অভিনেত্রী ও নাট্যপরিচালক দীপিকা সেনগুপ্তের সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার: অর্ঘ্য দত্ত



(দীপিকা সেনগুপ্ত মুম্বাই শহরের নাট্যদল 'দর্পণ'-এর কর্ণধার। এ শহরে যে কজন বাঙালি নাট্য ব্যক্তিত্ব বাংলা নাটক নিয়ে ভাবেন, নিয়মিত চর্চা জারি রাখেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি শুধু অভিনেত্রী নন, পরিচালক‌ও। লক্ষ্য করেছি তাঁর ঝোঁকটি শুধু লঘু বিনোদনমূলক নাটকের দিকে নয়, বরং এমন নাটকের প্রতি যা দর্শকদের চিন্তাকে আন্দোলিত করতে পারে। এবারের সংখ্যার 'আমচি মুম্বাই' বিভাগে কথা বলব এ শহরের প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় নাট্যব্যক্তিত্ব শ্রীমতী দীপিকা সেনগুপ্তর সঙ্গে। তিনি যে ব্যতিক্রমী তা আবার বুঝতে পারলাম যখন ওঁর ছবি চাওয়াতে বললেন, আমার নিজের ছবি নয়, অর্ঘ্য, তুমি বরং আমার প্রযোজনার ক'টি ছবি নাও।)

মুম্বাইয়ের মতো একটি বাণিজ্যিক ও পেশাদার শহরে এত বছর ধরে লাগাতার নাট্যচর্চা জারি রাখাই বলে দেয় নাটকের প্রতি আপনার অকৃত্রিম অনুরাগের কথা। কী ভাবে, কবে নাটকের সঙ্গে আপনার এই জড়িয়ে যাওয়ার সূত্রপাত?

সত্তর দশকের গোড়ার দিকের কথা। তখন অ্যাকাডেমি তে শম্ভু মিত্রকে দেখে আমার বড় হওয়া। সেই সময় অ্যাকাডেমির শেষ সারির টিকিটের অর্থ মূল্য ছিল মাত্র এক টাকা। ভাই বোনেরা মিলে দেখতে যেতুম। রাজা, রক্তকরবী, রাজা অয়দিপাউস, চুপ! আদালত চলছে, গ্যালিলিও, চার অধ্যায়, একটার পর একটা নাটক দেখতে দেখতে নেশা ধরে গেছিল। ১৯৭৬-এ যে বার শম্ভু মিত্র Magsaysay পুরস্কার পেলেন, সেবার অ্যাকাডেমির বাইরে ভোর থেকে লাইন লেগে যেত টিকিটের জন্য। চার অধ্যায় আমার সেই ভাবেই দেখা। সেই সময় আমার ভাই অধ্যাপক স্বপন চক্রবর্তী ছিল আমার অনুপ্রেরণা। নাটকের প্রতি অনুরাগ, শ্রদ্ধা, ভালবাসা এই ভাবেই তৈরি হয়। শুধু শম্ভু মিত্র নন, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত--- সত্তরের দশককে বাংলা নাটকের স্বর্ণযুগ বলা যায়।
পরবর্তীতে বৈবাহিক সূত্রে মুম্বই আসার পর সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে গেলাম নাটকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার। অমল দাশগুপ্ত যিনি কলকাতায় থাকা কালীন IPTA র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তখন এই মুম্বই শহরে এবং এখানেও একজন বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব বলে পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বে উত্তর সাধক নাট্যগোষ্ঠী তে যোগ দিলাম। মুগ্ধ হলাম মানসী দাশগুপ্তর বেনারে বাই দেখে। স্বয়ং বিজয় তেন্ডুলকর দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন। উত্তর সাধক এর প্রযোজনা ছিল খুবই উন্নত মানের। সেই থেকে শুরু পথ চলা। উত্তর সাধক এ থাকা কালীন মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের সুন্দর, তোতারাম, মনোজ মিত্রের পুঁটি রামায়ণ, বাদল সরকারের বাকি ইতিহাস, বিজয় তেন্ডুলকরের চুপ! আদালত চলছে, চন্দন সেনের দুই হুজুর ইত্যাদি নাটকে অংশ নিয়েছি।
চেম্বুর থেকে ভাসীতে আসার পর কিছু বছরের বিরতি। আবার নব্বই এর দশকে নাটকে প্রবেশ করলাম তাপস করের হাত ধরে। সংসপ্তক নাট্যগোষ্ঠীতে চন্দন রথের নির্দেশনায় নটী বিনোদিনী, টিনের তলোয়ার, দায়বদ্ধ, আপনজন, দায়াদী ইত্যাদি নাটকে অভিনয় করার সুযোগ পাই।
তারপর চারপাশে এই প্রজন্মের কিছু প্রতিভাবান তরতাজা তরুণ-তরুণীকে দেখে নাটকের দল গড়ার ইচ্ছে হলো। আমি ও রণতোষ আচার্য ছিলাম উত্তর সাধকে শিক্ষাপ্রাপ্ত দুই প্রবীণ ও আনন্দদীপ দাশগুপ্ত (অমল দাশগুপ্তর পুত্র), অভিষেক মুখার্জী, বৈশালী মজুমদার, মোহর রায় চৌধুরী, দময়ন্তী সেনগুপ্ত... এরা প্রত্যেকেই প্রতিভাবান শুধু দরকার ছিল একটু উন্নীত করার। গড়ে উঠল 'দর্পণ'। ভাসীতে ২০১৩ সালে।

নাটকে আপনি শুধু অভিনয় নয়, প্রযোজনা ও পরিচালনাও করেন। করতে ভালোবাসেন বলে, নাকি বাধ্যবাধকতায়?

বাধ্যবাধকতার কোনো প্রশ্নই নেই। ভালবাসাটা প্রায় পাগলামির পর্যায়ে পৌঁছে গেলেই এ সব কাজ করা যায়।

পরিচালনা করতে এসে মহিলা বলে আলাদা কোনো সুবিধা বা অসুবিধা ভোগ করেছেন?

না, মুম্বইতে বাংলা নাটকের সেরকম কোন প্রতিযোগিতা নেই। যে কটা দল এখানে তাদের মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট সহায়তা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। প্রত্যেকেই প্রত্যেক দলের প্রযোজনা দেখতে যাওয়া, প্রচার করা, টিকিট বিক্রি করা এগুলো আমরা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব বলেই মনে করি।



পশ্চিমবাংলার দর্শক ও মুম্বাইয়ের দর্শকদের নাট্যরুচির মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কোনো ফারাক লক্ষ্য করেছেন?

যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য ফারাক রয়েছে। এই বাণিজ্যিক শহরের সাথে কলকাতার মত সাংস্কৃতিক শহরের তুলনা করা যায় না। এখানে প্রায় প্রত্যেকেই ইঁদুর দৌড়ের শিকার। হাড়ভাঙা পরিশ্রম এর পর সপ্তাহের শেষে মানুষ লঘু বিনোদন মূলক নাটক দেখতেই পছন্দ করেন। গভীর তাৎপর্য্যপূর্ণ নাটক, যা মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে, এখানকার খুব বেশি মানুষ পছন্দ করেন না। কলকাতায় অত্যন্ত গভীর বিষয়ের, উন্নত মানের নাটক‌ও মানুষ খুবই উপভোগ করেন। দোষটা বোধহয় আমাদেরই। আমরাই দর্শকদের তৈরি করে তুলতে পারিনি। নতুন প্রজন্মকে শুধুমাত্র লঘু বিনোদনমূলক নাটকের পরিবর্তে উচ্চ মানের নাটক উপভোগ করার মত সৃজনশীল মনের অধিকারী করে গড়ে তুলতে পারিনি। তবে তার মানে অবশ্যই এই নয় যে একটি সিরিয়াস নাট্যপ্রয়াসের প্রশংসা করার মতো কোনো দর্শক‌ই এ শহরে নেই। আছেন, তবে তাদের সংখ্যা অত্যন্ত কম বলেই আমার ধারণা।

নাটক প্রযোজনা করতে গিয়ে কী ধরণের অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়?

এক কথায় 'অর্থ'। পৃষ্ঠপোষকের অভাব। খুবই স্বল্প সংখ্যক কিছু সহৃদয় মানুষ ছাড়া বাংলা নাটক sponsor করতে বিশেষ কেউ এগিয়ে আসেন না। আমরা প্রায় আমাদের নিজস্ব অর্থ দিয়েই নাটক করি বলতে পারেন। মুম্বইতে সব কিছুই খুব ব্যয় সাপেক্ষ। ব্যয় সংকোচন করতে গিয়ে অনেক কিছুর সঙ্গে আপোস করতে হয়।

আপনার কাছে শুদ্ধ বিনোদন ছাড়া নাটকের অন্য কোনো ভূমিকা আছে? কী ধরণের নাটক করতে ভালোবাসেন?

অবশ্যই আছে। নাটক হল দেশের মানুষের মনন বিকাশের অন্যতম কার্যকরী হাতিয়ার। শুদ্ধ বিনোদন ছাড়াও আমি মনে করি যে নাটক মানুষের চিন্তাশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করবে তাই মহৎ নাটক। সেই ধরনের নাটক মঞ্চস্থ করতেই আমরা পছন্দ করি যা মানুষকে ভাবতে শেখায়। এক কথায় epic theatre আমার পছন্দের।

আপনার দলের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাগুলো কী?

দর্পণ এর প্রযোজনা ও নিবেদন :-
রবীন্দ্রনাথের "চির কুমার সভা" অবলম্বনে " শালী বাহন দি গ্রেট"
চন্দন সেনের "দুই হুজুর"
উৎপল দত্তর "রাতের অতিথি"
চন্দন রথের " এই আকাশে" ( মূল নাটক সুধাংশু রায়ের "ভো কাট্টা")
চন্দন রথের " রাষ্ট্রকন্যা"
পরশুরামের "বিরিঞ্চি বাবা" অবলম্বনে "মাতাজি উপাখ্যান"
শৈলেশ গুহ নিয়োগীর "ঝুমুর" ও চন্দন সেনের " উন্মনা মন " অবলম্বনে "পাগলা গারদ"

নতুন নাটক কী করছেন? সেই বিষয়ে যদি দুকথা বলেন।

আমাদের নতুন নাটক সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের "প্রথম প্রবাহ" উপন্যাস অবলম্বনে নাটক "মৎস্যগন্ধা"।
নাট্যরূপ দিয়েছেন চন্দন রথ। মহাভারতের শ্রেষ্ঠ রাজনীতিজ্ঞ নারী সত্যবতীর কাহিনি। নাটকের উপজীব্য মহাভারতের কাহিনি হলেও নাটকটিতে লেখকের মৌলিক কল্পনা রয়েছে বিস্তর। আমরা লেখক সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। তিনি আমাদের নাটকটি মঞ্চস্থ করার অনুমতি দিয়েছেন এবং সম্মানদক্ষিণা বাবদ সামান্য অর্থ মূল্য তিনি আমাদেরই নাটকের সাহায্যার্থে দান করেছেন। আমরা আপ্লুত। মুম্বাইয়ের সমস্ত বন্ধুদের মৎস্যগন্ধা নাটকটি দেখতে অনুরোধ করবো, অনুরোধ করবো বাংলা নাট্য প্রযোজনাগুলির পাশে থাকতে।



ফেসবুক মন্তব্য