এক কাঠি ওপরে। তা সেই অজিতেশ এদেরকে বোঝাল – সত্যিকারের প্রেমে বাঁটোয়ারা চলে না। ব্যাপারটা বোঝ, নীল চোখ তোদের তিনজনকেই পোপাট বানিয়ে মস্তি করছে। তাছাড়া ওর সঙ্গে তো আমার বাল্য প্রেম। পার্কে লুকাছুপি খেলতাম… সেদিন দু-জনে দুলেছিনু বনে। শুনে প্রথম বন্ধু রাগে পাগল হয়ে গেল। দ্বিতীয় বন্ধু দাঁতে দাঁত ঘষল। ইমরানের চোখ থেকে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে এল। কেউ একবার ভাল করে ভেবে দেখল না অজিতেশ রবীন্দ্র সঙ্গীত কোথা থেকে শিখল।

গল্পর এই জায়গাটায় এসে আমার একটু একটু কৌতূহল জাগছিল। জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর?”
ভদ্রলোক বললেন, “তারপর যা হবার হল। প্রথম বন্ধুর লোনাভেলায় পাহাড়ের ওপর একটা বাংলো ছিল। তার দরজা কেটে নীল চোখের শব বার করল পুলিশ। সেই বিল্ডার বন্ধু অ্যাবস্কন্ডিং ছিল বহুদিন। পুলিস তার পাত্তা পায়নি অনেক খুঁজেও।”

গল্পটা যে এমন চট করে ফুরিয়ে যাবে ভাবিনি। খামোখা আমাকে শোনানোর উদ্দেশ্য নিয়েও নিশ্চিত ছিলাম না। ব্যাপারটা কি নিতান্তই স্মৃতিচারণ, নাকি অন্য কিছু? জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কোন জন ছিলেন? প্রথম, দ্বিতীয় না তৃতীয়? নাকি অজিতেশ... দ্য ভিলেন?”
ভদ্রলোক হো হো করে হেসে উঠলেন। হাসির দমকে তাঁর গলার শির ফুলে উঠল। টেবিলে হাতের চাপড় মেরে হাসছেন। আমার প্রশ্নটা কি এতই হাস্যকর ছিল? কে জানে? ভয় লাগল হাসতে হাসতে না তাঁর দম আটকে যায়! আমি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। ভদ্রলোকের হাসি থামছে না। তাঁর হাত লেগে একটা জল ভর্তি কাঁচের গ্লাস মেঝেয় পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। বুড়ো ওয়েটারটা এসে নিঃশব্দে কাঁচের ভাঙা টুকরোগুলো কুড়োতে লাগল। এখন রেস্তোরাঁ থেকে বেরোতে গেলে জুতো ভেদ করে পায়ে কাঁচ ফুটে যেতে পারে। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন সে সবগুলো টুকরো সে কুড়িয়ে তুলে নেবে আর আমি বাসায় ফিরে যেতে পারব।


পরের দিন সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম মিতুল আইসিইউ-এর সামনে একটা চেয়ারে বসে গলা অব্দি চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে। মিটিং-টিটিঙে মিতুল বেশ অথরিটি নিয়ে কথা বলে। তখন বোঝা যায় না তার মুখের ডৌলটি এত কমনীয়। আপাতত তার ঘুমন্ত মুখ দেখে তাকে বালিকার বেশি কিছু মনে হচ্ছে না। দু-এক কুচি আলগা চুল তার কপালে এসে পড়েছে। চশমার গভীরে বাঁ চোখের পাতা একবার কেঁপে উঠল। ভয় হল ঘুম ভেঙে যদি তাকিয়ে দেখে আমি তার দিকে হাঁদার মত চেয়ে আছি... দুচ্ছাই, ভয় আর আমার পাশ ছাড়ে না। মিতুলকে কাঁধে নাড়া দিয়ে জাগালাম। মিতুল জেগে উঠে আশ্বস্ত হল, “এসে গেছ?”
“মাসীমা কেমন আছেন?”
“ভাল, বিপদ কেটে গেছে, আজকেই হয়তো ওয়ার্ডে দিয়ে দেবে।”
মিতুল চশমাটা খুলে আমার হাতে দিল। চেয়ারের পাশে রাখা কিট ব্যাগ থেকে একটা ছোট টাওয়েল বার করে বলল, “তুমি বসো, আমি একটু চোখে মুখে জল দিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসি।”
আগে বুঝিনি, মিতুলের চশমার কাঁচটা টিন্টেড। দেখলাম মিতুলের চোখের মণি ভোরের আকাশের মত আবছা নীল। মিতুল উঠছিল, আমি খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক ভাবে জিজ্ঞেস করলাম, “কালকে যে ভদ্রলোক এসেছিলেন, উনি তোমাদের কে হন?”
মিতুল অল্প হেসে বলল, “কে, ইমরান আঙ্কল? উনি মমের এক্স, বাংলায় যেন কী বলে... একটা সিনেমা রিলিজ হয়েছে না রিসেন্টলি মাল্টিপ্লেক্সে... মম কাউকে না পেয়ে আমাকেই জোর করে টেনে নিয়ে গিয়েছিল...”
“তোমার মা বাংলা সিনেমা দেখেন?”
“হ্যাঁ, আমার বাবা কলকাতার বাঙালি ছিল। মাকে যত্ন করে বাংলা লিখতে পড়তে শিখিয়েছিল। আমাকেও...”
মিতুলের বাংলায় সামান্য টান আছে, একটানা বলতে পারে না, সুযোগ বুঝে দু-একটা হিন্দী বা ইংরিজি শব্দ ঢুকে পড়ে, “মম ওজ সবিং থ্রু দ্য মুভি... ইউ নো? আই হ্যাড টু সুদ হার আ লট... দুজনে ফুড কোর্টে ডিনার সেরে ফিরেছিলাম। এই তো সেদিনের কথা, আর আজ দেখো...”
মিতুলের চোখ ছলছল করে এল। বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, প্রাক্তন। ইমরান আঙ্কেলের বাবার বিল্ডিং কন্সট্রাকশানের বিরাট বিজনেস ছিল। ইমারান আঙ্কলও ভাল স্টুডেন্ট ছিল। আর্কিটেকচার পাশ করার পর ওর বাবা ওকে ফ্যামিলি বিজনেসে টেনে নেয়। হি ওজ আ রাইজিং স্টার। বিজনেস সামলাত, পলিটিক্সও জয়েন করেছিল। ড্যাডের সঙ্গে মমের বিয়ে হয়ে যাবার পর সব ছেড়ে ছুড়ে উধাও হয়ে যায়।”
গল্পটা চেনা-শোনা লাগছিল। কিন্তু ঠিক ধরতে পারছিলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি এত কথা জানলে কী করে?”
মিতুল বলল, “ওইদিন ডিনার খাবার সময় মম আমাকে সব বলেছিল। ডোন্নো হোয়াই দে ব্রোক আপ। মম সেটা বলেনি, এড়িয়ে গিয়েছিল। বংশ-মর্যাদা-ফর্যাদার মত কোনো পেটি ব্যাপার হবে। আমার দাদু-বুড়ো বহোত খড়ুস ছিল। কোঙ্কনস্থ ব্রাহ্মণ, পেশোয়ার বংশধর। মা ভরতনাট্যম শিখত ছোটবেলায়। খুব ভাল নাচত। দু-একটা স্টেজ শোও করেছে। দাদু সেটাও বন্ধ করে দিয়েছিল, জোর করে। এনিওয়েজ, ইমরান আঙ্কল রিটার্ন্ড আফটার এ ফিউ ইয়ার্স। কিন্তু আর বিজনেস টিজনেস দেখত না... কাজিনদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিল, লোনাভেলায় ওদের একটা বাংলো ছিল, সেখানেই থাকত, একা একা... লাইক আ রিক্লুজ।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “লোনাভেলায়...?”
মিতুল বলল, “হ্যাঁ, লোনাভেলায়। বেশি দূরে নয়, দেড়-দু ঘন্টার জার্নি। বাট হি নেভার এভার ট্রায়েড টু মিট মম। কাল কোত্থেকে মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে ছুটে এসেছিল।”

মিতুল আমাকে বসিয়ে রেখে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। আমি গত কালকের শোনা গল্পের সঙ্গে মিতুলের কথাগুলো মেলানোর চেষ্টা করছিলাম। মনে হচ্ছিল একই ঘটনা দুটো ডিফারেন্ট অ্যাঙ্গেল থেকে দেখছি। আচ্ছা, একটা গল্পকে কি একাধিক প্লেনে প্রোজেক্ট করে দেখা যায়? ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িঙের মত... এলিভেশান, টপ ভিউ, সাইড ভিউ... তাহলে বোধহয় গল্পের যে অংশটা সাধারণত চোখের আড়ালে থাকে সেটা চট করে সামনে চলে আসে। প্রোজেকশানের বাংলা প্রতিশব্দ কী? প্রক্ষেপণ? মরুক গে! বাংলা আজকাল আর ক’জন পড়ে? মিতুল দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রবাসী বাঙালি, বাংলা বলতে গিয়ে হোঁচট খায়। মিতুল যদি আমার মত কাউকে বিয়ে করে, সত্যি সত্যি নয়, তর্কের খাতিরে আর কী, আমাদের ছেলেমেয়েরা কি আদৌ বাংলা পড়বে?

তা ধিন ধিন তা/ কোথা যাস চিন্তা?

মনকে শাসন করলাম - বর্তমানে ফিরে আয় বাপ! আপাতত গল্পটার দুটো ভিউ পাওয়া গেল, ইমরান আঙ্কল আর মিতুলের মা এই দু-জন মানুষের ওপর ঘটনার প্রোজেকশান থেকে। ইমরান আঙ্কল একাই অন্ততপক্ষে তিন বন্ধুর রোল প্লে করেছেন, সেটারও মোটামুটি আন্দাজ পেলাম। ইমরান আঙ্কল ও তাঁর দুই বন্ধু কি একজন মানুষেরই তিনটে অর্থোগোনাল প্লেনে প্রোজেকশান? কে জানে? অজিতেশ দ্য ভিলেনের ব্যাপারটা একটু ফিশি। এক্ষুণি বোঝা যাচ্ছে না। এই সূত্রগুলো থেকে ঘটনাটার একটা থ্রি-ডি আইসোমেট্রিক ভিউ কি বানানো যাবে? নাহ, কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িংটা আরো ভাল ভাবে শেখা উচিত ছিল। আরো একটা কনফিউসান অবশ্য থেকেই যাচ্ছে, এই গল্পে আমার কি কোনো সক্রিয় ভূমিকা আছে, নাকি শুধুই গেস্ট এপিয়ারেন্স?

দুটো ধোঁয়া ওঠা কফি নিয়ে মিতুল ফিরে এল।


মিতুলের মা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে তাঁর সাজানো সংসারে ফিরে গেছেন, ইমরান আঙ্কল তাঁর লোনাভেলার বাংলোয়। আমি রোজ সকালে আমাদের ভাড়ার বাসা ছেড়ে অফিস যাই, সন্ধেবেলা ফিরে আসি। মিতুলের সঙ্গে ক্যাফেটেরিয়ায় প্রায়ই দেখা হয়ে যায়। আমাদের কফি পান করার সময়টা আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। আমরা দুজন একটা কোণার টেবিল দেখে কফি নিয়ে বসি। কথায় কথায় কফির কটু স্বাদ নম্র হয়ে আসে। আমাদের চোখের দৃষ্টিও।

ইদানীং ইদি দামিনীর খুব ন্যাওটা হয়েছে। রোজ অফিস থেকে ফেরার সময় দেখি দামিনীর সঙ্গে সঙ্গে লনের ঘাসে ঘুরছে, তুর তুর করে লেজ নাড়িয়ে খেলছে। দামিনীর প্রতি বিবেকদাদার যে বিতৃষ্ণা ছিল তাও খানিক কমে এসেছে। সেটা ইদির সঙ্গে দামিনীর নৈকট্যের কারণেও হতে পারে। এই বিষয়ে কর্ণেলের মতামত জানার সুযোগ হল সপ্তাহান্তে। আমাদের বাসার কলিং বেল বাজিয়ে তিনি ঘরে ঢুকলেন। ইদি তাঁকে দেখে লেজ গুটিয়ে ডিভানের নিচে সেঁধোল। জানি না কেন কর্নেলকে সে সাংঘাতিক ভয় পায়। আমি কর্নেলকে ইদির মত অতটা ভয় করি না, চেয়ার এগিয়ে দিলাম বসার জন্যে। কর্নেলের মুখ গম্ভীর। হাতে একটা মুখবন্ধ খাম। বিবেকদাদা ডিভানেই বসে ছিলেন, আমি পাশে বসলাম। কর্নেল মুখবন্ধ খামটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এর মধ্যে কী আছে?”
কর্নেল বললেন, “নিজেই দেখো।”
আমি মুখছেঁড়া খামটা খুলে দেখলাম একটা এক পাতার মেডিক্যাল রিপোর্ট। বিশদে বললে দামিনীর ইউরিন টেস্টের রিপোর্ট। প্রেগনেন্সি টেস্ট পজিটিভ, দামিনী মা হতে চলেছে। আমি কর্নেলের দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম, “কনগ্র্যাচুলেসান্স! মিষ্টি খাওয়াতে হবে কিন্তু।”
কর্নেল বললেন, “কনগ্র্যাচুলেসান্স... মাই ফুট! মিষ্টি কে খাওয়াবে, আমি না তুমি?”
আমি আহত গলায় বললাম, “আমি কেন মিষ্টি খাওয়াব? আপনি বাবা হতে চলেছেন...”
কর্নেল কড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ডোন্ট মাইন্ড টেলিং ইউ, আমি ইমপোটেন্ট, সন্তান উৎপাদন করার ক্ষমতা আমার নেই। মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দেখতে চাও?”
আমি আকাশ থেকে পড়লাম, “মানে...?”
কর্নেল বললেন, “মানে আর কী? হয় তুমি না হলে তোমার এই গুণধর দাদাটি দামিনীর গর্ভসঞ্চার করেছো।”
কর্নেল কোথা থেকে এত ভাল বাংলা শিখলেন কে জানে? আমি রাগতস্বরে বললাম, “আপনি অহেতুক আমাদের দোষারোপ করতে পারেন না।”
কর্নেল ক্ষেপে গেলেন, “অহেতুক? দামিনী তোমাদের সঙ্গে ছাড়া আর কার সঙ্গে মেশে? সে ভাল করে হিন্দী বলতে পারে না। বিল্ডিঙের বাইরে বেরোতে ভয় পায়। ছিঃ ছিঃ! একটা সরল মেয়ের এমন সর্বনাশ করলে?”
আমি বললাম, “কে সরল? দামিনী? আমাদের গায়ে কালি ছেটানোর আগে তাকেই তো ডেকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন।”
কর্নেল গজগজ করে বললেন, “করিনি আবার! সে শয়তানী তো মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে।”
কর্নেল উঠলেন, বোধ হয় দামিনীকে আর এক দফা জেরা করার জন্যে। যাবার আগে বলে গেলেন এক সপ্তাহের মধ্যে অপরাধীর স্বীকারোক্তি না পেলে তিনি পুলিশে কমপ্লেন করবেন। আমি বললাম, “যান যান, যা খুশি করুন গিয়ে, আমাদের জ্বালাতে আসবেন না।”
কর্নেলএর পিঠের ওপর দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বিবেকদাদার দিকে তাকিয়ে বললাম, “মগের মুল্লুক পেয়েছে, যা খুশি তাই বলে যাবে!”
বিবেকদাদা ভীষণ বিচলিত হয়ে কী বললেন বোঝা গেল না। উত্তেজিত হলে বিবেকদাদার মুখ দিয়ে কিছু অস্ফুট অর্থহীন শব্দ বার হয়। ইদি ডিভানের নিচে থেকে বেরিয়ে কুঁই কুঁই করতে করতে বিবেকদাদার কোলে চেপে বসল। অন্য সময় হলে বিবেকদাদা নির্ঘাত তাকে নামিয়ে দিতেন। এখন কিছু বললেন না। ইদি বিবেকদাদার মুখ চেটে দিল।

আমি নিশ্চিত কর্নেল আমাদের ফাঁসানোর ছক করছেন। নিজের পাপের বোঝা আমাদের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টায় আছেন। ইমপোটেন্সি স্রেফ ভাঁওতাবাজি। এই সময় কারো সঙ্গে পরামর্শ করতে পারলে ভালো হত। একমাত্র মিতুল ছাড়া বিশ্বাস করে কাউকে কিছু বলা মুশকিল। এমন মুখোরোচক খবর পেলে অন্যরা খিল্লি ওড়াবে। সোমবার অফিসে পৌঁছেই মিতুলকে মেসেজ করলাম, জরুরি দরকার, কাফেটেরিয়ায় দেখা কর। মিতুল এল, মন দিয়ে সব শুনল। বলল, “ভেবো না, আজ সন্ধেবেলা আমি তোমার সঙ্গে যাব। তোমার কর্নেলকে দাবড়ে দিয়ে আসব।”
আমি কৃতজ্ঞতায় মিতুলের হাত চেপে ধরলাম।

সন্ধেবেলা বাসায় পৌঁছে দেখি ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে। বিবেকদাদা ইদিকে নিয়ে কোথাও বেরিয়েছেন হয়তো। সাধারণত সন্ধের আগেই ফিরে আসেন। আজ কোনও কারণে দেরি হচ্ছে। অসুবিধে নেই, আমার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে। ঘরের দরজা খুলে স্যুইচ টিপে আলো জ্বালালাম। মিতুলকে বসতে বললাম। দরজা বন্ধ হতেই মিতুল আর আমি, আমি আর মিতুল, ঘরের মধ্যে। কতবার স্বপ্নের মধ্যে দেখেছি... আজ সত্যি সত্যি। যতবার স্বপ্নে দেখেছি ততবার ভয় পেয়েছি। সাহস করে ছুঁতে পারিনি। খুব সুন্দর কিছুর কাছাকাছি গেলে আমি ভয় পাই... চিরকাল, যদি অসাবধানে হাত লেগে ভেঙ্গে যায়। আশ্চর্য, আজ কিন্তু একটুও ভয় লাগল না। মিতুলকে বললাম, বস একটু, চা বানাই?

মিতুল আরাম করে বসল চেয়ারে। এক টুকরো কাগজ কাঁচের টেবিলের ওপর পেপারওয়েট চাপা দিয়ে রাখা ছিল। সেটা তুলে দেখল। কী ওটা? মিতুল ইশারায় আমাকে ডাকল। বিবেকদাদা বেরোনোর সময় একটা নোট ছেড়ে গেছেন। একবার চোখ বুলিয়ে মিতুল নোটটা আমার হাতে দিল। বিবেকদাদার কথা আটকে যায়, লেখা আটকায় না। মুক্তোর মত হস্তাক্ষরে লিখেছেন – দামিনী ও তার সন্তানের দায়িত্ব এখন থেকে আমার। এখানে থাকলে দুজনের কেউই সুস্থ থাকবে না। তাই ওদের নিয়ে গেলাম। ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে, চিন্তা কোরো না। ইদিকে তুমি সামলাতে পারবে না। সে বড় চঞ্চলমতি। তাই তাকেও সঙ্গে নিলাম। ইতি - আশীর্বাদক বিবেকদাদা।

দরজায় কলিং বেল বাজল। দরজা খুলে দেখলাম – কর্নেল। তাঁর হাতেও একটা চিরকুট। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললেন, “দামিনী চলে গেছে, লিখে রেখে গেছে ফিরবে না...”
আমি বললাম, “জানি...”
“জানো?” কর্নেল অগোছালো পা ফেলে ফিরে চলে যাচ্ছিলেন। আমি পিছন থেকে ডেকে বললাম, “ভালোই তো হল। আপনার ঝামেলা কমে গেল।”
কর্নেল ঘাড় ঘুরিয়ে অসহায় ভাবে তাকালেন, বললেন, “আমার অর্শ আছে, আমি বাইরের খাবার মুখে তুলতে পারি না। মলদ্বার জ্বলে। এখন দুই বেলা রন্ধন করবে কে?”
এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে ছিল না। সৌভাগ্যবশত সমাধান খোঁজার দায়ও না।

(এই গল্পের মূল তিনটি চরিত্রর সঙ্গে পাঠক যদি ফ্রয়েডিয় ইড, ইগো, সুপার ইগোর কোনও সাদৃশ্য খুঁজে পান তাহলে আমার সত্যিই কিছু বলার নেই।)

ফেসবুক মন্তব্য