চৌকাঠে জড়িয়ে থাকে ছায়া

অর্ঘ্য দত্ত




আমাদের বহুতলে, লিফ্টে ওঠা-নামার সময়
মনে হয় এর কোনো একটা ফ্লোরেই তুমি থাক
অফিস যাবার পথে কখনো কখনো ভাবি
ট্রেনটা যে প্লাটফর্মে থামবে, বোধ হয় সেখানেই
তোমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখব
এমনকি ঘুম থেকে উঠেই একেকদিন
বাইরের ঘরে উঁকি দিই। বুকসেল্ফের সামনে
খোলা বই হাতে তোমাকে দেখতে পাবো ভেবে
অথচ, আজও তোমার ঠিকানা জানিনা
ফোননম্বরটুকুও আমার কাছে নেই
তোমার গলার স্বর চিনি না
জানি না তোমার চোখের মণির কী রঙ

শুধু জানি ইচ্ছে করলেই যে কোনো দিন
পাকা যাদুকরের মতো চুটকিতে হারিয়ে যেতে পারো


হে প্রিয়, প্রৌঢ়, বৃষস্কন্ধ, কলম-নাবিক
সমস্ত ব্যাধির আরোগ্য যে সময়, তাহার দিব্যি
জানি, জ্যোৎস্না ঝরানো কোনো চাঁদ এসে
একদিন মুছে দেবে গোধূলির ধূসর বিকার

সেইদিন পড়ে থাকবে
গোপন আলোয় লেখা পান্ডুলিপি সব
যেখানে রয়েছে কথা, সত্য পরিচয়...

যে নামেই ডাকি, আদপে আমরা দুই পুরুষ প্রেমিক।


তোমার প্রথম চিঠি এসেছিল সাতান্ন বছর আগে
তারপর থেকে অপেক্ষায় থেকে থেকে
শেষ হয়ে গেল চিঠির জমানা...
এখন দেওয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে
অদৃশ্য ফ্রেমে বাঁধানো তোমার সাতান্নটা ফটোই
উড়ন্ত গালিচার ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে
সেই চিঠি থেকে উবে গেছে সকালের রোদ ও ঘ্রাণ

এবার বর্ষায় চিঠিটা দিয়ে একটা নৌকা বানাব
জলে ভাসিয়ে দিয়ে বলবো, দূর হ!

শূন্য খামে তবু লেগে থাকবে নাছোড় কিছু সোনালি অক্ষর


সানগ্লাস পরে আছি বলে বুঝি অন্ধ হয়ে গেছি?
কুলুপ এঁটেছি মুখে তাই ভাবো কাঁদতে ভুলে গেছি?
মন্দিরের খিড়কি খুলে প্রতি রাতে নেমে যাও নিচে
লোভী শূকরের দল ঘিরে থাকে, আশীর্বাদ চাটে
নয়নতারার মূল দাঁতে কাটো নষ্ট অন্ধকারে...

বাসি সিংহাসন জুড়ে পড়ে আছে প্রণামের কুচি
হারানো প্রণয় আজও ছুঁয়ে থাকে ভিজে কোষাকুষি

ফিরবে না? খাদের গহন থেকে আসবে না উঠে?
তোমার মন্ত্র‌ কি শুধু বধিরের করতালি খোঁজে?


কোথায় লুকিয়েছিলে এত ঘৃণা, এইসব মেধাবী বমন?
প্রতি দিন ইস্তেহার, প্রতি রাতে স্ববিরোধী কথা
থাক। কিছুদিন বন্ধ থাক। তুমি লোক হাসিও না আর
দুহাতের মুঠি খুলে দেখ, কোনো দাগ লেগে নেই
লেগে নেই জোয়ারের ঘ্রাণ
দক্ষিণ বারান্দা থেকে রীতি মেনে সরে গেছে খেলুড়ে জোছনা...
তার কি থাকার কথা ছিল?
তার কি শপথ ছিল তোমার আদিম ঠোঁটে
আজীবন তুলে দেবে সোনালী বাদাম?

তার কোনো দোষ নেই।
আলো যদি, জল যদি, চলে যাবে জানাই তো কথা
শুধুমাত্র, সঠিক চিনেছে তাকে এইটুকু দোষে
যাদের হাতের থেকে কেড়ে নিলে বেহালার ছড়
মাঝে মাঝে পা ছড়িয়ে বসে, কেন তবে কেঁদে ওঠো
তাহাদের‌ সিম্ফনির সুরে?

বরং, কিছুদিন চুপ থাকো। প্লিজ, লোক হাসিও না আর


তোমার ভর্ৎসনাও ছুঁয়ে থাকি প্রেমে
এত অন্ধকার কথা, তীক্ষ্ণ কাঁটা, মুখখানি আমূল ফেরানো
তবু তাতে আলো পাই, এমন মরণ!
আরো মারো। দাহ করো জমানো জঞ্জাল
গ্লানি থাক। জয়ী হোক শুদ্ধ প্ররোচনা...

আমি তাও মায়া খুঁজি, রোদ, নরম বাতাস
পেয়ে যাই। পাই। ...যাই?

কী যত্নে এ বজ্জাতের গোপন রেখেছ পরিচয়!


গ্যালারি দেখেছে শুধু তোমার কুপিত চোখ
ক্রুদ্ধ পিঠ, লীলাময় বধের ভঙ্গিমা
বধ্যের শ্রীমুখ থেকে খসাওনি মুখোশ
দর্শক পায়নি সুখ, চেনা রক্তের ঘ্রাণ
এরেনায় লেগে থাকা অশ্রু ও ক্ষত

কলোসিয়াম জুড়ে তবুও কি মত্ততা
তবুও কি উন্মত্ত উল্লাস!

প্রতিটি হাততালি জেনো ছিনিয়ে নিয়েছে
গ্লাডিয়েটরের জমা এক কোটি তিন লক্ষ চুমু...
যে ওষ্ঠ এখনো ভেজা, সে ওষ্ঠে অভিশাপ লেখো?

টের পাই, ভালো নেই। নিজেও পেয়েছ ব্যথা
তবু কত আদরে মেরেছো!

আরো, আরো মারো, যদি কাহাকেও দিয়ে থাকো কথা...


ভাঁজ করে তুলেছি আসন
ভেসে গেছে নিরুপায় কোষাকুষি, ঘট ও পল্লব
খড়ের কাঠামোটুকু তবু ছুঁয়ে থাকি...

ভালোবাসা পুড়ে গেলে এমন সুগন্ধ হয়!
চোখের জলেও এত মায়া?

পণ্ড হয়ে গেছে পুজো অকাল বর্ষণে
বিসর্জনের আগে তার পাশে বসি
চুপ করে, যেমনটি স্বপ্নে কতবার!
গলে যাওয়া ঠোঁট আর অন্ধ চোখে খুঁজি
আলো। চারিদিকে অথৈ সাগর...

শেষবার খোড়ো বুকে কান রাখি
শুনে নিই ভেজা সুর, অশ্রুত শিবরঞ্জনী

তারপর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিই জলে!


পশ্চিমে তো আমি থাকি
পূবে ছিল জন্মান্তর, অতুল-আশ্রয়

মাধবীকুঞ্জের দ্বার বন্ধ হয়ে গেল
দুটি দিক খোলা আজ -- উত্তর দক্ষিণ

এত ভালোবাসা বুকে
উত্তরের বাণপ্রস্থ সে আমার নয়

তার থেকে দক্ষিণ‌ অনেক ভাল
ওই দিকে চলে যাব, খোলা আছে অন্য এক দ্বার

১০
তিনমাস বাদে মৃতদেহ উঠে বসে ফের
তিনমাস বাদে মৃতদেহ টের পায় কিছুই মরেনি
এত যে আগুন, এত লেলিহান ঘৃণা
জ্বলন্ত চিতার মতো কী তবে পোড়ালো?

কিছু নয়! কিচ্ছুটি নয়?
পুড়ে গেছে স্বপ্ন গন্ধ মায়া অঙ্গীকার
সুমুখে রয়েছে আঁকা বন্ধ দরোয়াজা
একবার-দুইবার-তিনবার ধাক্কা দিয়ে বলে
পেতেছি আঙ্গুল দগ্ধ, এই দেখো, একফোঁটা আলো
আর দাও জলধারা...

খোলে না কপাট, শুধু
চৌকাঠে জড়িয়ে থাকে অকারণ ছায়া

ফেসবুক মন্তব্য