চয়েস

সর্বাণী রিঙ্কু গোস্বামী

গাপ্পার বাবাকে আমরা কেউ কোনোদিন হাসতে দেখিনি! আমরা বলতে আমি নিতে পিকু গদাই ভিকি এমন কি হুলাই আর গাপ্পাও। আমরা ইস্কুল যাই, কানমলা খাই, কাদামাঠে দাপিয়ে ফুটবল খেলি চটি হারাই আবার কানমলা খাই, মাঝেমধ্যে দু চারটে চড় চাপড়ও কিন্তু পৃথিবীতে এতো দুঃখের কি আছে ভেবেই পাইনা। গাপ্পা বলে, ওর বাবা নাকি কিছু খেতেও চায় না সারাদিন। ঐ শুকনো কাঠের মতো শনচুলো বুড়ি পিসিমা অনেক সাধ্য সাধনা করে সকালে দুটো মুড়ি, দুপুরে একগাল ভাত আর রাতে আবার কিছুমিছু মেখে মুখে গুঁজে দেন। তাও নাকি গাল নড়ে না...

কেমন মানুষ রে বাবা! আমাদের তো রাক্ষসের মতো খিদে পায়।ভাত রুটি মুড়ি বিস্কুট যা দাও চেটেপুটে সাফ। হুলাই তো আবার দেওয়াল খুঁটে চুন বালিও খায় এমন কি বললে বিশ্বাস করবে না আমি ওকে টিফিন কেকের মোমকাগজও চিবিয়ে খেয়ে নিতে দেখেছি। আমি দেখতেই এমন ভাব করলো যেন মুখ থেকে বের করে ফেলে দিচ্ছে কিন্তু আমি পষ্ট দেখলাম ওর হাত ফাঁকা। আমাদের সকলের বাবা পাটকলের লেবার, ওর বাবা খালি রিক্সা চালায়। মাকে বলতে মা বললো হুলাইয়ের পেটে কৃমি আছে বোধহয়!

সে যাকগে, বলছিলাম গাপ্পার বাবার কথা। সারাদিন উনি বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যে দেখেন কে জানে। "মেসোমশাই,গাপ্পা আছে?" জিজ্ঞাসা করলেও উত্তর দেন না কিছু। শুনতেই পাননি যেন মনে হয় আর ভেতর থেকে খনখনে গলায় গাপ্পার পিসি একদম... "কে রে!" করে ঝাঁঝিয়ে ওঠে। "এই হতচ্ছাড়াগুলোর জ্বালায় শান্তি নেই গো। আবার এসেছিস?"

ওমা, বিকেলে খেলতে ডাকবো না? তোমার মতো সারাক্ষণই ঘরের ভেতর ঢুকে থাকবো না এই মানুষটার মতো আকাশ দেখবো সারাক্ষণ। একটু কথাও তো বলে না কখনো, কিসের যে এতো দুঃখ কে জানে বাবা!

অনেক অনেক বছর কেটে গেছে তারপর। বড়ো-টড়ো হয়ে আমরা সবাই চারদিকে ছিটকে গেছি সেই ছোট্ট মফস্বল শহর থেকে। মা এখন আমার কাছে থাকে, নাতনির সঙ্গে খুব ভাব। সেদিন ছুটি, দুপুরে মা পুরোনো অ্যালবাম বের করে পুপাইকে পুরোনো গল্প শোনাচ্ছিলো।

হলদে হয়ে যাওয়া অ্যালবামটা থেকে একটা আশ্চর্য গন্ধ বেরোচ্ছিলো ছোটোবেলার। অনসূয়াও বসে বসে আমাদের মফস্বল শহরের গল্প শুনছিলো বুঁদ হয়ে। হঠাতই মনে পড়লো কথাটা... "মা, গাপ্পার বাবাকে তোমার মনে আছে? কথাও বলতো না হাসতোও না... শুনেছি নাকি খেতোও না কিছু। আকাশ দেখতো খালি!" একটুখানি থমকে থেকে মা বললো, "নিজের মুখে বউয়ের মৃত্যুর পরোয়ানা দিয়েছিলো যে!"

"মানে?"

পুপাইয়ের উপস্থিতিও আমার কৌতূহলকে লাগাম পরাতে পারছিলো না আর। "গাপ্পা হওয়ার সময় খুব সংকটজনক অবস্থা, ডাক্তার মত জানতে চেয়েছিলো, বউ না বাচ্চা! সরকার বাবুর মুখ ফসকে বেরিয়েছিল... বাচ্চা। নিজেকে আর সারাজীবন ক্ষমা করতে পারেননি সেই থেকে।"

স্তব্ধ হয়ে যাই, পুপাই আর অনসূয়ার মধ্যে যেকোনো একজনকে বাছতে হলে আমিই বা কি করবো? বুকের মধ্যেটা হঠাৎ কেমন খালি হয়ে যায় যেন। অনেক পেছনে ফেলে আসা একটা মানুষের জন্য কেন যে আজ কাঁদতে ইচ্ছে করে খুব... খুব!

ফেসবুক মন্তব্য